২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি চাঁদপুরের মতলবের বিস্তীর্ণ মাঠ হলুদে ছেয়ে যায়। আগাম জাতের সরিষার ফুলে একের পর এক মাঠ ঢেকে যায় উজ্জ্বল হলুদ আভায়। জাগো নিউজের চাঁদপুর প্রতিনিধি শরীফুল ইসলাম ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জানান, হিমেল হাওয়ায় দোল খাওয়া সরিষা ফুলের এই দৃশ্য পথচারী ও বেড়াতে আসা মানুষকে মুগ্ধ করছিল, আর তৃপ্ত করছিল সরিষা চাষ করা কৃষকের মনও।
ফুলের এমন প্রাচুর্যে কৃষকেরা উৎফুল্ল ছিলেন, আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছিলেন সরিষা খেত থেকে মধু সংগ্রহকারীরাও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের কয়েক বছরে সরিষার ভালো ফলন ও সন্তোষজনক বাজারদর পাওয়ায় ২০২৫-২৬ শীত মৌসুমে আগের তুলনায় বেশি কৃষক সরিষা চাষে আগ্রহী হন।
কৃষি অফিস সূত্র পত্রিকাটিকে জানায়, ওই মৌসুমে মতলব উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়। কৃষকেরা কয়েকটি উন্নত জাত ব্যবহার করেন, তার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত বারি সরিষা-৯, ১১, ১৪ ও ১৮ এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত বিনা সরিষা-৪ ও ৯ উল্লেখযোগ্য।
সেচ প্রকল্প এলাকা ও চরাঞ্চলে হলুদের সমারোহ
প্রতিবেদক দুই ধরনের জমিতে ব্যাপকভাবে সরিষার চাষ দেখতে পান: মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প এলাকার ভেতরে এবং উপজেলার চরাঞ্চলে, অর্থাৎ মেঘনার বুকে জেগে ওঠা দ্বীপ ও নদীতীরে জমা পলির জমিতে। দুই জায়গাতেই মাঠের পর মাঠজুড়ে ছিল কেবল হলুদ আর হলুদ। প্রতিবেদনে বলা হয়, মতলবে উৎপাদিত সরিষা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন মোকামে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আবাদ বৃদ্ধি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছিলেন।
উপজেলার আধুরভিটি গ্রামের কৃষক আবুল কালাম প্রতিবেদককে বলেন, "এ বছর আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সরিষা আবাদ করেছি। আবহাওয়া যদি এভাবেই অনুকূলে থাকে, তাহলে ভালো ফলন পাওয়ার আশা করছি।"
চানখার বিলের কান্দি গ্রামের কৃষাণী আকলীমা বেগম বলেন, সরিষা চাষে রোপণ থেকে শুরু করে তেমন বাড়তি খরচ লাগে না। "আমি এ বছর ৩৫ শতাংশ জমিতে এবং আমার ছোট ভাই কালাম ২৩ শতাংশ জমিতে সরিষার আবাদ করেছি। শুধু সার দিলেই হয়, আলাদা করে সেচও দিতে হয় না। তাই সরিষা চাষে আমরা ভালো লাভ পাচ্ছি।"
সরিষার খেত থেকে মধু আহরণে যুক্ত দুলাল মিয়া বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার সরিষার খেত অনেক বেশি, তাই এ বছর মধু উৎপাদনও বেশি হবে বলে তিনি আশা করছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার ফয়সাল মোহাম্মদ আলী সরিষাকে স্বল্প খরচের লাভজনক ফসল বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, "চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় সরিষার আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলন ভালো হলে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।" প্রতিবেদনে আগের মৌসুমের আবাদের পরিমাণ দেওয়া হয়নি, তাই কর্মকর্তার বলা বৃদ্ধির পরিমাণ সংখ্যায় জানা যায়নি।

মতলবের মাঠে যেসব জাত
কৃষি অফিসের উল্লেখ করা জাতগুলো দুটি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন: বারি এবং ময়মনসিংহভিত্তিক বিনা। এই মৌসুমের আগে থেকেই পুরোনো, কম ফলনের জাতের বদলে এগুলোর কয়েকটি ছড়িয়ে দিতে সরকার উদ্যোগ নিয়ে আসছিল।
এদের মধ্যে বারি সরিষা-১৪ সম্পর্কে তথ্য সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ মৌসুমে যশোরে জাতটি ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কার্যালয় ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলোকে জানায়, এই জাত বপনের ৭৫-৮০ দিনে ঘরে তোলা যায়, হেক্টরে ফলন হয় প্রায় দেড় হাজার কেজি, আর সরিষা কেটে ওই জমিতে আবার বোরো আবাদ করা যায়। যশোরের উপপরিচালক আরও বলেন, এ জাতের গাছ লম্বা হওয়ায় এর পাতা মাটিতে ঝরে পড়ে জৈব সারের কাজ করে। একই প্রতিবেদনে যশোরে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া জাতগুলোর মধ্যে টরি-৭, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫ ও সম্পদের সঙ্গে বারি সরিষা-৯-এর নামও ছিল।
বারি সরিষা-১৮ তুলনামূলক নতুন জাত। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বাংলা ট্রিবিউন ফরিদপুর থেকে জানায়, সেখানকার পদ্মার চরাঞ্চলে কৃষকেরা জাতটি চাষ করছেন। ফরিদপুরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন খামারের উপপরিচালক বলেন, বারি সরিষা-১৮-তে ইরুসিক এসিড খুবই কম এবং সয়াবিন তেলের বিকল্প হিসেবে এর তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিনা তার জাত-পরিচিতিতে বিনা সরিষা-৪ ও বিনা সরিষা-৯-এর জীবনকাল যথাক্রমে ৮০-৮৫ দিন ও ৮০-৮৪ দিন বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্ণনায়, দুটি জাতই অল্টারনারিয়াজনিত পাতা ও ফলের ঝলসানো রোগে মধ্যম প্রতিরোধী, ভারী বৃষ্টিজনিত সাময়িক জলাবদ্ধতা সহনশীল, মাটির অতিরিক্ত আর্দ্রতায় চাষবিহীন জমিতে বপনযোগ্য, নাবিতে বপনযোগ্য এবং ৬-৮ ডিএস/মি. মাত্রার লবণাক্ত জমিতে চাষযোগ্য। বিনা সরিষা-৪-এর গড় ফলন হেক্টরে ২.০ টন, সর্বোচ্চ ২.৪০ টন এবং বীজে তেলের পরিমাণ ৪৪ শতাংশ; বিনা সরিষা-৯-এর গড় ফলন হেক্টরে ১.৬০ টন, সর্বোচ্চ ২.০ টন এবং তেলের পরিমাণ ৪৩ শতাংশ। দুই জাতেরই বীজের রং লালচে কালো।
বিনার পরামর্শ অনুযায়ী দুটি জাতের বপনের উপযুক্ত সময় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে মধ্য নভেম্বর (কার্তিকের দ্বিতীয় থেকে শেষ সপ্তাহ)। তবে নাবিতে বপনযোগ্য বলে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ (পৌষের প্রথম সপ্তাহ) পর্যন্ত বীজ বুনলেও সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যায়।
মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় জাতগুলোর তুলনা পাওয়া যায়। বিনার বিজ্ঞানীরা ২০২১-২২ রবি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলার নগরঘাটায় এক কৃষকের জমিতে আটটি সরিষার জাত ও লাইন পরীক্ষা করেন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত গবেষণায় জানান, ফলন ছিল হেক্টরে ১.৪৩ থেকে ১.৮০ টন। সবচেয়ে বেশি, হেক্টরে ১.৮০ টন ফলন দেয় বিনা সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৮, দুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল না; এরপর ছিল বিনা সরিষা-৪, হেক্টরে ১.৬৩ টন। যেসব জাত আগে পেকেছে, বারি সরিষা-১৪ তাদের অন্যতম; গবেষকদের মতে, এমন আগাম জাত নিবিড় শস্যবিন্যাসে যুক্ত করা যায়। ওই পরীক্ষায় বিনা সরিষা-৪ ও ৯-এ তেল ও শক্তির পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়।
২০২৩ সালের মে মাসে কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, টরি-৭, মাঘী, ডুপিসহ কম ফলনের স্থানীয় জাতের বদলে উচ্চফলনশীল বিনা-৪, বিনা-৯, বারি-১৪, বারি-১৭ প্রভৃতি জাত ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মতলবের মাঠের কয়েকটি জাত এই তালিকারই।
মতলব ও মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প
মতলবের অবস্থান চাঁদপুর জেলার উত্তরে, মেঘনার পাশে। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মতলব থানা গঠিত হয় ১৯১৮ সালে, আর ২০০০ সালের ৩০ এপ্রিল এটি মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ নামে দুটি উপজেলায় ভাগ হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে মতলব উপজেলার কথা বলা হয়েছে, তবে পরিসংখ্যানটি দুই উপজেলার কোনটির, তা বলা হয়নি।
মতলব উত্তরের আয়তন ২৬০.২৯ বর্গকিলোমিটার; এখানে একটি পৌরসভা, সেঙ্গারচর, এবং ১৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। প্রধান নদী মেঘনা, গুমতি ও ধনাগোদা; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৭। মতলব দক্ষিণের আয়তন ১২৯.৩২ বর্গকিলোমিটার, প্রধান নদী ধনাগোদা, ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৫০। বাংলাপিডিয়া দুই উপজেলার প্রধান ফসলের তালিকা একই ভাষায় দিয়েছে: ধান, গম, আলু, পাট, আখ, সরিষা ও তিসি। মতলব উত্তরে ৫০.৪০ শতাংশ এবং মতলব দক্ষিণে ৪৮.০৭ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
প্রতিবেদনে বর্ণিত কৃষিজমির বড় অংশ মেঘনা-ধনাগোদা প্রকল্পের ভেতরে। এটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প। বাংলাপিডিয়া জানায়, প্রকল্পটি ১৯ হাজার ২১ হেক্টর জমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন এবং ১৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে সেচের পানি দেয়। এর দুটি পাম্প স্টেশন রয়েছে: উদমদীতে, যার ক্ষমতা সেকেন্ডে ৪৩.৩৫ ঘনমিটার, এবং কালিপুরে, ক্ষমতা সেকেন্ডে ২৮.৯ ঘনমিটার। এগুলো দ্বৈত কাজের পাম্প, সেচ ও নিষ্কাশন দুই কাজেই ব্যবহৃত হয়। এখলাসপুর ও দুবগীতে আছে দুটি বুস্টার পাম্প স্টেশন। প্রকল্পে রয়েছে ৬৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ২২০ কিলোমিটার সেচ খাল ও ১২৫ কিলোমিটার নিষ্কাশন নালা।
দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১০ সালের অক্টোবরে জানায়, প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে এবং শেষ হয় ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে, ব্যয় হয় ১.৭৫ বিলিয়ন টাকা; এর আওতায় মতলব উত্তরের একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের কৃষিজমি রয়েছে, আর প্রকল্পের আগের ২৭ হাজার ১৩৬ টন থেকে এলাকার কৃষি উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩ হাজার ৪০৮ টনে। ২০২১ সালের মে মাসে একই পত্রিকা বাঁধটিকে ৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বলে বর্ণনা করে, যার ভেতরে ১৯টি ইউনিয়ন, বেশির ভাগ মতলব উত্তরের এবং কয়েকটি মতলব দক্ষিণের; বাঁধের ভেতরে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বাস। বিভিন্ন সূত্রে বাঁধের দৈর্ঘ্য ৬৩ থেকে ৬৫ কিলোমিটার বলা হয়েছে।
বাঁধের ভেতরের জমি মেঘনার বন্যা থেকে সুরক্ষিত, শুকনো মৌসুমে খাল থেকে সেচও পাওয়া যায়। আকলীমা বেগম যে বলেছেন সরিষায় আলাদা সেচ লাগে না, তার প্রেক্ষাপট এটিই। বিনার নিজস্ব পরামর্শও হলো, মাটিতে রসের অভাব হলে চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর প্রথম সেচ দিতে হবে, তবে জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকলে সেচের প্রয়োজন নেই।

মেঘনার চরাঞ্চল
প্রতিবেদকের উল্লেখ করা অন্য এলাকা চরাঞ্চল, অর্থাৎ নদীর গড়া জমি। বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায়, নদীখাত বা মোহনায় জমে ওঠা যেকোনো ভূমিই চর; মাঝনদীর দ্বীপ থেকে শুরু করে তীরের সঙ্গে যুক্ত বালুচর পর্যন্ত সবই এর মধ্যে পড়ে, আর গাছপালা জন্মালে বাংলাদেশে এগুলোকে সাধারণত চর বলা হয়। চর বসতি ও চাষের সুযোগ দেয়, তবে ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকে।
বিনুনি আকারের যমুনার চর থেকে মেঘনার চর আলাদা। বাংলাপিডিয়া জানায়, উজানের মেঘনা কয়েকটি সমান্তরাল ধারায় বয়ে চলে, এর চরগুলো খুব স্থিতিশীল এবং প্রায় সবই দ্বীপচর, যাদের বেশির ভাগের বয়স ৭০ বছরের বেশি। জ্ঞানকোষটিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অনেক চরে সেচনির্ভর ফসল কম হলেও উজানের মেঘনার চরগুলো এর ব্যতিক্রম। চাঁদপুরের কাছে পদ্মা ও উজানের মেঘনার সংগমস্থলে নদী চওড়া হয়েছে এবং চরের আয়তনও বেড়েছে।
মতলবের চরে সরিষা চাষ নতুন নয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের খবর উদ্ধৃত করে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, সেই মৌসুমে চাঁদপুর জেলায় ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়, যার প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ছিল মতলব ও চাঁদপুর সদর উপজেলার চরাঞ্চলে। তখনও কৃষকেরা আগাম জাতের সরিষা বুনেছিলেন, আর জেলায় প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছিল।
চাঁদপুর জেলা ও আগের মৌসুমগুলো
চাঁদপুর চট্টগ্রাম বিভাগের একটি জেলা, পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ১,৬৪৫.৩২ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ১৬ হাজার ১৮। প্রধান নদী মেঘনা, ডাকাতিয়া, গুমতি ও ধনাগোদা। চাঁদপুর মহকুমা হয় ১৮৭৮ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। জেলায় আটটি উপজেলা: চাঁদপুর সদর, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর, হাজীগঞ্জ, কচুয়া, মতলব দক্ষিণ, মতলব উত্তর ও শাহরাস্তি। জেলার ৪৪.৪২ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
জেলায় শীত মানেই একাধিক ফসলের মৌসুম। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ডিএইর বরাতে জানায়, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের অসময়ের বৃষ্টিতে জেলার আট উপজেলায় সরিষা ও সবজির ক্ষতি হয়; দাঁড়িয়ে থাকা সরিষার ১৬.২০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর চাঁদপুর সদরের কৃষকেরা ক্ষতি পোষাতে আবার সরিষা বুনছিলেন। একই প্রতিবেদনে চাঁদপুর সদর, হাজীগঞ্জ, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়াকে জেলার প্রধান আলু উৎপাদন এলাকা বলা হয়। সেই অভিজ্ঞতাই মনে করিয়ে দেয়, কেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মতলবের কৃষকেরা তাঁদের আশার সঙ্গে "আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে" শর্তটি জুড়ে দিয়েছিলেন।
দুই ধানের মাঝের ফসল
বাংলাদেশে সরিষা রবি বা শীতকালীন ফসল। বাংলাপিডিয়া সরিষাকে ক্রুসিফেরি পরিবারের তেলবীজ উদ্ভিদ বলে বর্ণনা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ব্রাসিকা ন্যাপাস (রেপ) ও ব্রাসিকা নাইগ্রা (কালো সরিষা)। কৃষকেরা রেপসিড ও আসল সরিষা দুটিকেই সরিষা বলেন; ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) বরাতে জানায়, বাংলাদেশের কৃষকেরা রেপসিড (ব্রাসিকা ক্যাম্পেস্ট্রিস ও ব্রাসিকা ন্যাপাস) এবং সরিষা (ব্রাসিকা জুনসিয়া) দুটিই চাষ করেন এবং দুটিকেই সরিষা নামে ডাকেন। ততদিনে বারি, বিনা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় মিলে ২০টির বেশি সরিষার জাত উদ্ভাবন করেছে।
স্বল্পমেয়াদি জাতের গুরুত্ব ফসলের ক্যালেন্ডারে। ২০২৩ সালের মে মাসে কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, তেলবীজ পরিকল্পনার তিনটি ভিত্তির একটি হলো নতুন শস্যবিন্যাস, যেখানে স্বল্প জীবনকালের ধান চাষ করে রোপা আমন ও বোরোর মধ্যবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ফসল হিসেবে সরিষা চাষ করা হচ্ছে। অন্য দুটি হলো স্থানীয় জাতের বদলে উচ্চফলনশীল জাত ছড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, এবং অনাবাদি চরাঞ্চল, উপকূলের লবণাক্ত অঞ্চল, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলকে তেলজাতীয় ফসলের আওতায় আনা। যশোর থেকে প্রথম আলোর ২০২১ সালের প্রতিবেদনে এই বিন্যাসের বাস্তব চিত্র মেলে: সরিষা কাটা জমিতে তখন বোরো লাগানো হচ্ছিল।
ফসল কাটার বিষয়ে বিনার পরামর্শ হলো, শতকরা ৭০-৮০ ভাগ ফল গাছসহ বাদামি রং ধারণ করলে সরিষা কাটতে হবে, কারণ বেশি পেকে গেলে নিচের দিকের ফল ফেটে বীজ ঝরে যেতে পারে।
সরিষা খেতের মৌমাছি ও মধু
বেশি মধুর যে আশা দুলাল মিয়া করছিলেন, তার পেছনে আছে সরিষা ও মৌচাষের পুরোনো সম্পর্ক। দ্য ডেইলি স্টার ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জানায়, সরিষা ফুল ফোটে ৪০ থেকে ৬০ দিন, যা অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে বেশি; এ কারণেই মৌচাষিরা সরিষা খেত ইজারা নিয়ে সেখানে মৌবাক্স বসান। দেশে তখন প্রায় ২৫ হাজার মৌচাষি ছিলেন, যাঁরা সরিষা, ধনিয়া ও কালোজিরার খেত, লিচুবাগান ও সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করতেন। দেশে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন মধু উৎপাদিত হতো, মূল সংগ্রহের মৌসুম নভেম্বর থেকে এপ্রিল।
পত্রিকাটির উদ্ধৃত বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) একটি মৌচাষ প্রকল্পের সাবেক প্রধানের মতে, এই মধুর প্রায় ৮০ শতাংশ সংগ্রহ হয় সরিষার মৌসুমে। তিনি বলেন, সরিষা খেতে মৌমাছি পালন করলে বিঘাপ্রতি ফলন ১৫ শতাংশ বাড়ে, কারণ মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছি পরাগায়ন ঘটায়; ফলন কমে যাওয়ার ভয়ে আগে যেসব কৃষক মৌচাষিদের খেতে ঢুকতে দিতেন না, তাঁদের অনেকে মত বদলেছেন। পাবনার এক কৃষক পত্রিকাটিকে জানান, মৌচাষিদের জমি ব্যবহার করতে দেওয়ার পর তাঁর বিঘাপ্রতি ফলন ৪-৪.৫ মণ থেকে বেড়ে ৬.৫ মণ হয়।

সরিষা ও দেশের ভোজ্যতেল
ভোজ্যতেল নিয়ে কৃষি অফিসারের মন্তব্যে সেই কারণটিই উঠে আসে, যে জন্য সরকার সরিষার আবাদ বাড়াতে জোর দিচ্ছিল। বাংলাপিডিয়া জানায়, মাত্র কয়েক দশক আগেও সরিষার তেলই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র রান্নার তেল। অনেক জায়গায় গরু দিয়ে টানা ঐতিহ্যবাহী ঘানিতে বীজ পিষে তেল বের করা হতো, আর এই পেশার মানুষকে বলা হতো কলু; এখন সরিষার তেল বেশির ভাগ বৈদ্যুতিক মিলে ভাঙানো হয়।
২০২২ সালের জুনে কৃষি মন্ত্রণালয় দেশীয় উৎস থেকে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ জোগানোর তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে। ২০২৩ সালের ১ মে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, ডিএইর হিসাবে ২০২২-২৩ মৌসুমে ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ১১ লাখ ৫২ হাজার টন, যেখানে আগের বছর ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টরে উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ২৪ হাজার টন। মন্ত্রণালয় দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন বলে জানায়, যার মধ্যে সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী থেকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় ৩ লাখ টন; লক্ষ্য ছিল ধানের উৎপাদন না কমিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে দেশে ১০ লাখ টন তেল উৎপাদন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন ডিএইর বরাতে জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১.৩৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে তেলবীজের আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় প্রায় ১.৮৩ মিলিয়ন টন, যা আগের বছরের চেয়ে যথাক্রমে ৩১ ও ২৯ শতাংশ বেশি; এই বৃদ্ধির মূল কারণ দেশের সবচেয়ে বড় তেলবীজ ফসল সরিষার আবাদ বাড়া। একই প্রতিবেদনে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদা প্রায় তিন মিলিয়ন টন বলা হয়; কেনা রান্নার তেলের প্রায় ৭৫ শতাংশই সয়াবিন ও পাম তেল, আর ভোজ্যতেল আমদানিতে বছরে ব্যয় হয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিবার পর্যায়ে সয়াবিনের বিকল্প হিসেবে সরিষার তেলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মতলবের হলুদ মাঠের পেছনে জাতীয় চিত্র ছিল এমনই।
ফসল তোলার আগের সপ্তাহগুলোতে রোগবালাই ও আবহাওয়া
কৃষক ও কর্মকর্তা দুই পক্ষই তাঁদের আশার সঙ্গে অনুকূল আবহাওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। বিনা জানায়, তাদের দুটি জাত অল্টারনারিয়াজনিত পাতা ও ফলের ঝলসানো রোগে কেবল মধ্যম প্রতিরোধী, আর অনুকূল আবহাওয়ায় এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে; জাবপোকার আক্রমণ হলে কী করতে হবে, সে পরামর্শও জাত-পরিচিতিতে দেওয়া আছে।
বিনার জাত-পরিচিতিতে দুটি সমস্যারই স্প্রের নিয়ম দেওয়া আছে, তবে কোন বালাইনাশক কী মাত্রায় ব্যবহার করা হবে, তা অনুমোদিত পণ্য ও জমির অবস্থার ওপর নির্ভর করে। পাতা ঝলসানো বা জাবপোকার উপদ্রব দেখা দিলে স্প্রে করার আগে উপজেলা কৃষি অফিসকে ফসল দেখিয়ে পরামর্শ নেওয়াই কৃষকের জন্য নিরাপদ।
ছবি: Belayet2014 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৮ ডিসেম্বর ২০২৫), বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ: চাঁদপুর জেলা; মতলব উত্তর উপজেলা; মতলব দক্ষিণ উপজেলা; বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প; চর; সরিষা), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা সরিষা-৪ ও বিনা সরিষা-৯-এর জাত-পরিচিতি), রেজা ও অন্যান্য, টার্কিশ জার্নাল অব এগ্রিকালচার: ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫), প্রথম আলো (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১), বাংলা ট্রিবিউন (১৮ জানুয়ারি ২০২২), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (১০ ডিসেম্বর ২০১০, ২৬ অক্টোবর ২০১০, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ ও ২৪ মে ২০২১), দ্য ডেইলি স্টার (৭ জানুয়ারি ২০২১), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (১ মে ২০২৩), ঢাকা ট্রিবিউন (২৫ জানুয়ারি ২০২৫)





মন্তব্য
(০)