নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাস ২০২৬ সালের ২৬ জুলাই, রোববার, ‘বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো ডেলিকেসি’ শীর্ষক একটি আম উৎসবের আয়োজন করে। দূতাবাস সংলগ্ন উৎসব ব্যাংকুয়েট হলে আয়োজিত এ উৎসবে বাংলাদেশের আমের ঐতিহ্য, মান ও স্বাদের বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয় এবং তাজা ফল ও মূল্যসংযোজিত প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা বলা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম ভূইয়া নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সার্ক সচিবালয়ের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত মো. গোলাম সারওয়ার। নেপালের পররাষ্ট্র সচিবের পক্ষে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের যুগ্মসচিব গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, নেপাল সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও গণমাধ্যমকর্মীসহ প্রায় ২৫০ জন অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বাংলাদেশের আম ও আম গবেষণা
স্বাগত বক্তব্যে নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে আম কেবল একটি ফল নয়, এটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষি ও জীবনযাত্রার অংশ। মুঘল আমলের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, উর্বর পলিমাটি ও অনুকূল জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। খিরসাপাত, হাঁড়িভাঙা, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, আম্রপালি, আশ্বিনা, বানানা ম্যাঙ্গো, কাটিমন, গৌরমতি ও বারি আমের নাম উল্লেখ করে তিনি এসব জাতের মিষ্টতা, সুবাস ও পুষ্টিগুণের কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত জানান, দেশের বিজ্ঞানীরা মৌসুমের পরে দেরিতে ফল দেয় এমন নতুন বারি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন এবং কিছু বিদেশি জাত সফলভাবে দেশের আবহাওয়ায় মানিয়ে নিয়েছেন। এই গবেষণার একটি বড় কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণা কেন্দ্র, যা ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারির প্রথম সংকর জাত বারি আম-৪ তৈরি হয় ফ্লোরিডার এম-৩৮৯৬ জাতের সঙ্গে দেশি আশ্বিনার সংকরায়ণে এবং জাতটি অবমুক্ত হয় ২০০৩ সালে। রাষ্ট্রদূত বেসরকারি খাতের প্রশংসা করে বলেন, দেশের আমভিত্তিক শিল্প এরই মধ্যে জুস, নেকটার, পাল্প, জ্যাম, আচার, চাটনি, শুকনো আম, ক্যান্ডি ও ফ্রুট বারের মতো আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করছে।

প্রদর্শনীতে মৌসুম-শেষের আম ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য
উৎসবে রাজশাহী অঞ্চলের দেরিতে পাকা আম, যেমন ফজলি, আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন, গৌরমতি ও আশ্বিনা প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের আমের জুস, আচার, ফ্রুট বার, শুকনো আম, চাটনি, জ্যাম ও জেলি রাখা হয়। অতিথিদের আমের কেক, ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস ও ম্যাঙ্গো পুডিংসহ নানা ডেজার্ট পরিবেশন করা হয় এবং বাংলাদেশের আম চাষ, সংস্কৃতি ও পর্যটন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।
বাংলাদেশের আমচাষি রফিকুল ইসলাম অতিথিদের সামনে তার ১৫ বছরের আম চাষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তত্ত্বাবধানে উত্তম কৃষি চর্চা (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস, জিএপি) মেনে কীভাবে নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদন করেন, তার পদ্ধতি তিনি ব্যাখ্যা করেন।

আঞ্চলিক সহযোগিতার ডাক ও রপ্তানির বাস্তবতা
সার্ক মহাসচিব মো. গোলাম সারওয়ার দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আমের ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের আম ও আমজাত পণ্যের রপ্তানি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি কৃষিখাতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। নেপালের যুগ্মসচিব গহেন্দ্র রাজভাণ্ডারী আয়োজনের জন্য দূতাবাসকে ধন্যবাদ দেন এবং বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেতুবন্ধন গড়তে ভূমিকা রাখবে। তিনি রাষ্ট্রদূতের ‘ম্যাঙ্গো ডিপ্লোমেসি’ উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
রপ্তানির পিছিয়ে থাকার চিত্র দেশের তথ্যেও স্পষ্ট। ২০২৬ সালের ৭ জুলাই দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়, যেখানে দেশের চাহিদা ১৮ থেকে ২০ লাখ টন; অথচ সবচেয়ে ভালো বছরেও রপ্তানি মোট উৎপাদনের মাত্র ০.১ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি সর্বোচ্চ ৩,১০০ টনে ওঠে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নামে ১,৩২১ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয় ২,১৯৪ টন। আন্তর্জাতিক মানের প্যাকহাউস ও কোল্ড চেইনের ঘাটতি, মান অনুযায়ী বাছাই ও প্যাকেজিং ব্যবস্থার অভাব এবং জিএপির সীমিত প্রয়োগকে প্রতিবেদনে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দেশের সবচেয়ে বেশি আম হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে, প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টরে সাড়ে ৪ লাখ টনের বেশি।
এই উৎসবের আগেও দূতাবাস নেপালে আম নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিল। নেপালের সংবাদমাধ্যম পিপলস রিভিউ ও বীমা পোস্ট জানায়, ২০২৬ সালের জুনে ‘সিজনস বেস্ট কমপ্লিমেন্টস’ উদ্যোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুটি বাগান থেকে ১,৭৫০ কেজির বেশি খিরসাপাত আম নেপালের রাষ্ট্রপতি, প্রতিনিধি সভার স্পিকার ও মন্ত্রিসভার সদস্যসহ ৩৬০ জনের বেশি ব্যক্তিকে পাঠানো হয়। আমগুলো বাংলাবান্ধা, ফুলবাড়ী ও কাকরভিট্টা বন্দর হয়ে নেপালে পৌঁছায়।

ছবি: Fozli.com / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, নেপাল প্রেস, স্পটলাইট নেপাল, পিপলস রিভিউ, বীমা পোস্ট, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)