যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ভোজগাতী ইউনিয়নের হুরগাতী গ্রামের খামারি আসমত আলী গাইন ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার আগে তার বিশালদেহী কালো ষাঁড় 'বাংলার বস-৫' ঢাকার গাবতলী পশুর হাটে তোলার প্রস্তুতি নেন। জাগো নিউজের ১ জুন ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড়টির ওজন প্রায় ৩০ মণ, উচ্চতা ৬৫ ইঞ্চি এবং লম্বায় ৯৬ ইঞ্চি। খামারি নিজে এর দাম হাঁকেন ১২ লাখ টাকা এবং দু-এক দিনের মধ্যে ষাঁড়টিকে গাবতলী নেওয়ার কথা জানান।
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সে বছর দেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হয় ৭ জুন। মণিরামপুর যশোর জেলার একটি উপজেলা; একটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলার একটি ইউনিয়ন ভোজগাতী।
নামের ধারাবাহিকতায় ষাঁড়
আসমত আলী জানান, আগের বছর তিনি 'বাংলার বস-৪' গাবতলী হাটে ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। ২০২৫ সালের ঈদের বাজারের জন্য তিনি ছয়টি ষাঁড় প্রস্তুত করেন এবং সবগুলোই গাবতলী হাটে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তিনি আশা করছিলেন, এবারও কাঙ্ক্ষিত দামে ষাঁড়গুলো বিক্রি করতে পারবেন।
তার ভাষ্য, কয়েক বছর ধরে তিনি গাবতলী হাটে ষাঁড় নিয়ে যান এবং ষাঁড়গুলোর নাম রাখেন বাংলার বস, বাংলার সম্রাট ও জলহস্তি। প্রথম যে ষাঁড়টি বড় করে গাবতলী নিয়েছিলেন, তার নাম ছিল বাংলার বস-১; এরপর নামের ধারাবাহিকতা বাংলার বস-৫ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর আগে তিনি জলহস্তি-১ ও জলহস্তি-২ বিক্রি করেছেন। সে বছর নতুন নামে আরেকটি ষাঁড় 'বাংলার সম্রাট' হাটে নেওয়ার কথা ছিল, যার ওজন ২৫ মণ এবং খামারির হাঁকা দাম ১০ লাখ টাকা।
হলস্টাইন ফ্রিজিয়ান জাতের উৎপত্তি নেদারল্যান্ডস ও জার্মানিতে। সাদা-কালো ছোপের এই গরু মূলত বেশি দুধের জন্য পরিচিত, আর পূর্ণবয়স্ক ষাঁড়ের ওজন সাধারণত ৬৮০ থেকে ৭৭০ কেজি।

রিকশাচালক থেকে খামারি
প্রতিবেদন অনুযায়ী আসমত আলীর বয়স ৩৯ বছর। কৈশোরে জীবিকার জন্য তিনি রিকশা চালিয়েছেন, বাদাম বিক্রি করেছেন। তার ব্যবসা মূলত ডেইরি খামারের; ষাঁড় ছাড়াও তার গাভী ও বাছুর আছে ২৫টি। মাত্র দুটি গরু দিয়ে খামার শুরু হয়েছিল; আগের চার-পাঁচ বছরে খামারে ৪৫ থেকে ৬০টি গরু পালন হয়েছে, শেড আছে তিনটি। এক শতক পৈতৃক জমি থেকে তিনি ১৭১ শতক জমির মালিক হয়েছেন বলে জানান।
আসমত আলী বলেন, ২০০৪ সালে ধারদেনা করে তিনি গরু পালন ও বেচাকেনা শুরু করেন, কিন্তু লাভের বড় অংশ নিয়ে যেতেন পুঁজি লগ্নিকারীরা। দেনার চাপে সে বছরই ঢাকায় গিয়ে প্রায় দুই বছর রিকশা চালান। বাবার মৃত্যুর পর বাড়ি ফিরলে চাচারা তাকে বাড়িতে থেকে গরু পালনের পরামর্শ দেন। ২০০৬ সালে তিনি আবার গরু কেনা, পালন ও বিক্রি শুরু করেন এবং ২০০৮ সালে পূর্ণমাত্রায় খামারের কাজ শুরু হয়; তখন গরু বিক্রির পাশাপাশি প্রধান আয় ছিল দুধ বিক্রি।
খামারের কাজে তাকে সহযোগিতা করেন স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম। তিনি জানান, গোয়াল পরিষ্কারের পাশাপাশি গরুকে দিনে তিনবার খাবার দেওয়া হয়: সকালে ঘাস, বিচালি ও খৈল মিশিয়ে, দুপুরে ও রাতে সেদ্ধ খুদ (ভাঙা চাল), সঙ্গে ভুট্টার গুঁড়া ও চিটাগুড়। আসমত আলীর হিসাবে গরুপ্রতি দিনে খাবারের খরচ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। পশু অসুস্থ হলে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন বলে জানান; গবাদিপশুর রোগে খামারিদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সরকারি সহায়তার দাবি ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বক্তব্য
আসমত আলীর মতে, সরকার ক্ষুদ্র খামারিদের পাশে দাঁড়ালে তারাও উন্নতমানের ষাঁড় পালন করে দেশের মাংসের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারবেন। তার অভিযোগ, তার ষাঁড়গুলো পরিচিতি পেলেও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা কখনো তার খামারে আসেননি।
এ বিষয়ে মণিরামপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, উপজেলাটি বেশ বড় এবং দপ্তরে লোকবলের সংকট (৬ জন) রয়েছে, তাই সব খামার ও ব্যক্তিপর্যায়ের পালনকারীর কাছে পৌঁছানো কঠিন। তবু বিভিন্ন খামার ও গরু পালনকারীদের পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার ২৯ মে ২০২৫ জানায়, সে বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি, এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৫৬ লাখ ২ হাজার ৯০৫টি, এবং প্রায় ২০ লাখ ৬৮ হাজার ১৩৫টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা ছিল। একই প্রতিবেদনে গাবতলী হাটে ক্রেতা কম থাকার কথা বলা হয়; যারা কিনেছিলেন, তারা একই আকারের ষাঁড়ের জন্য আগের বছরের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি দিয়েছেন, আর ব্যবসায়ী ও খামারিরা এর কারণ হিসেবে পশুখাদ্যের দাম বাড়ার কথা বলেন।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)