জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ী কোরবানির পশুর হাটে ২০২৬ সালের ২৪ মে, রোববার, বিক্রির জন্য আনা একটি মহিষ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং হাটজুড়ে ছুটে বেড়িয়ে সামনে থাকা লোকজনকে গুঁতা দেয়। এতে অন্তত ছয়জন আহত হন। তাঁদের একজন সেদিনই হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান, আরেকজন পরদিন সোমবার (২৫ মে) জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার পুলিশ দুজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করে। ঘটনাটি ঘটে পবিত্র ঈদুল আজহার চার দিন আগে, যখন সারা দেশের মতো জামালপুরেও কোরবানির পশুর হাটগুলোতে বেচাকেনা চলছিল। জাগো নিউজ ২৪ ঘটনাটির খবর প্রকাশ করে ২৬ মে সকালে।
সানন্দবাড়ী হাটে সেদিন যা ঘটেছিল
জাগো নিউজ ২৪ পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানায়, ঘটনাটি ঘটে উপজেলার চর আমখাওয়া ইউনিয়নের সানন্দবাড়ী হাটে। স্থানীয় আকন্দপাড়া গ্রামের এক ব্যক্তি সেদিন বিক্রির উদ্দেশ্যে কয়েকটি মহিষ নিয়ে হাটে আসেন। হাটে আনার পর একটি মহিষ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে মহিষটি হাটজুড়ে ছোটাছুটি শুরু করে এবং সামনে থাকা লোকজনকে গুঁতা দিতে থাকে।
জামালপুরের স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম জামালপুর নিউজ ২৫ মে প্রথম প্রহরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, প্রতি রোববার সানন্দবাড়ীতে হাট বসে এবং ঘটনাটি ঘটে রোববার সন্ধ্যায়। স্থানীয়দের বরাতে পত্রিকাটি লেখে, হাটে আসার পর মহিষটি হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে এবং হাটের ভেতরে ছোটাছুটি করে মানুষের ওপর চড়াও হয়। দৈনিক ইত্তেফাকও ২৫ মে রাতে স্থানীয়দের বরাতে একই বিবরণ দেয়।
মহিষের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হাটে থাকা মানুষজন আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। জাগো নিউজের হিসাবে এ সময় অন্তত ছয়জন আহত হন। জামালপুর নিউজের প্রথম প্রতিবেদনে চর আমখাওয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জিয়াউল ইসলামের বরাতে বলা হয়, মহিষের আক্রমণে অন্তত সাতজন আহত হয়েছিলেন এবং তাঁদের একজন মারা গেছেন। যাঁদের আঘাত তুলনামূলক কম ছিল, তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে পত্রিকাটি জানায়।
দুজনের মৃত্যু: কে, কোথায়
নিহত দুজনের একজন রুহুল আমিন, পাশের কুড়িগ্রাম জেলার রাজিবপুর উপজেলার জাউনিয়ার কড়াইডাঙ্গীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি হাটে এসেছিলেন এবং মহিষের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।
অপরজন মজিবুর রহমান, সানন্দবাড়ী এলাকার চর মাদার গ্রামের মৃত নুর মোহাম্মদের ছেলে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। ইত্তেফাক জানায়, সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। জাগো নিউজের বিবরণ অনুযায়ী, অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সেখানে পাঠানো হয় এবং সোমবার (২৫ মে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
মৃত্যুর সময় নিয়ে প্রতিবেদনগুলোর বর্ণনায় সামান্য পার্থক্য আছে। জাগো নিউজ প্রতিবেদনের শুরুতে সোমবার রাত এবং ভেতরে সোমবার সন্ধ্যার কথা লিখেছে; ইত্তেফাক ও জামালপুর নিউজ লিখেছে সোমবার বিকেল। জামালপুর নিউজের প্রথম প্রতিবেদনে তাঁকে জামালপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলা হলেও পরের প্রতিবেদনসহ অন্য প্রতিবেদনগুলোতে হাসপাতালটির নাম জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল।
পুলিশ যা বলেছে
দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, হঠাৎ মহিষের গুঁতায় আহত মজিবুর রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এবং এ ঘটনায় তখন পর্যন্ত দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় থানায় কেউ অভিযোগ করেননি।
রোববার রাতে জামালপুর নিউজকে ওসি মো. আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, মহিষটি হঠাৎ পাগলের মতো আচরণ শুরু করে এবং সেটির আক্রমণে একজনের মৃত্যু হয়েছে। দ্বিতীয় মৃত্যুর পর তিনি ইত্তেফাককে বলেন, মহিষের আক্রমণে আহত মজিবুর রহমান মারা যাওয়ায় এ ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়াল দুই।
২৬ মে সকাল পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে মহিষটি কেন হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। মহিষটির মালিক বা হাট পরিচালনাকারীদের কোনো বক্তব্যও সেগুলোতে আসেনি। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় অভিযোগ দায়ের করেনি।
দেওয়ানগঞ্জ ও সানন্দবাড়ী হাট
দেওয়ানগঞ্জ ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলার উত্তর প্রান্তের একটি উপজেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ২৬৭.৫১ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলা, দক্ষিণে ইসলামপুর, পূর্বে বকশীগঞ্জ উপজেলা ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য, পশ্চিমে গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি উপজেলা। ব্রহ্মপুত্র, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও জিঞ্জিরাম এখানকার প্রধান নদী। দেওয়ানগঞ্জ থানা গঠিত হয় ১৮৭৪ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে।
উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেওয়ানগঞ্জের জনসংখ্যা ২ লাখ ৮৮ হাজার ১৬৬, পরিবার ৬২ হাজার ৬৮৭টি। উপজেলায় একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন: বাহাদুরাবাদ, চর আমখাওয়া, চিকাজানী, চুকাইবাড়ী, ডাংধরা, দেওয়ানগঞ্জ, হাতীভাঙ্গা ও পাররামরামপুর। নারায়ণগঞ্জ থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেলপথ এই উপজেলার ভেতর দিয়ে গেছে। উইকিপিডিয়ার বিবরণে এলাকাটির পুরোনো নাম পদ্দত নগর; ১৭৭২ সালে এটি রংপুর জেলার অধীনে ছিল, ১৮২১ সালে বগুড়ায় এবং ১৮৬৬ সালে ময়মনসিংহে যুক্ত হয়।
এখানকার মানুষের জীবিকা প্রধানত কৃষিনির্ভর। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে উপজেলার ৬৮.৪৯ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ৯.০৭ শতাংশের ব্যবসা। প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, সরিষা, আখ, আলু, ছোলা, মসুর ও সবজি; পাট, চাল, সরিষা ও আলু এখান থেকে বাইরে যায়। উপজেলায় একটি গবাদিপশু প্রজনন কেন্দ্রও রয়েছে।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেওয়ানগঞ্জে হাটবাজারের সংখ্যা ১৬, মেলা দুটি। উল্লেখযোগ্য হাটবাজারের তালিকায় প্রথমেই আছে সানন্দবাড়ী হাট; অন্যগুলো চর মাগুরিহাট, বেলতলী বাজার, ঝালুর চর বাজার ও দেওয়ানগঞ্জ মেলা। একই এলাকার সানন্দবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৭ সালে। হাটটি যে চর আমখাওয়া ইউনিয়নে, বাংলাপিডিয়ায় তার আয়তন দেখানো হয়েছে ৮ হাজার ৮৪৮ একর; জনশুমারির তথ্যে সেখানে পুরুষ ১৯ হাজার ১৪৬ ও নারী ২০ হাজার ৪৮১ জন।
চিকিৎসার জন্য উপজেলায় একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দুটি স্যাটেলাইট ক্লিনিক, আটটি পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র ও ২৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে বলে বাংলাপিডিয়া জানায়। সানন্দবাড়ীর ঘটনায় গুরুতর আহত একজনকে প্রথমে এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছিল, পরে জেলা সদরের হাসপাতালে।

রাজিবপুর: ব্রহ্মপুত্রঘেরা চরের উপজেলা
নিহত রুহুল আমিনের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলায়, যা দেওয়ানগঞ্জের ঠিক উত্তরে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলাটির আয়তন ১১১.০৩ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭৩ হাজার ৩৭৩। এর পূর্বে ভারতের আসাম রাজ্য; উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে ব্রহ্মপুত্র নদ। প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র, হলহলি ও জিঞ্জিরাম। চর রাজিবপুর থানা হয় ১৯৭৭ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালের ১ আগস্ট। এখানে তিনটি ইউনিয়ন: কোদালকাটি, চর রাজিবপুর ও মোহনগঞ্জ।
রাজিবপুরের ৭৭.৭৬ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। প্রধান ফসল ধান, পাট, সরিষা, মাষকলাই, বাদাম, চীনা ও কাউন। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় উপজেলার বিলুপ্তপ্রায় যানবাহনের মধ্যে পালকির পাশাপাশি গরু, মহিষ ও ঘোড়ার গাড়ির নাম আছে; অর্থাৎ একসময় এই চর এলাকায় মহিষের গাড়িও চলত।
কুড়িগ্রাম রংপুর বিভাগের জেলা। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ২০২৬ সালের ৭ মে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য তুলে ধরে জানায়, এবার রংপুর বিভাগে কোরবানির পশুর চাহিদা ১৪ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭টি, বিপরীতে প্রস্তুত ২০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি, উদ্বৃত্ত ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৪১০টি। এর মধ্যে কুড়িগ্রামে প্রস্তুত ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯১৯টি পশু, চাহিদা ২ লাখ ৬১ হাজার ২৪৬টি। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভাগের আট জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২১ হাজার খামার রয়েছে, আর প্রায় আড়াই লাখ খামারি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য সাড়ে ৮ লাখের মতো গরু প্রস্তুত করেছেন। খামারিরা জানান, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পশু দেশের অন্যান্য এলাকায় পাঠানো হবে।
জামালপুর জেলা ও এবারের কোরবানির পশু
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জামালপুর জেলার আয়তন ২ হাজার ১১৫.১৬ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭৪। জেলাটি গঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। এর সাতটি উপজেলা: জামালপুর সদর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ ও সরিষাবাড়ী। যমুনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বানার ও ঝিনাই প্রধান নদী। জেলার ৬৫.৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। জেলার লোকসংস্কৃতির বিবরণে বাংলাপিডিয়া ষাঁড়ের লড়াই, ঘোড়দৌড়, লাঠিখেলা এবং বর্ষায় যমুনায় নৌকাবাইচের কথা উল্লেখ করেছে।
ঈদের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, ১৬ মে, দৈনিক ইত্তেফাক জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বরাতে জানায়, জামালপুরে প্রায় ১২ হাজার খামারির কাছে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৬৫টি গবাদিপশু, আর জেলার চাহিদা প্রায় ৮২ হাজার। চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ২৫ হাজার পশু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির কথা ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খামারিরা কয়েক মাস ধরে খড়, ঘাস, ভুসি ও ভুট্টার মতো দেশীয় খাবার খাইয়ে পশু মোটাতাজা করছিলেন। চাহিদার চেয়ে বেশি পশু থাকায় তাঁরা স্বস্তিতে থাকলেও গো-খাদ্যের বাড়তি দাম লাভ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছিল। হাটের পাশাপাশি অনলাইনেও বেচাকেনা বাড়ছিল; একজন খামারি ইত্তেফাককে জানান, ছবি ও ভিডিওর সঙ্গে ওজন উল্লেখ করে কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে গরু বিক্রি হচ্ছিল।
জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ টি এম হাবিবুর রহমান তখন ইত্তেফাককে বলেন, ছোট খামারিরাও এখন বড় আকৃতির গরু পালন করে লাভবান হচ্ছেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে খামারিদের নিয়মিত খোঁজখবর ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, এবং জেলায় বিভিন্ন পশুর হাটও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সারা দেশে কোরবানির প্রস্তুতি ও ঈদের তারিখ
২০২৬ সালের ৩ মে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্যমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে জানান, দেশে মোট ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে, আর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট ও দুম্বাসহ অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি (বাংলা ট্রিবিউন)।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আরও জানান, আগের বছরের ঈদুল আজহায় প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছিল এবং ৩৩ লাখের বেশি পশু অবিক্রিত থেকে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশীয় উৎপাদন দিয়েই কোরবানির পুরো চাহিদা পূরণ সম্ভব, তাই বিদেশ থেকে পশু আমদানির প্রয়োজন হবে না; পশু পরিবহনে যাতে প্রতিবন্ধকতা না থাকে, সে জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১৮ মে সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বৈঠক শেষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি জানায়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ফলে ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। ঈদুল আজহা নবী ইবরাহীম (আ.), তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও ছেলে ইসমাঈলের ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত উৎসব; আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় মুসলিমরা এ সময় পশু কোরবানি দেন। সানন্দবাড়ীর ঘটনাটি ঘটে ঈদের আগের শেষ রোববারের হাটে।

বাংলাদেশে মহিষ: সংখ্যা ও ব্যবহার
দেশের গবাদিপশুর মধ্যে মহিষ সংখ্যায় অনেক কম। ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানান, দেশে গরু ২ কোটি ৪৭ লাখ, ছাগল ২ কোটি ৬৭ লাখ ৭৪ হাজার এবং মহিষ ১৫ লাখ ৮ হাজার (প্রথম আলো)।
বাংলাপিডিয়া মহিষকে মূলত হালচাষ ও গাড়ি টানার প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে মহিষের কোনো উল্লেখযোগ্য জাত নেই, এবং কাঁচা ঘাসের অভাবই মহিষ পালনের প্রধান সীমাবদ্ধতা, কারণ প্রতিটি মহিষের প্রতিদিন প্রচুর ঘাস লাগে।
২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর সাভারের মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারে বাংলাদেশ বাফেলো অ্যাসোসিয়েশনের বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, মহিষ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলেও দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। তাঁর মতে, প্রাণিসম্পদ খাতে মহিষের গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি, আর চারণভূমির অভাব ও অবহেলায় মহিষের সংখ্যা কমছে। তিনি জানান, মহিষের দই ইতোমধ্যে বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, এবং মহিষের দুধ থেকে চিজসহ আরও নানা পণ্য তৈরি সম্ভব (খবর সংযোগ)।
কোরবানির জন্য মহিষ পালন হয় মূলত চর ও উপকূলীয় এলাকায়। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৬ সালের ৫ মে বাসস পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের যে হিসাব প্রকাশ করে, তাতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুর মধ্যে গলাচিপা উপজেলায় ৫৫৯টি, দশমিনায় ৫৫৬টি, সদর উপজেলায় ৩৫৫টি এবং বাউফলে ৩২২টি মহিষ ছিল। সেখানকার চর কালাইয়া গ্রামের এক মহিষপালক বাসসকে বলেন, কোরবানির সময় মহিষের চাহিদা বাড়ে।
মহিষ প্রাণীটি কেমন
গৃহপালিত মহিষ ইংরেজিতে ওয়াটার বাফেলো নামে পরিচিত। উইকিপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী এর দুটি ধরন: ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে পশ্চিমে বলকান অঞ্চল, মিসর ও ইতালি পর্যন্ত বিস্তৃত নদী মহিষ (রিভার বাফেলো), আর আসাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে চীনের ইয়াংসি উপত্যকা পর্যন্ত জলাভূমির মহিষ (সোয়াম্প বাফেলো)। নদী মহিষের ক্রোমোজোম ৫০টি, সোয়াম্প মহিষের ৪৮টি।
প্রাপ্তবয়স্ক মহিষের ওজন সাধারণত ৩০০ থেকে ৫৫০ কেজি, তবে ১ হাজার কেজির বেশি ওজনের মহিষও দেখা গেছে। নদী মহিষের শিং নিচে ও পেছনের দিকে বেড়ে তারপর ওপরের দিকে প্যাঁচানো হয়ে ওঠে; সোয়াম্প মহিষের শিং বাইরের দিকে বেড়ে অর্ধবৃত্তাকারে বাঁকে। শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণে মহিষের কাদাপানি, নদী বা পানির ছিটার দরকার হয়, আর সোয়াম্প মহিষ কাদাভরা গর্তে গড়াগড়ি দিতে পছন্দ করে।
ধারণা করা হয়, নদী মহিষকে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বছর আগে পশ্চিম ভারতে পোষ মানানো হয়েছিল, আর সোয়াম্প মহিষকে পোষ মানানো হয় ৩ থেকে ৭ হাজার বছর আগে। উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত হিসাবে বিশ্বে গৃহপালিত মহিষের আনুমানিক সংখ্যা ২০ কোটি ৮০ লাখ, পাঁচ মহাদেশের ৭৭টি দেশে। একই বিবরণে দুধ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ২০২০ সালে বাংলাদেশের মহিষের দুধ উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৩৫ হাজার ৭৯০ টন।

বড় গবাদিপশু সামলানোর ঝুঁকি নিয়ে কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা
বড় গবাদিপশু সামলানোর ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাজ্যের কর্মস্থল নিরাপত্তা সংস্থা হেলথ অ্যান্ড সেফটি এক্সিকিউটিভ (এইচএসই) ২০১২ সালে খামারিদের জন্য একটি তথ্যপত্র প্রকাশ করে। গরু সামলানো নিয়ে লেখা ওই তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, গবাদিপশু সামলানোর কাজে সব সময় চাপা পড়া, লাথি, ধাক্কা বা শিংয়ের গুঁতায় আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রতিবছর এ কাজে প্রাণহানি ও আঘাতের ঘটনা ঘটে, যার পেছনে প্রায়ই থাকে দুর্বল সরঞ্জাম, পশু সরানোর অকার্যকর পদ্ধতি এবং পশুর শক্তি, গতি বা আচরণকে খাটো করে দেখা।
সংস্থাটির মতে, যে পশু নিয়মিত হাতে সামলানো হয় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ে। তথ্যপত্রে পশু সামলানো মানুষদের শান্তভাবে, যথাসম্ভব কম চিৎকার, অধৈর্য ও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ ছাড়া কাজ করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে, জোড়াতালির গেট বা বেড়া যথেষ্ট নয়, এবং ভালো সতর্কতা থাকলেও গবাদিপশুর ঝুঁকিকে কখনো খাটো করে দেখা উচিত নয়। এইচএসই আরও জানিয়েছে, গবাদিপশু-সংক্রান্ত অনেক দুর্ঘটনা ঘটে অবসরের বয়স পেরোনো মানুষদের ক্ষেত্রে, যখন তাঁরা তুলনামূলক কম ক্ষিপ্র থাকেন।
নির্দেশিকাটি যুক্তরাজ্যের খামারের জন্য লেখা, বাংলাদেশের খোলা পশুর হাটের জন্য নয়। সানন্দবাড়ীর ঘটনার প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে হাটে পশু বাঁধা বা আলাদা রাখার কী ব্যবস্থা ছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, জামালপুর নিউজ, বাংলা ট্রিবিউন, বাসস, প্রথম আলো, খবর সংযোগ, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, যুক্তরাজ্যের হেলথ অ্যান্ড সেফটি এক্সিকিউটিভ (এইচএসই)




মন্তব্য
(০)