টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বিপর্যস্ত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার অবশেষে দেখা মিলেছিল স্বস্তির রোদের। সেদিন সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ ওঠায় হাওরজুড়ে ফিরেছিল প্রাণচাঞ্চল্য। জাগো নিউজ ২৪ সেদিন দুপুরে জানায়, ডুবে যাওয়া খেত থেকে কেটে আনা ধান আর খলায় স্তূপ করে রাখা ধান শুকাতে তখন ব্যস্ত সময় পার করছিলেন কৃষকেরা।
ইটনার অলওয়েদার সড়কসহ হাওরের উঁচু জমির খলাগুলোতে আবারও ফিরেছিল চিরচেনা কর্মব্যস্ততা। সড়কের দুই পাশে ধান শুকানো চলছিল, কোথাও চলছিল ধান মাড়াই, আবার কোথাও বাতাসে ধান উড়িয়ে চিটা ও ময়লা পরিষ্কারের কাজ। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও ধান শুকানো ও গোছানোর কাজে হাত লাগিয়েছিল। ফলে খলাগুলোতে কৃষকদের তখন দম ফেলার ফুরসত ছিল না।
তবে রোদের দেখা মিললেও কৃষকদের উদ্বেগ কাটেনি। আগের ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি বেড়েছিল, তাই পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা থেকেই গিয়েছিল। অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ইটনা উপজেলার হাওরাঞ্চল, আর অনেক নিচু জমি তখনও পানির নিচে তলিয়ে ছিল।
অলওয়েদার সড়কে ধান শুকানো, মাড়াই আর ঝাড়াই
মিঠামইন জিরো পয়েন্টে অলওয়েদার সড়কে ধান শুকাতে ব্যস্ত কৃষক রহিম মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, সকাল থেকে রোদ থাকায় সবাই খলা ও সড়কে রাখা ধান শুকাতে ব্যস্ত। কিছু জায়গায় তখনো পানির মধ্যে নেমে ধান কাটতে হচ্ছিল বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, কয়েক দিন রোদ থাকলে কিছুটা ফসল রক্ষা করা যাবে।
জয়সিদ্ধি খলার কৃষক খয়ের খা বলেন, রোদ না উঠলে সব শেষ হয়ে যেত। যা আছে, সেটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা। তিনি জানান, অনেকের ধান এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।
জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে হাতে ধান কাটার শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছিল, সেই সঙ্গে বেড়েছিল মজুরিও।
ধান কাটতে আসা শ্রমিক সবুর আলী বলেন, বুকসমান পানিতে নেমে কাজ করতে হচ্ছে। ঠান্ডা পানি আর জোঁকের কষ্টের মধ্যেও ধান কাটছেন তাঁরা, তাই মজুরি একটু বেশি নিচ্ছেন।
নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা তখনো কাটেনি। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পরের কয়েক দিনের মধ্যে অন্তত খলার ধান উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছিলেন স্থানীয় কৃষকেরা।

নদীর পানি, বৃষ্টি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য
নিকলী আবহাওয়া অফিস সেদিন জানিয়েছিল, আগের ২৪ ঘণ্টায় ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং সেদিনও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এর তিন দিন আগে, ২ মে শনিবার, একই প্রকৌশলী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, জেলার অধিকাংশ নদ-নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে, তবে তা বিপৎসীমার নিচে। ইটনার ধনু-বৌলাই নদ, করিমগঞ্জের চামড়া বন্দর এলাকার মগড়া নদী, অষ্টগ্রামের কালনী নদী ও ভৈরবের মেঘনা নদীতে আগের দিনের তুলনায় ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছিল। কিছু এলাকায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কৃষকেরা নিজেরাই বাঁধ কেটে দিচ্ছিলেন বলেও জানান তিনি।
ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আগেই ছিল। ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর সাত দিনের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস উদ্ধৃত করে জানায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে; ২৭ এপ্রিল মাঝারি থেকে ভারী এবং ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। সুনামগঞ্জে পাউবোর কর্মকর্তারা ২৮ এপ্রিল থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকির কথা বলেছিলেন। সেখানকার নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছিলেন, স্থানীয় বৃষ্টির চেয়ে ভারতের চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি হাওরের ধানের জন্য বেশি ঝুঁকি তৈরি করে, কারণ উজানের পাহাড়ি ঢলে দ্রুত হাওর তলিয়ে যায়।
কিশোরগঞ্জে টানা কয়েক দিন বৃষ্টির পর ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার হালকা রোদ উঠেছিল, কিন্তু ১ মে শুক্রবার সকাল থেকে আবার আকাশে মেঘ জমে, রাতে বৃষ্টি শুরু হয়। ২ মে শনিবার সকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টির খবর পাওয়া যায়। প্রথম আলো সেদিন জানায়, প্রায় পাঁচ দিন ধরে স্তূপ করে রাখা ধান রোদে শুকানো যায়নি; জমি থেকে কেটে আনা ভেজা ধান খলা বা বাড়ির উঠানে স্তূপ করে রাখা ছিল।
ক্ষতির হিসাব যেভাবে বেড়েছে
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান ৫ মে জাগো নিউজকে জানান, তখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ৪৯ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়, আর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছিল।
দশ দিনের মধ্যে এই হিসাব কয়েক গুণ বেড়েছিল। ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো জানায়, ২৬ এপ্রিল বিকেল থেকে হাওরাঞ্চলে বৃষ্টি, ঝড় ও বজ্রপাত চলছিল; কৃষকদের হিসাবে দুই দিনে অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকাসহ ইটনা ও মিঠামইন হাওরের কিছু এলাকায় প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গিয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে তখন সঠিক হিসাব ছিল না, আর কৃষকদের দাবি ছিল দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর। সাদিকুর রহমান তখন বলেছিলেন, পূর্ণ হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন লাগবে; ধানগাছ পাঁচ-ছয় দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে, আর সেদিন পর্যন্ত হাওরের ৪৮ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গিয়েছিল।
২ মে দুপুরে অধিদপ্তরের হিসাবে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলীসহ কয়েকটি এলাকায় ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন আনুমানিক ২১ হাজার কৃষক। সেদিন বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টরে, আর আনুমানিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩০ হাজারে।
ক্ষতি শুধু কিশোরগঞ্জে সীমাবদ্ধ ছিল না। ৩ মে প্রথম আলো স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য উল্লেখ করে জানায়, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি ধানখেত তলিয়ে গিয়েছিল। সুনামগঞ্জে প্রাথমিক হিসাবে অতিবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার হেক্টরের ধানের ক্ষতি হয়েছিল, তার আগে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয়েছিল ২ হাজার হেক্টর; টাকার অঙ্কে ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। নেত্রকোনায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর ধানের জমির মধ্যে হাওরে ছিল ৪২ হাজার হেক্টর, আর সরকারি হিসাবে তলিয়েছিল ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর।

সংখ্যায় কিশোরগঞ্জের এবারের বোরো মৌসুম
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল, যার মধ্যে শুধু হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে প্রায় ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন চাল পাওয়ার কথা।
ধান কাটা শুরুর সময় ২২ এপ্রিল সাদিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, কিশোরগঞ্জ খাদ্যে উদ্বৃত্ত জেলা; এখানে বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। তিনি জানান, এক সপ্তাহ আগে ধান কাটা শুরু হয়েছে, পরের সপ্তাহে পুরোদমে কাটা হবে। শিলাবৃষ্টি ও আগাম পানির ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে তিনি কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, জমির ধান ৮০ ভাগ পেকে গেলেই যেন কেটে ফেলা হয়। ২ মে তিনি আবারও বলেন, রোদ না থাকলেও ৮০ শতাংশ পেকে যাওয়া ধান যেন কোনো অবস্থাতেই জমিতে না থাকে।
বৃষ্টির আগেই মৌসুমে আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ১২ এপ্রিল প্রথম আলো জানায়, জেলার ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর বোরো জমির মধ্যে ব্রি ধান ৮৮ চাষ হয়েছিল ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টরে। করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও বাজিতপুরের হাওরের কৃষকদের অভিযোগ ছিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সরবরাহ করা এ জাতের বীজে নানা জাতের মিশ্রণ থাকায় একই খেতে ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধান হয়েছে, পাকছেও ভিন্ন সময়ে। সাদিকুর রহমান বলেছিলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বীজে মিশ্রণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। বিএডিসির উপপরিচালক (বীজ বিপণন) জানিয়েছিলেন, বীজ কোথা থেকে এল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে; আর উপপরিচালক (বীজ উৎপাদন) দাবি করেছিলেন, প্রাকৃতিক মিউটেশন, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, বেশি বয়সের চারা রোপণ কিংবা বীজের উৎসে ত্রুটির কারণেও এমন ভিন্নতা দেখা দিতে পারে।
ধানের দাম, মজুরি ও শ্রমিকসংকট
বন্যার আগেই হাওরের কৃষকেরা ধানের দাম নিয়ে অসন্তোষ জানাচ্ছিলেন। ২২ এপ্রিলের প্রতিবেদনে নিকলী ও করিমগঞ্জের কৃষকেরা প্রথম আলোকে বলেন, এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়, অথচ এক দিনের জন্য ধান কাটার শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। একজন কৃষকের দাবি ছিল, এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি। ইটনার বড়িবাড়ি হাওর থেকে ৩০০ বস্তা ধান নিয়ে আসা এক কৃষক জানান, আড়তদারেরা হাইব্রিড হীরা ধানের দাম দিচ্ছেন মণপ্রতি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়া নৌবন্দর হাওরাঞ্চলের ধানবাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। মৌসুমে এখানে প্রতিদিন হাজারো মণ ধান কেনাবেচা হয়, নাগচিন্নি নদের তীরে প্রায় ৪০টি আড়ত বসে। কৃষকেরা ভেজা ও শুকনা ধান বস্তায় ভরে নৌকায় করে ঘাটে এনে আড়তে বিক্রি করেন, আর আড়তদারেরা সেই ধান ট্রাকে করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলার চালকলে পাঠান।
পানি বাড়ার পর শ্রমিক আরও দুর্লভ ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ২ মে প্রথম আলো জানায়, কৃষকেরা দিনে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক দিয়ে জমি থেকে ধান কেটে আনছিলেন; নিকলীর এক কৃষক বলেন, ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। শ্রমিক ও হারভেস্টার মেশিনের উচ্চ খরচ দিতে না পেরে অনেক কৃষক ‘নয়ন ভাগা’ দিয়ে দিচ্ছিলেন, অর্থাৎ চোখ যত দূর যায়, তার মধ্যে যে যার খুশিমতো ধান কেটে নিয়ে যেতে পারবেন। মিঠামইনের ঢাকি এলাকার এক কৃষক জানান, তাঁর পাঁচ একরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে, শ্রমিকসংকটে কাটতে না পেরে তিনি নয়ন ভাগা ঘোষণা করেছেন।
পাশের সুনামগঞ্জেও একই সমস্যা ছিল। ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো জানায়, সে জেলায় ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার থাকলেও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় সেগুলো দিয়ে ধান কাটাতে সমস্যা হচ্ছিল, আর ধান কাটার শ্রমিকেরও সংকট ছিল।
ভেজা ধান কেন দ্রুত শুকাতে হয়
রোদ ওঠামাত্র ধান শুকানোর এই তাড়ার পেছনে কারিগরি কারণ আছে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) রাইস নলেজ ব্যাংক অনুযায়ী, কাটার সময় ধানে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতা থাকে, আর ফসল কাটার পর শুকানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সংরক্ষণের সময় আর্দ্রতা বেশি থাকলে দানার রং নষ্ট হয়, ছত্রাক জন্মায়, পোকার আক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে এবং বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা কমে যায়। ইরি তাই কাটার পর যত দ্রুত সম্ভব, আদর্শভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধান শুকানোর পরামর্শ দেয়; দেরিতে, অসম্পূর্ণ বা অকার্যকরভাবে শুকালে মান কমে ও ক্ষতি হয়।
নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য ইরির নির্দেশিকায় আর্দ্রতার মাত্রা এমন:
- কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সংরক্ষণের জন্য ১৪ শতাংশ বা তার কম, যাতে ছত্রাক, বিবর্ণতা, শ্বসনজনিত ক্ষতি ও পোকার আক্রমণ এড়ানো যায়;
- ৮ থেকে ১২ মাস সংরক্ষণের জন্য ১৩ শতাংশ বা তার কম;
- কৃষকের নিজের বীজ রাখার জন্য ১২ শতাংশ বা তার কম, যাতে অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা নষ্ট না হয়।
ইরির তথ্যমতে, মাদুর, জাল, প্লাস্টিকের শিট বা পাকা চাতালে ধান বিছিয়ে রোদে শুকানো এশিয়ায় সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি, কারণ এতে খরচ কম; তবে এতে শ্রম বেশি লাগে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন, আর রাতে বা বৃষ্টিতে শুকানো যায় না। ভালোভাবে রোদে শুকাতে ইরির পরামর্শ হলো, ধান ২ থেকে ৪ সেন্টিমিটারের পাতলা স্তরে বিছানো, প্রায় প্রতি ৩০ মিনিটে উল্টে বা নেড়ে দেওয়া, প্রচণ্ড গরমের দিনে দুপুরে ঢেকে রাখা এবং বৃষ্টি শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে ঢেকে দেওয়া; কারণ শুকানো ধান আবার ভিজলে দানায় ফাটল ধরে এবং ভাঙানোর সময় বেশি ভেঙে যায়।
ধান শুকানো না গেলে কী হয়, কিশোরগঞ্জে বৃষ্টির সপ্তাহটিতেই তা দেখা গিয়েছিল। ২ মে প্রথম আলো জানায়, করিমগঞ্জের মানিকপুর হাওরের এক কৃষক এক সপ্তাহ আগে ৩৫০ মণ ধান মাড়াই করে শুকানোর জন্য খলায় স্তূপ করে রেখেছিলেন; সাত দিনের টানা বৃষ্টিতে সেই ধানে চারা গজিয়ে পচন ধরে, দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে, শেষে তিনি তা হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দেন। সেখানকার আরেক কৃষক ৭০ বস্তা ধান নিয়ে একই কাজ করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যেও বলা হয়েছিল, অনেক কৃষক চারা গজানো ধান হাওরের পানিতে ফেলে দিচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জের হাওর ও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, হাওর হলো গামলা আকৃতির বিশাল ভূতাত্ত্বিক নিম্নভূমি, যা নদী ও খালের পানিতে বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে পরিণত হয় এবং বর্ষার পর বেশির ভাগ শুকিয়ে যায়। দেশে হাওর মূলত বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে। ভারতের পাহাড় থেকে নামা নদীগুলো সমভূমিকে ৬ মিটার পর্যন্ত গভীর পানিতে ডুবিয়ে দেয়, আর এসব সমভূমি বছরে ৭ থেকে ৮ মাস পানির নিচে থাকে। শুকনা মৌসুমে পানি নেমে গেলে বেরিয়ে আসে উর্বর পলিমাটি, যেখানে ব্যাপকভাবে ধান চাষ হয়। শুকনা মৌসুমের ফসল বোরো ধানই হাওর অববাহিকার প্রধান ফসল।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ঢাকা বিভাগের কিশোরগঞ্জ জেলার আয়তন ২ হাজার ৬৮৮.৫৯ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১৩টি; ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৬৭ হাজার ৬২৬। জেলার পূর্বাংশ জলাভূমির কাদা ও পিটমাটির অগভীর অববাহিকা, যা বর্ষায় প্লাবিত হওয়া হাওর নিয়ে গঠিত। ৫ মের প্রতিবেদনে যে উপজেলাগুলোর নাম এসেছে, সেগুলো এই হাওর এলাকারই:
- ইটনা: আয়তন ৪০১.৯৩ বর্গকিলোমিটার, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪০; কয়েকটি ইউনিয়ন ধনু নদের তীরে, আর কৃষিই আয়ের প্রধান উৎস;
- অষ্টগ্রাম: আয়তন ৩৫৫.৫৩ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১ লাখ ৫১ হাজার ২৩৮; খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুরসহ আটটি ইউনিয়ন;
- মিঠামইন: আয়তন ২২২.৯১ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার ১৫৭; ঢাকিসহ সাতটি ইউনিয়ন;
- নিকলী: আয়তন ২১৪.৩৯ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৮৭; সাতটি ইউনিয়ন।
জেলার নদীগুলো বোঝায়, উজানের বৃষ্টি কেন এখানে এত গুরুত্বপূর্ণ। সুরমা নদী স্থানীয়ভাবে ধনু নামে ইটনার ধনপুরের কাছে কিশোরগঞ্জে ঢোকে এবং পরে ঘোড়াউত্রা নাম নেয়; কুশিয়ারা স্থানীয়ভাবে কালনী নামে মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের ভেতর দিয়ে দক্ষিণে বয়ে যায়। বাজিতপুরের দিলালপুরের কাছে এই দুই ধারা মিলে মেঘনা হয়েছে।

হাওরের সংগঠন ও স্থানীয় মানুষের বক্তব্য
৩ মে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক উদ্যোগ যৌথভাবে হাওরের ফসলহানি নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে। লিখিত বক্তব্যে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা দাবি করেন, মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত টানা তিন দফা বৃষ্টি এবং ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হাওরাঞ্চলে অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে, আর শিলাবৃষ্টিতে আরও প্রায় ৮০০ হেক্টরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি আয়োজকদের হিসাব, যা তখনকার সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।
তিনি ১৫ দফা দাবি তুলে ধরেন, যার মধ্যে ছিল:
- ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বছরব্যাপী পরিবারপ্রতি ৩০ কেজি চাল ও এক হাজার টাকা সহায়তা;
- নদী, খাল ও বিল খনন করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা;
- ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর স্লুইসগেট নির্মাণ;
- হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে চাল নয়, অন্তত ১০ লাখ টন ধান সরাসরি কেনা;
- সুদমুক্ত ঋণ ও ঋণের পুনঃতফসিল;
- কমিউনিটি মাড়াইকেন্দ্র ও ড্রায়ার স্থাপন এবং বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা।
সংবাদ সম্মেলনে লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তা পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। তাঁর মতে, বর্গাচাষিরাই মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের সহায়তা দিতে হবে।
অষ্টগ্রামের স্থানীয় লোকজন ২৭ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেছিলেন, পরিবেশ না মেনে হাওরে উঁচু রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পলি জমে নদী ভরাট হওয়া এবং ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এক কৃষক জানান, হবিগঞ্জ সীমান্তের শিবপুর এলাকায় খোয়াই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই অষ্টগ্রাম অংশে জলাবদ্ধতা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাদিকুর রহমানও বলেছিলেন, পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় অষ্টগ্রামের হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
হাওরবাসীর মনে ২০১৭ সালের স্মৃতিও ছিল। ২৭ এপ্রিল প্রথম আলো মনে করিয়ে দেয়, সে বছর সুনামগঞ্জের হাওরে অকালবন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে সব ফসল তলিয়ে গিয়েছিল; জেলায় খাদ্যসংকট দেখা দেয়, দেশে চালের দাম বেড়ে যায়, আর সরকার জেলার প্রায় ২ লাখ কৃষক পরিবারকে টানা এক বছর খাদ্যসহায়তা দিয়েছিল।
ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) রাইস নলেজ ব্যাংক, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)