রাজশাহীর বিনোদপুরের বাসিন্দা শারমিন আক্তার নিজের বাড়ির ছাদে গড়ে তোলা বাগানের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের 'বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫'-এ 'ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদ বাগান' শ্রেণিতে প্রথম স্থান পেয়েছেন। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই জাগো নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি জানান, বাগানের চারা ও টব বিক্রি করে তার বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় হয়। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
শখ থেকে ২ হাজার ৬০০ বর্গফুটের বাগান
শারমিন আক্তার ২০২২ সালে নিজের বাড়ির ছাদে ছোট পরিসরে বাগান শুরু করেন। তার দেওয়া হিসাবে, তিনতলা বাড়ির নিচতলা ও ছাদ মিলিয়ে বাগানটি এখন প্রায় ২ হাজার ৬০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে তিন স্তরে সাজানো, সেখানে দেশি-বিদেশি প্রায় ১১০ প্রজাতির সাড়ে তিন হাজারের বেশি গাছ রয়েছে। বাগানের নাম 'ন্যাচার'স টাচ', তবে এলাকায় এটি 'কৃষিবাড়ি' নামে পরিচিত।
অনলাইন ও সরাসরি দুইভাবেই তিনি বিভিন্ন গাছের চারা ও টব বিক্রি করেন। তিনি জানান, এ থেকে মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকা আয় হয়। বাগানে তিনজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন, আর ভবিষ্যতে রাজশাহীতে অর্ধশতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেছেন। তার স্বামী মোহা. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, বাগানের বেশিরভাগ পরিচর্যা শারমিনই করেন; তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে চারা সংগ্রহ করে দেন এবং দেশের নানা এলাকার ক্রেতাদের অর্ডার করা চারা কুরিয়ারে পাঠাতে সাহায্য করেন।

বাগানে কী কী গাছ আছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শারমিনের বাগানে ঘরের ভেতরের ও বাইরের গাছ, ফুল, ফল, সবজি, ঔষধি এবং বিরল নানা প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ঘরের ভেতরের গাছ: অ্যাডেনিয়াম, অ্যাগলোনিমা, অ্যানথুরিয়াম, পিস লিলি, স্নেক প্ল্যান্ট, সাকুলেন্ট, ইউফোরবিয়া, পোথোস, জেডজেড প্ল্যান্ট, ফার্ন, ক্যাকটাস ও মানি প্ল্যান্ট
- ঔষধি গাছ: লেমনগ্রাস, স্টেভিয়া, কালমেঘ, ইনসুলিন গাছ, নিম, রোজমেরি, অরেগানো, পাথরকুচি ও উলটকম্বল
- বিরল গাছ: পারিজাত, মিষ্টি তেঁতুল, সাদা জাম, ফিডল লিফ ফিগ ও সাইকাস
- দেশীয় গাছ, যেগুলোকে তিনি হুমকির মুখে বলে উল্লেখ করেন: কর্পূর, অশোক, হিজল, পলাশ, মহুয়া ও বট
- ফল: আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, স্ট্রবেরি, রামবুটান, অ্যাভোকাডো ও আপেল
- সবজি: মরিচ, টমেটো, লাউ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শসা, বেগুন, করলা ও সজনে

জাতীয় পুরস্কার ও বৃক্ষমেলা
জাগো নিউজের ৮ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার বৃক্ষরোপণে অবদানের জন্য সাতটি শ্রেণিতে মোট ২১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। ১৫ জুন মন্ত্রণালয়ের বন-২ শাখার প্রজ্ঞাপনে তালিকা প্রকাশ করা হয়। ছাদবাগানের 'ঙ' শ্রেণিতে প্রথম হন রাজশাহীর শারমিন আক্তার, দ্বিতীয় ঢাকার আসফিয়া সাবিনা এবং তৃতীয় শেরপুর পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা।
বাসস ও ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ২০২৬ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও জাতীয় বৃক্ষমেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি জাতীয় পরিবেশ পদক ২০২৫, জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পদক ২০২৬ ও বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার ২০২৫ তুলে দেন। ঢাকায় মেলা মাসব্যাপী চলার কথা জানানো হয়, আর বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা সদরে আরও কম দিনের বৃক্ষমেলা। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠানেই শারমিন আক্তার পুরস্কার গ্রহণ করেন।

শারমিনের কথা ও কৃষি বিভাগের মত
শারমিন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, 'ছাদ বাগান শুধু শখের বিষয় নয়, এটি পরিবেশ রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় খাত।' তিনি জানান, পড়াশোনা ব্যবসায় শিক্ষায় হলেও ছোটবেলা থেকে কৃষি নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন ছিল; শুরুতে অনেকে বাগানটিকে ছোট করে দেখতেন, এখন অনেকে বাগান করে আয়ের পরামর্শ চান। প্রতিবেশী আব্দুল হাকিম বলেন, তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেকে নিজের বাসার ছাদে গাছ লাগাতে আগ্রহী হচ্ছেন।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, রাজশাহীতে এখন অনেকে ছাদ বাগান করছেন এবং কৃষি বিভাগ তাদের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেয়। তার মতে, রাজশাহীতে তাপমাত্রা অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি, আর ছাদ বাগান তাপমাত্রা কমাতে সহায়ক। পদ্মার উত্তর তীরের এই শহরে এপ্রিল থেকে জুলাই গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৩২ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। ছাদবাগান নিয়ে গবেষণার সারসংক্ষেপে বলা হয়, প্রস্বেদনের কারণে গাছের পাতা খালি ছাদের মতো গরম হয় না, এবং ব্যাপকভাবে ছাদবাগান হলে শহরের বাড়তি তাপ কমতে পারে।

ছবি: Wiki Ruhan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাগো নিউজ ২৪ (৮ জুলাই ২০২৬), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া (রাজশাহী; ছাদবাগান)





মন্তব্য
(০)