দেশের বাজারে সারা বছর গোলাপের চাহিদা থাকে, আর বাড়ির ছাদেও এই ফুল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা যায়। ২০২৫ সালের ১ জুন জাগো নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শফিক বিপ্লব গোলাপের জাত, চারা, পরিচর্যা এবং রোগ ও পোকা দমন নিয়ে পরামর্শ দেন; প্রতিবেদনটি লেখেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান। সঙ্গে রইল বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বালাই ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (ইউসি আইপিএম) তথ্য।
গোলাপের পরিচয় ও ইতিহাস
গোলাপ রোজাসি (Rosaceae) পরিবারের রোসা (Rosa) গণের কাঁটাযুক্ত গুল্ম। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে এই গণে ১৫০টির বেশি প্রজাতি আছে; উইকিপিডিয়ায় প্রজাতির সংখ্যা তিন শতাধিক এবং চাষের জাত হাজার হাজার বলে উল্লেখ আছে। বেশির ভাগ প্রজাতির আদি নিবাস এশিয়া; বাংলাদেশের দেশি প্রজাতি Rosa involucrata জন্মায় ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামের জলাভূমিতে।
কোথায় প্রথম গোলাপ চাষ শুরু হয়েছিল, তার নিশ্চিত তথ্য নেই বলে জানায় বাংলাপিডিয়া; উইকিপিডিয়ার তথ্যে শোভাবর্ধক গোলাপ চাষের সবচেয়ে পুরোনো জানা নিদর্শন অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালের, ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো, পারস্য ও চীনে। আজকের বাগানের গোলাপে সবচেয়ে বেশি অবদান চীনা গোলাপ রোসা কাইনেনসিসের (Rosa chinensis), যা বারবার ফুল দেওয়ার গুণের জন্য পরিচিত। উপমহাদেশে মুঘল সম্রাট বাবর ‘বসরা’ নামে হালকা গোলাপি রঙের তীব্র সুগন্ধি একটি গোলাপ আনেন।

বাংলাদেশে প্রচলিত জাত ও চারা
শফিক বিপ্লব জানান, দেশে চায়না ও ইন্ডিয়ান গোলাপ বেশি দেখা যায়; এ ছাড়া ইংলিশ, আমেরিকান ও ডাচ গোলাপও চাষ হয়। বড় কাটফ্লাওয়ারের হাইব্রিড জাতের মধ্যে তিনি তাজমহলের নাম বলেন। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাডিং পদ্ধতিতে বাংলাদেশে পাপা মেইলান্ড, ডাবল ডিলাইট, ডাচ গোল্ড, কুইন এলিজাবেথ ও মন্টেজুমার মতো বিশ্বখ্যাত জাত উৎপাদন হচ্ছে। দেশে উদ্ভাবিত স্থানীয় জাতের মধ্যে আছে ‘ফাতেমা সাত্তার’, ‘শিবলী’, ‘পিয়ারী’ ও ‘জয়ন্তী’।
চারার বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, বাজারে সাধারণত বাডিং বা চোখ কলমের চারা পাওয়া যায়; গুটি কলম ও কাটিংয়ের চারাও নার্সারিতে সহজলভ্য। তাঁর দেওয়া তথ্যে দেশি জাতের চারার দাম ২০ টাকা থেকে শুরু, উন্নত মানের চারা পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায়। বাংলাপিডিয়া বলছে, বীজ, কাটিং, দাবা কলম ও জোড় কলমে গোলাপের বংশবিস্তার করা যায়; বাণিজ্যিক উৎপাদনে বাডিংই সবচেয়ে উপযোগী, যেখানে কাঙ্ক্ষিত জাতের কুঁড়ি আরেকটি গাছের কাণ্ডে বসানো হয় এবং সেই গাছ শিকড়ের জোগান দেয়।
টবে ও বাগানে পরিচর্যা
শফিক বিপ্লবের পরামর্শে গোলাপ গাছ রোদ পছন্দ করে, তবে প্রখর রোদ নয়। ছাদে টব রাখলে মেঝে থেকে একটু উঁচুতে রাখতে হবে। নিয়মিত পরিমিত পানি এবং মাসে একবার তরল সার হিসেবে পচা খৈলের পানি দিতে হবে। পিঞ্চিং ও ছাঁটাই গোলাপের জন্য জরুরি। তাঁর তালিকায় অন্য কাজগুলো হলো:
- ফুল ঝরে গেলে বোঁটাসহ কেটে ফেলা
- মরা পাতা সরিয়ে ফেলা
- নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করা
- বছরে দুবার টবের ২৫ শতাংশ মাটি বদলানো
- বয়স্ক গাছের টবের দিক মাঝে মাঝে ঘুরিয়ে দেওয়া
ইউসি আইপিএমের ২০২০ সালের নির্দেশিকাও রোগ এড়াতে রোদেলা ও খোলামেলা জায়গায় ফাঁক রেখে গোলাপ লাগানো, পাতায় না দিয়ে গোড়ায় পানি দেওয়া এবং ঝরা পাতা সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়।
রোগ ও পোকা দমন
কৃষি কর্মকর্তা জানান, গোলাপের একটি মারাত্মক রোগ ডাইব্যাক, যাতে ডাল আগা থেকে শুকিয়ে মরে যায়। লেদা পোকা, শুঁয়োপোকা ও জাব পোকা গোলাপ গাছে আক্রমণ করে, মিলিবাগও দেখা দিতে পারে। তাঁর ভাষ্যে, প্রতি বছর গরমের সময় মাকড় ও পোকার আক্রমণে বাগানিদের অনেক গাছ মারা যায়। দমনে তিনি জৈব ও রাসায়নিক দুই পদ্ধতির কথা বলেন, রাসায়নিক কেবল অনুমোদিত মাত্রায়।
ইউসি আইপিএমের ২০১৯ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, জাব পোকা গোলাপের সবচেয়ে সাধারণ পোকা। সকালে জোরালো পানির ধারায় ধুয়ে ফেলাই অনেক সময় যথেষ্ট, আর কীটনাশক সাবান বা নিমতেলসহ উদ্যানতাত্ত্বিক তেল উপকারী পোকার কম ক্ষতি করে জাব পোকা দমায়। মাকড় শুকনো, ধুলাময় অবস্থায় বাড়ে, আর বিস্তৃত বিষক্রিয়ার কীটনাশকে লেডিবার্ড বিটল ও লেসউইংয়ের মতো উপকারী পোকা মারা পড়লে মাকড় আরও বাড়তে পারে। রোগের ক্ষেত্রে নির্দেশিকাটি আক্রান্ত ডাল ছেঁটে ফেলা ও বাগান পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর জোর দেয়; এতে কাজ না হলে তবেই প্রতিরোধমূলক ছত্রাকনাশক দেওয়ার কথা বলে।

চাহিদা, আয় ও ব্যবহার
শফিক বিপ্লবের মতে, দেশের বাজারে গোলাপের চাহিদা সারা বছর থাকে এবং তা বাড়ছে; বাংলাদেশে গোলাপ বাণিজ্যিক কাটফ্লাওয়ার হিসেবে চাষ হয়। ছাদে কাটফ্লাওয়ারের জাত লাগিয়ে ফুল ও চারা বিক্রি করেও আয় করা যায়।
গোলাপ থেকে তৈরি হয় সুগন্ধি গোলাপজল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ইসলামি সংস্কৃতিতে গোলাপজলের বিশেষ কদর আছে এবং মিলাদ মাহফিলে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে তা ব্যবহার হয়; গোলাপের পাপড়ি দিয়ে জেলিসহ কিছু মিষ্টান্নও তৈরি হয়। ভিটামিন সি বিশেষভাবে বেশি থাকে গোলাপের ফল ‘রোজ হিপে’। উইকিপিডিয়ার তথ্যে, ডগ রোজ (Rosa canina) ও রুগোসা গোলাপের ফল উদ্ভিদজগতে ভিটামিন সির সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎসগুলোর একটি, এবং এই ফল দিয়ে জ্যাম, জেলি ও চা তৈরি হয়।

ছবি: SAIDUL HASAN / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউসি আইপিএম)





মন্তব্য
(০)