দেশে উদ্ভাবিত বারি মাল্টা-১ জাতের চাষ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ায় বিদেশি মাল্টা আমদানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে বলে মনে করেন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার কৃষিবিদ মো. রাসেল সরকার। ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর আমাদেরসময়.কম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, এ জাতের মাল্টা চাষে দেশে নীরব বিপ্লব ঘটে চলেছে। তাঁর মতে, দেশি জাতের মাল্টার যথাযথ ব্র্যান্ডিং করা গেলে একদিকে ফলের উৎপাদন বাড়িয়ে মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানো যাবে, অন্যদিকে বিদেশি মাল্টার আমদানি কমিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
এই কৃষিবিদের ভাষ্য, সঠিক কর্মপরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সুষ্ঠু বিপণনব্যবস্থা, ব্যাপক প্রচার এবং সবার সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে বাংলাদেশ একদিন মাল্টা আমদানিকারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশের কাতারে উঠতে পারে। প্রতিবেদনে তিনি জাতটির উৎপত্তি, সরকারি প্রকল্প, দেশের উৎপাদন ও আমদানির হিসাব, দেশি মাল্টার প্রতি ক্রেতাদের অনীহার কারণ এবং চাষ বাড়ানোর কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। নিচে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সে সময় পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি তথ্য, গবেষকদের বক্তব্য ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন মিলিয়ে বিষয়টি তুলে ধরা হলো।
বারি মাল্টা-১: পাহাড় থেকে আসা একটি দেশি জাত
কৃষিবিদ রাসেল সরকারের তথ্যমতে, ২০০৪ সালে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে বারি মাল্টা-১ নামে দেশীয় মাল্টার একটি জাত উদ্ভাবন করা হয়। জাতটির শুরুর দিনগুলোর খবর পাওয়া যায় দ্য ডেইলি স্টারের পুরোনো প্রতিবেদনে। ২০০৭ সালের ২১ অক্টোবর পত্রিকাটি খাগড়াছড়ি থেকে জানায়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীদের চেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে মাল্টা চাষে নতুন আশা জেগেছে। তখন খাগড়াছড়িতে বারির প্রায় ৪০০টি মাল্টা গাছের একটি বাগান ছিল, আর পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা ও মহালছড়ি উপজেলায় ছিল আরও তিনটি প্রদর্শনী বাগান। স্থানীয়ভাবে এ ফলকে তখন "মিষ্টি কমলা" বলা হতো। বারির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, অন্তত ৫০০ কৃষক মাল্টা বাগান করতে তাঁদের সহায়তা চাইছেন।
২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টারের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, বারির বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত মাল্টা-১ জাতের কাজ খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে। সে বছর প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বাগানে প্রায় এক হাজার এবং তিনটি প্রদর্শনী বাগানে আরও প্রায় এক হাজার গাছ ছিল। বারির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ জানিয়েছিলেন, প্রতিটি গাছ থেকে ৪০০ থেকে ৫০০টি মাল্টা পাওয়া যাচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভালো ফলন দেখে খাগড়াছড়ির অন্তত দুই হাজার কৃষক বারি থেকে পাঁচ হাজারের বেশি মাল্টার চারা নিয়েছিলেন।
জাতটির উৎপত্তিস্থল নিয়ে সংবাদপত্রে ভিন্ন তথ্যও পাওয়া যায়। ২০০৯ সালের ৩ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টারের সিলেট প্রতিবেদনে বারির লেবুজাতীয় ফসল গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. খলিলুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, "বারি-১" জাতের মাল্টা সিলেটের জৈন্তাপুরে অবস্থিত ওই কেন্দ্রে বহু বছরের গবেষণার পর ২০০৫ সালে উদ্ভাবিত হয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কৃষকদের মধ্যে এর চারা বিতরণের অনুমোদন দিয়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, একেকটি ফলের ওজন ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম, পাকা ফলের রং উজ্জ্বল হলুদ, আর গড়ে একটি গাছে প্রায় ১০০টি ফল ধরে। সে বছর কেন্দ্রটি চাষিদের দুই হাজার চারা দিয়েছিল; এর আগের বছর প্রথমবারের মতো সিলেট ও মৌলভীবাজারের চাষিদের মধ্যে এক হাজার চারা বিতরণ করা হয়। গাজীপুর, খাগড়াছড়ি ও পঞ্চগড়েও তখন এ জাতের চারা পাঠানো হয়েছিল।
২০২১ সালের ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বরিশাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ততদিনে "বারি মাল্টা-১" ও "বারি মাল্টা-২" নামে দুটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। অর্থাৎ যে জাতটিকে ঘিরে আমদানি কমানোর আশা, সেটি প্রায় দুই দশকের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের প্রদর্শনীর ফল।
পাহাড়ি ঢাল, বেলে মাটি আর পানি না জমা জমি
মাল্টা চাষের শুরুটা কেন পাহাড়ে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বারির বিজ্ঞানীরা। ২০০৭ সালের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শওকত আলী মল্লিক বলেন, পাহাড়ের চূড়া, ঢাল ও উপত্যকা, যেখানে বৃষ্টির পানি দাঁড়ায় না, সেগুলো মাল্টা বাগানের জন্য খুবই উপযোগী। ২০০৯ সালে খাগড়াছড়িতে বারির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মহব্বত উল্লাহ জানান, এ অঞ্চলের পাহাড়চূড়া, উপত্যকা, ঢাল ও আবহাওয়া বিবেচনা করেই মাল্টা-১ জাতের কাজ শুরু হয়েছিল; খরা ও বর্ষা দুই মৌসুমেই মাল্টা চাষ সম্ভব, তবে গাছ বেশিদিন জলাবদ্ধতা সইতে পারে না।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে খাগড়াছড়ি জেলার আয়তন ২,৫০৫.৭৩ বর্গকিলোমিটার। জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রাম, পূর্বে রাঙ্গামাটি এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা ও ত্রিপুরা। প্রধান নদী মাইনী ও চেঙ্গী। জেলায় আটটি উপজেলা রয়েছে: খাগড়াছড়ি সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি, মাটিরাঙ্গা, মানিকছড়ি, রামগড় ও লক্ষ্মীছড়ি। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসবাস এ জেলায়। ২০০৯ সালে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তৎকালীন উপপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মালেক ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, খাগড়াছড়িতে তিন লাখ একরের বেশি অনাবাদি পাহাড়ি জমি রয়েছে এবং সরকার চাইলে এ জমি মাল্টা চাষে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিতে পারে।
সিলেট অঞ্চলের উপযোগিতা নিয়ে ২০০৯ সালে ড. খলিলুর রহমান ভূঁইয়া বলেছিলেন, সিলেটের রোদ ও মাটির বেলে প্রকৃতি মাল্টা ও কমলার মতো ফল চাষের অনুকূল, আর ঢালে বৃষ্টির পানি বেশিক্ষণ জমে না বলে সেখানে এ ফল চাষ সম্ভব। তিনি চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরির ওপর জোর দেন: দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে এক মিটারের একটি গর্তে চারা লাগানোর অন্তত ১৫ দিন আগে প্রায় ১৫ কেজি গোবর ও ২০০ গ্রাম টিএসপি সার দিতে হয়, আর চারা রোপণের উপযুক্ত সময় এপ্রিল থেকে আগস্ট। নিজের জমির জন্য সঠিক মাত্রা ও পরিচর্যার পরামর্শ পেতে চাষিরা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
২০০৭ সালের প্রতিবেদনে বারির কীটতত্ত্ব শাখার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা চন্দ্র কান্ত দাশ বলেছিলেন, মাল্টায় পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম বলে এর চাষ সহজ। তবে লিফ মাইনার, লেবুর প্রজাপতি, ফলের মাছি ও কালো দাগ রোগের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে; বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করলে এসব বড় ক্ষতি করতে পারে না বলে ২০০৯ সালে তিনি জানান।

পাহাড় ছাড়িয়ে বরেন্দ্র, দক্ষিণাঞ্চল আর মধ্যাঞ্চলে
রাসেল সরকারের ভাষ্য, পার্বত্য তিন জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এবং সিলেট অঞ্চল ছাড়াও এখন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা, বরেন্দ্রভূমি ও উত্তরাঞ্চলসহ প্রায় সারা দেশে মাল্টার চাষ হচ্ছে। তাঁর মতে, চারা রোপণের এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই গাছে ফুল ও ফল আসে এবং সঠিক পরিচর্যায় একটানা ২০ থেকে ২৫ বছর একেকটি গাছ থেকে পূর্ণমাত্রায় ফল সংগ্রহ করা যায়। দেশের প্রায় সব অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া বারি মাল্টা-১ চাষের অনুকূল বলে বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ছোট বড় নানা আকারের বাগান গড়ে উঠেছে, যেগুলো দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে খাগড়াছড়িতে বারির বিজ্ঞানীরা গাছে ফল আসতে তিন থেকে চার বছর লাগার কথা বলেছিলেন; অন্যদিকে ২০১৯ সালে রাজশাহীর এক চাষি জানিয়েছিলেন, তাঁর বাগানে রোপণের এক বছরের মধ্যেই ফল এসেছিল।
নরসিংদীর অভিজ্ঞতা জাতটির বিস্তারের একটি উদাহরণ। বাসসের বরাতে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২০ সালের ২৫ অক্টোবর জানায়, জেলার আবহাওয়া ও মাটি উপযোগী হওয়ায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ২০১১ সাল থেকে শিবপুর ও বেলাবো উপজেলার চাষিদের মাল্টা চাষে উৎসাহ ও প্রশিক্ষণ দেয়। ডিএইর নরসিংদীর উপপরিচালক শোভন কুমার ধর বলেন, পরীক্ষামূলক চাষে সফলতার পর এই দুই উপজেলার বহু চাষি, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণেরা, ডিএইর মাধ্যমে সিলেটের জৈন্তাপুর থেকে ১৫ হাজার চারা সংগ্রহ করে বসতবাড়ির বাগানে ও পতিত জমিতে বারি মাল্টার চাষ শুরু করেন। তাঁর হিসাবে, গত ১০ বছরে ওই দুই উপজেলায় ৬০ হেক্টর জমিতে মাল্টার চাষ হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় মাল্টা চাষের বিস্তারও তখন সংবাদপত্রে উঠে এসেছিল। ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জয়পুরহাট থেকে জানায়, রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়ায় বাণিজ্যিকভাবে মাল্টার চাষ শুরু হয়েছে। চাষিরা বলেছিলেন, কম পানি লাগে বলে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে এ ফসল উপযোগী। ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর ডেইলি অবজারভারের রাজশাহী প্রতিবেদনে গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান জানান, উপজেলায় বারি-১ জাতের মাল্টা প্রায় ৯৩ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে এবং এতে স্থানীয় চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে ডিএইর হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, বরেন্দ্র অঞ্চলে মাল্টা চাষ শুরু হয় ২০১৬ সালে। রাজশাহী জেলায় তখন ১৪৮ হেক্টর জমিতে মাল্টার চাষ হচ্ছিল, যার মধ্যে গোদাগাড়ীতেই ছিল ১০২ হেক্টর। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলায় মাল্টা উৎপাদন হয় ২২২ টন। সেখানে স্থানীয় মিষ্টি স্বাদের বারি মাল্টা-১ জাতের চাষ হচ্ছিল এবং অনেক চাষি পেয়ারা বাগান বদলে মাল্টা লাগাচ্ছিলেন, কারণ তাঁদের ভাষায় মাল্টা গাছ প্রায় ২০ বছর বাঁচে, উৎপাদন খরচ কম এবং বালাইনাশক কম লাগে। রাজশাহী ডিএইর উপপরিচালক শামসুল হক তখন বলেন, মাল্টা চাষে চাষিকে অত্যন্ত যত্নশীল হতে হয়।
দক্ষিণাঞ্চলের চিত্র এসেছে বাসসের ২০২১ সালের ৩১ আগস্টের প্রতিবেদনে। বরিশাল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত তিন হাজার হেক্টরে মাল্টার আবাদ হয়েছে এবং বরিশালের মাল্টা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত হচ্ছে। তবে ভালো জাত ও মানের কলম বা চারা সব জায়গায় সহজলভ্য ছিল না। বরিশালের বাজারে তখন দেশি মাল্টা কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, যা পাইকাররা চাষির কাছ থেকে কিনছিলেন ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. তাওফিকুল আলম জানান, সে বর্ষায় বিপুল সংখ্যক বারি-১ মাল্টার চারা সরবরাহ করা হয়েছে; তাঁর মতে আবাদের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ১০ বছরের মধ্যে এ ফল আমদানির প্রয়োজন হবে না।
লেবুজাতীয় ফসলের প্রকল্প ও উৎপাদনের হিসাব
রাসেল সরকার জানান, বিদেশি মাল্টা ও কমলার আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং দেশের মাটি ও জলবায়ু উপযোগী নতুন মাল্টার জাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারা দেশে লেবুজাতীয় ফসল (মাল্টা, কমলা, লেবু প্রভৃতি) চাষ সম্প্রসারণের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালে শেষ হতে যাওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৩০টি জেলার ১২৩টি উপজেলায় বিভিন্ন আয়তনের ৫৯ হাজার ১০০টি বাগান স্থাপন এবং প্রায় পাঁচ হাজার পুরোনো মাল্টা বাগানের ব্যবস্থাপনা করার কথা। প্রকল্প শেষে দেশে মাল্টা ও কমলার উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে, অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার টন মাল্টা ও কমলা উৎপাদিত হবে এবং এতে ৪০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া ডিএইর বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রকল্পের মাধ্যমেও লেবুজাতীয় ফলের চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে এই কৃষিবিদ বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে কমলার উৎপাদন হয়েছে ৪০,৩১৭ টন এবং মাল্টার উৎপাদন ২৮,০৪১ টন। তাঁর হিসাবে দেশে কমলার বার্ষিক উৎপাদন বাড়ার হার ৫ শতাংশ, আর মাল্টার ক্ষেত্রে তা ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি।
দেশি ফলের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানোর চিন্তা নতুন নয়। ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিল প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারির সময়টাতেও ফলের আবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ডিএইর "সারা বছরব্যাপী ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন" প্রকল্পের পরামর্শক এস এম কামরুজ্জামান তখন প্রথম আলোকে বলেন, দেশে যেভাবে বারোমাসি আম, মাল্টা, কমলা ও ড্রাগনসহ বিদেশি ফলের চাষ শুরু হচ্ছে, তাতে তিন থেকে চার বছরের ব্যবধানে আপেল, কমলা, নাশপাতি ও মাল্টার মতো বিদেশি ফলের আমদানিও কমবে বলে তিনি মনে করেন। একই প্রতিবেদনে ডিএইর হিসাব দিয়ে বলা হয়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে পেয়ারার উৎপাদন ছিল ৩ লাখ টন, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৬ হাজার টনে, এবং দেশে উৎপাদিত পেয়ারার ৭০ শতাংশই থাই জাতের। দেশি থাই পেয়ারা তখন বিদেশি আপেলের বাজারে ভাগ বসাচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আমদানির চিত্র: কোন ফল, কত টাকা
রাসেল সরকারের হিসাবে, দেশি জাতের ফল দিয়ে দেশের মোট ফলের চাহিদার মাত্র ৩৫ শতাংশ পূরণ হয়, বাকি ৬৫ শতাংশ বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ছয় ধরনের বিদেশি ফল: আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, বেদানা ও নাশপাতি। কিছু বিদেশি ফলের উৎপাদন দেশে শুরু হলেও এসব ফলের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা এখনো ৯০ শতাংশের বেশি বলে তিনি জানান, আর আমদানি করা ফলের ৮৫ শতাংশই আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙুর। পণ্যবাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনডেক্সমুন্ডির তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, মাল্টা আমদানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি জানান, ২০১২-১৩ অর্থবছরে আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙুর আমদানিতে শুল্ককরসহ ব্যয় হয়েছিল ৯৪৬ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১,৮০২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কাস্টমসের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ সালে শুধু মাল্টা ও কমলা আমদানি হয় ১,১৭,১৭০ মেট্রিক টন, যাতে প্রায় ১,০৮৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়। তাঁর ভাষ্য, উল্লিখিত ছয় ধরনের ফল আসে ৪৬টি দেশ থেকে; এর সিংহভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে ঢোকে, আর অল্প কিছু স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটান থেকে আসে। চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাব উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে বিভিন্ন জাতের মোট ৪.৫৮ লাখ টন বিদেশি ফল আমদানি হয়েছে, শুল্ককরসহ যার বাজারমূল্য প্রায় ৩,৪২২ কোটি টাকা।
প্রথম আলোর ২০১৯ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনেও আমদানির একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম কাস্টমসের হিসাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আপেল, নাশপাতি, কমলা, মাল্টা ও আঙুর, এই পাঁচটি প্রধান ফল আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৮২ হাজার টন; ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫২ হাজার টনে, আর তাতে আট মাসেই ৯৯ কোটি টাকার সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ২ হাজার ৪৭ কোটি টাকা, আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৯ কোটি ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। শুধু আপেলই ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানি হয় ২ লাখ ৫৭ হাজার টন, যাতে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকার সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম তখন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, দেশে ফলের উৎপাদন ও বৈচিত্র্য বাড়ছে এবং চাহিদা অনুযায়ী দেশি ফলের উৎপাদন হলে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে ফল আমদানি করতে হবে না।

মধুমাসের পর ফলের ঘাটতি
রাসেল সরকার বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল, অর্থাৎ মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কে মধুমাস ধরা হয়, আর এ সময়ই নানা দেশি ফলের প্রাচুর্য থাকে। বছরের অন্য সময়ে এত দেশি ফল পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত কুল ও পেয়ারা ছাড়া অন্য দেশি ফল বাজারে তেমন থাকে না, তাই এ সময় ফলের চাহিদা মেটাতে বিদেশি ফলই প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে।
প্রথম আলোর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনেও কৃষিবিদেরা একই কারণ দেখিয়েছিলেন: দেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষা ফল উৎপাদনের ভরা মৌসুম, আর সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ মাসে ফলের উৎপাদন বা সরবরাহ কম থাকায় মানুষকে বাধ্য হয়ে বিদেশি ফল কিনতে হতো। এই প্রেক্ষাপটে মাল্টার গুরুত্ব আলাদা। দ্য ডেইলি স্টারের ২০০৭ ও ২০০৯ সালের প্রতিবেদন দুটি অক্টোবরে প্রকাশিত হয়, যখন খাগড়াছড়িতে বারির বাগানে মাল্টা তোলা চলছিল; ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বরেন্দ্র অঞ্চলের বাজারে নতুন তোলা মাল্টা আসার খবর দেয় দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, আর ২০২১ সালের আগস্টের শেষে বরিশালে বাণিজ্যিকভাবে দেশি মাল্টার বিপণন শুরুর কথা জানায় বাসস। অর্থাৎ দেশি মাল্টা বাজারে আসে ঠিক সেই সময়ে, যখন দেশি ফলের সরবরাহ কমে যায়।
দেশি মাল্টায় ক্রেতার অনীহা কেন
রাসেল সরকার বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সারা দেশে বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও দেশি জাতের মাল্টার প্রতি বেশির ভাগ ভোক্তার অনীহা দেখা যায়। তিনি এর প্রধান কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেন:
- চেহারা: "আগে দর্শনধারী, তারপর গুণবিচারী", এই প্রবাদ দেশি মাল্টার ক্ষেত্রে প্রায় পুরোপুরি খাটে। দেশি জাতের মাল্টা পরিপক্ব অবস্থাতেও সাধারণত হলুদাভ সবুজ থাকে।
- ধারণা: সাধারণভাবে মনে করা হয়, বিদেশি ফলে পুষ্টিমান বেশি থাকে। ফলে বিদেশি ফলের প্রতি অতিরিক্ত দুর্বলতা এবং দেশি ফল সম্পর্কে অজ্ঞতাজনিত অনীহা কাজ করে।
- অপরিপক্ব অবস্থায় সংগ্রহ: মাল্টা নন-ক্লাইমেকটেরিক ফল, তাই গাছ থেকে তোলার পর আর পাকে না। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ও চাষি বেশি দাম পেতে পরিপক্ব হওয়ার আগেই ফল তুলে বাজারে আনেন; এতে পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যায় না এবং ভোক্তার মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
- তথ্যের ঘাটতি: দেশি মাল্টার পুষ্টিগুণ ও স্বাদ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় ভোক্তারা এ ফল এড়িয়ে চলেন।
ফল পাকার এই দুই ধরন নিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানে প্রচলিত শ্রেণিবিভাগটি জার্নাল অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ২০১২ সালে প্রকাশিত বিজয় পল ও সহগবেষকদের পর্যালোচনায় বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। বিশ্বকোষীয় সূত্রের সারসংক্ষেপে, আপেল, নাশপাতি ও কলার মতো ক্লাইমেকটেরিক ফল গাছ থেকে তোলার পরও পাকতে পারে; আর লেবুজাতীয় ফল, আঙুর ও স্ট্রবেরির মতো নন-ক্লাইমেকটেরিক ফল তোলার পর আর পাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি সেন্টারের নির্দেশনা উদ্ধৃত করে বিশ্বকোষীয় সূত্রগুলো জানায়, কমলা তোলার পর ইথিলিন গ্যাস দিয়ে খোসার সবুজ রং বদলানো যায়, যাকে "ডিগ্রিনিং" বলা হয়, কিন্তু এতে ভেতরের শাঁস আর পাকে না। পাকা কমলার খোসাতেও অনেক সময় সবুজ বা হলুদাভ সবুজ রং থেকে যায়। ফলে খোসার রং দিয়ে মাল্টার পরিপক্বতা বা স্বাদ বিচার করা যায় না; গাছে পুরো পাকার পর তোলাটাই মূল কথা।
২০০৯ সালে সিলেটের লেবুজাতীয় ফসল গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. খলিলুর রহমান ভূঁইয়া কেন্দ্রের মাল্টা খুব মিষ্টি এবং এর উজ্জ্বল হলুদ রং ও আকার আকর্ষণীয় বলে বর্ণনা করেছিলেন। ২০২০ সালে রাজশাহীতে বারি মাল্টা-১ জাতকে স্থানীয় মিষ্টি স্বাদের জাত হিসেবে উল্লেখ করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, আর সেখানে স্থানীয় সবুজ মাল্টা খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
মাল্টা কী ধরনের ফল, পুষ্টিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী কমলা রুটেসি পরিবারের সাইট্রাস গণের ফল, যার উৎপত্তি সম্ভবত চীনে, যেখানে প্রায় চার হাজার বছর আগে এর চাষ শুরু হয়। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাধারণ বা মিষ্টি কমলা (Citrus sinensis), ম্যান্ডারিন কমলা (Citrus reticulata) এবং টক কমলা (Citrus aurantium)। দেশে মাল্টা বলতে মূলত মিষ্টি কমলাকেই বোঝানো হয়; ২০০৯ সালের ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনেও মাল্টাকে "সুইট অরেঞ্জ" বলা হয়েছে। বিশ্বকোষীয় সূত্রমতে, মিষ্টি কমলা আসলে বাতাবিলেবু ও ম্যান্ডারিনের সংকর থেকে উদ্ভূত, এর উৎপত্তি দক্ষিণ চীন, উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার নিয়ে গঠিত অঞ্চলে, এবং এটি ১৫.৫ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভালো জন্মায়।
বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রংপুর ও পঞ্চগড়ের কিছু এলাকায় কমলার চাষ হয়। গাছের বংশবিস্তার হয় কলম বা চোখকলমের মাধ্যমে। প্রতি ১০০ গ্রাম কমলায় ০.৯৩ গ্রাম আমিষ, ০.৩ গ্রাম চর্বি ও ১১.০২ গ্রাম শর্করা থাকে, আর তাজা ফল ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। কমলা থেকে জ্যাম, জেলি, জুস ও স্কোয়াশ তৈরি হয়। বারি "বারি কমলালেবু-১" নামে কমলার একটি জাতও অবমুক্ত করেছে, যার একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে ৩০০ থেকে ৪০০টি ফল ধরতে পারে।
রাসেল সরকার বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মাল্টা অত্যন্ত সুস্বাদু, রসালো ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফল, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলগুলোর মধ্যে মাল্টা অন্যতম এবং শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের কাছে এটি সমান জনপ্রিয়। তাঁর মতে, ফল যত তাজা খাওয়া যায় ততই ভালো, কারণ এতে পুষ্টিমান অটুট থাকে; অন্যদিকে আমদানি করা ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকায় এর স্বাদ ও পুষ্টিমান ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাস জানায়, শরীরের সব অংশের টিস্যু গঠন ও মেরামতে ভিটামিন সি দরকার; এটি কোলাজেন নামের প্রোটিন তৈরি, ক্ষত সারানো এবং খাবার থেকে আয়রন শোষণে সাহায্য করে। শরীর নিজে ভিটামিন সি তৈরি বা জমা করতে পারে না, তাই প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখা জরুরি। কমলা ও জাম্বুরার মতো লেবুজাতীয় ফল ও এর রস ভিটামিন সির ভালো উৎস। মেডলাইনপ্লাসের তথ্যমতে, কাঁচা ফল ও সবজি ভিটামিন সির সবচেয়ে ভালো উৎস, আর রান্না বা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে খাবারে ভিটামিন সির পরিমাণ কমে যেতে পারে। কারও খাদ্যতালিকা বা স্বাস্থ্যগত বিশেষ প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দেশি মাল্টার বাজার তৈরিতে নয় দফা সুপারিশ
রাসেল সরকারের মতে, বিদেশি মাল্টার আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশি জাতের মাল্টার বাজার সৃষ্টির বিকল্প নেই। এ জন্য দেশি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সচেতনতা বাড়িয়ে ভোক্তার কাছে এ ফলকে আরও জনপ্রিয় করতে হবে। ভোক্তা, নতুন মাল্টাচাষি ও কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে তিনি নিচের সুপারিশগুলো তুলে ধরেন:
- গবেষণার মাধ্যমে ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণের নতুন প্রযুক্তি এবং উজ্জ্বল কমলা রঙের উচ্চফলনশীল আগাম ও নাবি জাত উদ্ভাবন করা।
- সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার ও বেসরকারি নার্সারিতে বেশি চারা উৎপাদন করে চারার সহজলভ্যতা বাড়ানো।
- বসতবাড়িতে আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা ও লিচুসহ অন্যান্য ফলের সঙ্গে মাল্টার চারা রোপণে মানুষকে সচেতন করা।
- বিদেশি মাল্টা আমদানিতে শুল্কহার বাড়িয়ে দেশি জাতের মাল্টা বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো।
- জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের ফল, সবজি ও কৃষিপ্রযুক্তি মেলা, প্রদর্শনী ও মাঠ দিবসে দেশি মাল্টা ও এর পুষ্টিগুণ নিয়ে আলোচনা ও লিফলেট বিতরণ করা।
- ছাপা ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমসহ সব মাধ্যমে দেশি মাল্টার পরিচিতি, পুষ্টিগুণ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন ও ভিডিওচিত্র প্রকাশ করা।
- বিভিন্ন উপজেলায় ডিএইর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং কৃষকের নিজস্ব উদ্যোগে গত কয়েক বছরে গড়ে ওঠা মাল্টা বাগানের উদ্যোক্তাদের সফলতার গল্প তুলে ধরা।
- জেলা, অঞ্চল ও জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ফলচাষিকে পুরস্কৃত করা।
- সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো এবং ফল উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের রপ্তানিযোগ্য মানসম্মত উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
চারার সহজলভ্যতার প্রশ্নটি মাঠপর্যায়েও উঠে এসেছিল। ২০২১ সালের আগস্টে বাসসের প্রতিবেদনে বরিশালের এক চাষি জানান, ডিএইর রহমতপুর হর্টিকালচার নার্সারি ভালো জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রি করলেও প্রচারের অভাবে বেশির ভাগ কৃষক তা জানেন না; সে বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই ওই নার্সারির মাল্টার চারা বিক্রি শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর ২০১৯ সালের ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে ডিএইর উপপরিচালক সুধীন্দ্রনাথ রায় বলেছিলেন, উত্তরাঞ্চলে মাল্টা চাষ বাড়ছে এবং আগ্রহী চাষিদের ফলন বাড়াতে অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।
ছবি: A S M Jobaer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: আমাদেরসময়.কম (২৪ অক্টোবর ২০২১), দ্য ডেইলি স্টার (২১ অক্টোবর ২০০৭; ২৬ অক্টোবর ২০০৯; ৩ নভেম্বর ২০০৯), প্রথম আলো (২০ এপ্রিল ২০১৯), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯; ২৫ অক্টোবর ২০২০, বাসসের বরাতে), ডেইলি অবজারভার (১০ নভেম্বর ২০১৯), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (৫ সেপ্টেম্বর ২০২০), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (৩১ আগস্ট ২০২১), বাংলাপিডিয়া (কমলা; খাগড়াছড়ি জেলা), জার্নাল অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (পল ও অন্যান্য, ২০১২), মেডলাইনপ্লাস (ভিটামিন সি)





মন্তব্য
(০)