আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ২০২৬ সালের মৌসুমে বিদেশে আম রপ্তানি শুরু হয় ২০২৬ সালের ৫ জুন, শুক্রবার বিকেলে। সেদিন দুই টন খিরসাপাত ও ব্যানানা ম্যাংগো জাতের আম ইতালিতে পাঠানোর মধ্য দিয়ে জেলার এ মৌসুমের রপ্তানি কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। পরদিন সকালে জাগো নিউজ২৪ এ খবর প্রকাশ করে।
আমগুলো পাঠান শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তি ইউনিয়নের চাত্রা গ্রামের আমচাষি শামীম রেজা সোহাগ। তিনি পত্রিকাটিকে জানান, তার বাগানে প্রায় ৫০ টন রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন হলেও সব আম বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয় না, ফলে প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
শিবগঞ্জের এক আমচাষির রপ্তানির পথ
এই চাষির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে তিনি রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন শুরু করেন। ২০২৩ সালে তিনি প্রথমবার ১২ টন আম বিদেশে পাঠান। পরে ২০২৫ সালে বিভিন্ন দেশে ৩৫ টন আম রপ্তানি করেন। ২০২৬ সালে তিনি মৌসুমের একেবারে শুরুতেই রপ্তানি শুরু করেন, ৫ জুন দুই টন আম ইতালিতে পাঠিয়ে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলি জাগো নিউজকে বলেন, 'নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনের মাধ্যমে বিদেশি বাজার সম্প্রসারণে কাজ চলছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের চাহিদা বাড়ছে।'
বাংলাদেশের আমের জন্য ইতালি নতুন বাজার নয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, ২০১৫ সালে রপ্তানি শুরুর সময় প্রথম ক্রেতা ছিলেন যুক্তরাজ্য, ইতালি ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা। ২০২৫ মৌসুমে ইতালি ২৬৪ টনের বেশি আম নেয়, যা যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ। পত্রিকাটি লিখেছে, ইতালির চাহিদার ধরন অনেকটা যুক্তরাজ্যের বাজারের মতো।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০২৬ সালের আমের মৌসুম
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয় এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ২০২৬ সালের ১৬ মে জানায়, এই লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের তুলনায় ৯১২ মেট্রিক টন বেশি; আগের বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। বাংলাদেশ প্রতিদিন ২০২৬ সালের ১ মে জানায়, জেলার পাঁচ উপজেলার ওই ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে প্রায় ৯০ লাখ আমগাছ রয়েছে।
গত এক দশকে জেলায় আমের আবাদ বেড়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার জেলার তৎকালীন ডিএই উপপরিচালক মনজুরুল হুদার বরাতে জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তখন ২৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে ১৯ লাখ আমগাছ ছিল এবং বছরে উৎপাদন হতো ২ লাখ ৪০ হাজার টন। পত্রিকাটির হিসাবে জেলায় আমের জাত প্রায় ৩৫০টি।
এ মৌসুমে আম পাড়ার কোনো ক্যালেন্ডার বা সময়সূচি বেঁধে দেওয়া হয়নি। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু ছালেহ মো. মুসা জানান, ১১ মে একটি মতবিনিময় সভায় আমচাষিদের সম্মতিতে এ বছর আম পাড়ার জন্য কোনো ক্যালেন্ডার নির্ধারণ না করার সিদ্ধান্ত হয়। গাছে আম পাকলেই তা বাজারে বিক্রি করা যাবে, চাষিদের সুবিধার কথা ভেবেই এ সিদ্ধান্ত। আমের ওজন নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার কথাও তিনি জানান।
বাসস আরও জানায়, ১৪ মে, বৃহস্পতিবার থেকে জেলার কয়েক জায়গায় গুটি জাতের ও গোপালভোগ জাতের পাকা আম পাওয়ার খবর মেলে। চাষিরা আশা করছিলেন, ২০ থেকে ২৫ মের মধ্যে গুটি ও গোপালভোগ আম পাড়া শুরু হবে। জেলার সবচেয়ে বড় আমের বাজার কানসাটের এক আড়তদার সংস্থাটিকে বলেন, আড়ত প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ২০ মের পর থেকে অল্প অল্প করে আম কেনা শুরুর আশা করছেন তিনি।
চাষিদের অভিযোগও ছিল। শিবগঞ্জের আমচাষি মনিরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ৪০ কেজিতে এক মণ হওয়ার কথা থাকলেও জায়গাভেদে ৫০ থেকে ৫৫ কেজিতে এক মণ দিতে হয়। তার ভাষ্য, প্রান্তিক চাষি যে আম ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন, সেই আম ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তিনি জেলা প্রশাসকসহ সরকারের হস্তক্ষেপ চান। একই প্রতিবেদনে ড. ইয়াসিন আলি বলেন, জেলার আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ ও ভৌগোলিক কারণে এখানকার আম অন্য জেলার তুলনায় সুস্বাদু, তবে এখানে আম কিছুটা দেরিতে পাকে।
মৌসুমের বসন্তকাল সহজ ছিল না। বাংলাদেশ প্রতিদিন ২০২৬ সালের ১ মে জানায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টি ও দুবার কালবৈশাখী ঝড় হয়েছে। চাষিরা অভিযোগ করেন, স্থানীয় পাম্পে চাহিদামতো জ্বালানি তেল না পাওয়ায় শিলাবৃষ্টির পর ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে পারছেন না। জবাবে ডিএইর উপপরিচালক বলেন, অনেক চাষি না বুঝে বেশি স্প্রে করছেন এই ধারণায় যে স্প্রে করলেই ফলন বাড়বে, যা ঠিক নয়। তার মতে, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে না, আর কৃষকদের কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি তেল দেওয়া হচ্ছে।
জেলা ও তার আমের অঞ্চল
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আয়তন ১ হাজার ৭০২.৫৫ বর্গকিলোমিটার। জেলার উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং পূর্বে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলা। জেলাটি বরেন্দ্র ভূমি, দিয়াড় ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত; প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও পাগলা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নবাবগঞ্জ ছিল মালদহ জেলার একটি থানা; দেশভাগের পর এটি রাজশাহী জেলার মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়।
রপ্তানিকারক চাষির উপজেলা শিবগঞ্জ জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড়, আয়তন ৫২৫.৪৩ বর্গকিলোমিটার, যা জেলার মোট আয়তনের প্রায় ৩০.৮৬ শতাংশ। বাংলাপিডিয়া শিবগঞ্জের প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় প্রথমেই রেখেছে আম, এরপর গুড়, রেশমি শাড়ি, সুতি কাপড় ও লাক্ষা। উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাটবাজারের মধ্যে কানসাট হাটের নামও রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে লেখা একই ভুক্তি অনুযায়ী, উপজেলার ৫৯.২৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে বেশির ভাগ আম চাষ হয় বসতবাড়ির বাগানে এবং প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলা রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর। দেশের সেরা কিছু বাগান গঙ্গার প্লাবনভূমিতে, যেখানে মাটি গভীর পলি দোআঁশ। আমগাছে মুকুল আসে জানুয়ারি থেকে মার্চে; এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধরায় ক্ষতি করে, আর প্রতি হাজার ফুলের মধ্যে মোটামুটি এক বা দুটি পরিপক্ব ফলে পরিণত হয়।
একই জ্ঞানকোষ অনুযায়ী, অ্যানাকার্ডিয়েসি গোত্রের আম (Mangifera indica) কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারসহ উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের আদি ফল। মোগল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) দারভাঙ্গার কাছে প্রায় এক লাখ আমগাছ লাগিয়েছিলেন, যাকে উপমহাদেশের প্রথম সুসংগঠিত আমবাগান ধরা হয়। কলমের গাছে চতুর্থ বছর থেকে ফল ধরে এবং প্রায় ৪৫ বছর পর্যন্ত ফলন দেয়, আর বীজের চারা থেকে হওয়া গাছ ৬০ বছরেরও বেশি সময় ফল দিতে পারে।

খিরসাপাত: চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিআই আম
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিমসাগর নামে বেশি পরিচিত খিরসাপাত আম ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। ইলিশ ও জামদানির পর এটি ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় জিআই পণ্য। জিআই এমন পণ্যকে চিহ্নিত করে, যার গুণাগুণ তার উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে যুক্ত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিদের পক্ষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে (ডিপিডিটি) আবেদন করেছিল। শিল্প মন্ত্রণালয়ে বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকের হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয়।
তখন জানানো ব্যবস্থা অনুযায়ী, জিআই চিহ্ন ব্যবহারের অনুমোদিত ব্যবহারকারী হতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিদের ডিপিডিটিতে নিবন্ধন করতে হবে, পরে ডিপিডিটি তাদের সনদ দেবে। বারির আম গবেষক সরফ উদ্দিন পত্রিকাটিকে বলেন, আশ্বিনার পর খিরসাপাতই দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া দ্বিতীয় জাত। পত্রিকাটি আরও উল্লেখ করে, প্রায় নয় বছর আগে ভারত খিরসাপাতি (হিমসাগর) ও লক্ষ্মণভোগকে পশ্চিমবঙ্গের জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করেছিল।
বাংলাদেশের আম রপ্তানিতে খিরসাপাতও একটি জাত। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, দেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া জাতগুলোর মধ্যে মাত্র সাত বা আটটি রপ্তানি হয়; চালানের প্রায় ৮০ শতাংশই আম্রপালি, অন্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে হিমসাগর, ল্যাংড়া, বারি-৪ ও ফজলি।

ব্যানানা ম্যাংগো: থাইল্যান্ডের একটি জাত
ইতালির চালানের দ্বিতীয় জাত ব্যানানা ম্যাংগো আসলে থাইল্যান্ডের নাম ডক মাই জাত। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৭ সালের জুলাইয়ে জানায়, এটি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের বিজ্ঞানীরা ২০১১ সালে প্রথমবার জাতটি এনে রোপণ করেন। ২০১৩ সালে কেন্দ্রটি চাষিদের কাছে চারা বিক্রি শুরু করে এবং ২০১৭ সাল নাগাদ প্রতিটি ৬০ টাকা দরে ৪ হাজারের বেশি চারা বিক্রি করে।
কলার মতো আকৃতির কারণে বাংলাদেশের চাষিরা একে ব্যানানা ম্যাংগো বলেন। ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফলটি ৯ থেকে ১১ ইঞ্চি লম্বা, ওজন ৩৫০ থেকে ৪৫০ গ্রাম, পাকলে সোনালি হলুদ রং ধরে; খেতে খুব মিষ্টি, সুগন্ধি ও প্রায় আঁশহীন, আর আঁটি চ্যাপ্টা হওয়ায় শাঁস বেশি থাকে। প্রতিবেদনে জাতটিকে মধ্য মৌসুমের আম বলা হয়, যা জুলাইয়ে পাকে। সদর উপজেলার বুলনপুরের এক ব্যবসায়ী প্রায় ৩৫০টি গাছ লাগিয়েছিলেন, আমনুরার আরেক চাষির তিন বিঘা জমিতে বাগান ছিল। কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. সাইফুর রহমান তখন বলেছিলেন, জাতটি অনেক দেশে রপ্তানি হবে বলে তিনি আশা করেন।
২০২৬ মৌসুমের আগে বাংলাদেশের আম রপ্তানি
ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জানায়, বাংলাদেশে বছরে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন হয়, যার দেশীয় বাজারের মূল্য ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২৩টি জেলায় ৭২টি জাতের বাণিজ্যিক চাষ হয়। রপ্তানি চলে মে মাসের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত।
একই প্রতিবেদনে ডিএইর রপ্তানির হিসাব ছিল: ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩২১ টন এবং সেপ্টেম্বরে মৌসুম শেষে ২০২৫ সালে ২ হাজার ১৯৪ টন। ২০২৫ সালে আম গেছে ২৬টি দেশে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছে:
- যুক্তরাজ্য: ৬৮৬ টন
- সৌদি আরব: ৩৫৬ টনের বেশি
- ইতালি: ২৬৪ টনের বেশি
- কুয়েত: ১৬৭ টনের বেশি
- কাতার: ১৬৩ টন
- চীন: ৫ টন, নতুন গন্তব্য
ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান এই ঘুরে দাঁড়ানোর কৃতিত্ব দেন আমের মান ও পরিমাণ দুটোই বাড়াকে। বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর বলেন, আগের বছর পরিবহন ভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছিল; তিনি ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট সুবিধার অভাবের কথাও তোলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের তৎকালীন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরফ উদ্দিন বলেন, রপ্তানি বাড়াতে যে অবকাঠামো ও নীতি দরকার, বাংলাদেশ তা গড়ে তোলেনি। তার হিসাবে বর্তমান সক্ষমতায় রপ্তানি প্রায় ৪ হাজার টনে আটকে থাকে, আর সমন্বিত উদ্যোগেও ৮ হাজার টন ছাড়ানো কঠিন হবে। ওইসিডির হিসাব উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, ২০২৪ সালে বিশ্বে টাটকা আমের রপ্তানি ছিল ২১ থেকে ২২ লাখ টন, যাতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ০.১ শতাংশ।
ফ্রেশপ্লাজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ মৌসুমের রপ্তানি শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৯ মে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইনে ১৩ টন আম পাঠানো হয়।
রপ্তানিযোগ্য আম প্রকল্প ও রাজশাহী অঞ্চল
ইউএনবি ২০২৩ সালের মে মাসে জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প চলছে ২০২২ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত, ১৫ জেলার ৪৬টি উপজেলায়, মোট ব্যয় ৪৭ কোটি টাকা। সে বছর ঢাকার শ্যামপুরের কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে কৃষিসচিব রপ্তানির উদ্বোধন করেন। আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৭৫৭ টন, আর ২০২৩ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার টন।
দুই বছর পর, ২০২৫ সালের ৩০ জুন দ্য ডেইলি অবজারভার রাজশাহী আঞ্চলিক ডিএইর তথ্য তুলে ধরে জানায়, তিন মৌসুমে রপ্তানির জন্য নির্ধারিত ৪ হাজার ৬৪৮ টন আমের মধ্যে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ২৭.৮৮ টন। ২০২৫ সালে অঞ্চলটিতে রপ্তানিযোগ্য আমের উৎপাদন ধরা হয় ৬ হাজার ৭২০ টন, যার ৬ হাজার টনই চাঁপাইনবাবগঞ্জে। জুনের শেষ নাগাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৭ টন ও নওগাঁ থেকে ৪.৮ টন আম রপ্তানি হয়েছিল।
আগের তিন মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলের হিসাব ছিল এমন:
- ২০২১-২২: রপ্তানির জন্য নির্ধারিত আম উৎপাদন ৫৫০ টন, রপ্তানি ২২২.৮৮ টন
- ২০২২-২৩: উৎপাদন ২ হাজার ৫২৮ টন, রপ্তানি ৬০৬ টন
- ২০২৩-২৪: উৎপাদন ১ হাজার ৫৭০ টন, রপ্তানি ১৯৯ টন
একই প্রতিবেদনে প্রকল্প পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, দেশের আম রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে রাজশাহী অঞ্চল থেকে; ২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার টন; রাজশাহী থেকে ঢাকায় পরিবহনের সময় প্রায় ১০ শতাংশ আম নষ্ট হয়; আর বেশি কার্গো ভাড়া ও বিমানে সীমিত জায়গা বড় সমস্যা। রাজ চাপাই অ্যাগ্রো ফুড প্রডিউসার্সের সভাপতি আনোয়ারুল হক বলেন, রাজশাহীতে একটি প্যাকিং হাউস স্থাপনের জন্য তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন। তার মতে, ঢাকার শ্যামপুরের একটিমাত্র প্যাকেজিং কেন্দ্র দিয়ে বড় পরিসরে আম রপ্তানির আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হাফিজুর রহমান খান পত্রিকাটিকে বলেন, প্যাকেজিং, গ্রেডিং ও হিমাগারের ঘাটতি এবং সীমিত বিমান কার্গো সেবা অগ্রগতি ধীর করছে; রপ্তানি চুক্তিতে কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, আর বেশি কার্গো ভাড়া ও দুর্বল বন্দর অবকাঠামো আরও বাধা তৈরি করছে। পত্রিকাটি জানায়, রপ্তানিযোগ্য আম বিক্রি করতে না পেরে চাষিদের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছে স্থানীয় সুপারশপ।

রপ্তানির চালানকে যেসব ধাপ পেরোতে হয়
বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিটি টাটকা ফলের চালান উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন, ২০১১ (২০১১ সালের ৫ নম্বর আইন) এর আওতায় পড়ে। আইনটি অনুযায়ী, স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক জাতীয় উদ্ভিদ সংগনিরোধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আমদানিকারক দেশের উদ্ভিদস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত শর্ত অনুযায়ী উদ্ভিদ ও উদ্ভিজ্জ পণ্যের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সে অনুযায়ী ফাইটোস্যানিটারি সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা এই কর্তৃপক্ষের কাজ। আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ সংরক্ষণ কনভেনশনে (আইপিপিসি) বাংলাদেশের যোগাযোগকেন্দ্র ঢাকার খামারবাড়িতে ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং।
আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী, রপ্তানির জন্য জমা দেওয়া প্রতিটি চালান আমদানিকারক দেশের শর্ত মেনে একজন উদ্ভিদ সংগনিরোধ কর্মকর্তাকে পরীক্ষা করতে হয়, এবং চালান উপযুক্ত হলে তিনি ফাইটোস্যানিটারি সনদ দেন। ১৮ ধারা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের দেওয়া ফাইটোস্যানিটারি সনদ ছাড়া কোনো রপ্তানিকারক কোনো উদ্ভিদ বা উদ্ভিজ্জ পণ্য রপ্তানি করতে পারেন না।
উদ্ভিদ ও উদ্ভিজ্জ পণ্যের বাণিজ্যের মাধ্যমে পোকামাকড় ছড়ানো ঠেকানোই এই আইনের উদ্দেশ্য। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় তিন ডজন প্রজাতির পোকা আমের ক্ষতি করে; এর মধ্যে রয়েছে আমের হপার বা শোষক পোকা, আমের উইভিল পোকা, কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা, ডগা ছিদ্রকারী পোকা ও আমের মাছি পোকা (Dacus dorsalis)। রোগের মধ্যে রয়েছে অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, ডাইব্যাক বা আগা মরা, পাউডারি মিলডিউ ও ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতার দাগ।
বাগান পর্যায়ে আমের জেলাগুলোর চাষিরা ভরসা রেখেছেন ফ্রুট ব্যাগে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২২ সালের জুলাইয়ে জানায়, ২০১৬ সালে প্রায় ৬০ হাজার ব্যাগ দিয়ে এই পদ্ধতির শুরু, আর ২০২২ সালে প্রায় ১২ কোটি ব্যাগ ব্যবহার হয়, যার প্রায় ১০ কোটিই চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ব্যাগ আমকে পোকামাকড়, ঝড়, মুষলধারে বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। প্রতিটি ব্যাগের দাম ৪ টাকা, লাগাতে শ্রমখরচ ১ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী সাধারণ আম যেখানে মণপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়, ব্যাগে বড় হওয়া উন্নতমানের আম বিক্রি করা যায় ৩ হাজার ২০০ টাকায়। ড. সরফ উদ্দিন পত্রিকাটিকে বলেন, ব্যাগ ব্যবহার করলে পরিবহনে অপ্রত্যাশিত ঝামেলা ছাড়াই আম বাজারে পৌঁছানোর বিষয়ে চাষিরা নিশ্চিত থাকতে পারেন।
এই উদ্যোগের আরেকটি অংশ উত্তম কৃষি চর্চা বা গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ)। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২০ সালের জুলাইয়ে জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ গ্যাপ নির্দেশিকার খসড়া করেছে। এতে রপ্তানির জন্য কৃষক ও রপ্তানিকারকদের সনদ লাগবে, খামার থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গ্যাপের নিয়ম মানতে হবে, সনদ প্রতিবছর নবায়ন হবে, পণ্য পরীক্ষাগারে যাচাই হবে এবং থাকবে ১৩ অঙ্কের বাংলাদেশ গ্যাপ নম্বর। তৎকালীন কৃষিসচিব মো. নাসিরুজ্জামান পত্রিকাটিকে বলেন, পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহের কারণেই গ্যাপ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
ছবি: Shamim Ahammed sumon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪, বাসস, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ফ্রেশপ্লাজা, দ্য ডেইলি অবজারভার, ইউএনবি (ঢাকা ট্রিবিউন), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন ২০১১ (আইপিপিসি), বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)