রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার কাজীপাড়া এলাকায় এক কৃষকের আমবাগানের ১১৭টি উন্নত জাতের আমগাছ রাতের আঁধারে কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর, বুধবার ভোরে সিন্দুর কুসুম্বী কাজীপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের বাগানটিতে কাটা গাছগুলো দেখা যায়। বাগানটি কৃষক সাইদুর রহমানের, দুই বছর আগে তিনি এটি গড়ে তুলেছিলেন। সেদিন দুপুরে জাগো নিউজের রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে দুই বছরের শ্রম, স্বপ্ন ও বিনিয়োগ এক রাতেই হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন কৃষক সাইদুর রহমান। সরেজমিনে দেখা যায়, বাগানে সারি সারি আমগাছ গোড়া থেকে কাটা অবস্থায় পড়ে আছে, মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ডালপালা ও পাতার স্তূপ। কাটা পড়া অনেক গাছে তখনও নতুন মুকুলের কুঁড়ি ঝুলছিল।
সাড়ে ১৫ শতক জমিতে ১৩৩টি গাছ
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাইদুর রহমান প্রতিবেদককে জানান, দুই বছর আগে সিন্দুর কুসুম্বী মৌজায় সাড়ে ১৫ শতক জমিতে তিনি ১৩৩টি উন্নত জাতের আমগাছ রোপণ করেন। এর মধ্যে ছিল বারোমাসি, কাটিমন, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতি ও বারি-৪ জাতের গাছ। শুরু থেকেই নিয়মিত সেচ, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই দমনে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আসছিলেন। ইতোমধ্যে অনেক গাছে মুকুল আসায় এ বছর ফল বিক্রি করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, "গতকালই আমগাছের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে প্রায় ৬০ কেজি রসুনের বীজ রোপণ করেছি। সব মিলিয়ে বড় পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভোরে এসে দেখি সব শেষ। ১৩৩টি গাছের মধ্যে ১১৭টি কেটে ফেলা হয়েছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার বুকের ভেতর ছুরি চালিয়েছে।"
তার দাবি, গাছ, পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়; দুই বছরের পরিশ্রম, ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা ও পরিবারের জীবিকার নিশ্চয়তাও একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে।

তদন্ত ও শাস্তির দাবি এলাকাবাসীর
স্থানীয় বাসিন্দারা জাগো নিউজকে জানান, এলাকাটি তুলনামূলক নিরিবিলি হওয়ায় গভীর রাতে এ ধরনের নাশকতা চালানো দুর্বৃত্তদের জন্য সহজ হয়েছে বলে তাদের ধারণা। খবর পেয়ে আশপাশের কৃষক ও এলাকাবাসী বাগানে ছুটে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, গাছের সঙ্গে শত্রুতা থাকা উচিত নয়। দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন কৃষকের ক্ষতি নয়; এটি এলাকার কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কাজীপাড়া এলাকার কৃষক ইশা খান বলেন, "এটা নিছক দুষ্টুমি নয়, পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। একজন কৃষকের জীবনের সঙ্গে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। আজ সাইদুর রহমান, কাল অন্য কেউ; এভাবে চলতে থাকলে কৃষিকাজে মানুষ আগ্রহ হারাবে।"
স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনার পেছনে পূর্বশত্রুতা, জমি সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এটি এলাকাবাসীর অনুমান; ১৭ ডিসেম্বরের কোনো প্রতিবেদনে কারও নাম সন্দেহভাজন হিসেবে আসেনি, কারা গাছ কেটেছে তাও জানা যায়নি।
থানায় লিখিত অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত
ঘটনার পর ভুক্তভোগী কৃষক সাইদুর রহমান পবা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পবা থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই প্রতাপ কুমার জাগো নিউজকে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক তদন্ত করা হয়েছে। পূর্বশত্রুতা ও জমি বিরোধসহ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।
একই দিন পরে আরও দুটি সংবাদমাধ্যম একই বিবরণ প্রকাশ করে। দেশ রূপান্তর নওহাটা কাজীপাড়া এলাকায় ১১৭টি আমগাছ কাটার খবরে বাগান, জাত ও অভিযোগের একই তথ্য দেয়, আর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ঘটনার স্থান, সময় ও তদন্ত নিয়ে একই এসআইয়ের বক্তব্য তুলে ধরে। ১৭ ডিসেম্বরের কোনো প্রতিবেদনে কোনো সন্দেহভাজনের নাম বা গ্রেফতারের খবর ছিল না; লিখিত অভিযোগটি তখনও মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তাও কোনো প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
অন্যের সম্পত্তি নষ্ট করা নিয়ে দণ্ডবিধি যা বলে
বাংলাদেশে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের সম্পত্তির ক্ষতি করার বিষয়টি দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর "অনিষ্ট" (মিসচিফ) অধ্যায়ে বিবেচিত হয়। আইনটির পাঠ লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ bdlaws.minlaw.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা পুলিশের তদন্ত এবং প্রয়োজনে আদালতের বিষয়; নিচের ধারাগুলো আইনের বর্ণনা, এই ঘটনা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
৪২৫ ধারায় অপরাধটির সংজ্ঞা দেওয়া আছে। জনসাধারণ বা কোনো ব্যক্তির অবৈধ ক্ষতি বা লোকসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে, কিংবা তা ঘটতে পারে জেনেও কেউ যদি কোনো সম্পত্তি ধ্বংস করে, অথবা সম্পত্তিতে বা তার অবস্থানে এমন পরিবর্তন ঘটায় যাতে এর মূল্য বা উপযোগিতা নষ্ট হয় বা কমে যায় কিংবা এর ক্ষতি হয়, তবে সে অনিষ্ট করে। ধারাটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মালিকেরই ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকা জরুরি নয়, এবং অন্যের সঙ্গে যৌথ মালিকানার সম্পত্তিতেও অনিষ্ট হতে পারে। এর একটি দৃষ্টান্ত কৃষি থেকেই নেওয়া: কেউ যদি অন্যের ফসলের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে বা ক্ষতি হতে পারে জেনে তার খেতে গবাদিপশু ঢুকিয়ে দেয়, তবে সে অনিষ্ট করে।
- ৪২৬ ধারায় অনিষ্টের সাধারণ শাস্তি: যেকোনো বর্ণনার সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড, বা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড।
- ৪২৭ ধারায় পঞ্চাশ টাকা বা তার বেশি ক্ষতি ঘটানো অনিষ্টের শাস্তি: যেকোনো বর্ণনার সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, বা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড।
অধ্যায়টির পরের ধারাগুলোতে আরও নির্দিষ্ট ধরনের অনিষ্টের কথা আছে, যেমন পশু হত্যা বা জখম করা এবং সেচকাজ, সড়ক, সেতু ও খালের ক্ষতি করা।
পবা উপজেলা ও নওহাটা
পবা রাজশাহী জেলার নয়টি উপজেলার একটি। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ৩৪০.০৩ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে মোহনপুর ও তানোর উপজেলা, দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও চারঘাট উপজেলা, পূর্বে পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলা এবং পশ্চিমে গোদাগাড়ী উপজেলা; প্রধান নদী পদ্মা ও শিবা। পবা থানা গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে, আর ১৯৮৩ সালের ১১ নভেম্বর এটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয়।
উপজেলায় দুটি পৌরসভা, কাটাখালী ও নওহাটা, এবং আটটি ইউনিয়ন রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে বাংলাপিডিয়া পবার জনসংখ্যা লিখেছে ৩ লাখ ১৪ হাজার ১৯৬ জন, আর ৯টি ওয়ার্ড ও ৪০টি মহল্লা নিয়ে গঠিত নওহাটা পৌরসভার জনসংখ্যা ৫৭ হাজার ১১৯ জন। বাংলাপিডিয়া উপজেলার বিমানবন্দরটির অবস্থান নওহাটায় উল্লেখ করেছে; উপজেলার পরিচিত হাট ও মেলার মধ্যে আছে নওহাটা হাট ও নওহাটা কৃষি মেলা।
এ এলাকার জীবিকার মূল ভিত্তি কৃষি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ৫৪.৬৮ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; ৪৯.৪৬ শতাংশ পরিবারের কৃষিজমি আছে, ৫০.৫৪ শতাংশ ভূমিহীন। প্রধান ফসল ধান, গম, পাট, আলু, পেঁয়াজ, শাকসবজি ও পান; প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, পেয়ারা ও লিচু, এবং উপজেলা থেকে বাইরে যাওয়া প্রধান পণ্যের মধ্যে আম অন্যতম।
পুরো রাজশাহী জেলার আয়তন ২ হাজার ৪২৫.৩৭ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় জেলাটি বরেন্দ্রভূমি, দিয়াড় ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত, আর এর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা, মহানন্দা ও শিবা নদী।
২০২৫ সালে রাজশাহীর আমের অর্থনীতি
বাগানটি কাটা পড়ে দেশের আম বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমিতে। ২০২৫ সালের মে মাসে মৌসুমের শুরুতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে জানায়, রাজশাহী জেলায় ১৯ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯৮৬টি আমগাছ রয়েছে এবং সে বছর হেক্টরপ্রতি ১৩.২০ টন ফলন আশা করা হচ্ছে। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বাসসকে বলেন, অঞ্চলে সে মৌসুমের আমের বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে; জেলার মোট ফলনের এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে শীর্ষে বাঘা উপজেলা, আর আগের বছর বাঘা থেকে ১০টি দেশে ৩৬ টন আম রপ্তানি হয়েছিল।
বাসসের একই প্রতিবেদনে বানেশ্বরকে রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের বাজার এবং দেশের "আমের রাজধানী" হিসেবে বর্ণনা করা হয়; অঞ্চলের অন্য আমের বাজারের মধ্যে উল্লেখ করা হয় সাহেববাজার, হরগ্রাম, উপশহর, শালবাগান, রাজাবাড়ী, গোদাগাড়ী, কানসাট ও রহনপুরের নাম। আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্রের একজন বিজ্ঞানী জানান, সে বছর নওগাঁয় ১২ হাজার ৬৭১ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্য ১ লাখ ৬১ হাজার ২৪২ টন; আর নাটোরে ৪ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমি থেকে ৫৬ হাজার ২১ টন আম আশা করা হচ্ছে।
পরিপক্ব আম যাতে বাজারে আসে, সে জন্য রাজশাহীতে জেলা প্রশাসনের ঠিক করা "আম ক্যালেন্ডার" মেনে আম পাড়া হয়। বাসসের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ মৌসুমে গোপালভোগ ২২ মে থেকে, রানীপছন্দ ও লখনা ২৫ মে থেকে, হিমসাগর বা খিরসাপাত ৩০ মে থেকে, ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে, আম্রপালি ও ফজলি ১৫ জুন থেকে, বারি-৪ ৫ জুলাই থেকে, আশ্বিনা ১০ জুলাই থেকে, গৌড়মতি ১৫ জুলাই থেকে এবং ইলামতি ২০ আগস্ট থেকে পাড়ার অনুমতি ছিল।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ডিএইর একজন অতিরিক্ত পরিচালক বাসসকে জানান, সে বছর রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৮৭ হাজার ৩০৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, প্রত্যাশিত উৎপাদন প্রায় ১০ লাখ টন, যার মূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অঞ্চলের চাষিরা অতি উচ্চ ঘনত্বে আম চাষ পদ্ধতি গ্রহণ করছিলেন, যেখানে প্রচলিত বাগানের চেয়ে কাছাকাছি গাছ লাগানো হয়; সঙ্গে ছিল ফ্রুট ব্যাগিং, যেখানে প্রতিটি ফল ব্যাগে ঢেকে মাছির মতো পোকা থেকে রক্ষা করা হয় এবং বালাইনাশকের প্রয়োজন কমে।
জাতীয় পর্যায়ে, ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ২৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছে, যার প্রায় ৬ লাখ টন আম্রপালি, এবং এ জাত দেশের ৬৪টি জেলাতেই উৎপাদিত হচ্ছে। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তালিকায় রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম ছিল বাংলাদেশের নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের একটি।
বাগানের ছয় জাতের আম
প্রথম আলো ২০২৫ সালের জুনে জানায়, দেশে প্রায় ৮০০ জাতের আম আছে, যার অধিকাংশই স্থানীয় জাত। ১৯৯৩ সালে আমের নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ শুরু করা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) তত দিনে "বারি আম" নামে তিনটি হাইব্রিডসহ ১৮টি জাত অবমুক্ত করেছে; এর ১৪টি এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণা কেন্দ্র থেকে। সাইদুর রহমানের বাগানে এমন কয়েকটি নতুন জাতের সঙ্গে ছিল অঞ্চলের পরিচিত জাতও।
- আম্রপালি: প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে এনে পর্যবেক্ষণের পর জাতটি বাংলাদেশে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত হয়। দ্য ডেইলি স্টার একে দাশেরি ও নীলম জাত থেকে উদ্ভাবিত জনপ্রিয় হাইব্রিড জাত এবং ২০২৩ সালে দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত আম হিসেবে বর্ণনা করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক উদ্যোক্তা পত্রিকাটিকে বলেন, রোপণের দ্বিতীয় বছর থেকেই এ গাছে ফল পাওয়া যায় এবং অন্য জাতের চেয়ে কম জায়গা লাগে বলে কম জমিতে বেশি গাছ লাগানো যায়।
- বারি-৪ (বারি আম-৪): আশ্বিনা আমের মা ফুলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি রঙিন জাতের আমের বাবা ফুলের সংকরায়ণে উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাত; প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, এটি ওজন, মিষ্টতা, ফলন ও দেখতে আশ্বিনার চেয়ে অনেক ভালো। এটি নাবি জাত; ২০২৫ সালের রাজশাহীর আম ক্যালেন্ডারে ৫ জুলাই থেকে এটি পাড়ার অনুমতি ছিল।
- গৌড়মতি: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, এটি প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত একটি নতুন জাত, যা ২০১২ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম পাওয়া যায়; সাধারণত আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রায় এক মাস এটি বাজারে থাকে, যখন অন্য আম কম থাকে। চাষিরা জানান, এর দাম বেশি পাওয়া যায়, তবে ব্যাগিং করতে হয় বলে খরচও বেশি।
- হাঁড়িভাঙ্গা: রংপুরের বিখ্যাত আম। দ্য ডেইলি স্টারের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আমকে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে অনুমোদন দিয়ে জার্নাল প্রকাশ করে, তাতে দেশের অনুমোদিত জিআই পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮টিতে।
- কাটিমন: থাইল্যান্ডের একটি জাত। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রায় ছয় বছর আগে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এটি দেশে আনেন। বাসস ২০২৫ সালের জুলাই ও সেপ্টেম্বরে জানায়, এ জাতের গাছে একসঙ্গে মুকুল ও ফল থাকে এবং প্রচলিত জাতের এক মৌসুমের বিপরীতে বছরে তিন থেকে চারবার ফলন দিতে পারে। ২০২৩ সালে ডিএইর একজন প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জানান, রাজশাহীতে প্রায় ১৫ হেক্টর জমিতে এর চাষ হচ্ছে; আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্র জানায়, জাতটিতে রোগবালাই কতটা হয় তা নিয়ে তারা গবেষণা করছে।
- বারোমাসি: নামের অর্থ বারো মাসের, অর্থাৎ প্রচলিত মৌসুমের বাইরেও ফল দেয় এমন আমকে এ নামে ডাকা হয়; সাইদুর রহমানের বারোমাসি গাছগুলো ঠিক কোন জাতের, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।

কচি গাছ, ডিসেম্বরের মুকুল ও সাথি ফসল রসুন
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে আমগাছে সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চে মুকুল আসে, আর এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া থাকলে ফল ধরা কমে যায়। একটি মুকুলে ১০০ থেকে ২৫০টি ফুলের কুঁড়ি থাকতে পারে, কিন্তু প্রায় এক হাজার ফুলের মধ্যে মাত্র একটি বা দুটি পরিপক্ব ফলে পরিণত হয়, এবং একটি মুকুলে দুই-তিনটি ফল থাকলেই ভালো ফলন ধরা হয়। কলম করা গাছে সাধারণত রোপণের চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে, আর প্রায় ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত গাছ ফল দেয়। সে হিসেবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সাইদুর রহমানের দুই বছর বয়সী গাছে দেখা মুকুল প্রচলিত মৌসুমের আগেই এসেছিল। মৌসুমের বাইরের জাতের ক্ষেত্রে চিত্র আলাদা: কাটিমনের চারা লাগানো দুর্গাপুরের এক কৃষক বাসসকে জানান, রোপণের পরের বছরেই তার গাছে মুকুল আসতে শুরু করে।

কচি গাছগুলোর ফাঁকে সাইদুর রহমান রসুন লাগিয়েছিলেন; গাছ কাটার আগের দিন প্রায় ৬০ কেজি বীজ রোপণ করেন তিনি। বাংলাপিডিয়া রসুনকে (Allium sativum) একটি শক্ত প্রকৃতির উদ্ভিদ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার ঝাঁঝালো কন্দ রান্না ও ওষুধে ব্যবহৃত হয়। উর্বর, পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত দোআঁশ মাটিতে এটি ভালো হয়; বাড়ন্ত অবস্থায় ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়া এবং কোয়া পরিপক্ব হওয়ার সময় তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়া দরকার, আর এটি রোপণ করা হয় নভেম্বর-ডিসেম্বরে। ফরিদপুর, যশোর, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ঢাকা ও কুমিল্লার সঙ্গে রাজশাহীও রসুন চাষের প্রধান এলাকাগুলোর একটি; বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে ২৫ হাজার ৫৯৩ হেক্টর জমিতে প্রায় ৯০ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন রসুন উৎপাদিত হয়।

অঞ্চলে আগেও কাটা পড়েছে আমবাগান
দেশের উত্তরাঞ্চলের আম অঞ্চলে এমন ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর যুগান্তর জানায়, নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা সীমানার জামালপুর ও গোন্দইল গ্রামের মাঠে ১১ জন আমচাষির প্রায় ৬০ বিঘা জমির প্রায় ১০ হাজার কচি আমগাছ এক রাতে কেটে ফেলা হয়। চাষিদের বেশির ভাগ জমি ইজারা নিয়ে মূলত আম্রপালির বাগান করেছিলেন; তাদের হিসাবে ক্ষতি প্রায় ৫০ লাখ টাকা। সাপাহার থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তখন জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে, তবে কেউ তখনও অভিযোগ করেননি। পত্রিকাটি লিখেছিল, পানির সংকটে যে বরেন্দ্র এলাকার কৃষক বছরে একটিমাত্র বৃষ্টিনির্ভর আমন ধানের ওপর নির্ভর করতেন, সেখানে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে নতুন আমবাগান গড়ে উঠছিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নওগাঁ শহরে এক সংবাদ সম্মেলনে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ১৫ সেপ্টেম্বর পত্নীতলা উপজেলায় তার বাগানের বারি-৪ জাতের আট শতাধিক আমগাছ কেটে ফেলা হয়েছে; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এ খবর দেয়। তিনি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাদের একজন সাংবাদিকদের বলেন, জমিটি তাদের পরিবারের। পত্নীতলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, পুলিশ পাঠিয়ে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়েছিল এবং ওই ব্যবসায়ী আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, দেশ রূপান্তর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (বিডিল'জ, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, যুগান্তর





মন্তব্য
(০)