চাঁপাইনবাবগঞ্জে লতাকস্তুরি গাছের চাহিদা বেড়েছে বলে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি জাগো নিউজ ২৪ জানায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বাজারে গাছ ও বীজের দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছিল, আর তাতে জেলার অনেক কৃষক লতাকস্তুরি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছিলেন। গাছটির প্রধান ক্রেতা আখচাষিরা, যাঁরা আখের রস থেকে গুড় তৈরির সময় এটি ব্যবহার করেন।
কানসাট গুড়ের হাটে কেজি দরে বিক্রি
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ভোর ৬টার দিকে জেলার কানসাট গুড়ের হাটে দেখা যায়, হাটের পাশে বসে কয়েকজন চাষি লতাকস্তুরির গাছ বিক্রি করছেন। এসব লতা প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল, আর কিনছিলেন মূলত আখচাষিরা। কানসাট চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন।
আব্বাস বাজার এলাকার লতাকস্তুরি চাষি মজিবুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে লতাকস্তুরি চাষ করেছেন। তখন পর্যন্ত তিনি ৫০ হাজার টাকার গাছ বিক্রি করেছিলেন এবং আরও অন্তত ৩০ হাজার টাকার বিক্রির আশা করছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, অল্প খরচে চাষ করা যায় এবং লাভ তুলনামূলক বেশি বলে স্থানীয় অনেক চাষি ফসলটিকে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে দেখছেন।
আখচাষি আতিকুর রহমান স্বজন বলেন, গুড় তৈরির সময় আখের রস পরিষ্কার করতে লতাকস্তুরির গাছ ব্যবহার করা হয়। তাঁর ভাষ্যে, রস জ্বাল দেওয়ার সময় ময়লা ও ফেনা পরিষ্কারে লতাকস্তুরি খুবই কার্যকর হওয়ায় গুড় তৈরিতে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

রস পরিষ্কারে লতাকস্তুরি কীভাবে কাজ করে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, গুড় তৈরির প্রক্রিয়ায় আখের রস পরিশোধন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। রস জ্বাল দেওয়ার সময় তাতে থাকা ময়লা, আঁশ, ধুলাবালি ও ফেনা ওপরে ভেসে ওঠে। এই ময়লা সরিয়ে না ফেললে গুড়ের রং কালচে হয়ে যায় এবং স্বাদ ও মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে আখচাষি ও গুড় প্রস্তুতকারীরা লতাকস্তুরি ব্যবহার করে আসছেন।
তাঁর ব্যাখ্যায়, রস জ্বাল দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ লতাকস্তুরির গাছ দিলে ময়লা ও ফেনা জমাট বেঁধে ওপরে উঠে আসে। তা সরিয়ে ফেললে রস পরিষ্কার হয় এবং গুড় উজ্জ্বল রঙের ও উন্নত মানের হয়। তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক উপাদান হওয়ায় এতে গুড়ের স্বাদ বা মানের ক্ষতি হয় না।
গবেষণাও এ ধরনের প্রাকৃতিক পরিশোধকের কথা বলে। ভারতের মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, রস ফোটানোর সময় উদ্ভিদের পিচ্ছিল রস বা মিউসিলেজ যোগ করলে তা জমাট বেঁধে রসের ভেতরের ভাসমান ময়লাকে গাদ হিসেবে ওপরে তুলে আনে, যা পরে ছেঁকে ফেলা হয়। যত বেশি গাদ সরানো যায়, গুড়ের রং ও সংরক্ষণগুণ তত ভালো হয়। ২০২০ সালে ইনটেকওপেনে প্রকাশিত আবেলমোস্কাস গণের উদ্ভিদ নিয়ে এক পর্যালোচনায়ও বলা হয়েছে, এ গণের উদ্ভিদে মিউসিলেজ থাকে এবং গুড় তৈরিতে আখের রস পরিষ্কারে তা কাজে লাগে। ঢেঁড়সও একই গণের উদ্ভিদ।

লতাকস্তুরি কোন উদ্ভিদ
লতাকস্তুরির বৈজ্ঞানিক নাম আবেলমোস্কাস মোসচাটাস (Abelmoschus moschatus)। স্থানীয়ভাবে এটি কলকস্তুরি নামেও পরিচিত; ইংরেজিতে মাস্ক ম্যালো বা অ্যামব্রেট। এটি ঢেঁড়স ও জবার মালভেসি পরিবারের উদ্ভিদ, আদি নিবাস এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। ভারতের কেরালা রাজ্য ঔষধি উদ্ভিদ বোর্ডের বর্ণনায় এটি খাড়া বীরুৎ, পাতা হাতের তালুর মতো ৩ থেকে ৭ ভাগে বিভক্ত, ফুল হলুদ এবং মাঝখানটা বেগুনি; আর্দ্র পর্ণমোচী বনের পাথুরে জায়গায়, সমতলেও জন্মায়।
এর বীজে কস্তুরির মতো মিষ্টি, ভারী সুগন্ধ থাকে বলে নামেও কস্তুরি। একসময় সুগন্ধি শিল্পে প্রাণিজ কস্তুরির বদলে এর বীজের তেল ব্যবহার হতো। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে এর বাণিজ্যিক চাষ হলেও বাংলাদেশে গাছটির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। কিছু দেশে প্রথাগত চিকিৎসায় এর পাতা, বীজ ও শিকড় ব্যবহারের কথা বলা হলেও কোনো গাছ ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ছবি: Yercaud-elango / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস (মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়), ইনটেকওপেন, কেরালা রাজ্য ঔষধি উদ্ভিদ বোর্ড, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)