বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) সফেদার নতুন জাত ‘বিনা সফেদা-১’ অবমুক্ত করেছে বলে ২০২৬ সালের ২৮ জুন জাগো নিউজের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) প্রতিবেদক জানান। বিনা লেবুর পর এটি প্রতিষ্ঠানটির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের নতুন উদ্ভাবন। গবেষকদের ভাষ্য, দেশে ফলের জাতের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক বিকল্প তৈরির লক্ষ্যেই জাতটি অবমুক্ত করা হয়েছে। জাতটির ফল দেশি সফেদার চেয়ে অনেক বড়, একেকটির ওজন ২৫০ থেকে ৪৫০ গ্রাম।
গামা রশ্মি থেকে নতুন জাত
বিনা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে এর প্রধান কার্যালয় ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে; নতুন জাত উদ্ভাবনসহ কৃষি গবেষণায় পারমাণবিক কৌশল প্রয়োগ এর মূল কাজ, আর এজন্য প্রতিষ্ঠানটির একটি গামা রশ্মির উৎস রয়েছে। বিকিরণ বা রাসায়নিক দিয়ে গাছের কোষে পরিব্যক্তি (মিউটেশন) ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের গাছ বেছে নেওয়ার এই পদ্ধতিকে বলে মিউটেশন প্রজনন; বড় আকারের বা বেশি মিষ্টি ফলের মতো বৈশিষ্ট্য পেতে পদ্ধতিটি বহুল ব্যবহৃত।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বিনা সূত্রের বরাতে বলা হয়, ২০১৯ সালে বারি সফেদা-২ জাতের সায়নে (কলমের ডাল) গামা রশ্মি প্রয়োগ করে তা ক্ষিরনীর চারার ওপর জোড় কলম করা হয়। সফল কলমগুলো থেকে নিবিড় গবেষণায় MZD60P1 নামের একটি মিউট্যান্ট শনাক্ত হয়। প্রজনন প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফলন পরীক্ষায় সন্তোষজনক হওয়ায় এটিকে জাত হিসেবে বাছাই করা হয়, আর ২০২৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড ‘বিনা সফেদা-১’ নামে কৃষক পর্যায়ে চাষের জন্য জাতটি নিবন্ধন করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বিনার বরাতে গবেষণাটি শুরুর সময় ২০১৬ সাল বলা হয়েছিল; সেখানে সায়নে গামা রশ্মির পাশাপাশি ইএমএস নামের রাসায়নিক প্রয়োগ এবং দুটি মিউট্যান্ট শনাক্ত হওয়ার কথাও ছিল।
ক্ষিরনী (Manilkara hexandra) সফেদার একই গোত্রের একটি গাছ, যা বাংলাদেশ ও ভারতসহ এ অঞ্চলে জন্মায় এবং সফেদার কলমে আদিজোড় (রুটস্টক) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


বড় ফল, বেশি ফলন
জাতটির উদ্ভাবন ও বিকাশে দায়িত্বে থাকা বিনার উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শামছুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, সফেদা বাংলাদেশে স্বল্প পরিচিত কিন্তু খুবই সুস্বাদু ফল, অল্প যত্নেই এর চাষ সম্ভব। তাঁর ভাষ্য, ফলটিতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট, প্রাকৃতিক চিনি, ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। সফেদার আদি নিবাস দক্ষিণ মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা; এখন বাংলাদেশসহ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়ার নানা দেশে ফলটির চাষ হয়।
বিনা ও এর বিজ্ঞানীর দেওয়া তথ্যে জাতটির প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- প্রতিটি ফলের ওজন ২৫০ থেকে ৪৫০ গ্রাম; বাংলা ট্রিবিউনকে ড. শামছুল আলম জানিয়েছিলেন, বাজারের প্রচলিত সফেদার ওজন সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম।
- প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে ভিটামিন সি ১৫ দশমিক ৫৮ মিলিগ্রাম।
- বীজ খুব ছোট, গড় ওজন চার গ্রাম; ফলের খাওয়ার উপযোগী অংশ ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ।
- উপযুক্ত পরিচর্যায় ফলন হেক্টরে ২৫ থেকে ৪০ টন।
- দেড় বছরের একটি গাছে দুই থেকে পাঁচ কেজি ফল; ফলের প্রধান মৌসুম জানুয়ারি থেকে মার্চ।
চাষের মাটি, আবহাওয়া ও চারা
ড. শামছুল আলমের মতে, সফেদার পরিবেশগত উপযোগিতা ব্যাপক; ফুল আসার সময় আর্দ্র আবহাওয়া বেশি উপযোগী, আর বারোমাসি জাত হওয়ায় বছরজুড়েই এটি আবাদ করা যায়। সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত, মাঝারি অম্ল-ক্ষারত্বের উর্বর দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো; বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বেলে দো-আঁশ মাটির কথাও বলেছিলেন। পাহাড়ি ও সমতল দুই এলাকাতেই বাণিজ্যিকভাবে চাষ সম্ভব। গাছ জলাবদ্ধতা কম সহ্য করে, তবে খরা মৌসুমে দুই-তিনবার সেচ দিয়ে চাষ করা যায়।
চারা তৈরিতে এখন অঙ্গজ বংশবিস্তার, অর্থাৎ কলম পদ্ধতিই বেশি প্রচলিত; এভাবে তৈরি চারায় ১৮ মাসের মধ্যে ফল আসে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরে কলমের চারা লাগালে পরের বছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরে ফুল আসে এবং জানুয়ারি থেকে এপ্রিলে ফল তোলা যায়।

রোগবালাই ও পোকামাকড়
বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, অন্যান্য জাতের তুলনায় বিনা সফেদা-১-এ রোগের আক্রমণ অনেক কম। তবে গাছে আগামরা ও শুটি মোল্ড রোগ হতে পারে; সেক্ষেত্রে বছরে দুইবার কপারযুক্ত ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেন ড. শামছুল আলম। ওষুধের মাত্রা প্রতিবেদনে নেই, তাই প্রয়োগের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত। গাছে মাজরা পোকা, পাতা ছিদ্রকারী পোকা ও জাবপোকার আক্রমণও দেখা যায়; তখন ডিম ও কীড়াযুক্ত পাতা সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
বিনার উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. মোহাম্মদ নুরুন-নবী মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ২০১১ সালে বিভাগটির যাত্রা শুরুর পর অল্প সময়েই তাঁরা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছেন, যার মধ্যে বিনা লেবু-১ ও বিনা লেবু-২ কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দেশি ও বিদেশি দুই ধরনের জাত নিয়েই তাঁরা কাজ করছেন, এবং বিনা লেবুর মতো বিনা সফেদাও সাড়া ফেলবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
ছবি: Sm faysal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া (সফেদা, ক্ষিরনী ও মিউটেশন প্রজনন)





মন্তব্য
(০)