বাংলাদেশে কাঁঠাল গ্রীষ্মের চেনা ফল; পাকা কোয়া যেমন খাওয়া হয়, তেমনি কাঁচা কাঁঠালের তরকারিও (এঁচোড়) ঘরে ঘরে রান্না হয়। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ৪ জুলাই এক ফিচারে জানায়, এই ফলই তখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের অনেক সুপারশপে টিনজাত, হিমায়িত বা ভ্যাকুয়াম প্যাকে বিক্রি হচ্ছিল এবং 'ভেজিটেরিয়ান মিট' বা উদ্ভিদভিত্তিক মাংসের বিকল্প হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। বার্গার, টাকো, স্যান্ডউইচ, পিৎজা ও বারবিকিউ তৈরিতে রেস্তোরাঁগুলো এটি ব্যবহার করছিল।
কাঁঠাল (Artocarpus heterophyllus) বাংলাদেশের জাতীয় ফল। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান ২০১৪ সালে লিখেছিল, এটি গাছে ধরা সবচেয়ে বড় ফল; ছোট একটি কাঁঠালও ৫ থেকে ৭ কেজি হয় এবং ৪৫ কেজির বেশি ওজনের কাঁঠালও কৃষকেরা পেয়েছেন।
মাংসের মতো গঠন, নিজস্ব স্বাদ মৃদু
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী কাঁচা কাঁঠালের মূল বৈশিষ্ট্য এর আঁশালো গঠন। রান্নার আগে শক্ত ও ঘন হলেও দীর্ঘ সময় সেদ্ধ বা ধীরে রান্না করলে আঁশগুলো আলাদা হয়ে যায়, যা দেখতে ও খেতে অনেকটা টেনে ছেঁড়া মুরগির মাংস বা ধীরে রান্না করা গরুর মাংসের মতো লাগে। স্বাদে কাঁঠাল মাংস নয়, তবে এর নিজস্ব স্বাদ মৃদু বলে যে মসলা বা সস দিয়ে রান্না হয়, সেটির স্বাদ সহজে শুষে নেয়। তাই একই কাঁঠাল দিয়ে বারবিকিউ, মেক্সিকান টাকো বা ভারতীয় কারি রাঁধা যায়।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ২০১৬ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছিল, ভেগানরা কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে টাকো, এনচিলাডা ও বারবিকিউ স্যান্ডউইচ তৈরি করেন। ভারতীয় রান্নার বইয়ের লেখক জুলি সাহনির মতে, কাঁচা কাঁঠালে মাংসের মতো মুখের অনুভূতি পাওয়া যায়, যা পেট ভরার তৃপ্তি দেয়। দ্য জ্যাকফ্রুট কোম্পানি ও আপটন'স ন্যাচারালসের মতো প্রতিষ্ঠান তখনই আগে থেকে রান্না করা, মসলা ছাড়া বা মসলা মেশানো কাঁঠালের প্যাক বাজারে এনেছিল। এর অনেক আগে, ১৯৮৭ সালে উদ্ভিদবিদ জুলিয়া মর্টন তাঁর 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস' বইয়ে লিখেছিলেন, পশ্চিমা মানুষের কাছে পূর্ণবয়স্ক কিন্তু কাঁচা কাঁঠালই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য; হালকা লবণপানিতে সেদ্ধ করে এটি সবজি হিসেবে খাওয়া হয়।

পুষ্টি আছে, প্রোটিন কম
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রালের হিসাবে রান্না না করা ১০০ গ্রাম কাঁঠালে ৯৫ কিলোক্যালরি শক্তি, ১.৭২ গ্রাম প্রোটিন, ০.৬৪ গ্রাম চর্বি, ১.৫ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ৪৪৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ১৩.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ০.৩২৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-৬ থাকে; কোলেস্টেরল নেই।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, মাংসের বিকল্প হলেও পুষ্টিতে কাঁঠাল মাংসের সমান নয়, কারণ মাংসে যে পরিমাণ প্রোটিন থাকে কাঁঠালে তা নেই। তাই যাঁরা পুরোপুরি নিরামিষ খান, তাঁদের ডাল, সয়াবিন, ছোলা ও বাদামের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও দরকার।
পরিবেশের প্রশ্নেও উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের দিকে আগ্রহ বাড়ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গবাদিপশু পালনের তুলনায় উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনে সাধারণত কম জমি ও কম পানি লাগে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনও কম হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৩ সালের এক মূল্যায়নে হিসাব দিয়েছিল, প্রাণিসম্পদ খাত বছরে ৭.১ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস ছাড়ে, যা মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ১৪.৫ শতাংশ।

প্রক্রিয়াজাত বাজার ও বাংলাদেশের সুযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদেশে কাঁঠাল একসময় মূলত এশীয় অভিবাসীদের দোকানে পাওয়া যেত; পরে বিভিন্ন দেশে টিনজাত কাঁচা কাঁঠাল, হিমায়িত কাঁঠাল, রান্নার জন্য কাটা কাঁঠাল ও মসলা মেশানো প্রস্তুত খাবার পাওয়া যেতে থাকে। জুলিয়া মর্টন লিখেছিলেন, কাঁচা কাঁঠাল পরীক্ষামূলকভাবে লবণপানিতে বা কারিসহ টিনজাত করা হয়েছে এবং টিনজাত কাঁঠালের মান ঘরের তাপমাত্রায় ৬৩ সপ্তাহ ঠিক ছিল। গার্ডিয়ানের ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে কাঁঠাল থেকে আটা, নুডলস, পাঁপড় ও আইসক্রিম তৈরির শিল্প গড়ে উঠেছে এবং টিনজাত কাঁঠাল সবজি হিসেবে রপ্তানি হয়।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে নষ্ট হয়, আর বিশেষজ্ঞদের মতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। যেসব পণ্যে মূল্য সংযোজনের কথা বলা হয়:
- হিমায়িত কাঁঠালের কোয়া
- কাঁচা কাঁঠালের টুকরা ও টিনজাত পণ্য
- শুকনো কাঁঠাল
- কাঁঠালের বিচি থেকে তৈরি পণ্য
শিকাগো বোটানিক গার্ডেনের উদ্ভিদ গবেষক নাইরি জেরেগা, যিনি বাংলাদেশে কাঁঠাল নিয়ে গবেষণা করেছেন, গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন, কাঁঠালের বিচি, কচি ফল ও পাকা ফল সবই খাওয়া যায় এবং কাঁঠাল থেকে দীর্ঘদিন টেকে এমন অনেক খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব।

ছবি: Mazhar Zarif / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় (জুলিয়া মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস), দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ডেইলি স্টার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)





মন্তব্য
(০)