নেদারল্যান্ডসের ওয়াখেনিঙেন ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড রিসার্চের (ডব্লিউইউআর) গবেষকেরা মঙ্গল ও চাঁদের মাটির আদলে তৈরি কৃত্রিম মাটিতে টমেটো, মটরশুঁটি, মুলাসহ নয়টি ফসল ফলাতে পেরেছেন। জ্যেষ্ঠ পরিবেশবিজ্ঞানী ভিগার ভামেলিংকের নেতৃত্বে করা এই পরীক্ষার ফল ২০১৯ সালের ২ অক্টোবর ওপেন অ্যাগ্রিকালচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় ব্যবহৃত মাটি মঙ্গল বা চাঁদ থেকে আনা নয়; এটি মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার তৈরি ‘সিমুলান্ট’, অর্থাৎ ওই দুই জায়গার মাটির মতো করে পৃথিবীতে বানানো মাটি।
মঙ্গলে চাষের গবেষণা কেন
২০১৪ সালের গবেষণাপত্রে ভামেলিংক ও তাঁর সহকর্মীরা লেখেন, মানুষ চাঁদ বা মঙ্গলে বসতি গড়লে সেখানে তাদের খেতে হবে। খাবার পৃথিবী থেকে উড়িয়ে নেওয়া যায়, তবে বিকল্প হলো সেখানেই, সম্ভব হলে স্থানীয় মাটিতে, ফসল ফলানো। মঙ্গলে খাবার ফলানো গেলে পৃথিবী থেকে কম খাবার বয়ে নিতে হবে; ২০০৮ সালে নাসার ফিনিক্স অভিযানের সময়ও এই প্রশ্ন আলোচনায় আসে।
ওই দলের প্রথম পরীক্ষার ফল ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট পিএলওএস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, বাড়তি কোনো পুষ্টি উপাদান ছাড়াই মঙ্গল ও চাঁদের কৃত্রিম মাটিতে গাছ অঙ্কুরিত হয়ে ৫০ দিন ধরে বেড়ে ওঠে। মঙ্গলের কৃত্রিম মাটিতে বৃদ্ধি ও ফুল আসা চাঁদের মাটির চেয়ে অনেক ভালো এবং তুলনার জন্য রাখা কম পুষ্টির নদীর মাটির চেয়েও কিছুটা ভালো ছিল। ফসলের মধ্যে টমেটো, গম ও ক্রেস বিশেষ ভালো করে।

দ্বিতীয় পরীক্ষায় নয় ফসলের ফলন
দ্বিতীয় পরীক্ষাটি চলে ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, কাচের ঘরে, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলোয় এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। এবার ছোট টবের বদলে ট্রে ব্যবহার করা হয় এবং মাটিতে জৈব উপাদান হিসেবে সদ্য কাটা ঘাস মেশানো হয়। নাসার দেওয়া মঙ্গলের কৃত্রিম মাটি এসেছে হাওয়াইয়ের একটি আগ্নেয়গিরি থেকে, চাঁদেরটি অ্যারিজোনার মরুভূমি থেকে।
গবেষকেরা দশটি ফসল বোনেন: গার্ডেন ক্রেস, রকেট, টমেটো, মুলা, রাই, কিনোয়া, পালংশাক, চাইভস, মটরশুঁটি ও লিক। পালংশাক ছাড়া বাকি নয়টি ভালোভাবে বেড়ে ওঠে এবং সেগুলোর খাওয়ার উপযোগী অংশ সংগ্রহ করা যায়। ২০১৬ সালের মার্চে ভামেলিংক জানান, মঙ্গলের কৃত্রিম মাটিতে মাটির ওপরের মোট জৈববস্তুর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ হিসেবে ব্যবহৃত পটিং কম্পোস্টের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা ছিল না।
২০১৯ সালের গবেষণাপত্রে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি জৈববস্তু হয়েছে পৃথিবীর মাটি ও মঙ্গলের কৃত্রিম মাটিতে, চাঁদের কৃত্রিম মাটিতে তা স্পষ্টভাবে আলাদা। মুলা, রাই ও ক্রেসের বীজ আবার বুনে দেখা হয় সেগুলো অঙ্কুরিত হয় কি না; চাঁদের কৃত্রিম মাটিতে ফলানো মুলার বীজের অঙ্কুরোদগম পৃথিবীর মাটির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।

ফসল কি খাওয়া নিরাপদ
কৃত্রিম মাটিতে সিসা, আর্সেনিক ও পারদের মতো ভারী ধাতু এবং লোহা আছে, যা ফসলের খাওয়ার অংশে জমতে পারে। তাই ২০১৬ সালের জুনে গবেষকেরা মুলা, মটরশুঁটি, রাই ও টমেটো পরীক্ষা করে জানান, এগুলোতে ক্যাডমিয়াম, তামা ও সিসার মতো ভারী ধাতু বিপজ্জনক মাত্রায় পাওয়া যায়নি। ভামেলিংক তখন বলেন, ‘আমরা সত্যিই মুলা, মটর, রাই আর টমেটো খেতে পারি; এগুলোর স্বাদ কেমন হবে, তা জানতে আমি খুব আগ্রহী।’ আলুসহ আরও ফসল পরীক্ষার পরিকল্পনা ছিল, যার খরচ জোগানো হচ্ছিল গণ-অর্থায়নে।
মঙ্গলের প্রতিকূল পরিবেশ
নাসার তথ্যে মঙ্গলের মহাকর্ষ পৃথিবীর ০.৩৭৫ গুণ, গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৮১ ডিগ্রি ফারেনহাইট, আর বায়ুমণ্ডলের বেশির ভাগই কার্বন ডাই-অক্সাইড। ডব্লিউইউআরের পরীক্ষা হয়েছে পৃথিবীর মহাকর্ষে; গবেষকেরা ধরে নিয়েছেন, মঙ্গলে চাষ হবে পৃথিবীর মতো আলো ও বায়ুমণ্ডলের বদ্ধ পরিবেশে। মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে ফসল বাঁচাতে সেখানে মাটির নিচে চাষের কথাও তাঁরা বলেছেন।
আসল মঙ্গলের মাটির আরেকটি সমস্যা পারক্লোরেট নামের রাসায়নিক লবণ। ২০০৮ সালে নাসার ফিনিক্স ল্যান্ডার মঙ্গলের উত্তর মেরু অঞ্চলের বরফমিশ্রিত মাটিতে এই বিষাক্ত রাসায়নিক পায়। পরে নাসার আরও কয়েকটি অভিযানে বিভিন্ন জায়গায় এর খোঁজ মেলে। ২০১৭ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, মঙ্গলের পাতলা বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আসা অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে পারক্লোরেট জীবাণুনাশী হয়ে ওঠে।

প্রাচীন সমুদ্রের চিহ্ন
মঙ্গলে পানির ইতিহাস নিয়েও গবেষণা চলছে। ২০১৬ সালের মে মাসে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্সিস রদ্রিগেজ ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবের্তো ফেয়ারেনসহ বিজ্ঞানীরা জানান, প্রায় ৩৪০ কোটি বছর আগে দুটি বড় উল্কার আঘাতে মঙ্গলের উত্তরের সমভূমির সমুদ্রে বিশাল সুনামি হয়েছিল। প্রথম ঢেউ ছিল তরল পানির; দ্বিতীয় ঢেউয়ের পানি স্থলে উঠে বরফ হয়ে জমে যায়, অর্থাৎ ততদিনে সমুদ্র আংশিক জমে গিয়েছিল। ফেয়ারেনের মতে, এমন ঠান্ডা ও লবণাক্ত পানি চরম পরিবেশে জীবনের আশ্রয় হতে পারত।
ছবি: Goldi.negi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, ওয়াখেনিঙেন ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড রিসার্চ, ওপেন অ্যাগ্রিকালচার, পিএলওএস ওয়ান, সায়েন্সডেইলি, ফিজ.অর্গ, নাসা, সায়েন্টিফিক আমেরিকান, ভায়া স্যাটেলাইট, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়




মন্তব্য
(০)