সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

জাতীয় বাজেটে কৃষির অবস্থান: বরাদ্দ, কৃষক কার্ড ও মাঠের বাস্তবতা

২০২৬ সালের ১৭ মে জাগো নিউজে প্রকাশিত কলামে কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস লেখেন, জাতীয় বাজেটে কৃষির অবস্থান খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন; শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সুশাসন ও কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি।

জাতীয় বাজেটে কৃষির অবস্থান: বরাদ্দ, কৃষক কার্ড ও মাঠের বাস্তবতা
ফসল

২০২৬ সালের ১৭ মে জাগো নিউজ ২৪ ডটকমে কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাসের একটি কলাম প্রকাশিত হয়, বিষয় দেশের জাতীয় বাজেটে কৃষির অবস্থান এবং কৃষকের বাস্তব চিত্র। লেখকের যুক্তি ছিল, কৃষি এখনো দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি; তাই বাজেটে কৃষির অংশ শুধু একটি খাতের বরাদ্দ নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি কৌশলগত বিষয়। কলামটি প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় তিন মাস পর; যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে।

সমীরণ বিশ্বাস লেখেন, শিল্প ও সেবা খাতের সম্প্রসারণে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির শতকরা অবদান তুলনামূলকভাবে কমেছে, তবু দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, খাদ্য সরবরাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এমন পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী কৃষি বাজেট দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রতিবেদনে তাঁর যুক্তিগুলোর পাশাপাশি কলাম প্রকাশের দিন পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি তথ্য, বাজেটের পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির বিবরণ তুলে ধরা হলো।

লেখকের মূল যুক্তি: আগে খাদ্য নিরাপত্তা


লেখকের মতে, জাতীয় বাজেটে কৃষির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে আবাদযোগ্য জমি কমছে; এই বাস্তবতায় খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে উন্নত বীজ, সার, সেচ, কৃষিযন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ অত্যন্ত জরুরি। তাঁর ভাষায়, সরকার ভর্তুকি, প্রণোদনা ও বিভিন্ন সহায়তা দিলে উৎপাদন খরচ কমে, কৃষক উৎপাদনে উৎসাহিত হন এবং দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থেকে সংকটকালেও মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে পারে।

ভর্তুকিকে তিনি কৃষকের ঝুঁকির বিপরীতে একটি সুরক্ষা হিসেবে দেখেছেন। কৃষক কাজ করেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারে মূল্যপতন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকির মধ্যে; সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ ও কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি উৎপাদন ব্যয় কমায়, আর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, বীজ সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি উৎপাদন টিকিয়ে রাখে, লেখেন তিনি। কৃষিকে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুও বলেছেন: কৃষকের আয় বাড়লে স্থানীয় বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পরিবহন সচল হয়, আর কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শহরমুখী চাপ কমবে।

এসব উপকরণের ওপর কতটা নির্ভর করে, তা ধানের হিসাবেই স্পষ্ট। ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল প্রকাশিত ইউএসডিএর বাংলাদেশবিষয়ক বার্ষিক খাদ্যশস্য ও পশুখাদ্য প্রতিবেদন (গ্রেইন অ্যান্ড ফিড অ্যানুয়াল) অনুযায়ী, ২০২৫/২৬ বিপণন বছরে ১ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি থেকে চালের উৎপাদন ধরা হয় ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টন, আর ২০২৬/২৭ বিপণন বছরের পূর্বাভাস ৩ কোটি ৭৪ লাখ টন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রোপণ করে এপ্রিল-মে মাসে কাটা সেচনির্ভর বোরো ধান দেশের মোট বার্ষিক চাল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি জোগায়। ইউএসডিএ ২০২৬/২৭ মৌসুমে উৎপাদন শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দেয়; এর কারণ হিসেবে বলা হয়, জ্বালানি ও সারের ঘাটতিতে সেচ ও সার প্রয়োগ ব্যাহত হওয়ায় বোরোর ফলন কমবে। অগভীর নলকূপ ও লো-লিফট পাম্প চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল নিয়ে কৃষকেরা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একই প্রতিবেদনে চালকে ১৭ কোটির বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য বলা হয়। দাম সহনীয় রাখতে সরকার চাল আমদানির শুল্ক কমিয়েছিল; ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে ২০২৬ সালের মার্চে মোটা চালের গড় খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৫ টাকা। ২০২৫/২৬ বিপণন বছরের আমন মৌসুমে সরকার দেশের বাজার থেকে প্রায় ৮ লাখ ৫৭ হাজার টন সেদ্ধ চাল ও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার টন ধান সংগ্রহ করে, আর ২০২৬ সালের মার্চে সরকারি গুদামে চালের মজুত ছিল ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন, বলা হয় প্রতিবেদনে। দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গম দেশে অল্প পরিমাণে উৎপাদিত হয়; চাহিদা মেটাতে দেশ আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, আর ২০২৫/২৬ বিপণন বছরে গম আমদানি ৭৪ লাখ টন হবে বলে ইউএসডিএর প্রাক্কলন।

বাংলাদেশে ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বাংলাদেশে ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষকেরা। ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

কৃষক কার্ড: এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রাক-পাইলট


কলামে সরকারের কৃষক কার্ড কার্যক্রমের কথা আলাদা করে বলা হয়। লেখকের মতে, এই কার্যক্রম কৃষি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করেছে, কারণ এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের তালিকা তৈরি সম্ভব হয়েছে এবং ভর্তুকি, প্রণোদনা, বীজ, সার ও কৃষিঋণ সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়েছে। কৃষক কার্ড ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক করতে বাজেটে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনায় কৃষক ডাটাবেজ, মোবাইলভিত্তিক পরামর্শ ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ কৃষিকে আধুনিক করতে সহায়তা করবে।

কলাম প্রকাশের সময় কর্মসূচিটির বয়স ছিল এক মাস, চলছিল প্রথম ধাপ অর্থাৎ প্রাক-পাইলট পর্যায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল সচিবালয়ে পিআইডি সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ জানান, প্রথম পর্যায়ে দেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। তিনি বলেন, এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড; রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখাগুলোতে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে এই কার্ডের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। কার্ড ব্যবহার করে কৃষকেরা ডিলারের কাছে থাকা পিওএস মেশিনের মাধ্যমে সার, বীজ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উপকরণ এবং খাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। পাইলটিং পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সুবিধা পাবেন।

মন্ত্রী জানান, জমির মালিকানা অনুযায়ী কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় কৃষক। ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি প্রথম পর্যায়ে মৎস্যচাষি ও মৎস্য আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতের খামারি, দুগ্ধ খামারি এবং লবণচাষিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কার্যক্রম তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে: প্রাক-পাইলটিং, পাইলটিং ও দেশব্যাপী কার্যক্রম। প্রাক-পাইলট শেষে ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চলবে, আর তার অভিজ্ঞতার আলোকে পরের চার বছরে সারা দেশে কার্ড বিতরণ ও ডাটাবেস তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে শেষ করার পরিকল্পনা সরকারের। মন্ত্রী কর্মসূচিটিকে সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির অংশ বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে এর রূপরেখা ছিল।

বাংলা ট্রিবিউন সেদিনই জানায়, পহেলা বৈশাখ, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন; ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অন্য উপজেলাগুলোও এতে যুক্ত হয়। প্রথম দফায় টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঘারিন্দা ইউনিয়নের সুরুজ পূর্বপাড়া ব্লকের ১ হাজার ৪৫৩ জন কৃষকের কার্ড পাওয়ার কথা ছিল, যাঁদের মধ্যে ১৫ জনের হাতে প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্ড তুলে দেন।

২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক নিবন্ধে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন ১১টি ব্লকের নাম দেন: পঞ্চগড় সদরের কমলাপুর, পঞ্চগড়ের বোদার পাঁচপীর, বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলি, ঝিনাইদহের শৈলকুপার কৃপালপুর, পিরোজপুরের নেছারাবাদের রাজাবাড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফের রাজারছড়া, কুমিল্লার আদর্শ সদরের অরণ্যপুর, টাঙ্গাইল সদরের সুরুজ, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের তেনাপঁচা, মৌলভীবাজারের জুড়ীর ফুলতলা এবং জামালপুরের ইসলামপুরের গাইবান্ধা ব্লক। তিনি লেখেন, দেশের প্রায় দুই কোটি ২৭ লাখ কৃষককে একটি ডাটাবেজের আওতায় আনার লক্ষ্য সরকারের, আর কার্ডধারী কৃষকেরা ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে:

  • সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তা এবং সার, বীজ ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণে ভর্তুকি;
  • অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে কৃষিঋণ;
  • ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ, আর ভর্তুকি মূল্যে কৃষিযন্ত্র কেনার সুযোগ;
  • দুর্যোগকালে ঝুঁকি কমাতে শস্য ও কৃষি বিমার সুবিধা;
  • উন্নত চাষপদ্ধতি ও প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা;
  • উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিক্রির সুযোগ, আবহাওয়ার তথ্য এবং রোগবালাই দমনের পরামর্শ।

নিবন্ধে আরও বলা হয়, কার্ডটি বিনা মূল্যে দেওয়া হবে, এ জন্য কাউকে কোনো অর্থ দিতে হবে না। কার্ড পেতে কৃষককে সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার (এসএএও) সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, কারণ তিনিই প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেন; জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরনসহ কৃষকের দেওয়া তথ্য কৃষি অফিস সরেজমিনে যাচাই করার পর জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বরের ভিত্তিতে একটি ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি হয়, এরপর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কার্ড দেওয়া হয়।

সর্বশেষ বাজেটে কৃষি কী পেয়েছিল


কলাম প্রকাশের দিন সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট ছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (জুলাই থেকে জুন), যা ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ঘোষণা করেন। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ৫ জুন জানায়, ওই বাজেটে কৃষি, খাদ্য, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের জন্য ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি; কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয় ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণে ভর্তুকির জন্য রাখা হয় ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, যা আগের, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রায় সমান।

ঢাকার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্স ২০২৫ সালের ৫ জুনের বিশ্লেষণে উল্লেখ করে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কৃষির অংশ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৫ দশমিক শূন্য শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়। বাজেটে ধান, গম, আলু ও পাটের মতো প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের সরবরাহমূল্যের ওপর উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব, হিমাগারের যন্ত্রপাতিতে শুল্ক অব্যাহতি, এবং ৫ হাজার ৪০০ কিলোমিটার নতুন সড়ক ও ১০৪টি গ্রামীণ হাটবাজার ও প্রবৃদ্ধিকেন্দ্র উন্নয়নের পরিকল্পনা ছিল। লাইটক্যাসল সতর্ক করে, বাজেট ঘাটতির ৪৬ শতাংশ ব্যাংকঋণে মেটানোর পরিকল্পনায় এমনিতেই তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংক খাতে ক্ষুদ্র কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে।

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বাজেটের সমালোচনা করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান বলেন, বছরের পর বছর উৎপাদনশীলতার চেয়ে ভর্তুকি বাড়ানোয় বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, আর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানে ধানের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাসংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) পূরণে কৃষি উৎপাদন বছরে ৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে; ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে শুধু ধান ও গম নয়, অন্তত ২০ থেকে ২৫টি প্রধান ফসল সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার পরামর্শও দেন তিনি। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগের বাজেটগুলোতে কৃষি গবেষণার জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকলেও প্রস্তাবিত বাজেটে তা নেই।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যও উদ্ধৃত হয়: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম; আর জিডিপিতে কৃষির অংশ সত্তরের দশকের শুরুর ৩৮ শতাংশের বেশি থেকে নেমে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশে দাঁড়ায়। কলামের শুরুতে লেখক জিডিপিতে কৃষির শতকরা অবদান কমার যে কথা স্বীকার করেছেন, এই পরিসংখ্যান সেটিই দেখায়; আর এ কারণেই তিনি কৃষিকে উৎপাদনের অংশ দিয়ে নয়, কর্মসংস্থান ও খাদ্যের দিক থেকে দেখার কথা বলেছেন।

সার, সেচ ও ধান উৎপাদনের বাড়তি খরচ


সার, ডিজেল ও বিদ্যুতে সহায়তার যে আহ্বান লেখক জানিয়েছেন, তা এসেছে উৎপাদন খরচ বাড়ার এক মৌসুমে। ইউএসডিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরিয়া, মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ট্রিপল সুপারফসফেটের (টিএসপি) সংগ্রহ, বিতরণ ও দাম সরকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। বোরো, আউশ ও আমন মৌসুমের আগে প্রতিটি জেলা ও উপজেলার চাহিদা নিরূপণ করে মাসভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হয়, আর কৃষি মন্ত্রণালয় নিযুক্ত ডিলার ও সাব-ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামে তা বিক্রি করেন; মজুতদারি ও অবৈধ দাম বাড়ানো ঠেকাতে কৃষি কর্মকর্তারা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিক্রি তদারক করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেজিপ্রতি দাম ছিল ইউরিয়া ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা ও টিএসপি ২৭ টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল।

তবু প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে অনেক এলাকায় কৃষকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৫ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি আলু উৎপাদনকারী জেলায় আলুতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে বোরোর জন্য সারের ঘাটতি দেখা দেয় এবং কৃষকেরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া, পটাশ ও ফসফেট কেনেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সারের মোট ব্যবহার দাঁড়ায় ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টন। ইউএসডিএর সূত্রগুলো জানায়, কৃষকেরা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের চেয়ে বেশি রাসায়নিক সার দেন, আর স্থানীয় পর্যায়ে মাটি পরীক্ষার সুবিধা অপ্রতুল হওয়ায় অনেক কৃষক নিজের জমির জন্য সুপারিশকৃত মাত্রাই জানেন না।

সেচ আরেকটি বড় খরচ। প্রতিবেদনে বলা হয়, আমন মৌসুমের শুরুতে দেরিতে বৃষ্টি এবং বোরো মৌসুমে অতিরিক্ত গরমের কারণে কৃষকদের আগের চেয়ে বেশি সেচ দিতে হচ্ছে, আর সেচ, সার ও শ্রমের খরচ বাড়ায় বোরো ধান উৎপাদনের ব্যয় প্রতিবছরই বাড়ছে। লেখকও তাঁর কলামে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি কৃষিকে ঝুঁকিতে ফেলছে; অনেক এলাকায় নদী ও খাল ভরাট হয়ে কৃষিতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে; তাই বাজেটে খাল পুনঃখনন, জলাধার সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।

ভোক্তার ওপরও চাপ ছিল। ইউএসডিএ জানায়, ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে দেশে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি; ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা ১০ শতাংশ ছাড়ায়, অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সামষ্টিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কমে আসে, তবে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে আবার বাড়ছিল।

যন্ত্র, গবেষণা ও নতুন জাত


লেখক লেখেন, উন্নত দেশগুলো ড্রোন, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট সেচ ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কৃষির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াচ্ছে; বাংলাদেশেও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, স্মার্ট সয়েল সেন্সর, আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ ও ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্মের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উদ্ভাবকদের মধ্যে সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব অনেক সময় উন্নয়নকে ধীর করে দেয়; উচ্চ ফলনশীল, রোগপ্রতিরোধী ও জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং আধুনিক চাষাবাদ, মাটি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকের প্রশিক্ষণ দরকার।

যন্ত্রের প্রশ্নে ইউএসডিএর মাঠ পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণও একই কথা বলে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যান্ত্রিকীকরণ সীমিত হওয়ায় দেশে ধান চাষ এখনো মূলত মানুষের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল; ২০২৬ সালের শুরুতে চারা রোপণের ভরা মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে শ্রমিকের মজুরি বিশেষভাবে বেশি ছিল, আর ধান কাটার সময় শ্রমিকসংকটে মজুরি আরও বাড়বে বলে কৃষকেরা আশঙ্কা করছিলেন। ২০২৫ সালের জুনে জাহাঙ্গীর আলম খান ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের যন্ত্রপাতি দেওয়ার একটি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প সম্ভাবনা দেখিয়েছিল এবং নতুন বাজেটে তা আবার চালু করা যেত।

বাংলাদেশের একটি গ্রামে পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করছেন এক কৃষক। ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বাংলাদেশের একটি গ্রামে পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করছেন এক কৃষক। ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

লেখক যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলেছেন, এই কাজের বড় অংশ তাদের। কলামে নাম উল্লেখ করা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৭৬ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠিত হয়; এর সূচনা ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ফার্ম থেকে। ঢাকা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে গাজীপুরের জয়দেবপুরে এর সদর দপ্তর; ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া, যেগুলোর জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে, সব ফসল নিয়ে বারি গবেষণা করে। ধান নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), যা ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্বাধীনতার পর নতুন নাম পায়; এর সদর দপ্তরও গাজীপুরে।

ইউএসডিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রি আনুষ্ঠানিকভাবে ১১৮টি ইনব্রেড ও ১০টি হাইব্রিড ধানের জাত অবমুক্ত করেছে, তবে এর মধ্যে অল্প কয়েকটিই ব্যাপকভাবে চাষ হয়। ৩০ বছরের বেশি পুরোনো এবং রোগ ও পোকার আক্রমণপ্রবণ হলেও ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় ইনব্রেড জাত; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বেশি ফলনশীল ও বেশি সহনশীল নতুন জাত ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। কৃষকেরা ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান১০২ ও ব্রি ধান১০৫-এর মতো নতুন জাতও গ্রহণ করছেন, আর বেশি ফলনের কারণে বেসরকারি বীজ কোম্পানির হাইব্রিড জাতও জনপ্রিয় হচ্ছে, বলা হয় প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত ব্রি ধান২৮ জাতের ধান। ছবি: ROCKY / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত ব্রি ধান২৮ জাতের ধান। ছবি: ROCKY / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

জলবায়ু ঝুঁকি ও অভিযোজন


লেখক বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন; ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষিতে বড় প্রভাব ফেলছে। তাই কৃষি বাজেটে জলবায়ু সহনশীল কৃষির ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি: লবণাক্ততা সহনশীল ধান, খরাসহিষ্ণু ফসল, ভাসমান কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজন প্রযুক্তির গবেষণা ও সম্প্রসারণ বাড়ানো, এবং জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে কৃষকের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি।

পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা জার্মানওয়াচ ২০২৫ সালের নভেম্বরে যে ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৬ প্রকাশ করে, তাতে চরম আবহাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ২০২৪ সালের হিসাবে ১৩তম এবং ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরের হিসাবেও ১৩তম। চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনায় প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতির ভিত্তিতে এই সূচক দেশগুলোকে ক্রমানুসারে সাজায়।

আকস্মিক বন্যা এমন একটি ঝুঁকি, যা মাথায় রেখে সম্প্রসারণ সেবা কাজ করে। ইউএসডিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের হাওর অঞ্চলে ডিএই স্বল্পমেয়াদি বোরো জাত চাষে উৎসাহ দিচ্ছে, কারণ সীমান্তের ওপারে ভারতের পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে ভাটিতে আকস্মিক বন্যা নেমে কখনো কখনো পুরো ফসল নষ্ট করে দেয়। ১০ থেকে ১৫ দিন আগে পাকে এমন জাত, যেমন ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান১০১ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫, এ ধরনের ক্ষতি অনেকটা কমাতে পারে।

লেখক যে ভাসমান কৃষির কথা বলেছেন, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৫ সালে সেই পদ্ধতিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্য ব্যবস্থা (জিআইএএইচএস) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশাল জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জুড়ে ভাসমান বাগান রয়েছে। ঘন কচুরিপানার স্তরের ওপর বাঁশ বিছিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করা হয়, যা বেডের ভিত্তি, স্থিতি ও ভেসে থাকার ক্ষমতা ধরে রাখে; এর ওপর ঢেঁড়স, ঝিঙা, পুঁইশাক, বেগুন, শসা, লালশাক, ডাঁটা ও চালকুমড়ার মতো সবজি চাষ হয়। এফএওর হিসাবে, সমান আয়তনের জমির চাষের তুলনায় ভাসমান সবজি চাষের উৎপাদনশীলতা প্রায় ১০ গুণ।

রপ্তানি, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও বাজার


লেখক বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্য ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে; সবজি, ফল, চা, পাট, মসলা ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মান, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতায় সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাই হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি সহায়তায় বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, খাদ্য, পাট, চিনি, বস্ত্র ও দুগ্ধশিল্পের প্রধান কাঁচামাল আসে কৃষি থেকে; কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, পরিবেশবান্ধব কৃষি, জৈব সারের ব্যবহার ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গেও তিনি কৃষিকে যুক্ত করেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটেও এসব বিষয় এসেছিল। ডেইলি স্টার জানায়, অর্থ উপদেষ্টা বাজেট বক্তৃতায় বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানির ৫৯টি বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলো দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাজেটের পদক্ষেপের মধ্যে ছিল হিমাগারভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও লজিস্টিকস শক্তিশালী করা, কৃষিপণ্য পরিবহনের অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশীজনদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি এবং রপ্তানির জন্য বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল ও বন্দর সুবিধা গড়ে তোলা।

কৃষি কীভাবে শিল্পের কাঁচামাল জোগায়, ইউএসডিএর প্রতিবেদনে তার কিছু চিত্র মেলে। দেশে উৎপাদিত ভুট্টার প্রায় ৯০ শতাংশ যায় পশুখাদ্য শিল্পে, যার পেছনে রয়েছে পোলট্রি, দুগ্ধ ও মৎস্যচাষ খাতের চাহিদা; আবাদি জমি ও উৎপাদন উভয় দিক থেকে ধানের পরই ভুট্টা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দানাশস্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রুটি, বিস্কুট, কেক ও পাস্তার মতো গমজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ২০ কোটি মার্কিন ডলার হবে বলে ইউএসডিএর প্রাক্কলন, যার প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব, ওমান, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য; আর সুগন্ধি চালের রপ্তানির পূর্বাভাস ছিল ১০ হাজার টন।

ঋণ, বিমা এবং বরাদ্দ ও বাস্তবতার ফারাক


লেখকের মতে, দেশের অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক; পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় অনেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন, ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং কৃষক আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েন। তাই তিনি সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধার সম্প্রসারণ এবং শস্য বিমা চালু ও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারেন এবং উৎপাদন ধারাবাহিক থাকে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে মন্ত্রণালয় কৃষক কার্ডের যে বিবরণ দিয়েছিল, তাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বল্প সুদে ঋণ ও শস্য বিমা প্রস্তাবিত সুবিধার মধ্যে ছিল।

কলামের শেষ অংশে লেখক যাকে বাস্তব চিত্র বলেছেন, সেদিকে নজর দেন। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে কৃষির জন্য বরাদ্দ থাকলেও অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, লেখেন তিনি; বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্যের অভাব, ভেজাল সার-বীজ ও সংরক্ষণ সংকট কৃষকের বড় সমস্যা, আর অনেক সময় বাজেট ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয় থাকে না। তাঁর মতে, শুধু বাজেটের আকার বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি উদ্ভাবকদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়ে লেখক বলেন, কৃষকবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও সময়োপযোগী বাজেট শুধু খাদ্য উৎপাদনই বাড়াবে না, দারিদ্র্য হ্রাস, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথও সুদৃঢ় করবে। তাঁর ভাষায়, জাতীয় বাজেটে কৃষির গুরুত্ব তাই কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ভিত্তি।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (সমীরণ বিশ্বাসের কলাম), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক ইনকিলাব, দ্য ডেইলি স্টার, লাইটক্যাসল পার্টনার্স, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের বৈদেশিক কৃষি সেবা (ইউএসডিএ এফএএস), জার্মানওয়াচ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)