দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তরমুজ উৎপাদিত হয়, কিন্তু লাল শাঁস খাওয়ার পর খোসা ও বীজ সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। কৃষি ও খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকরা ২০২৬ সালের জুনের শেষে জাগো নিউজকে বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি থাকলে এই খোসা ও বীজ থেকে খাদ্যপণ্য, তেল, পশুখাদ্য ও সিট্রুলিন নামের অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া সম্ভব, যা ঘিরে নতুন শিল্প ও কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ খুলতে পারে।
ফেলে দেওয়া খোসা থেকে বর্জ্য
প্রথম আলোর ২০২৬ সালের ২ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর বিভাগে ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়, যার মধ্যে পটুয়াখালীতে ৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর, ভোলায় ১৯ হাজার ৭৫৩ হেক্টর এবং বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা তখন বিভাগে মোট ৩৮ লাখ ২১ হাজার ৭২৯ টন তরমুজ উৎপাদনের আশা করছিলেন।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদিত তরমুজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খোসা। পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, একটি তরমুজের উল্লেখযোগ্য অংশই খোসা ও বীজ। ফেলে দিলে এগুলো দ্রুত পচে মিথেন গ্যাস তৈরি করে এবং দুর্গন্ধ ছড়ায়। অথচ খাদ্যশিল্পে এসব অংশের বাণিজ্যিক ব্যবহার আছে এবং সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণে খোসা থেকে মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করা যায়।

খোসা থেকে কী কী তৈরি হতে পারে
গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা জাগো নিউজকে খোসার কয়েকটি ব্যবহারের কথা বলেন:
- আচার: বিভিন্ন দেশে তরমুজের সাদা খোসা দিয়ে আচার তৈরির প্রচলন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর হোম ফুড প্রিজারভেশনের প্রণালীতে খোসার বাইরের সবুজ আবরণ ও ভেতরের গোলাপি শাঁস ছেঁটে ফেলে শুধু সাদা অংশ আচারে ব্যবহার করা হয়।
- জ্যাম ও মোরব্বা: সাদা অংশে আঁশ থাকায় এটি দিয়ে মোরব্বা, জ্যাম ও মিষ্টিজাত পণ্য তৈরি করা যায়।
- সবজি হিসেবে: খোসার ভেতরের সাদা অংশ তরকারি, ভাজি বা স্যুপে ব্যবহার করা যায়।
- পশুখাদ্য ও কম্পোস্ট: খাবারে ব্যবহার না হলে খোসা গবাদিপশুর খাদ্য ও জৈবসারের কাঁচামাল হতে পারে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
খোসার সবচেয়ে আলোচিত উপাদান সিট্রুলিন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের গবেষণা সংস্থা (ইউএসডিএ-এআরএস) জানায়, মানবদেহ সিট্রুলিন থেকে আরজিনিন নামের আরেকটি অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে। এআরএসের বিজ্ঞানী আগনেস রিমান্দো ও পেনেলোপি পারকিন্স-ভিজির ২০০৫ সালে জার্নাল অব ক্রোমাটোগ্রাফি এ-তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, শুকনো ওজনের হিসাবে খোসায় শাঁসের চেয়ে বেশি সিট্রুলিন থাকে (প্রতি গ্রামে ২৪.৭ মিলিগ্রাম, শাঁসে ১৬.৭ মিলিগ্রাম), যদিও তাজা ওজনে কিছুটা কম। গবেষকরা লেখেন, কম ব্যবহৃত এই কৃষিবর্জ্য প্রাকৃতিক সিট্রুলিনের উৎস হতে পারে।
খোসা থেকে পেকটিনও পাওয়া যায়, যা খাদ্যশিল্পে জেল তৈরি ও ঘন করার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইথিওপিয়ার অ্যাডিস আবাবা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ২০২৩ সালে হেলিয়ন সাময়িকীতে জানান, অ্যাসিটিক অ্যাসিড দিয়ে তরমুজের খোসা থেকে সর্বোচ্চ ১৮.২ শতাংশ হারে পেকটিন নিষ্কাশন করা গেছে এবং খোসা পেকটিন উৎপাদনের বিকল্প উৎস হতে পারে।
বীজের ব্যবহার
পুষ্টিবিদ ও খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকরা জাগো নিউজকে বলেন, তরমুজের বিচিও কাজে লাগানো যায়:
- ভাজা বিচি: শুকিয়ে ভেজে খাবার হিসেবে খাওয়া যায়।
- বিচির গুঁড়া: বেকারি পণ্য ও বিস্কিটে ব্যবহার করা যায়।
- তেল: বিচি চেপে তেল বের করা যায়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে, রোদে শুকানো বিচি চেপে এই তেল তৈরি হয় এবং পশ্চিম আফ্রিকায় এটি বিশেষভাবে প্রচলিত, সেখানে একে উটাঙ্গা তেলও বলা হয়।
- প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান: গবেষকদের মতে, বিচিতে প্রোটিন, চর্বি ও খনিজ থাকায় খাদ্যশিল্পে মূল্য সংযোজিত পণ্যে এর ব্যবহারের সুযোগ আছে।

কৃষকের প্রত্যাশা, গবেষণার ঘাটতি
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকেরা জানান, মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে বাজারদর পড়ে যায় এবং সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় অনেক ফল নষ্ট হয়। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার কৃষক নান্না গাজী বলেন, উৎপাদন ভালো হলেও সংরক্ষণের অভাবে অনেক তরমুজ বিক্রি করা যায় না; খোসা থেকেও বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি হলে কৃষকেরা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাবেন। গলাচিপা উপজেলার কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, তরমুজের বিভিন্ন অংশের শিল্পভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে আরও বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।
খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকদের মতে, খোসাভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠলে খাদ্য অপচয় কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং গ্রামে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, তরমুজের খোসা নিয়ে তখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি; তবে বিভিন্ন গবেষণাসাহিত্য ঘেঁটে জানা যায়, খোসা থেকে নানা খাদ্য উপকরণ তৈরির পাশাপাশি সিট্রুলিন নিষ্কাশন করা সম্ভব, যা ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত হয়।

ছবি: Raysonho @ Open Grid Scheduler / Grid Engine / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ, প্রথম আলো, ইউএসডিএ কৃষি গবেষণা সংস্থা (এআরএস), জার্নাল অব ক্রোমাটোগ্রাফি এ (রিমান্দো ও পারকিন্স-ভিজি, ২০০৫), হেলিয়ন (মামিরু ও গনফা, ২০২৩), ন্যাশনাল সেন্টার ফর হোম ফুড প্রিজারভেশন, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)