২০২৬ সালের ২৩ মে, শনিবার, ঈদুল আজহার পাঁচ দিন আগে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে ব্যাপারী ও গৃহস্থেরা কোরবানির গরু নিয়ে প্রস্তুতি সারছিলেন, কিন্তু বেচাকেনা তখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। জাগো নিউজ ২৪-এর সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাটে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম; যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকে গরুর দাম যাচাই-বাছাই করে বাজারদরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছিলেন। বিক্রেতারা চার মণ মাংস হবে এমন গরুর দাম হাঁকছিলেন ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
গাবতলী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন স্থায়ী পশুর হাট, সারা বছরই সেখানে গবাদিপশু কেনাবেচা হয়। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে সন্ধ্যায় ঘোষণা করে, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে ২৮ মে, বৃহস্পতিবার। সেই হিসাবে ২৩ মে হাটে ঈদের আগের শেষ সপ্তাহের প্রস্তুতি চলছিল।
হাটে যে দাম হাঁকা হচ্ছিল
সেদিন গাবতলী হাট ঘুরে জাগো নিউজের প্রতিবেদক দেখেন, ব্যাপারীরা গরুর পরিচর্যায় ব্যস্ত, কিন্তু অনেক খাটাল তখনো খালি এবং পর্যাপ্ত গরু এসে পৌঁছায়নি। বিক্রেতারা জানান, কোরবানির জন্য তিন মণ মাংস পাওয়া যাবে এমন গরুর দাম হাঁকা হচ্ছিল প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। চার মণ মাংসের গরুর দাম উঠছিল ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিক্রেতাদের হিসাবে গড়ে প্রতি মণ মাংসের দাম ঘোরাফেরা করছিল ৩২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে।
বরাবরের মতো এবারও হাটে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা ছিল বেশি। বিশেষ করে চার থেকে ছয় মণ মাংস পাওয়া যায় এমন গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব গরুর ক্ষেত্রে মাংসের দাম গড়ে প্রতি মণ ৩৫ হাজার টাকা পড়ছিল।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা থেকে আসা ব্যাপারী শফি বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি গাবতলী হাটে ১৪টি দেশি ষাঁড় গরু এনেছি। প্রতিটি গরুতে প্রায় ৬ মণ মাংস পাওয়া যাবে। এসব গরুর দাম ২ লাখ ১০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে হাঁকা হচ্ছে।’ তাঁর ভাষ্য, হাটে ক্রেতা একেবারেই কম, আর প্রতি মণ মাংসের দাম ৩৫ হাজার টাকা না হলে তাঁদের লোকসানে পড়তে হবে।
কুষ্টিয়া সদরের ব্যাপারী গোলাপ কসাই বলেন, ‘আমি ২৫টি গরু হাটে তুলেছি। প্রতিটি গরুতে প্রায় ৫ মণ মাংস পাওয়া যাবে। এসব গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।’ তিনি জানান, সাধারণ সময়ে মাংসের মণ ৩২ হাজার টাকার মধ্যে থাকে, কিন্তু ঈদের সময় মণপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা না পেলে বিক্রি করে টিকে থাকা যায় না। তিন দিন ধরে হাটে এলেও তেমন ক্রেতা পাচ্ছিলেন না বলে জানান তিনি।
হাটের প্রবেশপথেই রাখা হয়েছিল বড় আকারের গরু। তবে সেসব খাটালে ক্রেতার চেয়ে ইউটিউবার ও টিকটকারদের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ক্রেতারা কেন অপেক্ষা করছিলেন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩ মে পর্যন্ত কোনো ক্রেতাকে গরু কিনে হাট থেকে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়নি; বরং দর্শনার্থী, ইউটিউবার ও গণমাধ্যমকর্মীর ভিড়ই ছিল বেশি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঢাকায় গরু রাখার জায়গার সংকটের কারণে সাধারণত ঈদের দুই দিন আগে কেনাবেচা বেশি জমে।
মিরপুরের পল্লবী থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে হাটে এসেছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী হাজি মিরন মিয়া। তিনি জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট বাজেট নিয়ে এসেছেন এবং সেই বাজেট অনুযায়ী দাম যাচাই করছেন। তাঁর কথায়, এখন গরু কিনে রাখার সুযোগ নেই; ব্যাপারীরা দাম কিছুটা বেশি হাঁকছেন, তবে ঈদের আগমুহূর্তে দাম কিছুটা কমতে পারে।
বাগেরহাটের মোল্লাহাট থেকে আসা আব্দুর রহিম ব্যাপারী দুই দিন আগে হাটে ১৫টি গরু তুলেছিলেন, কিন্তু তখনো কোনো ক্রেতা পাননি। তিনি বলেন, ‘গরুর কেউ দাম বলেনি। আজ দুদিন বসে আছি।’
ক্রেতাদের এই অপেক্ষা শুধু গাবতলীতে নয়, দেশের অন্য এলাকাতেও দেখা যাচ্ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ১৭ মে রংপুর থেকে জানায়, খামারে অনেকে গরু দেখে গেলেও তখনো অগ্রিম বায়না তেমন হয়নি, পশুর হাটেও বেচাকেনা পুরোপুরি জমে ওঠেনি; খামারিরা আশা করছিলেন, ঈদের শেষ সময়ে ক্রেতা বাড়বে। বাসসের ১৫ মে-র প্রতিবেদনে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের শিয়ালমারি হাটে এক ক্রেতা বলেন, তিনি ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে গরু খুঁজছেন, কিন্তু পছন্দের গরুর দাম দেড় লাখ টাকার নিচে বলছেন না বিক্রেতারা। সেখানেও দেশি জাতের ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি ছিল, আর বড় গরুর চাহিদা কম থাকায় খামারিরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
ভারত থেকে আনা বলদ, দেশে মোটাতাজা
গাবতলী হাটে সেদিন ভারতীয় সাদা বলদ গরুও বিক্রির জন্য তোলা হচ্ছিল। ব্যাপারীরা জানান, এসব গরু সরাসরি ভারত থেকে সদ্য আনা নয়; প্রায় এক থেকে দেড় বছর আগে দেশে আনা হয়েছিল। দেশে আনার সময় গরুগুলোর শরীরে শুধু হাড় ছিল। এরপর ধানের কুঁড়া, খেসারি, ভুট্টা, ধান ও ভুসিমিশ্রিত দানাদার খাবার খাইয়ে সেগুলো ধীরে ধীরে মোটাতাজা করা হয় এবং এখন সেগুলো দেশীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। প্রতিটি গরুর দাম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছিল; বিক্রেতাদের দাবি, প্রতিটিতে ৭ থেকে ৮ মণ মাংস পাওয়া যাবে।
লক্ষ্মীপুরের ব্যাপারী মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা ভারত থেকে গরু এনে খামারে লালন-পালন করে মোটাতাজা করেছি। শুরুতে শুধু হাড় কিনেছিলাম, এখন এগুলো দেশি পরিবেশে বড় হয়েছে। অন্যান্য গরুর তুলনায় এসব ভারতীয় বলদের দামও তুলনামূলক কম।’
কোরবানিতে দাম কেমন হবে, এমন প্রশ্নে বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে কাঁচা ঘাস সহজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং খড়ের দামও অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল ও চিকিৎসা খরচসহ সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। এবার লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চালান উঠলেই আলহামদুলিল্লাহ।’
ওই সপ্তাহেই সরকার সীমান্ত দিয়ে পশু আসা নিয়ে কড়া অবস্থানের কথা জানাচ্ছিল। বাসস জানায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ২৩ মে সকালে গাবতলী হাট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, চোরাইপথে আনা পশু নয়, বৈধ উৎস থেকে কোরবানির পশু কেনা উচিত। তিনি বলেন, অবৈধ বা চোরাইপথে আসা পশু কোরবানির উপযোগী কি না, সে বিষয়ে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ও মুফতিরাই সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধভাবে গবাদিপশু প্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
খরচের চাপের কথা বলছেন ব্যাপারী ও খামারিরা
গাবতলীর ব্যাপারীদের মূল অভিযোগ ছিল খরচ নিয়ে। শফি বিশ্বাসের দাবি, গরুর খাবারের দাম মানুষের খাবারের চেয়েও বেশি, পাশাপাশি ওষুধ ও চিকিৎসা খরচও অনেক বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন হাটে কোরবানির পশুর বেচাকেনা জমতে শুরু করলেও দাম নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই পক্ষের মধ্যেই অসন্তোষ ছিল। ক্রেতাদের অভিযোগ, পশুর দাম অনেক বেশি; বিক্রেতারা বলছিলেন, খাদ্যসহ সব ধরনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সে তুলনায় দাম কমই।
একই সময়ে অন্য জেলার খামারিরাও একই কথা বলছিলেন। বাসস ১৭ মে যশোর থেকে জানায়, জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সেখানে সাড়ে ১৩ হাজার ছোট-বড় খামারি ও কৃষক মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৭টি পশু কোরবানির হাটের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন, যেখানে জেলার চাহিদা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ১২৮টি। যশোর সদরের এক খামারি বাসসকে বলেন, গত কয়েক বছরে পশুখাদ্য হিসেবে খড়, ভুসি, ভুট্টা ও ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে সে অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না।
যশোরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বাসসকে জানান, খামারিদের বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের বলা হয়েছে শুধু দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভর না করে পাশাপাশি কাঁচা ঘাস খাওয়াতে। তিনি আরও বলেন, সব খামারি কোরবানির ঈদ লক্ষ্য করে পশু পালন করায় একই সময়ে অনেক পশু হাটে ওঠে এবং দাম কমে যায়; তাই বছরের অন্য উৎসবগুলো লক্ষ্য করেও পশু পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ১৫ মে-র প্রতিবেদনেও বলা হয়, প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে পশু লালন-পালন করলেও পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় সে বছর লাভ কম হওয়ার শঙ্কায় ছিলেন খামারিরা, আর বাজার স্থিতিশীল রাখতে তাঁরা সীমান্তপথে ভারত থেকে গরু আনা বন্ধে সরকারের কঠোর নজরদারি চাইছিলেন। বাসসের চুয়াডাঙ্গা প্রতিবেদনে শিয়ালমারি হাটের এক খামারিও বলেন, গোখাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় সব হিসাব করেই তাঁরা দাম চাইছেন।
মণের হিসাবে গরুর দাম কেন
কোরবানির হাটে গরুর দাম সাধারণত ঠিক হয় গরুটি থেকে কত মণ মাংস পাওয়া যাবে, সেই অনুমানের ভিত্তিতে। গাবতলীর ব্যাপারীরাও তাই তিন মণ, চার মণ বা ছয় মণের গরু বলে দাম হাঁকছিলেন, আর লাভ-লোকসানের হিসাব করছিলেন প্রতি মণ মাংসের দাম ধরে।
মণ উপমহাদেশের প্রচলিত ওজনের একক। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মোগল আমলে এক মণকে ৪০ সের ধরা হতো; ব্রিটিশ ভারতে ১৮৩৩ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে প্রথম মণের মান নির্দিষ্ট করা হয়, যা পরে পুরো ব্রিটিশ ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর মেট্রিক পদ্ধতিতে এক মণ দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৩২৪২ কেজি। বাংলাদেশ ও নেপালেও একই ধরনের মেট্রিক সংজ্ঞা ব্যবহৃত হয়, তবে বাংলাদেশে প্রচলিত হিসাবে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি।
হাটে কোনো গরু থেকে কত মণ মাংস হবে, তা বিক্রেতার অনুমান; প্রতিবেদনের সব দামও বিক্রেতাদের হাঁকা দাম, চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য নয়।
গাবতলী ও ঢাকার কোরবানির হাট
ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল জানায়, রাজধানীতে সারা বছর চালু থাকে দুটি স্থায়ী পশুর হাট: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গাবতলী এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সারুলিয়া। কোরবানির ঈদ এলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় অস্থায়ী হাট। দৈনিক ইত্তেফাকের ইংরেজি সংস্করণের ২০ মে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর রাজধানীতে মোট ২৭টি হাট বসানো হয়, এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে গাবতলীসহ ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি। সারা দেশে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিক কেনাবেচা চলার কথা ছিল ঈদের দিনসহ পাঁচ দিন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৩ মে এক ব্রিফিংয়ে জানায়, ঢাকার এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বড় হাটগুলোতে ভেটেরিনারি দল পশু পরীক্ষা করবে এবং স্বাস্থ্য ছাড়পত্র ছাড়া কোনো পশু বিক্রি করতে দেওয়া হবে না; সব হাটে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েনসহ নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
২৩ মে গাবতলী পরিদর্শনের পর প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, এ বছর হাটে গবাদিপশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে; সেখানে অসুস্থ পশুর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, জ্বর পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা আছে, আর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকেরা হাটে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি আরও বলেন, জাল টাকা শনাক্তে বিশেষ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
হাটের বাইরে অনলাইনেও কোরবানির পশু বেচাকেনা চলছিল। মন্ত্রণালয়ের ৩ মে-র ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, অনলাইনে পশু কেনায় কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না। ইত্তেফাক জানায়, খামারিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, ওয়েবসাইট ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে পশুর ছবি, ভিডিও, জীবন্ত ওজন, খাদ্যের বিবরণ ও খামারের ঠিকানা দিচ্ছিলেন।

দেশে কোরবানির পশুর হিসাব
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৩ মে-র ব্রিফিংয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব তুলে ধরে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ২০২৬ সালে কোরবানির জন্য দেশে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে প্রাপ্যতা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু, ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ৫ হাজার ৬৫৫টি।
গাবতলীর যে ব্যাপারীরা সেদিন কথা বলেছিলেন, তাঁদের একজন এসেছিলেন চুয়াডাঙ্গা থেকে। বাসস ১৫ মে চুয়াডাঙ্গা থেকে জানায়, জেলার চার উপজেলায় সে বছর কোরবানি উপযোগী পশু ছিল ২ লাখ ২ হাজার ২৩৯টি, যার মধ্যে গরু ৪৪ হাজার ৩৯৬টি ও ছাগল ১ লাখ ৫৫ হাজার ২০০টি; জেলার চাহিদা ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ১৮১টি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়তি পশু দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হবে।
আগের বছরের অভিজ্ঞতাও এই হিসাবের প্রেক্ষাপট দেয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংবাদবিজ্ঞপ্তির বরাতে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ১০ জুন জানায়, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় দেশে মোট ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়; এর মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি এবং ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি। সে বছর ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু অবিক্রীত থেকে যায়; অধিদপ্তর জানায়, সরবরাহ বেশি থাকায় এমনটি হয়েছে এবং এটি অস্বাভাবিক নয়। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি কোরবানি হয় রাজশাহী বিভাগে, ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১টি; এরপর ঢাকা বিভাগে ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০টি।
সীমান্ত, ভারতীয় গরু ও দেশীয় খামারের বিস্তার
ভারতীয় গরুর প্রসঙ্গ বাংলাদেশের কোরবানির বাজারে পুরোনো। দ্য ডেইলি স্টার ২০২১ সালের ১৯ জুলাই জানায়, সীমান্তে ভারতের কড়াকড়ির আগে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ গরুর জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সীমান্ত দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা গরুর সংখ্যা ছিল ২১ লাখ; ২০১৫ সাল থেকে এই ব্যবসা বাধার মুখে পড়ে এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২ লাখে।
একই প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তখনকার মহাপরিচালক বলেন, এর ফলে বাংলাদেশ গবাদিপশু পালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে; আগে কোরবানির মৌসুমে ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভর করতে হতো, কিন্তু ২০২১ সালের ওই প্রতিবেদনের আগের চারটি ঈদে দেশে পালিত ষাঁড়েই চাহিদা মিটেছে। অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে মোটাতাজা করা ষাঁড়ের সংখ্যা ২০১৭ সালে ছিল ৩৩ লাখ ৪২ হাজার, ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ৩৮ লাখ ৫৮ হাজার। ২০০৯-১০ সালে দেশে মাংস উৎপাদন ছিল প্রায় ১৩ লাখ টন, ২০১৯-২০ সালে তা ৭৫ লাখ টন ছাড়ায়।
২০২৬ সালের কোরবানির আগেও সীমান্ত প্রসঙ্গটি আলোচনায় ছিল। ৩ মে-র ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী জানান, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে; তাঁর ভাষ্য, অতীতে সীমান্তঘেঁষা কিছু হাটের মাধ্যমে বিদেশি পশু ঢোকায় দেশীয় খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ইত্তেফাকের ২০ মে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু প্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশকে নজরদারি বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। রংপুর বিভাগের খামারিরাও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভারতীয় গরু অবৈধভাবে ঢুকলে তাঁরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
গাবতলীতে যে ভারতীয় বলদগুলো তোলা হয়েছিল, সেগুলো কোন পথে বা কোন প্রক্রিয়ায় দেশে আনা হয়েছিল, প্রতিবেদনে তার বিবরণ নেই; ব্যাপারীরা শুধু জানান, সেগুলো এক থেকে দেড় বছর আগে আনা।
হাড্ডিসার গরু মোটাতাজাকরণ: গবেষণা কী বলে
লক্ষ্মীপুরের ব্যাপারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভারতীয় বলদগুলোকে ধানের কুঁড়া, খেসারি, ভুট্টা, ধান ও ভুসিমিশ্রিত দানাদার খাবার খাইয়ে বড় করা হয়েছে। বাংলাদেশে গরু মোটাতাজাকরণে এসব উপকরণের ব্যবহার নিয়ে গবেষণাও হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষকদের একটি গবেষণা ২০১৫ সালে ‘লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, দেশের কৃষকেরা প্রধানত খড় খাইয়ে গরু পালেন, কিন্তু শুধু খড় একটি নিম্নমানের আঁশজাতীয় খাদ্য, যা গরুর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় শক্তি ও আমিষের চাহিদাও মেটাতে পারে না। সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে ২০১৩ সালে ৯০ দিনের পরীক্ষায় দেশি ও ব্রাহমা সংকর জাতের ১২টি ষাঁড়কে তিন ধরনের খাদ্য দেওয়া হয়। গমের ভুসি, ভাঙা ভুট্টা, ভাঙা খেসারি ও সয়াবিন খইলসহ মিশ্র দানাদার খাদ্য পাওয়া দলের দৈনিক গড় ওজন বেড়েছে ৯৫৪ গ্রাম; দানাদার খাদ্য ও ইউরিয়া-চিটাগুড় মেশানো খড় সমান অনুপাতে পাওয়া দলের বেড়েছে ৮৭৩ গ্রাম; আর শুধু ইউরিয়া-চিটাগুড় মেশানো খড় পাওয়া দলের বেড়েছে মাত্র ২০৫ গ্রাম। গবেষকেরা খরচ ও খাদ্যদক্ষতা বিবেচনায় দানাদার খাদ্য ও ইউরিয়া-চিটাগুড়-খড়ের সমান মিশ্রণকে এই সংকর ষাঁড়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী বলে মত দেন। গবেষণাপত্রে আগের গবেষণার উল্লেখ করে বলা হয়, শুধু ইউরিয়া-চিটাগুড়-খড়ে দেশি গরুর দৈনিক ওজন বৃদ্ধি ছিল ১৫৭ থেকে ২৯২ গ্রাম, আর এর সঙ্গে দানাদার খাদ্য যোগ করলে তা ৫৫৪ থেকে ৮৮৩ গ্রামে ওঠে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িকীতে ২০১৮ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার ১০ জন ক্ষুদ্র খামারির ষাঁড় নিয়ে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে ইউরিয়া-চিটাগুড় মেশানো খড় পাওয়া ষাঁড়ের দৈনিক গড় ওজন বেড়েছে ৪৯৬ দশমিক ৪১ গ্রাম, আর না পাওয়া দলের ২৩৬ দশমিক ৬২ গ্রাম; খামারিদের মোট লাভও প্রথম দলে বেশি হয়েছে। খাদ্যের পরিমাণ ও মিশ্রণের অনুপাত প্রাণীর বয়স, জাত ও অবস্থাভেদে আলাদা হয়, তাই খাদ্যতালিকা ঠিক করতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ব্যাপারীদের উল্লেখ করা খেসারি (Lathyrus sativus) একটি ডাল ফসল, যা এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় মানুষের খাবার ও পশুখাদ্য দুই কাজেই চাষ হয়। খরা বা বন্যাতেও টিকে থাকতে পারে বলে একে ‘বিমা ফসল’ বলা হয়। তবে এর বীজে একটি স্নায়ুবিষ থাকে; দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান আমিষ হিসেবে খেলে মানুষের ল্যাথাইরিজম নামের স্নায়ুরোগ হতে পারে।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, দ্য ডেইলি ইত্তেফাক (ইংরেজি সংস্করণ), ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার, লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট, জার্নাল অব দ্য সিলেট এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)