একজন চাষি ধান আর সবজিতে যে ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ার ব্যবহার করেন, সেটি কাঁধে নিয়েই ঢুকলেন নিজের আমবাগানে। হাতল চেপে চাপ তুললেন, নল উঁচু করে স্প্রে করলেন। কুয়াশার মতো দ্রবণ পড়ল নিচের ডালে আর তাঁর নিজের হাতে, অথচ বড় গাছের মাথায় মুকুল ও কচি ফল শুকনোই রইল। যে পোকা দমনের জন্য এত আয়োজন, সেটি রয়ে গেল; কীটনাশকের টাকাটা গেল জলে।
২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর দ্য এগ্রো নিউজ ঠিক এই সমস্যাটি তুলে ধরেছিল: আম, লিচু ও নারকেলের বাণিজ্যিক বাগানে সার সাধারণত নিয়মমতো পড়ে, কিন্তু বড় গাছে রোগপোকা দমনের স্প্রে ঠিকমতো হয় না। প্রতিবেদনে বলা হয়, সবজি, ধান বা ডালশস্যে ব্যবহৃত ন্যাপস্যাক ও হ্যান্ড কম্প্রেশন স্প্রেয়ার আম, লিচু, নারকেল, কাঁঠালের মতো বড় গাছে এবং ডালপালা ছড়ানো পেয়ারা, সফেদা, কুল ও লেবু গাছে উপযোগী নয়। তবু অনেক চাষি সব কাজে একই যন্ত্র চালান; ফলে কীটনাশক, ছত্রাকনাশক বা হরমোন দিলেও কাজ হয় সামান্য, শুধু খরচ বাড়ে।
এই লেখায় জানা যাবে, মাঠের স্প্রেয়ার বাগানে কেন ব্যর্থ হয়, কোন ধরনের স্প্রেয়ার উঁচু গাছের মাথা পর্যন্ত পৌঁছায়, কেনার আগে কী কী দেখতে হয়, যন্ত্র কীভাবে ঠিক করে নিতে হয় এবং যিনি স্প্রে করেন তাঁকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়। তথ্য নেওয়া হয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), এফএও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ নির্দেশিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগ ও মাঠপর্যায়ের গবেষণা থেকে। এখানে কোনো বালাইনাশকের মাত্রা দেওয়া হয়নি: মাত্রা জানাবে বোতলের লেবেল ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।
মাঠের স্প্রেয়ার কেন উঁচু ফলগাছে কাজ করে না
হাতে চালানো ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ার এবং বাজারে "হাইটেক" নামে বিক্রি হওয়া এর উন্নত সংস্করণ হাতলের চাপে দ্রবণকে নলের মাথার নজল দিয়ে বের করে দেয়। ব্যাটারি, বিদ্যুৎ বা জ্বালানিচালিত মোটরের সংস্করণগুলো অল্প সময়ে বেশি জায়গায় আরও সূক্ষ্মভাবে দ্রবণ ছড়ায়। ধানক্ষেত বা সবজির বেডে লক্ষ্য থাকে চালকের কাছেই, তাই সেখানে এসব যন্ত্র ভালো কাজ করে।
ফলগাছ একেবারে আলাদা লক্ষ্য। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, দূরে দূরে লাগানো আমগাছ ছাতার মতো মাথা নিয়ে ২০ মিটারের বেশি উঁচু ও ৩০ মিটার চওড়া হতে পারে। লিচুগাছ ১২ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। নারকেলগাছ ৮ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। মাটিতে দাঁড়িয়ে ছোট নল দিয়ে এমন গাছের মাথা ও ভেতরের অংশে ফোঁটা পৌঁছানো যায় না।
মূল প্রতিবেদনটি সীমারেখা স্পষ্ট করে দিয়েছিল: আনারস, কলা, পেঁপের মতো ছোট ফলগাছের পাতা ও ফল হাতের নাগালে থাকে বলে সাধারণ ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ারে সুরক্ষা দেওয়া যায়; কিন্তু উঁচু আম, লিচু, পেয়ারা, কাঁঠাল বা নারকেলগাছের চারদিকে সমানভাবে স্প্রে করতে হলে অন্য ধরনের স্প্রেয়ার বেছে নিতে হয়।
ঠিকমতো না ভেজানো শুধু অপচয় নয়। ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড আমের শোষক পোকা বা হপারকে আমের সবচেয়ে মারাত্মক ও বিস্তৃত পোকা বলে উল্লেখ করেছে। এরা গাছের কচি অংশের রস চুষে খায় এবং আঠালো মধুরস ছড়ায়, যার ওপর শুটি মোল্ড ছত্রাক জন্মে পাতার খাদ্য তৈরির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। স্প্রে যদি গাছের মাথার মুকুলে না পৌঁছায়, সেখানকার পোকা বেঁচে যায় এবং চাষি বারবার স্প্রে করতে থাকেন।

বাংলাদেশে আম ও লিচুর বাগান
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে ফলবাগান বড় ব্যবসা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উন্নত জাতের আম বেশি হয় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে, এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরে আমের গবেষণাকেন্দ্র ও বাগান গড়ে তুলেছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর এই চার জেলায় ৯৩ হাজার ২৬৬ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে এবং আগের বছর সেখানে ১২ লাখ ৭০ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছিল; ২০২৪ মৌসুমে ওই এলাকার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ লাখ ৫০ হাজার টন।
লিচু মূলত উত্তরাঞ্চলের ফসল। ২০২২ সালের এপ্রিলে দ্য ডেইলি স্টার ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের আট জেলায় ৯ হাজার ১৯৭ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়, যার ৭ হাজার ২২৬ হেক্টরই দিনাজপুরে। ওই আট জেলায় প্রায় ৪ হাজার বাণিজ্যিক লিচুবাগান রয়েছে, যার অন্তত ৩ হাজার দিনাজপুরে। আর নারকেল বাংলাদেশে মূলত বসতবাড়ি ও রাস্তার ধারের গাছ হিসেবে চাষ হয় বলে বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে।
বাংলাপিডিয়া আমের ক্ষতিকর পোকার মধ্যে হপার, ফলের উইভিল বা আঁটির পোকা, কাণ্ড ছিদ্রকারী, ডগা ছিদ্রকারী পোকা ও আমের মাছি পোকার কথা বলেছে; আর ছত্রাকজনিত রোগের মধ্যে অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, আগা মরা ও পাউডারি মিলডিউয়ের কথা।
মূল প্রতিবেদনে ফলবাগানকে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ী আমানতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল, এর জন্য কেনা স্প্রেয়ারও এমনভাবে বাছাই করতে হবে যাতে বহু মৌসুম ভালোভাবে চলে।
স্প্রেয়ারের প্রধান ধরন ও কোনটি কতদূর পৌঁছায়
এফএও কাঁধে বা হাতে বহনযোগ্য স্প্রেয়ারকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছে: লিভারচালিত ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ার, মোটরচালিত হাইড্রোলিক ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ার, কম্প্রেশন স্প্রেয়ার, মোটরচালিত মিস্টব্লোয়ার এবং রোটারি অ্যাটোমাইজার। ফলবাগানের জন্য কাজে লাগার মতো বিকল্পগুলো এমন।
- ন্যাপস্যাক ও কম্প্রেশন স্প্রেয়ার: হালকা ও সস্তা; মাঠের ফসল, ছোট চারাগাছ এবং আনারস, কলা, পেঁপের মতো নিচু ফলগাছের উপযোগী, পরিণত আম, লিচু বা নারকেলগাছের জন্য নয়।
- ফুট স্প্রেয়ার বা পায়ে চালানো স্প্রেয়ার: প্যাডেলে চলা পাম্প আলাদা পাত্র থেকে দ্রবণ টেনে পাইপ ও নলের মাধ্যমে ছিটায়। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ) জানায়, এটি মাঠের ফসল, ফলবাগান, বাগিচা ও নার্সারির উপযোগী, প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে ১৪ থেকে ১৮ কেজি চাপ তৈরি করে, এবং উঁচু জেট বা বাঁশের নল লাগালে প্রায় ১০ মিটার উঁচু গাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একটি নল দিয়ে দিনে প্রায় ১ হেক্টর, দুটি নল দিয়ে দেড় থেকে ২ হেক্টর জমিতে স্প্রে করা যায়।
- মোটরচালিত ন্যাপস্যাক মিস্টব্লোয়ার: ছোট ইঞ্জিন একটি পাখা ঘোরায়, আর সেই বাতাসের স্রোত দ্রবণকে নজল দিয়ে বের করে নিয়ে যায়। টিএনএইউর তথ্যে এ ধরনের যন্ত্রে ৭ থেকে ১২ লিটারের দ্রবণের ট্যাংক, পৌনে ১ থেকে সোয়া ২ লিটারের জ্বালানি ট্যাংক থাকে এবং মিনিটে আধা লিটার থেকে ৫ লিটার দ্রবণ বের হয়।
- ইঞ্জিনচালিত উচ্চচাপের স্প্রেয়ার: মাটিতে রাখা পাম্প থেকে লম্বা পাইপ ও স্প্রে গানে দ্রবণ যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ প্রকৌশলী পল ই. সামনার ২০১২ সালে লিখেছেন, বাগানের স্প্রেয়ারের পাম্প সাধারণত পিস্টন বা সেন্ট্রিফিউগাল ধরনের হয়; উচ্চচাপের কাজে সাধারণত পিস্টন পাম্প বেছে নেওয়া হয়।
- পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টরচালিত বাগান স্প্রেয়ার: টিএনএইউ একটি পাওয়ার টিলারচালিত স্প্রেয়ারের বর্ণনা দিয়েছে, যাতে আছে হরাইজন্টাল ট্রিপ্লেক্স পিস্টন পাম্প, নাড়ানোর ব্যবস্থাসহ ২০০ লিটারের ট্যাংক, মিনিটে ৩৬ লিটার নির্গমন এবং ছয়টি টার্বো নজল, যা ১০০ থেকে ১৫০ মাইক্রনের ফোঁটা তৈরি করে; এটি ডালিম, কমলা ও আঙুরবাগানের জন্য তৈরি। নারকেলগাছের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি ট্রাক্টরে বসানো একটি স্প্রেয়ারের কথা বলেছে, যার ৯ থেকে ১৪ মিটারের টেলিস্কোপিক পাইপ, ২০০ লিটারের ট্যাংক এবং মোট ৫৫ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত স্প্রে করার ক্ষমতা আছে; ঘণ্টায় প্রায় ৩৫টি গাছে স্প্রে করা যায়।
- বায়ুচালিত বা এয়ারব্লাস্ট স্প্রেয়ার: সামনারের ভাষায়, এসব যন্ত্র পাখার তৈরি বিপুল পরিমাণ বাতাসের সঙ্গে তরল বয়ে নিয়ে গাছে প্রয়োগ করে।
সামনারের পরামর্শ, বাগানের সবচেয়ে কঠিন অবস্থাতেও কাজ চালানোর মতো সক্ষম স্প্রেয়ার বেছে নিতে হবে। বাস্তবে কোনটি নেবেন, তা নির্ভর করে গাছের উচ্চতা, বাগানের আয়তন এবং সারির মাঝ দিয়ে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার চলতে পারে কি না তার ওপর।

বাতাস কেন জরুরি: গবেষণা যা বলে
ঘন ও উঁচু গাছে সমস্যা শুধু উচ্চতা নয়, ভেতরে ঢোকানোও: বাইরের পাতাই বেশির ভাগ ফোঁটা আটকে ফেলে এবং গাছের ভেতরটা আড়াল করে রাখে। বায়ুচালিত স্প্রেয়ার বাতাসের স্রোত দিয়ে ফোঁটাকে ভেতরে বয়ে নিয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির ফলবাগান সম্প্রসারণ বিভাগের আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ গোয়েন হোহাইজেল ২০১৬ সালের এক নির্দেশিকায় নীতিটি সহজ করে বলেছেন: বাতাসই স্প্রের ফোঁটা বয়ে নেয়, তাই বাতাস যেখানে যায়, ফোঁটাও সেখানে যায়। তিনি সতর্ক করেছেন, যে স্প্রে বাতাসে ভেসে অন্যত্র চলে যায়, তা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করে এবং টাকারও অপচয় ঘটায়। নির্দেশিকায় রাসায়নিক দমনকে উৎপাদনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচ বলা হয়েছে।
ভারতের আমবাগানে চালানো এক পরীক্ষা সরাসরি তুলনা দেয়। কে. পি. সাহা, এ. সি. বার্শনে ও সুরেশ নারাং ২০০৪ সালে জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ট্রাক্টরচালিত অ্যারো ব্লাস্ট স্প্রেয়ার, পাওয়ার ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ার এবং হাতে চালানো রকার স্প্রেয়ারের তুলনা প্রকাশ করেন। অ্যারো ব্লাস্ট স্প্রেয়ার সবচেয়ে ছোট ফোঁটা তৈরি করেছে, ২৫৪ মাইক্রোমিটার; এটি ৬.৭০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা পরীক্ষার আমগাছগুলোর পুরো উচ্চতা ঢাকার জন্য যথেষ্ট; ঘণ্টায় ১.৫৪ হেক্টরে স্প্রে করেছে এবং হেক্টরপ্রতি শ্রম লেগেছে মাত্র ১.৯৫ শ্রমঘণ্টা।
তবে চালানোর খরচও ছিল সবচেয়ে বেশি: হেক্টরপ্রতি ১৯৭.১৯ রুপি, যেখানে হাতে চালানো রকার স্প্রেয়ারে লেগেছে ৪২.২৬ রুপি। তবু ভালো কার্যকারিতার কারণে লেখকেরা মাঝারি উচ্চতার বাগানে অ্যারো ব্লাস্ট স্প্রেয়ার ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন, নিজের মালিকানায় হোক বা ভাড়ায়।

স্প্রেয়ার কেনার আগে যা যাচাই করবেন
মূল প্রতিবেদনে চাষিদের কেনার আগে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এর কারিগরি দিকটি পাওয়া যায় ২০০১ সালে প্রকাশিত এফএওর কৃষি বালাইনাশক প্রয়োগ যন্ত্রের ন্যূনতম মানের নির্দেশিকায়। এফএও জানায়, সব সদস্য দেশে স্প্রেয়ারের নিরাপত্তা ও মানের কোনো মানদণ্ড নেই; তাই জাতীয় বাজার থেকে নিম্নমানের ও অনিরাপদ স্প্রেয়ার দূর করাই নির্দেশিকার লক্ষ্য। বহনযোগ্য স্প্রেয়ারের জন্য এতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি নিচের শর্তগুলো রয়েছে।
- ওজন: সর্বোচ্চ সুপারিশকৃত মাত্রা পর্যন্ত ভরা অবস্থায় ২৫ কেজির বেশি নয়।
- কোনো লিক নয়: চাপ ছাড়া বা স্বাভাবিক কাজের চাপে, কোনো অবস্থাতেই স্প্রেয়ার থেকে দ্রবণ চুঁইয়ে পড়বে না।
- দাগ কাটা ট্যাংক: সর্বোচ্চ ভরার মাত্রা স্পষ্ট ও টেকসইভাবে চিহ্নিত থাকবে; কম্প্রেশন স্প্রেয়ারের ট্যাংক মোট আয়তনের ৭৫ শতাংশের বেশি ভরা যাবে না।
- নল ও ভালভ: লিভারচালিত, মোটরচালিত হাইড্রোলিক ও কম্প্রেশন স্প্রেয়ারের নল ট্রিগারের হাতল থেকে নজল পর্যন্ত অন্তত ৫০০ মিলিমিটার লম্বা হবে; থাকবে বন্ধ অবস্থায় আটকে রাখা যায় এমন ট্রিগার ভালভ এবং ০.৩ মিলিমিটারের বেশি নয় এমন ছিদ্রের খুলে পরিষ্কার করা যায় এমন ছাঁকনি।
- চাপ: এই তিন ধরনের স্প্রেয়ারে নজলে সর্বোচ্চ কাজের চাপ ৪ বারের বেশি হবে না।
- ফিতা: কাঁধের ফিতার ভারবহনকারী অংশ অন্তত ৫০ মিলিমিটার চওড়া হবে এবং দ্রুত খুলে ফেলার ক্লিপ থাকবে।
- মোটরচালিত মিস্টব্লোয়ারে: চালকের হাতের নাগালে ইঞ্জিন বন্ধের ব্যবস্থা, চালক যাতে পুড়ে না যান সে জন্য মজবুত আবরণে ঢাকা সাইলেন্সার, ট্যাংকে ছাঁকনি এবং চালকের কানের কাছে শব্দ ৮৫ ডেসিবেলের মধ্যে।
বাগানে স্প্রেয়ার ঠিক করে নেওয়া
২০১৬ সালের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির নির্দেশিকায় এয়ারব্লাস্ট স্প্রেয়ারের জন্য ছয়টি ধাপ দেওয়া হয়েছে: চলার গতি যাচাই করা; বাতাসের দিক গাছের ভেতরের দিকে ঠিক করা; গাছের ঘনত্ব অনুযায়ী বাতাসের পরিমাণ মেলানো, যাতে স্প্রে ভেতরে ঢোকে কিন্তু গাছ ফুঁড়ে বেরিয়ে না যায়; প্রয়োজনীয় নজল-নির্গমন হিসাব করা; প্রতিটি নজলের আসল নির্গমন মেপে দেখা এবং লক্ষ্য থেকে ১০ শতাংশের বেশি গরমিল থাকলে নজল বদলানো; আর শেষে স্প্রে কতটা ছড়াল তা যাচাই করা।
ছড়ানো যাচাই করা হয় পানি-সংবেদনশীল কাগজ দিয়ে; এই কার্ডে ফোঁটা পড়লে জায়গাটি নীল হয়ে যায়। কার্ডগুলো গাছের বিভিন্ন উচ্চতায় ও মাটিতে রাখা হয়। নির্দেশিকা অনুযায়ী আদর্শ ফল হলো পুরো কার্ডজুড়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম ফোঁটা, লম্বা দাগ ছাড়া। প্রতিটি নজল গাছের যে অংশে স্প্রে করে, সেই অংশের পাতার ঘনত্বের সঙ্গে নজলের নির্গমন মিলিয়ে নিতে হবে।
কতদূর পৌঁছাল তার মতোই জরুরি সময়। আমের হপারের জন্য ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড প্রথম স্প্রে মুকুল বের হওয়ার শুরুতে, দ্বিতীয়টি মুকুল পুরো লম্বা হলে কিন্তু ফুল পুরোপুরি ফোটার আগে এবং তৃতীয়টি ফল মটরদানার আকার হলে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। বোর্ড আরও জানায়, বিউভেরিয়া ব্যাসিয়ানা ছত্রাকসহ প্রাকৃতিক শত্রুরা এই পোকা দমনে সাহায্য করে।
এফএও ও ডব্লিউএইচও আবহাওয়ার কিছু নিয়ম দিয়েছে: বাতাসের গতি সেকেন্ডে ৩ মিটারের বেশি হলে, বৃষ্টির সময় বা তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে স্প্রে করা যাবে না; আগে বাতাসের দিক দেখে নিতে হবে; মাঠে কাজ করা মানুষ, বাড়িঘর ও স্কুলের কাছে স্প্রে এড়াতে হবে; প্রতিবেশীদের আগে থেকে জানাতে হবে, সংস্থা দুটি ৪৮ ঘণ্টা আগে জানানোর সুপারিশ করেছে। যন্ত্রপাতি ধুতে হবে পুকুর, খাল ও অন্যান্য পানির উৎস থেকে দূরে।

যিনি স্প্রে করেন, তাঁর সুরক্ষা
উঁচু গাছে স্প্রে মানে ওপরের দিকে স্প্রে করা, ফলে কুয়াশা ঝরে পড়ে চালকের গায়েই। ২০২০ সালে এফএও ও ডব্লিউএইচও বালাইনাশক ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক আচরণবিধির আওতায় বালাইনাশক নাড়াচাড়া ও প্রয়োগের সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষার নির্দেশিকা প্রকাশ করে। এতে সতর্ক করা হয়েছে, হাতে চালানো ন্যাপস্যাক স্প্রেয়ার ও হাতের নল ব্যবহারে সংস্পর্শের ঝুঁকি বেশি, এবং লিক করা স্প্রেয়ার ও নল বেয়ে হাতে গড়িয়ে আসা দ্রবণই গুরুতর সংস্পর্শ ও বিষক্রিয়ার সাধারণ কারণ।
নির্দেশিকা অনুযায়ী বেশির ভাগ স্প্রের ফোঁটা ২০০ থেকে ৪০০ মাইক্রোমিটার বা তার বড়, তাই বিষ শরীরে ঢোকার প্রধান পথ চামড়া। হাতের নল দিয়ে ওপরের দিকে স্প্রে করার সময় ন্যূনতম সুরক্ষা হলো কভারঅল ও বুট, দস্তানা, ফেস শিল্ড বা গগলস এবং হুড বা টুপি; রেসপিরেটর ঐচ্ছিক। মিস্টব্লোয়ারের ক্ষেত্রে তালিকায় আছে কভারঅল ও বুট, দস্তানা, ফেস শিল্ড বা গগলস, হুড বা টুপি এবং কানের সুরক্ষা, কারণ মোটরচালিত ন্যাপস্যাক মিস্টব্লোয়ারের শব্দ ৮৫ ডেসিবেল ছাড়াতে পারে। চালককে যতটা সম্ভব স্প্রের উল্টো দিকে, অর্থাৎ বাতাস যেদিক থেকে আসছে সেদিকে থাকতে হবে।
- দ্রবণ মেশানো, ট্যাংক ভরা, স্প্রে করা ও যন্ত্র পরিষ্কারের সময় রাসায়নিক-প্রতিরোধী পুনর্ব্যবহারযোগ্য দস্তানা; নির্দেশিকায় আলোচিত দস্তানার উপকরণের একটি নাইট্রাইল।
- কভারঅলে হুড না থাকলে পানি শোষণ করে না এমন জলরোধী টুপি; এতে কানও সুরক্ষিত থাকে এবং চুলে ফোঁটা জমে না।
- বোতল খোলা ও দ্রবণ মেশানোর সময় ফেস শিল্ড, যা পুরো মুখকে ছিটা থেকে বাঁচায়; ধুলা, ছিটা বা কুয়াশার ঝুঁকি থাকলে গগলস।
- ব্যবহারের আগে স্প্রেয়ারে, বিশেষ করে ট্রিগার ভালভে লিক আছে কি না দেখা, এবং লিক করা, ক্ষয়ে যাওয়া বা ভাঙা যন্ত্রাংশ মেরামত বা বদলানো।
- কখনো খাবার বা পানীয়ের পাত্রে বালাইনাশক না রাখা।
- অসুস্থ, গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী অবস্থায় স্প্রে না করা এবং বালাইনাশক শিশু ও গবাদিপশুর নাগালের বাইরে তালাবদ্ধ করে রাখা।
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় সুরক্ষা পোশাক পরা কষ্টকর বলে নির্দেশিকা সকালে ও বিকেলে স্প্রে করা, শরীর ঠান্ডা করার মতো বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রচুর পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে। নির্দেশিকা জোর দিয়ে বলেছে, সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রতিরক্ষার শেষ স্তর: এটি সংস্পর্শ কমায়, পুরোপুরি ঠেকায় না। স্প্রের পর কেউ অসুস্থ বোধ করলে কাজ থামিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
বাংলাদেশে এই সুরক্ষার প্রয়োজন বাস্তব। বিশ্বব্যাংকের গবেষক সুস্মিতা দাশগুপ্ত, ক্রেগ মেইসনার ও মাইনুল হকের এক গবেষণা ২০০৭ সালে জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল ইকোনমিকসে প্রকাশিত হয়। বোরো ধান, আলু, শিম, বেগুন, বাঁধাকপি, আখ ও আম চাষ করা ৮২০ জন কৃষকের ওপর জরিপে দেখা যায়, ৪৭ শতাংশের বেশি কৃষক মাত্রার চেয়ে বেশি বালাইনাশক ব্যবহার করছিলেন, মাত্র ৪ শতাংশ বালাইনাশক ব্যবহার বা নাড়াচাড়ার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, আর ৮৭ শতাংশের বেশি কৃষক জানান, স্প্রের সময় তাঁরা সামান্য বা কোনো সুরক্ষাই নেন না।
খরচ, যৌথ ব্যবহার ও কোথায় সাহায্য মিলবে
বড় স্প্রেয়ারের দাম বেশি; সে কারণেই ২০০৪ সালের আমবাগানের গবেষণায় নিজের মালিকানার পাশাপাশি ভাড়ায় ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছিল। কয়েকজন চাষি মিলে বা স্থানীয় সেবাদাতার মাধ্যমে একটি যন্ত্র অনেক বাগানে ব্যবহার করলে খরচ ভাগ হয়ে যায়। সরকারের ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প ২০২৫ সাল পর্যন্ত হাওর ও উপকূলীয় এলাকায় ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে যন্ত্র দিচ্ছিল; ২০২১ সালের এপ্রিলে কৃষিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পের আওতায় দেওয়া ৫১ হাজারের বেশি যন্ত্রের মধ্যে পাওয়ার স্প্রেয়ারও রয়েছে।
কম স্প্রে করেও টাকা বাঁচানো যায়। সুস্মিতা দাশগুপ্তের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংকের গবেষণা নিয়ে ২০১০ সালের অক্টোবরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস লেখে, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) উৎপাদন না কমিয়েই বালাইনাশকের খরচ কমায়। এফএও ও ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকাও প্রথমে প্রশ্ন তোলে, আদৌ বালাইনাশক দরকার কি না।
স্প্রেয়ার কেনা বা রাসায়নিক বাছাইয়ের আগে চাষিরা ডিএইর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা বারির গবেষণাকেন্দ্রে জেনে নিতে পারেন, তাঁদের গাছের জন্য কোন যন্ত্র উপযুক্ত এবং তাঁদের ফসলের জন্য কোন বালাইনাশক নিবন্ধিত, তার মাত্রা কত এবং প্রয়োগের কত দিন পর ফল তোলা যাবে।
ছবি: Gregory Heath, CSIRO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), এফএও ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি, জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগ, ভারতের ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড, জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল ইকোনমিকস, বাংলাপিডিয়া, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ




মন্তব্য
(০)