কাজ, ক্লাস বা যানজটে দিন কাটাতে গিয়ে ক্লান্ত লাগলে অনেকে চা বা কফির দিকে ঝোঁকেন। জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে বিকল্প হিসেবে দিনের বিভিন্ন সময়ে পাঁচটি ফল খাওয়ার পরামর্শ দেয়: সকালে কলা, দুপুরের আগে আপেল, বিকেলে কমলা বা মাল্টা, সন্ধ্যায় আঙুর এবং ব্যায়ামের আগে বা পরে খেজুর। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার, হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের নিউট্রিশন সোর্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মিলিয়ে দেখা হলো, এই ফলগুলোতে আসলে কী আছে।
ফলের শক্তি আসে মূলত এর প্রাকৃতিক চিনি থেকে, যা এক ধরনের শর্করা। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন জানায়, ফলের চিনি প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি; তবে সব শর্করাই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে ফলের আঁশ পেট ভরা রাখে এবং রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কোন ফল ঠিক কোন সময়ে খেলে বেশি উপকার, তা নিয়ে নির্দিষ্ট গবেষণার প্রমাণ পাওয়া যায়নি; সময়ের এই ভাগ প্রতিবেদনের নিজস্ব পরামর্শ।
সকালে কলা, দুপুরের আগে আপেল
ইউএসডিএর তথ্যে ১০০ গ্রাম কাঁচা কলায় ৮৯ কিলোক্যালরি শক্তি এবং ১২.২ গ্রাম চিনি থাকে। এর মধ্যে গ্লুকোজ ৪.৯৮ গ্রাম, ফ্রুক্টোজ ৪.৮৫ গ্রাম ও সুক্রোজ ২.৩৯ গ্রাম। একই পরিমাণ কলায় পটাশিয়াম ৩৫৮ মিলিগ্রাম এবং আঁশ ২.৬ গ্রাম। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স জানায়, পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৫১, যা কম বলে ধরা হয়; একটু কম পাকা কলায় তা ৪২। একেবারে কাঁচা (সবুজ) কলায় থাকে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ, যা ক্ষুদ্রান্ত্রে সহজে হজম হয় না।
আপেলের ক্ষেত্রে হার্ভার্ডের হিসাবে একটি মাঝারি আপেলে প্রায় ৯৫ ক্যালরি, ২৫ গ্রাম শর্করা, ১৯ গ্রাম প্রাকৃতিক চিনি ও ৩ গ্রাম আঁশ থাকে। আঁশসমৃদ্ধ ও কম গ্লাইসেমিক লোডের ফল হিসেবে আপেল রক্তে চিনির মাত্রা কম ও ছোট আকারে বাড়ায়। তাই আপেলের শক্তি ধীরে আসে, প্রতিবেদনের এই বক্তব্যের সঙ্গে তথ্য মেলে।

বিকেলে কমলা বা মাল্টা, সন্ধ্যায় আঙুর
ইউএসডিএর তথ্যে ১০০ গ্রাম কমলায় ৪৭ কিলোক্যালরি, ৯.৩৫ গ্রাম চিনি, ২.৪ গ্রাম আঁশ এবং ৫৩.২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে। হার্ভার্ডের নিউট্রিশন সোর্স অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক ভিটামিন সি প্রয়োজন ৯০ মিলিগ্রাম, নারীর ৭৫ মিলিগ্রাম। ভিটামিন সি নিজে ক্যালরি বা শক্তি দেয় না; শক্তি আসে ফলের চিনি থেকে। তবে এটি শরীরে কোলাজেন তৈরিতে লাগে, উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণে সাহায্য করে, আর এর তীব্র ঘাটতির লক্ষণের মধ্যে আছে ক্লান্তি ও আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা।

আঙুরে চিনির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। ইউএসডিএর হিসাবে ১০০ গ্রাম সবুজ বা লাল আঙুরে ৬৯ কিলোক্যালরি ও ১৫.৫ গ্রাম চিনি থাকে, যার প্রায় সবটাই গ্লুকোজ (৭.২ গ্রাম) ও ফ্রুক্টোজ (৮.১৩ গ্রাম); আঁশ মাত্র ০.৯ গ্রাম। বেগুনি আঙুরের খোসায় অ্যান্থোসায়ানিনসহ পলিফেনল জাতীয় যৌগ থাকে, আর খোসা ও বীজে থাকে রেসভেরাট্রল। প্রতিবেদনে যেমন বলা হয়েছে, ডায়াবেটিস রোগীরা আঙুর পরিমাণ বুঝে খাবেন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
ব্যায়ামের আগে বা পরে খেজুর
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০০৮ সালে ক্রিটিক্যাল রিভিউস ইন ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত পর্যালোচনায় বলা হয়, খেজুরের শাঁসে চর্বি ও আমিষ কম, কিন্তু চিনি বেশি, প্রধানত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ। ১০০ গ্রাম খেজুর গড়ে ৩১৪ কিলোক্যালরি শক্তি দেয় এবং এতে আঁশ থাকে ৮ গ্রাম। ইউএসডিএর তথ্যে ১০০ গ্রাম ডেগলেট নূর খেজুরে চিনি ৬৩.৪ গ্রাম ও পটাশিয়াম ৬৫৬ মিলিগ্রাম। সৌদি আরবের কাসিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় ১৭টি জাতের খেজুরের গড় গ্লাইসেমিক ইনডেক্স পাওয়া যায় ৫৫.২, জাতভেদে ৪২.৮ থেকে ৭৪.৬।
ব্যায়ামের সঙ্গে শর্করার সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মেডলাইনপ্লাস জানায়, ব্যায়ামের সময় শক্তির জন্য শর্করা দরকার, যা মূলত পেশি ও যকৃতে জমা থাকে। এক ঘণ্টার বেশি ব্যায়াম করলে আগে শর্করা খাওয়া উপকারী, আর ভারী ব্যায়ামের পর পেশির জমানো শক্তি আবার গড়ে তুলতে শর্করা খেতে হয়। খেজুরের মতো শর্করাসমৃদ্ধ ফল এই কাজে লাগতে পারে, তবে খেজুরে চিনি অনেক বেশি বলে পরিমাণের দিকে নজর রাখা দরকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম, অর্থাৎ পাঁচ ভাগ ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেয় এবং জানায়, এতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমে। সংস্থাটি নাশতা হিসেবে তাজা ফল খাওয়ার কথাও বলে। তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, যকৃৎ বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে কোনো খাবার নিয়মিত খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, প্রতিবেদনেও এ কথা বলা হয়।
ছবি: Shixart1985 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল), হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ (দ্য নিউট্রিশন সোর্স), আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন, মেডলাইনপ্লাস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ক্রিটিক্যাল রিভিউস ইন ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন, অ্যানালস অব সৌদি মেডিসিন, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)