২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার বিষয় ছিল কারা আমলকী খেতে সতর্ক থাকবেন। আমলকী টক স্বাদের সবুজ একটি ফল; ইংরেজিতে একে ইন্ডিয়ান গুজবেরি বা এমব্লিক বলা হয়, বৈজ্ঞানিক নাম ফিলান্থাস এমব্লিকা (Phyllanthus emblica)। প্রতিবেদনে আমলকীকে ভিটামিন সি-এর প্রাকৃতিক ভাণ্ডার বলা হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ত্বক ও চুল এবং হজমের জন্য এর উপকারিতার কথা বলা হয়। তবে সেখানে সতর্ক করা হয়, উপকারী খাবারও সবার জন্য সমান নিরাপদ নয়। প্রতিবেদনে পাঁচ ধরনের মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়: যাঁদের গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি বা পেপটিক আলসারের সমস্যা আছে; যাঁদের কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি আছে; যে ডায়াবেটিস রোগীরা আচার, মোরব্বা বা মিষ্টি জুস হিসেবে আমলকী খান; যাঁদের রক্তচাপ কম; এবং যে রক্তাল্পতার রোগীরা আয়রন সাপ্লিমেন্ট খান। প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়, আমলকী স্বাস্থ্যকর হলেও ওষুধ নয়; গ্যাস্ট্রিক, কিডনি, রক্তচাপ বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগ থাকলে নিয়মিত আমলকী খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রতিবেদনে সূত্র হিসেবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন এবং হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের নাম উল্লেখ করা হয়।
নিচের অংশগুলোতে প্রতিবেদনের প্রতিটি সতর্কতাকে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বাস্থ্য সংস্থা ও প্রকাশিত চিকিৎসা গবেষণা এ বিষয়ে কী বলেছে তার সঙ্গে। এর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ), যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), হেলথ কানাডা, বাংলাদেশের খাদ্য উপাদান সারণি এবং পিয়ার-রিভিউড গবেষণা। প্রতিবেদনের কিছু কথা এসব সূত্রে সমর্থিত; কিছু ক্ষেত্রে প্রমাণ প্রতিবেদনে যতটা বলা হয়েছে তার চেয়ে দুর্বল, কোথাও আবার উল্টো দিকে। এর কোনোটিই নির্দিষ্ট কোনো মানুষের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
আমলকী কী
আমলকী ফিলান্থেসি (Phyllanthaceae) পরিবারের একটি পর্ণমোচী গাছ, যার আদি বিস্তার ক্রান্তীয় ও দক্ষিণ এশিয়ায়। গাছটি ছোট থেকে মাঝারি আকারের, সাধারণত ১ থেকে ৮ মিটার উঁচু হয়। সরু ডালের দুই পাশে ছোট ছোট হালকা সবুজ পাতা ঘন হয়ে সাজানো থাকে, ফলে প্রতিটি ডাল দেখতে পালকের মতো একটি যৌগিক পাতার মতো লাগে। ফুল সবুজাভ হলুদ; মার্চ ও এপ্রিল মূল ফুল ফোটার সময়। ফল প্রায় গোলাকার, হালকা সবুজাভ হলুদ, মসৃণ ও শক্ত, গায়ে ছয়টি হালকা খাড়া খাঁজ থাকে, এবং ব্যাস প্রায় ২৬ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়। বুনো গাছের একটি ফলের ওজন প্রায় ৫.৫ গ্রাম, আর চাষ করা গাছের ফল গড়ে প্রায় ২৮ থেকে ৫৬ গ্রাম। স্বাদ টক, তেতো ও কষা, শাঁস আঁশযুক্ত। এই তেতো ভাবের সঙ্গে যুক্ত এলাজিট্যানিন নামের ট্যানিন, যার মধ্যে আছে এমব্লিকানিন-এ, এমব্লিকানিন-বি, পিউনিগ্লুকোনিন ও পেডানকুলাজিন।
বাংলাদেশে বন অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশের উদ্ভিদ লাল তালিকায় (প্ল্যান্টস রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ) গাছটি আমলকী, আমলা, আম্বোলাটি ও আমলোটি (চাকমা নাম) নামে তালিকাভুক্ত; ইংরেজি নাম এমব্লিক মাইরোবালান ও ইন্ডিয়ান গুজবেরি। মূল্যায়নে একে 'ন্যূনতম উদ্বেগ' (লিস্ট কনসার্ন) শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। ২০২২ সালে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় বলা হয়, এই ফল প্রধানত ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, ইরান ও পাকিস্তানে পাওয়া যায় এবং ভারতের প্রচলিত চিকিৎসায় এর দীর্ঘ ব্যবহার রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আমলকী কাঁচা বা রান্না করে খাওয়া হয়। প্রায়ই লবণ, তেল ও মসলা দিয়ে এর আচার বানানো হয়, ডালের মতো খাবারে দেওয়া হয়, আর মোরব্বা বানানো হয়, যেখানে ফল চিনির শিরায় ভিজিয়ে রাখা হয় যতক্ষণ না তা মিছরির মতো হয়ে যায়। আয়ুর্বেদে ত্রিফলা নামের মিশ্রণের তিনটি ফলের একটি আমলকী। আমলকী-পণ্য নিয়ে হেলথ কানাডার ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ তারিখের মনোগ্রাফে লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্যের লেবেলে লেখা যায় এমন প্রচলিত আয়ুর্বেদিক ব্যবহারগুলোর তালিকা আছে: পুনর্যৌবনদায়ী টনিক (রসায়ন), অতি-অম্লতাজনিত (অম্লপিত্ত) বুকজ্বালা ও বদহজম উপশম, হজমের টনিক, মৃদু জোলাপ এবং চোখের টনিক; সঙ্গে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের উৎস হিসেবেও। এগুলো প্রচলিত ব্যবহারের বিবরণ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা লেবেলে লেখার অনুমতি দেয়; এগুলো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল নয়।

আমলকীতে কতটা ভিটামিন সি
প্রতিবেদনের মূল কথা, অর্থাৎ আমলকীতে প্রচুর ভিটামিন সি আছে, বাংলাদেশের নিজস্ব পুষ্টি সারণিতেই তার সমর্থন মেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তৈরি এবং ২০১৩ সালে প্রকাশিত 'ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ' অনুযায়ী কাঁচা আমলকীর খাওয়ার উপযোগী ১০০ গ্রাম অংশে আছে:
- শক্তি: ৪৪ কিলোক্যালরি (১৮৬ কিলোজুল)
- পানি: ৮৬.৭ গ্রাম
- আমিষ: ০.৮ গ্রাম; চর্বি: ০.১ গ্রাম
- প্রাপ্য শর্করা: ৮.৩ গ্রাম; খাদ্যআঁশ: ৩.৪ গ্রাম
- ক্যালসিয়াম: ৩২ মিলিগ্রাম; আয়রন: ০.৯ মিলিগ্রাম; পটাশিয়াম: ২২৫ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন সি: ৪৫৩.৪ মিলিগ্রাম
একই সারণিতে ভিটামিন সি-এর উৎস হিসেবে পরিচিত কাঁচা সবুজ পেয়ারায় প্রতি ১০০ গ্রামে ভিটামিন সি ২২৮.৩ মিলিগ্রাম। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস সাময়িকীর ২০২২ সালের পর্যালোচনায় দেখা যায়, আমলকীর বিভিন্ন জাত নিয়ে করা গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা ফলে ১৯৩ থেকে ৭২০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ভিটামিন সি পাওয়া গেছে; অর্থাৎ পরিমাণ জাত ও মাপার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। ভিটামিন সি ছাড়াও ফলটিতে আছে গ্যালিক অ্যাসিড, এলাজিক অ্যাসিড ও নানা ধরনের ট্যানিনের মতো পলিফেনল। পর্যালোচনাটি গবেষণাগার, প্রাণী এবং মানুষের ওপর ছোট পরিসরের গবেষণায় পাওয়া অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কার্যকারিতার সঙ্গে এগুলোকে যুক্ত করেছে।
তুলনার জন্য, এনআইএইচের অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টসের হিসাবে ১৯ বছর ও তার বেশি বয়সী পুরুষের দৈনিক প্রস্তাবিত ভিটামিন সি ৯০ মিলিগ্রাম, নারীর ৭৫ মিলিগ্রাম, গর্ভাবস্থায় ৮৫ মিলিগ্রাম এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় ১২০ মিলিগ্রাম। যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের ধূমপান না করা মানুষের চেয়ে দিনে ৩৫ মিলিগ্রাম বেশি লাগে। প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সহনীয় সর্বোচ্চ মাত্রা, অর্থাৎ একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন যতটা নিলে ক্ষতির আশঙ্কা কম, তা ২,০০০ মিলিগ্রাম; এই হিসাবে খাবার ও সাপ্লিমেন্ট দুটোই ধরা হয়। ভিটামিন সি পানিতে দ্রবণীয় এবং তাপে নষ্ট হয়, তাই দীর্ঘদিন রেখে দিলে বা রান্না করলে খাবারে এর পরিমাণ কমে যায়। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ভিটামিন সি-এর ঘাটতি থাকলে স্কার্ভি রোগ হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সূত্রগুলোর একটি, হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ, তাদের 'দ্য নিউট্রিশন সোর্স' নির্দেশিকায় ব্যাখ্যা করেছে যে অন্ত্রের ভিটামিন সি শোষণের ক্ষমতা সীমিত। একবারে ১,০০০ মিলিগ্রামের বেশি নিলে শোষণ অর্ধেকেরও নিচে নেমে যায়, আর শরীরের কোষ পরিপূর্ণ হয়ে গেলে বাড়তি অংশ প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, দিনে ৩,০০০ মিলিগ্রামের বেশি গ্রহণে বিরূপ প্রভাব দেখা দিতে পারে, যেমন ডায়রিয়া, আগে থেকে কিডনি রোগ বা পাথরের ইতিহাস আছে এমন মানুষের কিডনিতে পাথর বেড়ে যাওয়া, ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়া এবং হিমোক্রোমাটোসিস রোগীর শরীরে আয়রন শোষণ ও জমা বেড়ে যাওয়া। এই পরিমাণগুলো খুব বেশি মাত্রার, যা সাধারণত খাবারের সঙ্গে খাওয়া ফল থেকে নয়, বরং সাপ্লিমেন্ট ও ঘন প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে আসে।

গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি ও আলসার
প্রতিবেদনের প্রথম সতর্কতা ছিল গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি বা পেপটিক আলসারে ভোগা মানুষের জন্য। সেখানে বলা হয়, আমলকীতে ভিটামিন সি ও প্রাকৃতিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি, তাই অতিরিক্ত খেলে পেটে জ্বালা, বুকজ্বালা, অ্যাসিডিটি বা ব্যথা বাড়তে পারে। এনআইএইচের অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে) গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি) বা অম্লরসের ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহজনিত রোগের উপসর্গের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত খাবারের একটি তালিকা দিয়েছে: লেবুজাতীয় ফল ও টমেটোর মতো অম্লীয় খাবার, অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়, চকলেট, কফি ও ক্যাফেইনের অন্যান্য উৎস, বেশি চর্বিযুক্ত খাবার, পুদিনা এবং ঝাল খাবার। সংস্থাটি রিফ্লাক্সে ভোগা মানুষকে পরামর্শ দেয়, যেসব খাবারে উপসর্গ বাড়ে বলে মনে হয়, সেগুলো নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে; উপসর্গ কমে কি না দেখতে চিকিৎসক নির্দিষ্ট কিছু খাবার কমাতে বা বাদ দিতে বলতে পারেন।
বুকজ্বালা ও অ্যাসিড রিফ্লাক্স নিয়ে এনএইচএসের পরামর্শও প্রায় একই। সংস্থাটি বলে, কফি, টমেটো, অ্যালকোহল, চকলেট এবং চর্বিযুক্ত বা ঝাল খাবারের মতো কিছু খাবার ও পানীয়ে বুকজ্বালা হতে পারে বা বাড়তে পারে। পরামর্শ হলো, যে খাবার বা পানীয়ে উপসর্গ শুরু হয় তা না খাওয়া, অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া এবং ঘুমানোর তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে না খাওয়া। জীবনযাপনে পরিবর্তন ও ফার্মেসির ওষুধে কাজ না হলে, প্রায় প্রতিদিন বুকজ্বালা হলে, কিংবা খাবার গলায় আটকে যাওয়া, বারবার বমি হওয়া বা কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা হয়েছে। খুব বেশি মাত্রার ভিটামিন সি নিজেও পেটের সমস্যা করতে পারে: এনআইএইচের তথ্যপত্রে বেশি মাত্রার সবচেয়ে সাধারণ প্রভাব হিসেবে ডায়রিয়া, বমিভাব, পেট কামড়ানো ও হজমের অন্যান্য সমস্যার কথা বলা হয়েছে, যার কারণ শোষিত না হওয়া ভিটামিন সি।
পাকস্থলীর আলসারের প্রধান কারণ হিসেবে এনএইচএস হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং আইবুপ্রোফেনের মতো প্রদাহনাশক ব্যথার ওষুধের নিয়মিত ব্যবহারের কথা বলে; ধূমপায়ীদের মধ্যেও আলসার বেশি দেখা যায়। নিজে নিজে করণীয়ের মধ্যে আছে যে খাবার বা পানীয়ে উপসর্গ বাড়ে তা এড়িয়ে চলা। সংস্থাটি বলে, রক্তবমি, কফির গুঁড়ার মতো দেখতে বমি, কিংবা কালো ও আঠালো মল হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
তবে আমলকী নিয়ে করা গবেষণায় দেখা যায় না যে এটি রিফ্লাক্সের রোগীর ক্ষতি করে। ২০১৮ সালে জার্নাল অব ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনে প্রকাশিত একটি ডাবল-ব্লাইন্ড, প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে ইরানের ৬৮ জন নন-ইরোসিভ রিফ্লাক্স রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। যাঁরা চার সপ্তাহ ধরে খাবারের পর আমলকীর ট্যাবলেট খেয়েছেন, তাঁদের বুকজ্বালা ও খাবার উঠে আসার ঘনত্ব ও তীব্রতা প্লাসিবো পাওয়া রোগীদের চেয়ে বেশি কমেছে। অন্যদিকে হেলথ কানাডা আমলকী-পণ্যের একটি জানা প্রতিক্রিয়া হিসেবে জোলাপের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিক্রিয়া মানুষভেদে আলাদা হয়, তাই এনএইচএস ও এনআইডিডিকের বাস্তব পরামর্শই প্রযোজ্য: আমলকীর মতো টক খাবার খেলে যাঁর বুকজ্বালা বা পেটব্যথা বাড়ে, তিনি তা কমাবেন, আর উপসর্গ না সারলে চিকিৎসকের কাছে যাবেন।
কিডনিতে পাথর
প্রতিবেদনে কিডনিতে পাথরের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে আমলকী সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। বলা হয়, ফলটির অক্সালেট জাতীয় উপাদান ঝুঁকি বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যাঁদের আগে পাথর হয়েছে। এই প্রতিবেদনের জন্য দেখা স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর কোনোটিই বেশি অক্সালেটযুক্ত খাবারের তালিকায় আমলকীর নাম রাখেনি। এনআইডিডিকে বলে, কিডনিতে পাথর ঠেকাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পর্যাপ্ত তরল, প্রধানত পানি, পান করা। যাঁদের ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হয়েছে, তাঁদের প্রস্রাবে অক্সালেট বাড়ায় এমন খাবার এড়াতে বলা হয়েছে, যার মধ্যে আছে বাদাম ও বাদামজাত খাবার, চীনাবাদাম, রুবার্ব, পালংশাক ও গমের ভুসি; অক্সালেটের অন্যান্য উৎস নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়েছে। সংস্থাটি সোডিয়াম কমানো, প্রাণিজ আমিষ সীমিত রাখা এবং খাবার থেকে যথেষ্ট ক্যালসিয়াম নেওয়ারও পরামর্শ দেয়, কারণ সঠিক পরিমাণ ক্যালসিয়াম অন্ত্রে অক্সালেটকে আটকে রাখে। যাঁর একবার পাথর হয়েছে, তাঁকে পাথরটি কোন ধরনের ছিল তা জেনে নিতে বলা হয়েছে, কারণ ক্যালসিয়াম অক্সালেট, ক্যালসিয়াম ফসফেট, ইউরিক অ্যাসিড ও সিস্টিন পাথরের ক্ষেত্রে পরামর্শ আলাদা।
বেশি নথিভুক্ত সম্পর্কটি ভিটামিন সি-এর মাধ্যমে। এনআইএইচের তথ্যপত্র বলে, বেশি মাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণে প্রস্রাবে অক্সালেট ও ইউরিক অ্যাসিডের নিঃসরণ বাড়তে পারে, যা কিডনিতে পাথর তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে কিডনির রোগে ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে। দিনে ৩০ মিলিগ্রাম থেকে ১০ গ্রাম পর্যন্ত গ্রহণ নিয়ে করা গবেষণাগুলোর ফল পরস্পরবিরোধী, তাই ভিটামিন সি সত্যিই পাথর তৈরি করে কি না তা স্পষ্ট নয়; এর পক্ষে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ সেই মানুষদের ক্ষেত্রে, যাঁদের প্রস্রাবে আগে থেকেই অক্সালেট বেশি (হাইপারঅক্সালুরিয়া)। হার্ভার্ডের নির্দেশিকাও ঝুঁকিটি দেখেছে দিনে ৩,০০০ মিলিগ্রামের বেশি গ্রহণে এবং আগে থেকে কিডনি রোগ বা পাথরের ইতিহাস আছে এমন মানুষের ক্ষেত্রে।
পাঠকের জন্য এর অর্থ হলো, যাঁদের কিডনিতে পাথর হয়েছে, বিশেষ করে ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর, কিংবা যাঁদের কিডনির রোগ আছে, তাঁরা বেশি পরিমাণে আমলকী, ঘন জুস বা গুঁড়া খাওয়ার আগে, কিংবা ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে আমলকী নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেবেন।
ডায়াবেটিস, আচার ও মোরব্বা
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আমলকী সাধারণত উপকারী, তবে অতিরিক্ত খেলে বা আচার, মোরব্বা ও মিষ্টি জুস হিসেবে খেলে সমস্যা হতে পারে, কারণ এসব পণ্যে চিনি ও লবণ বেশি থাকায় রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। গবেষণা এই কথার প্রথম অংশকে সমর্থন করে, তবে সতর্কভাবে। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস সাময়িকীর ২০২২ সালের পর্যালোচনায় এমন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বর্ণনা আছে, যেখানে আমলকীর গুঁড়া ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজ কমিয়েছে; একটিতে প্রতিদিন খাওয়ার ২১ দিন পর, আরেকটিতে ৯০ দিন পর। আরেকটি ট্রায়ালে ফ্ল্যাভোনয়েড-সমৃদ্ধ আমলকীর নির্যাস স্নায়ুর ক্ষতির (নিউরোপ্যাথি) ঝুঁকি কমিয়েছে। পর্যালোচনার উপসংহার, রক্তে গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আমলকী সহায়ক হতে পারে, তবে প্রাণী ও মানুষের ওপর আরও গবেষণা দরকার। এসব ট্রায়ালে আমলকীর গুঁড়া ও নির্যাস রক্তে গ্লুকোজ কমিয়েছে বলে ডায়াবেটিসের ওষুধ খান এমন রোগীরা নিয়মিত এগুলো খাওয়ার আগে চিকিৎসককে জানাবেন।

সতর্কতার দ্বিতীয় অংশ আন্তর্জাতিক পরামর্শের সঙ্গে মেলে। ২০২০ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নির্দেশিকা অনুযায়ী, মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের নিচে 'ফ্রি সুগার' রাখা উচিত। দিনে প্রায় ২,০০০ কিলোক্যালরি খান এমন স্বাভাবিক ওজনের একজন মানুষের জন্য সংস্থাটি এর পরিমাণ বলেছে প্রায় ৫০ গ্রাম বা ১২ চা-চামচ; আরও ভালো হয় ৫ শতাংশের নিচে রাখলে। ফ্রি সুগারের মধ্যে আছে প্রস্তুতকারক, রাঁধুনি বা ভোক্তার যোগ করা চিনি এবং মধু, সিরাপ ও ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি; ফলে চিনির শিরায় তৈরি মোরব্বা ও মিষ্টি আমলকীর জুস দুটোই এর আওতায় পড়ে। সংস্থাটি প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ, অর্থাৎ প্রায় এক চা-চামচ, খেতে এবং আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করতে বলে।
বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্য নির্দেশিকা (ডায়েটারি গাইডলাইনস ফর বাংলাদেশ) প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে এবং ২০১৩ সালে তা হালনাগাদ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস (বারডেম), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কারিগরি সহায়তায়। এতেও একই বার্তা আছে: লবণ ও মসলাজাত উপকরণ সীমিত রাখা ও শুধু আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা, এবং চিনি, মিষ্টি ও চিনিযুক্ত পানীয় কম খাওয়া। নির্দেশিকার খাদ্য পিরামিডে শাকসবজি ও ফল দ্বিতীয় স্তরে, যা পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়ার কথা, আর চর্বি, তেল ও চিনি সবার ওপরে, যা অল্প খাওয়ার কথা। টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এনএইচএসের পরামর্শও হলো ফল ও শাকসবজিসহ স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং বেশি লবণ ও চিনিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি না খাওয়া।

রক্তচাপ
প্রতিবেদনে বলা হয়, আমলকী রক্তচাপ কমাতে সহায়ক, তাই যাঁদের রক্তচাপ আগে থেকেই কম, তাঁরা নিয়মিত বেশি পরিমাণে খেলে মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন। রক্তচাপের ওপর প্রভাব নিয়ে ক্লিনিক্যাল প্রমাণ মিশ্র। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার গবেষকদের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিস ২০২৩ সালে বিএমসি কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন অ্যান্ড থেরাপিজ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে ৫৩৫ জন অংশগ্রহণকারীর নয়টি র্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়, যার সবগুলোতে আমলকী ক্যাপসুল হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। প্লাসিবোর তুলনায় এলডিএল কোলেস্টেরল, ভিএলডিএল কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং প্রদাহের সূচক এইচএস-সিআরপি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কিন্তু সিস্টোলিক বা ডায়াস্টোলিক রক্তচাপে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পাওয়া যায়নি। কোনো ট্রায়ালেই এমন গুরুতর বিরূপ ঘটনা ঘটেনি যার জন্য গবেষণা আগেভাগে থামাতে হয়েছে; ট্রায়ালগুলোর মধ্যে বড় পার্থক্য থাকায় লেখকেরা ফলাফল সতর্কতার সঙ্গে পড়তে বলেছেন।
আলাদা আলাদা ট্রায়ালের ফলও ভিন্ন ভিন্ন দিকে গেছে। ভারতের পুদুচেরির জওহরলাল ইনস্টিটিউট অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চে (জিপমার) করা এবং ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি ট্রায়ালে উচ্চ রক্তচাপে ভোগা ১৫০ জন রোগী নিয়মিত ওষুধের পাশাপাশি ১২ সপ্তাহ আমলকীর নির্যাস বা প্লাসিবো খেয়েছেন; নির্যাসটি নিরাপদ পাওয়া গেলেও রক্তচাপ বাড়তি কমেনি। ২০২৩ সালের পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত ইরানের তাবরিজের একটি ট্রায়ালে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে ভোগা ৮১ জন প্রাপ্তবয়স্কের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক দুই রক্তচাপই উল্লেখযোগ্যভাবে কমার কথা বলা হয়েছে। আর ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় ১২ সপ্তাহ আমলকীর নির্যাস খাওয়া ১৫ জন বাড়তি ওজনের প্রাপ্তবয়স্কের গড় সিস্টোলিক রক্তচাপ আগে ও পরে দুবারই ছিল ১১৭ মিলিমিটার পারদ।
এনএইচএস ৯০/৬০ মিলিমিটার পারদের নিচের রিডিংকে নিম্ন রক্তচাপ বলে। সংস্থাটি জানায়, নিম্ন রক্তচাপে সব সময় উপসর্গ থাকে না, তবে মাথা হালকা লাগা বা মাথা ঘোরা, বমিভাব, ঝাপসা দেখা, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া রক্তচাপ বেশি কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে; এমন উপসর্গ বারবার হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা হয়েছে। নিজে করণীয় হিসেবে বলা হয়েছে ধীরে ধীরে ওঠা, অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া এবং বেশি পানি পান করা। খাবার হিসেবে খাওয়া আমলকী নির্ভরযোগ্যভাবে রক্তচাপ কমায় এমন প্রমাণ যেহেতু পাওয়া যায় না, তাই বাস্তব সতর্কতাটি বেশি প্রযোজ্য তাঁদের ক্ষেত্রে, যাঁরা আগে থেকেই রক্তচাপের ওষুধ খান এবং সঙ্গে ঘন আমলকী সাপ্লিমেন্ট যোগ করতে চান; তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
রক্তাল্পতা, আয়রন ট্যাবলেট ও আয়রনের আধিক্য
প্রতিবেদনে বলা হয়, আমলকী আয়রন শোষণে সাহায্য করে, তবে আয়রন সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে বেশি আমলকী খেলে কারও কারও পেটে অস্বস্তি হতে পারে। প্রথম অংশটি সুপ্রতিষ্ঠিত: এনআইএইচের তথ্যপত্র বলে, ভিটামিন সি নন-হিম আয়রনের শোষণ বাড়ায়, যা উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা আয়রনের ধরন। আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতা নিয়ে এনএইচএসের পরামর্শেও একই কথা বাস্তব রূপে আছে: আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার পর কমলার রস পান করলে শরীর আয়রন ভালোভাবে শোষণ করতে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য সারণি অনুযায়ী আমলকীতে নিজে আয়রন কম, প্রতি ১০০ গ্রামে ০.৯ মিলিগ্রাম।
পেটের অস্বস্তি মূলত আয়রন ট্যাবলেটেরই জানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এনএইচএস কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, পেটব্যথা, বুকজ্বালা, বমিভাব এবং স্বাভাবিকের চেয়ে গাঢ় রঙের মলকে কিছু মানুষের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, খাবারের সঙ্গে বা খাবারের পরপর ট্যাবলেট খেলে এসব কমতে পারে। চিকিৎসা সাধারণত প্রায় ছয় মাস চলে; পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলেও ট্যাবলেট চালিয়ে যেতে এবং কীভাবে খাবেন সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মানতে বলা হয়েছে। চা, কফি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং গোটা শস্যের মতো ফাইটিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার কম খেতে বলা হয়েছে, কারণ এগুলো বেশি পরিমাণে খেলে আয়রন শোষণ কঠিন হয়। সংস্থাটি আরও সতর্ক করে, আয়রন ট্যাবলেট শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে, কারণ ছোট শিশুর শরীরে বেশি আয়রন মারাত্মক, এমনকি প্রাণঘাতী হতে পারে।
একটি দলের জন্য আবার বাড়তি আয়রন শোষণই বিপদ। এনআইএইচ বলে, বংশগত হিমোক্রোমাটোসিস, অর্থাৎ যে অবস্থায় শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে, তাতে আক্রান্ত মানুষ দীর্ঘদিন বেশি মাত্রায় ভিটামিন সি নিলে আয়রনের আধিক্য আরও বাড়তে পারে এবং শরীরের কোষকলার ক্ষতি হতে পারে। এই রোগে আক্রান্তরা ভিটামিন সি বা আমলকীর সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
ওষুধ, গর্ভাবস্থা ও আমলকীর সাপ্লিমেন্ট
প্রতিবেদনের পাঁচটি দলের বাইরে, গবেষণা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথিতে আরও কিছু মানুষের কথা আসে, যাঁরা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ খান বা ঘন আমলকী-পণ্য ব্যবহার করেন। দেখা গেছে, আমলকীর নির্যাস রক্তের অণুচক্রিকার (প্লাটিলেট) জমাট বাঁধার প্রবণতা কমায়। ভারতের হায়দরাবাদের নিজামস ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের চিকিৎসকদের একটি গবেষণা ২০১৪ সালে ফাইটোমেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ভোগা ১০ জন রোগী আমলকীর নির্যাস, রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধী ওষুধ ক্লোপিডোগ্রেল বা অ্যাসপিরিন, কিংবা এগুলোর মিশ্রণ খেয়েছেন। প্রতিটি চিকিৎসা, আলাদাভাবে ও একসঙ্গে, শুরুর তুলনায় প্লাটিলেটের জমাট বাঁধা কমিয়েছে এবং রক্তক্ষরণ ও রক্ত জমাট বাঁধার সময় বাড়িয়েছে; সবগুলোই রোগীরা ভালোভাবে সহ্য করেছেন। ২০১৫ সালের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণাতেও ১২ সপ্তাহ আমলকীর নির্যাস খাওয়ার পর প্লাটিলেটের জমাট বাঁধা কমতে দেখা গেছে। তাই যাঁরা রক্ত পাতলা করার বা প্লাটিলেটবিরোধী ওষুধ খান, তাঁরা আমলকীর নির্যাস বা গুঁড়া খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলবেন।
হেলথ কানাডার মনোগ্রাফটি প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যপণ্য হিসেবে বিক্রি হওয়া শুকনা আমলকী, গুঁড়া ও নির্যাস নিয়ে; খাবার হিসেবে খাওয়া ফল নিয়ে নয়। এতে লেবেলে লিখতে বলা হয়েছে, বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় ব্যবহারের আগে স্বাস্থ্যসেবাদাতার পরামর্শ নিতে হবে, আর যেসব পণ্যে দিনে ৩ গ্রামের বেশি আমলকী থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায়ও পরামর্শ নিতে হবে। অন্য ওষুধ বা স্বাস্থ্যপণ্য খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে বা পরে আমলকী-পণ্য খেতে বলা হয়েছে, জোলাপের প্রভাব হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে, এবং জ্বর বা নির্ণয় না হওয়া পেটের সমস্যা থাকলে জোলাপ হিসেবে ব্যবহৃত পণ্য না খেতে বলা হয়েছে। এনআইএইচ আরও জানায়, ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট রেডিয়েশন থেরাপি এবং কিছু ক্যানসারের ওষুধ ও স্ট্যাটিনসহ বিভিন্ন ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে; কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন চলাকালে ভিটামিন সি বা অন্য অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সাপ্লিমেন্ট, বিশেষ করে বেশি মাত্রায়, নেওয়ার আগে ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
প্রতিবেদনের শেষ পরামর্শটি এসব সূত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এখানে দেখা সূত্রগুলো আমলকীকে একটি পুষ্টিকর খাবার হিসেবে দেখে, যার স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে গবেষণা আশাব্যঞ্জক হলেও এখনো সীমিত; একে ওষুধ হিসেবে দেখে না। গ্যাস্ট্রিক, কিডনি বা রক্তচাপের সমস্যা, ডায়াবেটিস, রক্তাল্পতা বা হিমোক্রোমাটোসিস থাকলে, গর্ভাবস্থায় বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়, এবং নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে প্রতিদিন বেশি পরিমাণে আমলকী খাওয়ার আগে কিংবা আমলকী বা ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
ছবি: Mazhar Zarif / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ (২১ জানুয়ারি ২০২৬), এনআইএইচ অফিস অব ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টস (ভিটামিন সি তথ্যপত্র, জুলাই ২০২৫), এনআইডিডিকে, এনএইচএস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, এপ্রিল ২০২০), হেলথ কানাডা (আমলকী মনোগ্রাফ, মার্চ ২০২৫), পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ফুড কম্পোজিশন টেবিল ফর বাংলাদেশ, ২০১৩), হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ (দ্য নিউট্রিশন সোর্স), এফএও (বাংলাদেশের খাদ্য নির্দেশিকা), বাংলাদেশের উদ্ভিদ লাল তালিকা, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস (২০২২), জার্নাল অব ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন (২০১৮), ফাইটোমেডিসিন (২০১৪), জার্নাল অব মেডিসিনাল ফুড (২০১৫), ফাইটোথেরাপি রিসার্চ (২০২১), বিএমসি কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন অ্যান্ড থেরাপিজ (২০২৩), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)