২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২৫ জুন বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষিপণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা বিবিসি বাংলাকে বলেন, এর মধ্য দিয়ে কাঁঠাল রপ্তানির প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সফরে কী সই হয়
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল চীনে রপ্তানি সহজ করতে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছে। বার্তা সংস্থা ইউএনবি ও ঢাকা ট্রিবিউন ২৫ জুন ১৩টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের খবর দেয়; বিবিসি বাংলা মাহদী আমিনের বরাতে জানায়, সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব দলিলে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যম সহযোগিতা রয়েছে; চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
চীনের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে চীন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানি শুরু করে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, তাঁরা কাঁঠাল ও পেয়ারার জন্য চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার দেওয়ার কাজ করছেন।

বিশ্ববাজারে কাঁঠাল ও বাংলাদেশের অবস্থান
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী কাঁঠাল রপ্তানি ২০১২ সালে ছিল ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের, ২০২৩ সাল নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭০ কোটি ডলারে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর মিলে বিশ্ব রপ্তানির ৬০ শতাংশের সঙ্গে জড়িত; শুধু ভিয়েতনামের দখলে ২৫ শতাংশ। চীন কাঁঠালের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক, তার চাহিদার বড় অংশ আসে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনের বরাতে বিবিসি বাংলা জানায়, বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০.৩ শতাংশ। বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ যায় যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সে, যার সিংহভাগ (৭৬ শতাংশ) যুক্তরাজ্যে।
কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, গাছে ফুল আসে ডিসেম্বর থেকে মার্চে আর ফল পাকে মে থেকে আগস্টে; কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবেও রান্না হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর আট থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম এবং রপ্তানির সুযোগ না থাকায় এর ৪৫ শতাংশের বেশি নষ্ট হয়।
ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম প্রথম, কলা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কাঁঠাল।" তিনি জানান, বারি এখন পর্যন্ত কাঁঠালের ছয়টি জাত উদ্ভাবন করেছে। বারির গবেষকেরা কাঁঠাল থেকে ভেজিটেবল মিট, চিপস, আচার, জেলি, আইসক্রিম ও কেক তৈরি করেছেন; কয়েক বছর আগে উদ্ভাবিত 'কাঁঠালসত্ত্ব' নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।

রপ্তানির পথে যেসব বাধা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, "আমাদের টোটাল কৃষি খাতের রপ্তানি এখনো তেমন ভালো নয়। আমরা যতটুকু রপ্তানি করি তার বেশিভাগই এথনিক মার্কেটে।" এথনিক মার্কেট বলতে নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী বা সংস্কৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাজার বোঝায়। তাঁর মতে, মান ধরে রাখতে না পারায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ এখনো তেমন ঢুকতে পারেনি; তিনি মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেন।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্ট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, "কাঁঠাল দিয়ে তৈরি পণ্য কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, কিন্তু চীন কীভাবে নেবে সেটি হলো প্রশ্ন। কারণ কাঁঠাল সংরক্ষণ করা এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি আছে।" তাঁর মতে, চীন বিনিয়োগ বা প্রক্রিয়াজাতকরণে কারিগরি সহায়তা দিলে কাজটি সহজ হবে। তিনি জানান, দেশে কারখানা করে কাঁঠালের চিপস ও অন্যান্য খাদ্য তৈরির একটি উদ্যোগ তাঁদের সংগঠন নিয়েছিল, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

ড. আমিরুল ইসলাম স্থানীয় চাহিদার কথাও মনে করিয়ে দেন: "আমরা যখন সুযোগ পাই, তিনগুণ দাম পাই- তখন সবই দেশের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করি। দেশিয় চাহিদা এবং নিউট্রিশনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।" তবু কৃষিপণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা চীনের সঙ্গে এই সমঝোতাকে কেবল কাঁঠাল নয়, দেশের অন্যান্য কৃষিপণ্যের নতুন বাজার তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখেন।
ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, ইউএনবি, ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)