২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি জাগো নিউজের লাইফস্টাইল বিভাগ নারকেল দুধে আস্ত মুরগির রোস্ট রান্নার একটি ঘরোয়া রেসিপি প্রকাশ করে। রেস্টুরেন্টের ঝামেলা ছাড়াই যাঁরা ঘরে বসে ভিন্নধর্মী ও সুস্বাদু কিছু রাঁধতে চান, তাঁদের জন্য পত্রিকাটি এই রেসিপি দেয়। পত্রিকার ভাষায়, নারকেল দুধের ক্রিমি স্বাদ আর মসলার মৃদু সুগন্ধে মুরগি হয়ে ওঠে নরম ও রসালো, আর বিশেষ দিন হোক বা সাধারণ পারিবারিক খাবার, দুই ক্ষেত্রেই পদটি মানিয়ে যায়। রেসিপিতে লাগে একটি আস্ত মুরগি, অল্প কয়েকটি মসলা, আধা কাপ নারকেলের দুধ আর চুলায় কয়েকটি সহজ ধাপ।
এই প্রতিবেদনে জাগো নিউজের দেওয়া রেসিপিটি হুবহু তুলে ধরা হলো। সেই সঙ্গে বিশ্বকোষ ও আগের প্রতিবেদন থেকে উপকরণগুলোর পরিচয় এবং বাংলাদেশের রান্নায় পদটির স্থান ব্যাখ্যা করা হলো, আর কাঁচা মুরগি সামলানো ও পুরোপুরি সেদ্ধ করা নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ যোগ করা হলো।
জাগো নিউজের রেসিপির উপকরণ
পত্রিকাটি যে পরিমাণ দিয়েছে, সেই অনুযায়ী উপকরণের তালিকা:
- মুরগি: ১টি (আস্ত)
- জর্দার রং: ১ চা-চামচ
- তেল: ৪ টেবিল চামচ
- গরমমসলার গুঁড়া: ১ চা-চামচ
- জয়ফল-জয়ত্রীর গুঁড়া: আধা চা-চামচ
- মরিচের গুঁড়া: আধা চা-চামচ
- আদাবাটা: ১ টেবিল চামচ
- রসুনবাটা: দেড় চা-চামচ
- এলাচ ও দারুচিনি (পরিমাণ দেওয়া হয়নি)
- তেজপাতা: ৫-৬টি
- বাদামবাটা: ১ টেবিল চামচ
- নারকেলের দুধ: আধা কাপ
- বেরেস্তাবাটা: ১ চা-চামচ
- ঘি: ২ টেবিল চামচ
- লবণ: স্বাদমতো
এ ধরনের পদের তুলনায় তালিকাটি ছোট। এলাচ ও দারুচিনির কোনো পরিমাণ এতে দেওয়া হয়নি, বাদামবাটা কোন বাদামের তা বলা হয়নি, মুরগির ওজন কত হবে তা-ও উল্লেখ নেই। ফলে রান্নার সময় নির্ভর করবে মুরগির আকারের ওপর। এ কারণেই স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মাংস সেদ্ধ হয়েছে কি না তা যাচাইয়ের যে পদ্ধতির কথা বলে, যা এই প্রতিবেদনের পরের অংশে আছে, ছোট টুকরার চেয়ে আস্ত মুরগির ক্ষেত্রে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যেভাবে রান্না করবেন
জাগো নিউজ কয়েকটি বাক্যে প্রণালী দিয়েছিল। ধাপে ধাপে সাজালে তা দাঁড়ায় এমন:
- প্রথমে মুরগি পরিষ্কার করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন।
- মুরগিতে সামান্য জর্দার রং ও লবণ মেখে অল্প আঁচে হালকা ভেজে নিন।
- মুরগি সোনালি রং হয়ে এলে উঠিয়ে রাখুন।
- এবার কড়াইয়ে সব গুঁড়া ও বাটা মসলা, বাদামবাটা ও গরমমসলা ভালো করে কষিয়ে নিন।
- কষানো মসলায় মুরগি ও নারকেলের দুধ দিয়ে ঢেকে দিন।
- মুরগি সেদ্ধ হয়ে তেল ওপরে উঠে এলে ভাজা বেরেস্তা ও ঘি দিন এবং ২-৩ মিনিট পর চুলা থেকে নামিয়ে নিন।
নাম শুনে কেউ ওভেনে সেঁকা মুরগি ভাবতে পারেন, কিন্তু পদটি তা নয়। বাংলাদেশের বিয়েবাড়ির রোস্ট নিয়ে ২০২৩ সালের এপ্রিলে মার্কিন খাদ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট টেস্টিং টেবিল লিখেছিল, এই মুরগি আসলে মোটেও রোস্ট বা সেঁকা হয় না, রাঁধা হয় চুলায়, ফ্রাইপ্যান বা কড়াইয়ে। ওয়েবসাইটটি এই কৌশলকে বলেছে ভুনা, যার ব্যাখ্যা তারা দিয়েছে ঘন ঝোলসহ মাংস ভাজা বা নেড়েচেড়ে রাঁধা হিসেবে; দক্ষিণ এশিয়ার রান্নায় চুলায় রাঁধার এটি একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি।
টেস্টিং টেবিলের বর্ণনায় প্রচলিত প্রণালীর ধাপগুলো জাগো নিউজের ধাপের মতোই সাজানো। মুরগিতে লবণ ও হলুদ রং মেখে বাদামি করে ভেজে তুলে রাখা হয়; গরম তেলে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও তেজপাতার মতো সুগন্ধি মসলা ভেজে তাতে মসলার পেস্ট দিয়ে ঝোল তৈরি হয়; ঝোল রান্না হয়ে ঘন ও ক্রিমি হলে মুরগি আবার তাতে দেওয়া হয়; শেষে মচমচে ভাজা পেঁয়াজ ছড়িয়ে পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। ওয়েবসাইটটি নানা রকমফেরের কথাও লিখেছে, যেমন আদা-রসুনবাটা মেশানো দইয়ের মেরিনেড, কিংবা পানি দিয়ে পাতলা করা ঝোল, কখনো গোলাপজল বা কেওড়াজল মিশিয়ে। জাগো নিউজের রেসিপিতে ক্রিমি ভাবটা আসে নারকেলের দুধ আর বাদামবাটা থেকে।
মোগল শিকড়ের বিয়েবাড়ির পদ
টেস্টিং টেবিল পদটিকে বলেছে "বিয়েবাড়ির মুরগির রোস্ট"। তাদের লেখা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বিয়েতে বিরিয়ানি, সমুচা ও কাবাবের পাশে এর জায়গা আছে, আর ঈদ থেকে শুরু করে সাধারণ জন্মদিনের আয়োজনেও এটি থাকে। ওয়েবসাইটটি এর ঝোলকে বর্ণনা করেছে ভালোভাবে মসলা দেওয়া, ঘন ও সমৃদ্ধ হিসেবে, যাতে নোনতা আর মিষ্টি স্বাদের ভারসাম্য থাকে।
পদটির উৎস নিয়ে ওয়েবসাইটটি মার্কিন খাদ্য সাময়িকী এপিকিউরিয়াসের বরাত দিয়েছে, যেখানে একজন রন্ধনশিল্পী ও খাদ্যগবেষকের বক্তব্য ছাপা হয়েছিল। তাঁর মতে, এর প্রথম রূপ ছিল মুরগ মুসাল্লাম, যা এসেছে তুর্কি-পারসিক-আফগান মোগল প্রভাব থেকে। তখন পরে প্রচলিত হওয়া মুরগির চার টুকরার বদলে রাঁধা হতো আস্ত পাখি। আস্ত মুরগি পরিবেশনের সেই রীতি এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে, তবে বিয়েতে এখনো বর-কনেকে ভাগ করে খাওয়ার জন্য একটি আস্ত মুরগি দেওয়া হয়। জাগো নিউজের রেসিপি সেই পুরোনো আস্ত মুরগির ধারাটিই ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশের খাবার নিয়ে বিশ্বকোষেও একই ধারার কথা আছে। উইকিপিডিয়ার বাংলাদেশি রন্ধনশৈলী নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশের রান্নার অভ্যাস মোগল শাসনের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রভাবিত; ঢাকা ছিল সুবা বাংলার মোগল রাজধানী, আর ঢাকার নবাবেরা বাংলায় মোগলাই রান্না নিয়ে আসেন, যার বৈশিষ্ট্য মৃদু মসলায় মাংস ও দুগ্ধজাত উপকরণের ব্যবহার। নিবন্ধটির ভাষ্যে, কোরমা এখনো ঈদ ও বিয়ের মতো বিশেষ উপলক্ষে পরিবেশন করা হয়। একই নিবন্ধে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের দুরুস কুরা হলো ঘন ঝোলে রাঁধা আস্ত মুরগি, যা পোলাও বা খিচুড়ির সঙ্গে খাওয়া হয়।
পুরান ঢাকার বিয়ের খাবার কীভাবে বদলেছে, তা নিয়ে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারের স্টার লাইফস্টাইল পাতায় গ্যেটে-ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি একটি ধারাবাহিকে লেখা হয়। পত্রিকাটি লেখে, কাচ্চি বিরিয়ানি এখন বিয়ের প্রধান পদ হয়ে উঠলেও আগের প্রিয় খাবার ছিল মুরগি, বিশেষ করে জাফরানের সুবাসে রাঁধা মুরগ পোলাও। তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে একই ঠিকানায় বসবাসকারী পুরান ঢাকার একটি পরিবারের একজন সদস্য পত্রিকাটিকে বলেন, "দিন শেষে কাচ্চি, চিকেন রোস্ট আর রেজালাই রাজত্ব করে"। বংশালের একটি জাদুঘরের প্রধান পত্রিকাটিকে জানান, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অভিবাসনের সূত্রে কাচ্চি বিয়ের পদ হিসেবে জায়গা করে নেয়।

নারকেলের দুধ কী
এই রেসিপির বিশেষ উপকরণ নারকেলের দুধ হলো পরিপক্ব নারকেলের কোরানো শাঁস থেকে বের করা উদ্ভিজ্জ দুধ। এর দুধসাদা রং ও সমৃদ্ধ স্বাদ আসে উচ্চমাত্রার তেল থেকে, যার বেশির ভাগই সম্পৃক্ত চর্বি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ওশেনিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় এটি রান্নার প্রচলিত উপকরণ।
প্রচলিত পদ্ধতিতে নারকেলের সাদা শাঁস কুরিয়ে তাতে অল্প গরম পানি মিশিয়ে কাপড়ে ছেঁকে চিপে দুধ বের করা হয়। প্রথম চাপে মেলে নারকেলের ক্রিম বা ঘন দুধ, যাতে চর্বি থাকে প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ; ছিবড়ে গরম পানিতে ভিজিয়ে আবার চাপলে মেলে পাতলা দুধ, যাতে চর্বি থাকে ৫ থেকে ২০ শতাংশ। এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক কোকোনাট কমিউনিটি এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস দুই ধরনের পণ্যের মান নির্ধারণ করেছে, যদিও বাজারের মোড়কে সব সময় সেই পরিভাষা মানা হয় না।
নারকেলের দুধ আর ডাবের পানি এক জিনিস নয়। নারকেলের ভেতরের স্বচ্ছ তরলটি হলো পানি, আর শাঁস পিষে বের করা তরল হলো দুধ। উইকিপিডিয়ার নিবন্ধে উদ্ধৃত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পুষ্টি তথ্য অনুযায়ী, ১০০ মিলিলিটার নারকেলের দুধে থাকে ২৩০ কিলোক্যালরি; এর ৬৮ শতাংশ পানি, ২৪ শতাংশ চর্বি, ৬ শতাংশ শর্করা ও ২ শতাংশ আমিষ, আর সম্পৃক্ত চর্বি ২১ গ্রাম, যার প্রায় অর্ধেক লরিক অ্যাসিড। জাগো নিউজের রেসিপিতে একটি আস্ত মুরগির জন্য আধা কাপ নারকেলের দুধ লাগে।
নারকেলগাছ বাংলাদেশের অতি পরিচিত গাছ। বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়া কোকোস নিউসিফেরা নামের এই পামগাছের বর্ণনায় বলেছে, এটি ৮ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং ভালো যত্নে একটি গাছে বছরে ২০০ বা তার বেশি ফল ধরতে পারে। বাংলাদেশে এটি ফল ও নানা কাজে লাগার জন্য বসতবাড়ির গাছ হিসেবে, আবার রাস্তার ধারের গাছ হিসেবেও লাগানো হয়। বিশ্বকোষটি জানায়, শাঁস কাঁচা খাওয়া হয় এবং মিষ্টান্ন, নানা খাবার ও মিঠাই তৈরিতে ব্যবহৃত হয়; শুকনো শাঁস বা কোপরা থেকে তেল হয়; ছোবড়া থেকে মাদুর ও দড়ি হয়; আর কচি ডাব পানীয় হিসেবে খুবই চাহিদাসম্পন্ন। বাংলাপিডিয়ার ভুক্তি অনুযায়ী দেশে প্রায় ৩১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে নারকেলের আবাদ হয় এবং উৎপাদন প্রায় ৯৬ হাজার টন।

মসলার পরিচয়: গরমমসলা, জয়ফল, জয়ত্রী, এলাচ, দারুচিনি ও তেজপাতা
বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায়, খাবারে স্বাদ-গন্ধ আনতে ব্যবহৃত যেকোনো সুগন্ধি উদ্ভিদ, উদ্ভিদের অংশ বা উদ্ভিজ্জ পণ্যই মসলা, আর এর মূল্য নিহিত থাকে সুগন্ধে, অর্থাৎ উদ্বায়ী তেলে। বিশ্বকোষটি জনপ্রিয় গরমমসলাকে লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও এলাচের মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা মূলত বিশেষ মাংসের তরকারি ও ভাতের পদে ব্যবহৃত হয়। অঞ্চলভেদে মিশ্রণটি বদলায়; উইকিপিডিয়া জানায়, পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, আসাম ও বাংলাদেশে শুধু এলাচ, দারুচিনি ও লবঙ্গ দিয়েও গরমমসলা হতে পারে।
বাংলাপিডিয়ার ভাষায় জয়ফল মৃদু সুগন্ধের একটি মসলা: মিরিস্টিকা ফ্রাগ্রান্স নামের চিরসবুজ গাছের পাকা ও শুকনো বীজ। গাছটি ১০ থেকে ২০ মিটার উঁচু হয়, এর আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ার মলুক্কা দ্বীপপুঞ্জ, আর চাষ হয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে। বিশ্বকোষটি জানায়, বাংলাদেশে পোলাও, বিরিয়ানি ও তেহারির মতো বিশেষ খাবারে জয়ফল খুবই কদর পায়। জয়ত্রী আসে একই ফল থেকে: জয়ফলের বীজকে ঘিরে থাকা লালচে আবরণটিই জয়ত্রী। এর স্বাদ জয়ফলের মতো, তবে আরও মৃদু; বীজ থেকে ছাড়িয়ে চ্যাপ্টা করে ১০ থেকে ১৪ দিন শুকালে এর রং বদলে হালকা হলুদ, কমলা বা বাদামি হয়। রেসিপিতে দুটো একসঙ্গে গুঁড়া করে আধা চা-চামচ দিতে বলা হয়েছে।
এলাচ আদা-গোত্রের এলেটারিয়া ও অ্যামোমাম গণের উদ্ভিদের বীজ। সবুজ এলাচের খোসা ছোট ও হালকা সবুজ, আর বড় এলাচ বা কালো এলাচের খোসা বড় ও গাঢ় বাদামি। খোসাসহ রাখলে এলাচ ভালো থাকে, কারণ গুঁড়া করা দানা দ্রুত স্বাদ হারায়। দারুচিনি হলো সিনামোমাম গণের গাছের ভেতরের ছাল। সিলন বা আসল দারুচিনি নামে পরিচিত সিনামোমাম ভেরাম প্রজাতির নাম এসেছে শ্রীলঙ্কা থেকে, তবে বিশ্ববাজারের বেশির ভাগ দারুচিনি আসে কাছাকাছি অন্য প্রজাতি থেকে, যেগুলোকে সাধারণত ক্যাসিয়া বলা হয়।
বাংলাপিডিয়া তেজপাতাকে বর্ণনা করেছে একই গোত্রের ছোট গাছ সিনামোমাম তামালার শুকনো পাতা হিসেবে। বিশ্বকোষটির মতে, এটি বাংলাদেশের রান্নায় সবচেয়ে প্রচলিত মসলাগুলোর একটি; সিলেটের উঁচু জমি ও টিলায় বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ হয়, আর কলমের চারা অনেক বাগান ও বসতবাড়ির আঙিনায়ও লাগানো হয়। রেসিপিতে ৫-৬টি তেজপাতা লাগে।
রেসিপির দুই বাটা মসলা আদা ও রসুন, দুটোই বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। বাংলাপিডিয়া আদাকে (জিঞ্জিবার অফিসিনালে) উঁচু জমি ও পাহাড়ি ঢালের বৃষ্টিনির্ভর ফসল হিসেবে বর্ণনা করেছে; দিনাজপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি এর প্রধান উৎপাদক জেলাগুলোর মধ্যে, আর বিশ্বকোষটির হিসাবে দেশে প্রায় ১৯ হাজার ৫৫ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৪৯ হাজার ৪০৫ টন আদা হয়। রসুন সারা দেশে চাষ হয়, তবে বেশি হয় ফরিদপুর, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ঢাকা ও কুমিল্লায়; বিশ্বকোষটির হিসাবে ২৫ হাজার ৫৯৩ হেক্টর জমিতে উৎপাদন প্রায় ৯০ হাজার ১৭০ টন। রেসিপিতে লাগে এক টেবিল চামচ আদাবাটা আর দেড় চা-চামচ রসুনবাটা।

বেরেস্তা, ঘি ও জর্দার রং
বেরেস্তা হলো ভাজা পেঁয়াজ, আর টেস্টিং টেবিল বিয়েবাড়ির রোস্টের প্রচলিত শেষ ছোঁয়া হিসেবে মচমচে ভাজা পেঁয়াজের কথা লিখেছে। জাগো নিউজের রেসিপিতে পেঁয়াজ আসে দুবার: মসলার সঙ্গে এক চা-চামচ বেরেস্তাবাটা, আর শেষে ঘিয়ের সঙ্গে ভাজা বেরেস্তা। বাংলাপিডিয়া পেঁয়াজকে (অ্যালিয়াম সেপা) বাংলাদেশের সব জেলায় চাষ হওয়া ফসল হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার সবচেয়ে বড় উৎপাদক ফরিদপুর; বিশ্বকোষটির ভুক্তিতে আবাদ প্রায় ৮৬ হাজার ৪২৯ হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৪১০ টন। বিশ্বকোষটি আরও জানায়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বারি পিঁয়াজ-১ নামে একটি জাত অবমুক্ত করেছে।
ঘি হলো ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত পরিশোধিত মাখন, রান্নার একটি চর্বি। সাধারণত মাখন অল্প আঁচে ফুটিয়ে ওপরের ময়লা ফেলে দিয়ে তলায় জমা কঠিন অংশ বাদ রেখে স্বচ্ছ চর্বিটুকু রাখা হয়; এর বাদামের মতো সুবাস আর উচ্চ ধোঁয়াবিন্দুর জন্য ঘি সমাদৃত। বাংলায় গরুর দুধের ঘি, যাকে গাওয়া ঘি বলা হয়, ভাত বা রুটির সঙ্গে অথবা তরকারি বা ডালের ওপর শেষে ছড়িয়ে দেওয়া হয়; এই রেসিপিতেও দুই টেবিল চামচ ঘি দেওয়া হয় রান্নার শেষ কয়েক মিনিটে।
জর্দার রঙের নাম এসেছে জর্দা থেকে, উপমহাদেশজুড়ে বিয়েতে পরিবেশন করা হলুদ মিষ্টি ভাত। নামটি এসেছে ফারসি শব্দ জার্দ থেকে, যার অর্থ হলুদ, কারণ খাবারের রং দিয়েই চালকে হলুদ করা হয়। রেসিপিতে ভাজার আগে লবণের সঙ্গে মুরগিতে সামান্য জর্দার রং মাখাতে বলা হয়েছে, উপকরণের তালিকায় যার পরিমাণ এক চা-চামচ। টেস্টিং টেবিল লিখেছে, এই পদের অনেক রেসিপিতে খাবারের রঙের বদলে হলুদের মতো হলদে মসলা দিয়েই মুরগিতে রং আনা হয়।
আস্ত মুরগি পুরোপুরি সেদ্ধ করা: স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ
আস্ত মুরগির ক্ষেত্রে মাংসের সবচেয়ে পুরু অংশ যাচাই করার বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ পুরোপুরি প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিলের নির্দেশনায় বলেছে, কাঁচা মুরগিতে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার, সালমোনেলা বা ক্লস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিনজেনস ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, আর কম সেদ্ধ মুরগি খেলে, কিংবা কাঁচা মুরগি বা এর রসের সংস্পর্শে আসা অন্য খাবার খেলে, খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার নিয়ে তাদের তথ্যপত্রে বলেছে, এই ব্যাকটেরিয়া বিশ্বে ডায়রিয়াজনিত রোগের চারটি প্রধান কারণের একটি এবং মানুষের পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহের সবচেয়ে সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণ। কম সেদ্ধ, দূষিত হাঁস-মুরগির মাংস খাওয়াকে এর বড় উৎস বলে মনে করা হয়। সংক্রমণের সাধারণত ২ থেকে ৫ দিন পর, তবে ১ থেকে ১০ দিনের মধ্যে, উপসর্গ দেখা দেয়: ডায়রিয়া (প্রায়ই রক্তমিশ্রিত), পেটব্যথা, জ্বর, মাথাব্যথা, বমিভাব ও বমি, যা সাধারণত ৩ থেকে ৬ দিন থাকে। অসুখটি সাধারণত মৃদু হলেও খুব ছোট শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। ডব্লিউএইচও বলেছে, তাপে এবং খাবার ভালোভাবে রান্না করলে এই ব্যাকটেরিয়া মারা যায়।
জাগো নিউজের রেসিপির প্রথম ধাপে মুরগি ধোয়ার কথা আছে। সিডিসির পরামর্শ হলো, কাঁচা মুরগি রান্নার জন্য প্রস্তুত অবস্থাতেই থাকে, আগে ধোয়ার দরকার নেই; সংস্থাটি ইউএসডিএর একটি গবেষণার উল্লেখ করেছে, যাতে দেখা যায়, মুরগি ধোয়ার পর সিংক পরিষ্কার করেছেন এমন প্রতি ৭ জনের ১ জনের সিংকে তখনো জীবাণু ছিল। যাঁরা মুরগি ধুতে চান, তাঁদের জন্য সিডিসির পরামর্শ: পানি যেন ছিটকে না পড়ে সে জন্য আস্তে পানি ঢালুন, ধোয়ার পরপরই সিংক ও আশপাশ গরম সাবান-পানি দিয়ে পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করুন, আর ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে নিন।
সিডিসি আরও পরামর্শ দেয়: কাঁচা মুরগি ধরার আগে ও পরে অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান-পানিতে হাত ধোয়া, কাঁচা মুরগির জন্য আলাদা কাটার বোর্ড ব্যবহার করা, কাঁচা মুরগি রাখা প্লেট, বোর্ড বা জায়গায় কখনো রান্না করা খাবার বা তাজা সবজি-ফল না রাখা, আর মুরগি কাটার পর বোর্ড, ছুরি-চামচ, থালা ও রান্নাঘরের তাক গরম সাবান-পানিতে ধোয়া।
মুরগি সেদ্ধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে সিডিসি খাদ্য থার্মোমিটার ব্যবহার করে ভেতরের তাপমাত্রা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছেছে কি না দেখতে বলে। কানাডার স্বাস্থ্য বিভাগ হেলথ কানাডার ২০২৪ সালের ৪ জুন প্রকাশিত নিরাপদ রান্নার তাপমাত্রার তালিকায় মুরগির বুক, রান, উরু ও ডানার মতো টুকরার জন্য ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এবং আস্ত পাখির জন্য ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রার কথা বলা হয়েছে। থার্মোমিটার মাংসের সবচেয়ে পুরু অংশ দিয়ে একেবারে মাঝখান পর্যন্ত ঢোকাতে হবে, হাড় না ছুঁইয়ে, আর একাধিক টুকরা থাকলে প্রতিটি আলাদা করে দেখতে হবে। রেসিপিতে রান্না শেষের সংকেত হলো ঝোলের ওপর তেল ভেসে ওঠা; স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা হলো মাংসের মাঝখানের তাপমাত্রা।
সিডিসি বলেছে, বেঁচে যাওয়া খাবার ২ ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজ বা ফ্রিজারে রাখতে হবে, আর খাবার ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় থাকলে ১ ঘণ্টার মধ্যে। খাওয়ার পর কেউ অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উৎসবের পদে চর্বি ও লবণ
রেসিপিটি বেশ সমৃদ্ধ: চার টেবিল চামচ তেল, দুই টেবিল চামচ ঘি, আধা কাপ নারকেলের দুধ আর এক টেবিল চামচ বাদামবাটা। ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্রে, যার তারিখ ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি, চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, পাম তেল, ক্রিম, পনির ও লার্ডের পাশাপাশি ঘি ও নারকেল তেলকে সম্পৃক্ত চর্বির উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্যপত্রটি বলছে, মাছ, অ্যাভোকাডো ও বাদামে এবং সূর্যমুখী, সয়াবিন, ক্যানোলা ও জলপাই তেলে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি বেশি ভালো।
ডব্লিউএইচওর পরামর্শ, দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের বেশি যেন সম্পৃক্ত চর্বি থেকে না আসে। সম্পৃক্ত চর্বি কমানোর উপায় হিসেবে সংস্থাটি ভাজার বদলে ভাপে বা সেদ্ধ করে রান্না, মাখন, লার্ড ও ঘিয়ের বদলে সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টা, কুসুমফুল ও সূর্যমুখীর মতো বহু-অসম্পৃক্ত চর্বিসমৃদ্ধ তেল ব্যবহার এবং মাংসের দৃশ্যমান চর্বি ছেঁটে ফেলার কথা বলেছে। লবণের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি, এবং বলেছে রান্নার সময় দেওয়া লবণও এই হিসাবের মধ্যে পড়ে। রেসিপিতে লবণ দিতে বলা হয়েছে স্বাদমতো।
হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা বিশেষ খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হয় এমন কোনো রোগ থাকলে এ ধরনের পদ কতটা ও কত ঘন ঘন খাওয়া যাবে, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে মুরগি: সরকারি হিসাব কী বলে
বাংলাপিডিয়ার হাঁস-মুরগি ভুক্তিতে বলা হয়েছে, গৃহপালিত মুরগির পূর্বপুরুষ সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনমোরগ, আর মানুষ সম্ভবত চার হাজার বছরেরও বেশি আগে মুরগিকে পোষ মানিয়েছে। বিশ্বকোষটি জানায়, দেশি মুরগিতে মাংস ও ডিম কম হয় বলে বাংলাদেশে হোয়াইট লেগহর্ন ও রোড আইল্যান্ড রেডের মতো উন্নত জাতের মুরগির খামারের দিকে ঝোঁক বেড়েছে; এসব মুরগি আকারে বড় এবং ওজন ৪ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি তাদের "লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৪-২০২৫" তথ্যপত্রে, যা সাময়িক হিসাব হিসেবে চিহ্নিত, দেশে মুরগির সংখ্যা দেখিয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৬০ দশমিক ৭০ লাখ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ২৭৭ দশমিক ৭৭ লাখ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৮৩ দশমিক ৯৩ লাখ। হাঁস ছিল ৭০৫ দশমিক ৮২ লাখ, আর হাঁস-মুরগি মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৬৬ দশমিক ৫২ লাখ।
একই তথ্যপত্রে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব ধরনের মাংসের উৎপাদন দেখানো হয়েছে ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ টন, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৯২ দশমিক ২৫ লাখ টন। মাথাপিছু দিনে ১২০ গ্রাম ধরে চাহিদা হিসাব করা হয়েছে ৭৭ দশমিক ৯২ লাখ টন, আর প্রাপ্যতা মাথাপিছু দিনে ১৩৭ দশমিক ৯০ গ্রাম। ডিমের উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৪৪০ দশমিক ৬৫ কোটি। স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ; ডিএলএসের হিসাবে এই খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান ২০ শতাংশ মানুষের এবং আংশিক কর্মসংস্থান ৫০ শতাংশের।
ছবি: Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, টেস্টিং টেবিল, দ্য ডেইলি স্টার, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), হেলথ কানাডা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)