শীতে খেজুর খাওয়া নিয়ে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি জাগো নিউজের লাইফস্টাইল বিভাগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পুষ্টিবিদদের বরাত দিয়ে সেখানে বলা হয়, শীতের সকালে খালি পেটে বা দুধের সঙ্গে খেজুর খেলে সারাদিনের শক্তি মেলে, হজম ভালো থাকে, আর দিনে ৩ থেকে ৫টি খেজুরই যথেষ্ট। প্রতিবেদনের তথ্যসূত্র ছিল স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইন। খেজুরের পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো কী বলে, আর কোন দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তা এখানে তুলে ধরা হলো।
খেজুরে কী থাকে
খেজুর হলো খেজুর গাছের (Phoenix dactylifera) ফল। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০০৮ সালে ক্রিটিক্যাল রিভিউজ ইন ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত পর্যালোচনায় ৮০টির বেশি গবেষণার তথ্য একত্র করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, খেজুরের শাঁসে চর্বি ও আমিষ কম, কিন্তু শর্করা বেশি, মূলত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ। গড়ে ১০০ গ্রাম খেজুর থেকে প্রায় ৩১৪ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়।
একই পর্যালোচনা অনুযায়ী, খেজুরে ১০টি খনিজের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে প্রধান সেলেনিয়াম, তামা, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম; ১০০ গ্রাম খেজুর এসব খনিজের দৈনিক প্রস্তাবিত চাহিদার ১৫ শতাংশের বেশি জোগাতে পারে। ভিটামিনের মধ্যে প্রধান বি-কমপ্লেক্স ও সি। প্রতি ১০০ গ্রামে আঁশ ৮.০ গ্রাম, যার বড় অংশ অদ্রবণীয় আঁশ। খেজুরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে মূলত ক্যারোটিনয়েড ও ফেনোলিক যৌগ থাকে।

আঁশ, হজম ও শক্তি
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, আঁশে ভরপুর খেজুর হজমে সাহায্য করে এবং নিয়মিত খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে। খেজুরে আঁশ যে বেশি, তা গবেষণাতেও এসেছে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) কোষ্ঠকাঠিন্যে খাবারে ধীরে ধীরে আঁশ বাড়ানো, প্রচুর পানি পান করা এবং ফলসহ সুষম খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেয়। কোষ্ঠকাঠিন্য না সারলে, বারবার হলে, মলের সঙ্গে রক্ত গেলে বা অকারণে ওজন কমলে চিকিৎসকের কাছে যেতে বলে সংস্থাটি।
খেজুরের প্রাকৃতিক শর্করা দ্রুত শক্তি জোগায়, প্রতিবেদনের এই কথাটি পর্যালোচনার তথ্যের সঙ্গে মেলে। তবে খালি পেটে খেলে বাড়তি উপকার মেলে, খেজুর শরীরকে ভেতর থেকে উষ্ণ রাখে, কিংবা এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ত্বক, স্মৃতিশক্তি, হাড় ও রক্তচাপের উন্নতি ঘটায়, এমন দাবির পক্ষে কোনো স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ বা মানুষের ওপর করা গবেষণার প্রমাণ পাওয়া যায়নি; তাই এসব দাবি এখানে রাখা হয়নি।

ডায়াবেটিস, ওজন ও দাঁতের সতর্কতা
মূল প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, খেজুরে ক্যালরি ও প্রাকৃতিক চিনি বেশি থাকায় বেশি খেলে ওজন বা রক্তে শর্করা বাড়তে পারে, আর ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই খেজুর খাওয়া উচিত। এ বিষয়ে কিছু গবেষণা আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০১১ সালে নিউট্রিশন জার্নালে পাঁচ জাতের খেজুরের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (কোনো খাবার রক্তে শর্করা কত দ্রুত বাড়ায় তার মাপ) প্রকাশ করেন। ১৩ জন সুস্থ মানুষ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ১০ জনের ওপর করা ওই পরীক্ষায় সুস্থদের ক্ষেত্রে মান ছিল ৪৬.৩ থেকে ৫৫.১, যা কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স হিসেবে গণ্য। গবেষকেরা লেখেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের খাবারের পর রক্তে শর্করা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি, এবং সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে খেজুর তাঁদের জন্য উপকারী হতে পারে।
২০১৬ সালে অ্যানালস অব সৌদি মেডিসিনে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় সৌদি আরবের ১৭ জাতের খেজুরের গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের গড় পাওয়া যায় ৫৫.২, আর জাতভেদে মান ছিল ৪২.৮ থেকে ৭৪.৬। অর্থাৎ জাত অনুযায়ী ফল ভিন্ন হতে পারে। দুটি গবেষণাই ছোট পরিসরের, তাই ডায়াবেটিস থাকলে কতটা খেজুর খাওয়া যাবে, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করাই নিরাপদ।
এনএইচএসের হিসাবে শুকনো ফলের এক পরিবেশন প্রায় ৩০ গ্রাম। সংস্থাটি বলে, শুকনো ফলে চিনি বেশি থাকতে পারে এবং তা দাঁতের ক্ষতি করতে পারে; তাই দুই বেলার খাবারের ফাঁকে নাশতা হিসেবে না খেয়ে খাবারের অংশ হিসেবে, যেমন খাবারের পর মিষ্টিমুখ হিসেবে খাওয়াই ভালো। কোনো রোগ থাকলে বা খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ছবি: ORGANIChouse / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, ক্রিটিক্যাল রিভিউজ ইন ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন (আল-ফারসি ও লি, ২০০৮), নিউট্রিশন জার্নাল (আলকাবি ও সহকর্মী, ২০১১), অ্যানালস অব সৌদি মেডিসিন (আলগেফারি ও সহকর্মী, ২০১৬), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস)





মন্তব্য
(০)