২০২৬ সালের ৯ মে, দেশের উত্তর-পূর্বের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা যখন এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া বোরো ধানের ক্ষতির হিসাব করছিলেন, তখন জাগো নিউজ ২৪ “ডুবন্ত ধান, ডুবন্ত জীবন: হাওরের কৃষকের টিকে থাকার লড়াই” শিরোনামে একটি মতামত কলাম প্রকাশ করে। লেখক সাঈদ উজ্জ্বল, এনসিপির কৃষক উইংয়ের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সমন্বয়কারী। তাঁর যুক্তি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অব্যবস্থাপনা, বাজার সিন্ডিকেট ও নীতিগত ঘাটতির কারণে হাওরের কৃষক এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করেন, আর হাওরের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও কৃষককেন্দ্রিক নীতি এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন।
কলামে লেখক এমন এক অঞ্চলের কথা বলেছেন, যেখানে বছরে একটিমাত্র ফসল হয়, বোরো ধান; ফলে কৃষকের সারা বছরের জীবিকা এই এক ফসলের ওপর নির্ভর করে। তাঁর ভাষায়, অকাল বন্যা, দুর্বল বাঁধ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং পানিপ্রবাহে বাধার কারণে প্রায়ই পাকা ধান পানিতে ডুবে যায়, আর গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, অপরিকল্পিত ও অদক্ষ বাঁধ নির্মাণ এবং বাঁধ ভাঙন অনেক সময় ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তিনি ধান কাটার পরের আরেকটি সংকটের কথাও তুলেছেন: বৃষ্টির সময় ধান শুকানোর জায়গা থাকে না, আধুনিক গুদামের অভাবে কাটা ধান নষ্ট হয়, কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন, আর লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট। এই প্রতিবেদনে লেখকের যুক্তি ও দাবিগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি কলাম প্রকাশের দিন পর্যন্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গবেষক ও সংবাদপত্রগুলো একই বিষয়ে যা জানিয়েছিল, তা মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
লেখকের প্রথম দাবি ছিল বাজার নিয়ে। তিনি লিখেছেন, ধান সংগ্রহের মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা চালু করা জরুরি; সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে প্রান্তিক কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারেন। তাঁর মতে, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সম্ভব।
এরপর তিনি সেই দাবিগুলোর তালিকা দিয়েছেন, যা তাঁর ভাষায় হাওরের কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন:
- দুর্বল বাঁধের স্থায়ী সংস্কার ও টেকসই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা;
- আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন;
- একটি সমন্বিত হাওর ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন;
- কৃষিযান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো ও পর্যাপ্ত কম্বাইন হারভেস্টার সরবরাহ;
- জরুরি সময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা;
- ‘শস্য বন্ধকি ঋণ’ চালু করা এবং ফসল হারানো কৃষকের ঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল করা;
- ফসল বিমা চালু করা, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে কৃষক কিছুটা সুরক্ষা পান;
- জরুরি পরিস্থিতিতে নগদ ও খাদ্যসহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে দ্রুত পুনর্বাসন।
লেখকের মতে, শেষোক্ত ধরনের উদ্যোগগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাময়িক থেকে যায়, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়। তাঁর মূল সমালোচনা, হাওরের উন্নয়নকে শুধু রাস্তা বা বড় প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, অথচ পরিকল্পনা হওয়া উচিত এই অঞ্চলের প্রকৃতি, পানিপ্রবাহ, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। তিনি লিখেছেন, হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়; এটি একটি সংবেদনশীল, পরিবেশনির্ভর অর্থনীতি, যেখানে সামান্য নীতিগত ভুলও হাজার হাজার কৃষকের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল
কলামটি প্রকাশিত হয় সংকটের সূচনা করা বৃষ্টির প্রায় দুই সপ্তাহ পরে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ২ মে জানান, ২৭ এপ্রিলের অবিরাম বর্ষণে সব হাওর পানিতে ভরে যায় এবং ফসল তলিয়ে যায়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ থেকে ২৮ এপ্রিলের ২৪ ঘণ্টায় দিরাইয়ে ২০৫ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জে ১৩৭ মিলিমিটার, লাউড়ে ১৩৩ মিলিমিটার এবং ছাতকে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যেখানে আগের বছরের একই দিনে বৃষ্টি হয়েছিল ২৭ মিলিমিটার। এমন বর্ষার বছরকে সেখানকার কৃষকেরা স্থানীয় ভাষায় ‘কাঁচইরা’ বলেন; তাঁরা প্রতিবেদককে জানান, এ ধরনের জলাবদ্ধতা পাঁচ, দশ, পনেরো বা বিশ বছর পরপর ফিরে আসে।
অঞ্চলের অন্য জেলাগুলোর চিত্রও ছিল কাছাকাছি। দ্য ডেইলি স্টার ২৯ এপ্রিল জানায়, শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া কেন্দ্রে পাঁচ দিনে ২৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয় এবং ২৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টি মাপে। ১ মে একই পত্রিকা বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সাত দিনের পূর্বাভাস উদ্ধৃত করে জানায়, সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বাউলাই ও ভুগাই-কংশ নদীর পানি ৩ মের মধ্যে একসঙ্গে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে, ১৫০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, আর ৫ মের পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
জাতীয় পর্যায়ে প্রথম আলো ৪ মে জানায়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টি হয়েছে, যা নয় বছরের মধ্যে এই মাসের সর্বোচ্চ; ২০১৭ সালের পর এপ্রিলে এত বৃষ্টি অধিদপ্তর দেখেনি। এপ্রিল সাধারণত দেশের সবচেয়ে উষ্ণ মাস, গড় তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ পত্রিকাটিকে বলেন, বর্ষার আগে ও পরে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়া একটি নতুন প্রবণতা, আর এর প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
সরকারি হিসাবে ফসলের ক্ষতি
পানি যত বেড়েছে, ক্ষতির সরকারি হিসাবও দিনে দিনে বদলেছে; নিচের প্রতিটি সংখ্যা যে সূত্র যেদিন জানিয়েছে, সেভাবেই দেওয়া হলো। ১ মে দ্য ডেইলি স্টার ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরের বোরো ফসলের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্যার ঝুঁকিতে ছিল; ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ততক্ষণে হাওরের ৬৩ দশমিক ৯১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। পত্রিকাটির হিসাবে হাওরের সাত জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়, যার প্রায় অর্ধেক হাওর এলাকায়, আর ৭৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি তখন ঝুঁকিতে ছিল।
প্রথম আলোর ৪ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডলের নেতৃত্বাধীন ডিএইর সরেজমিন উইংয়ের হিসাবে সাত জেলার হাওরে বোরো আবাদ হয় ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টরে; এর ৭১ শতাংশ কাটা হয়েছিল এবং প্রায় ৪৬ হাজার হেক্টর পানির নিচে চলে যায়। ডিএইর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, এলাকাভেদে ধানের দাম আলাদা হওয়ায় ক্ষতির হিসাব রক্ষণশীলভাবে করা হচ্ছে; অন্যদিকে স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবি, সরকারি হিসাবে প্রকৃত ক্ষতি কম দেখানো হয়েছে।
কলাম প্রকাশের আগের দিন, ৮ মে, দ্য ডেইলি স্টার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খানের হিসাবে ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা হাওরের আবাদি জমির প্রায় ১১ শতাংশ, আর আরও সাড়ে ১৭ শতাংশ জমি ঝুঁকিতে রয়েছে। সাত জেলায় দুই লাখ ৩৬ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং কর্মকর্তারা ক্ষতির পরিমাণ ধরেন এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা। একই প্রতিবেদনে ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, হাওরে আবাদ হওয়া চার লাখ ৫৫ হাজার হেক্টরের প্রায় ৮০ শতাংশের ধান কাটা শেষ হয়েছিল।
একই সময়ে জেলা কার্যালয়গুলো নিজ নিজ হিসাব দেয়:
- সুনামগঞ্জ: ১৩৭টি হাওর ও আশপাশের জমি মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরে বোরো আবাদ, যার ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর হাওর এলাকায়; জেলা কৃষি কার্যালয়ের প্রাথমিক হিসাবে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ১৮ হাজার হেক্টর এবং আগের জলাবদ্ধতায় আরও ২ হাজার হেক্টরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা (প্রথম আলো, ৩ মে)। উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, চূড়ান্ত ক্ষতি এর চেয়ে বেশি হবে। সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদের হিসাবে কমপক্ষে ৫০ হাজার হেক্টরের ধান ক্ষতিগ্রস্ত।
- কিশোরগঞ্জ: জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্যে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায় এবং ৩০ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন (প্রথম আলো, ৩ মে); ডিএইর উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জেলার ক্ষতি প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বলে ধারণা দেন (দ্য ডেইলি স্টার, ৮ মে)।
- নেত্রকোনা: ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টরে বোরো আবাদ, যার ৪২ হাজার হেক্টর হাওরে; সরকারি হিসাবে ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর তলিয়ে যায়, তবে স্থানীয়দের দাবি প্রকৃত ক্ষতি প্রায় দ্বিগুণ (প্রথম আলো, ৩ মে); ডিএইর উপপরিচালক আমিরুল ইসলাম জানান, জেলায় প্রায় ৮০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত (দ্য ডেইলি স্টার, ৮ মে)।
- হবিগঞ্জ: ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টরে বোরো আবাদ; অতিরিক্ত উপপরিচালক দ্বীপক কুমার পাল জানান, প্রায় ২ হাজার ৭১০ হেক্টরের ধান তলিয়ে গেছে (দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ এপ্রিল)।
- মৌলভীবাজার: ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টরে বোরো আবাদ, যার ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওরে; হাওরের প্রায় ৭৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছিল; উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ক্ষতির পরিমাণ তখনো নির্ধারণ হয়নি (দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ এপ্রিল)।
ধান কাটার পরের যে সংকটের কথা কলামে বলা হয়েছে, প্রতিবেদনগুলোতেও তার প্রমাণ মেলে। প্রথম আলো ৩ মে জানায়, কয়েক দিন রোদ না ওঠায় কাটা ধান শুকাতে না পেরে কৃষকেরা ধান পচে যেতে দেখেছেন, কেউ কেউ ভেজা ধান হাওরের পানিতেই ফেলে দিয়েছেন।
হাওর কী এবং এর বোরো ধান কেন গুরুত্বপূর্ণ
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া হাওরকে বর্ণনা করেছে পিরিচ আকৃতির বৃহৎ ভূ-গাঠনিক অবনমন হিসেবে, যা নদী ও খাল থেকে পানি পায়, বর্ষায় বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয় এবং শুকনো মৌসুমে বেশির ভাগ শুকিয়ে যায়; ‘হাওর’ শব্দটি সংস্কৃত ‘সাগর’ শব্দের বিকৃত রূপ বলে ধারণা করা হয়। এই অববাহিকায় প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিল রয়েছে, যার প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি স্থায়ী ও ২ হাজার ৮০০টি মৌসুমি। অববাহিকাটির উত্তরে মেঘালয়, দক্ষিণে ত্রিপুরা ও পূর্বে মণিপুরের উচ্চভূমি; সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, যাদুকাটা, পিয়াইন, মোগরা প্রভৃতি নদী এখানে পানি আনে। বর্ষায় পানির গভীরতা ৬ মিটার পর্যন্ত হয় এবং প্রায় ৭ থেকে ৮ মাস এলাকা প্লাবিত থাকে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তৈরি ২০১২ সালের হাওর মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৭৩টি হাওর ও জলাভূমি রয়েছে, যার আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর, অর্থাৎ এই জেলাগুলোর মোট আয়তনের প্রায় ৪৩ শতাংশ।

শীতে পানি নেমে গেলে জেগে ওঠা পলিমাটিতে বোরো ধান রোপণ করা হয়, যা পরের বন্যার আগে এপ্রিল-মে মাসে কাটা হয়। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) প্রকাশনা রাইস টুডের ২০২৫ সালের মে মাসের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, হাওরাঞ্চলের ৮০ শতাংশের বেশি জমিতে বোরো চাষ হয় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট বোরো ধানের ২৫ শতাংশ এবং বছরের মোট চাল উৎপাদনের ১৫ শতাংশ আসে হাওর থেকে। বাংলাপিডিয়া সতর্ক করেছে, জলাভূমির প্রান্তিক জমিতে বোরো চাষের বিস্তার নিজেই বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে ফেলছে এবং হাওরকে হুমকির মুখে ফেলছে।
হাওরের ক্ষতি কেন সারা দেশের দুশ্চিন্তা, জাতীয় পরিসংখ্যানে তা স্পষ্ট। ৮ মে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৫০ দশমিক ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি; উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ দশমিক ২৪ কোটি টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বোরো উৎপাদন হয়েছিল ২ দশমিক ১৩ কোটি টন, আর দেশের মোট চালের প্রায় ৫৫ শতাংশই বোরো। পত্রিকাটির ১ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের মৌসুমে জাতীয় উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জুগিয়েছিল হাওরের সাত জেলা।
বাঁধ, পিআইসি ও পানি নামার পথ
অপরিকল্পিত বাঁধ ক্ষতি বাড়ায়, কলামের এই অভিযোগ সেই মৌসুমে অঞ্চলজুড়ে আলোচনার বিষয় ছিল। ২০১৭ সালের বিপর্যয়ের পর থেকে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত করে স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি), সংশোধিত ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’ (কাবিটা) নীতিমালা ২০১৭-এর আওতায়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২২ সালে জানায়, নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে কমিটি গঠন, ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু এবং পাহাড়ি ঢলের মৌসুমের আগে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২ মের প্রতিবেদনে শুধু সুনামগঞ্জের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব তুলে ধরা হয়: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০৩ কোটি টাকায় ৭৩৪টি প্রকল্প, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪৫ কোটি টাকায় ৬৮৪টি প্রকল্প এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় দেড়শ কোটি টাকায় ৭১৮টি প্রকল্প; তিন বছরে ২ হাজার ১৩৬টি বাঁধ নির্মাণ বা মেরামত করা হয়। কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা প্রতিবেদককে বলেন, গত এক দশকে ফসল রক্ষার নামে তৈরি বাঁধ বৃষ্টির পানি নামার পথগুলো আটকে দিয়েছে; কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, কাগজে মাটি কাটার যে হিসাব দেখানো হয়, প্রকৃত কাজ তার চেয়ে কম। প্রতিবেদনে এই অভিযোগের বিষয়ে বোর্ডের কোনো বক্তব্য ছিল না।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বিডিনিউজকে বলেন, হাওরে যত্রতত্র উন্নয়ন জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ; তিনি স্বীকার করেন, বাঁধের মাটি প্রতিবছর খাল, নদী ও জলাশয় ভরাট করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআইআরডির পরিচালক আবদুল হাই চৌধুরী বলেন, এই সংকট শুধু প্রাকৃতিক নয়, এর মূলে নীতির দুর্বলতা ও দুর্বল বাস্তবায়ন; তিনি কাবিখা ও পিআইসি ব্যবস্থার অদক্ষতা ও জবাবদিহির ঘাটতির সমালোচনা করেন। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, হাওরের তলদেশ ও নদীতে পলি জমেছে এবং এর ওপর তৈরি স্থাপনা পানি নামতে বাধা দিচ্ছে; তাঁর ভাষ্য, সে বছর সুনামগঞ্জে বোর্ডের কোনো বাঁধ ভাঙেনি, তবু ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মন্ডল পত্রিকাটিকে বলেন, আংশিকভাবে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে হাওরের ভূমিরূপ বদলে গেছে, তাই চাষাবাদ ও ফসল নির্বাচনেও পরিবর্তন আনতে হবে।

ধান শুকানো, গুদাম ও সরকারি সংগ্রহ
কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা ও গুদামের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর দাবি যখন কলামে উঠেছে, তখন বন্যার কারণে সরকার বোরো সংগ্রহের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছিল। দ্য ডেইলি স্টার ১ মে জানায়, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ, এই ছয় হাওর জেলায় আগে নির্ধারিত ১৫ মের বদলে ৩ মে থেকে সংগ্রহ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল কেনার লক্ষ্য ঠিক হয়: ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল। দাম প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা ও আতপ চাল ৪৮ টাকা; সঙ্গে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ৫০ হাজার টন গম। সংগ্রহ অভিযান চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
ধান শুকানো নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, খাদ্যসচিবের সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের সভায় বিভাগীয় সহায়তায় বেসরকারি চালকল ও সরকারি গুদামে কৃষকদের ধান শুকাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়; খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক বলেন, অধিদপ্তর শুকনো ধান সরাসরি কিনবে এবং চালকলমালিকদের দ্রুত কিনতে উৎসাহিত করবে। তবে ভেজা ধানের দাম ছিল অনেক কম: পত্রিকাটির ৮ মের প্রতিবেদনে নেত্রকোনার খালিয়াজুরির এক কৃষক জানান, তিনি ভেজা ধান প্রতি মণ ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছেন, আর সুনামগঞ্জের এক হাওরের কৃষক জানান, তিনি প্রতি মণ ৭০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

বৃহত্তর বাজারের প্রশ্নে অর্থনীতিবিদ আবদুল বায়েস ১ মে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, জাতীয় পর্যায়ে দামের ওপর প্রভাব খুব সামান্য হবে এবং সরকারের প্রায় ১৩ লাখ টন মজুত বাজারে বড় অস্থিরতা ঠেকাতে সাহায্য করবে; অন্যদিকে নবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
ঋণ, কৃষিঋণ নীতি ও ত্রাণ
সহজ শর্তে ঋণ না পেয়ে কৃষক চড়া সুদে ধার নেন, লেখকের এই সতর্কবার্তার সঙ্গে সেই মাসে হাওরে দ্য ডেইলি স্টারের পাওয়া চিত্র মিলে যায়। পত্রিকাটির প্রতিবেদকেরা সাত জেলার ৪০ জনের বেশি কৃষকের সঙ্গে কথা বলেন, যাঁদের ২৫ জনের বেশি ঋণের ফাঁদে পড়ার কথা জানান: সুদে নেওয়া ঋণ, কারও কারও ক্ষেত্রে জমি ইজারা নেওয়ার জন্য, যা শোধ করার কথা ছিল পানিতে তলিয়ে যাওয়া ফসল থেকে। পত্রিকাটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অর্থনীতিবিদ আবদুল বায়েসের সুপারিশ উদ্ধৃত করে: ঋণ পুনঃতফসিল, কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ অথবা সুদ মওকুফ।
প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণের বার্ষিক লক্ষ্য ঠিক হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্টে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৩৯ হাজার কোটি টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ঘোষণা করে, যা আগের বছরের ৩৮ হাজার কোটি টাকার চেয়ে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি, এবং আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) চার্জ মওকুফ করে।
৯ মে পর্যন্ত সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে যা এসেছে: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে সুনামগঞ্জের একজন সংসদ সদস্য হাওরের পরিস্থিতি তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস সরকারি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। দ্য ডেইলি স্টার ৮ মে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বরাতে জানায়, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিক ও স্বচ্ছ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে তিন মাসের খাদ্যসহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন, যা কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা।
আগাম বন্যা এড়াতে স্বল্পমেয়াদি জাত
ঝুঁকির একটি অংশ সময়ের হিসাবে। ইরির রাইস টুডে ২০২৫ সালের মে মাসে জানায়, হাওরের কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯-এর ওপর নির্ভর করেন, যেগুলো পাকতে ১৪০ থেকে ১৬০ দিন লাগে; অথচ পাহাড়ি ঢল এখন এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই, ধান কাটার আগে চলে আসে। ইরির নেতৃত্বে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (ব্রি) সঙ্গে নিয়ে এবং কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে একটি প্রকল্প হাওরের জন্য ১২০ থেকে ১৪০ দিনে পাকে, ঠান্ডা সহনশীল এবং হেক্টরপ্রতি ৬ থেকে ৭ টন ফলনক্ষম জাত উদ্ভাবনের কাজ করছিল।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ইরি ও সহযোগী সংস্থা ফ্রেন্ডস ইন ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশ (এফআইভিডিবি) কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে মাঠ দিবসের আয়োজন করে, যেখানে কৃষকেরা ব্রি ধান৪৯, ধান৮৭, ধান৯৩, ধান৯৪, ধান১০৩ এবং নতুন ধান১১১ যাচাই করেন। ইরি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জানায়, ফলন, সহনশীলতা ও সামগ্রিক পারফরম্যান্সে কৃষকেরা ধান৯৪ ও ধান১০৩-কে সবচেয়ে এগিয়ে রেখেছেন, আর প্রথমবার হাওরে পরীক্ষা করা ব্রি ধান১১১ সর্বোচ্চ সাত দিন পর্যন্ত বন্যার পানিতে টিকে ছিল।
আগের বিপর্যয়: ২০১৭ ও ২০২২
কয়েক বছর পরপর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তির যে কথা কলামে বলা হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে পরিচিত ইতিহাস। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ধান কাটার আগেই আগাম পাহাড়ি ঢল আঘাত হানে। ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল জানায়, কিশোরগঞ্জে ডিএই প্রায় ২৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ার তথ্য পেয়েছে, হবিগঞ্জে কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ হেক্টরের আধাপাকা ধান পানির নিচে, আর সুনামগঞ্জে কর্মকর্তারা বলেন, অন্তত ২৭ হাজার হেক্টর তখনই তলিয়ে গেছে। দ্য ডেইলি স্টার পরে লেখে, ২০১৭ সালের সেই আগাম বন্যায় হাওরের ছয় জেলার আট লাখের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই বছরের পর সরকার বাঁধ নির্মাণের নীতিমালা সংশোধন করে কাজের দায়িত্ব কৃষকদের কমিটির হাতে দেয়।
২০২২ সালের এপ্রিলে পাহাড়ি ঢল আবার বাঁধ ভেঙে ঢোকে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল জানায়, প্রায় ৭ হাজার ৮৩ হেক্টরের বোরো ধান পানির নিচে চলে যায়, যার ৪ হাজার ৯০০ হেক্টর সুনামগঞ্জে; সেখানে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত করা হয়েছিল। দুটি বড় বাঁধ ভাঙে, ধর্মপাশার চন্দ্রসোনার থালে এবং দিরাইয়ের চাপতির হাওরে।
২০২৬ সালের ক্ষতি এসেছে ভিন্ন পথে। প্রথম আলো জামালগঞ্জের এক কৃষকের কথা তুলে ধরে, যিনি বলেন, আগেও বন্যা হয়েছে, কিন্তু বৃষ্টির পানিতে এমন জলাবদ্ধতা তাঁর এলাকায় নতুন; আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীর ভাষ্য, সুনামগঞ্জে কোনো বাঁধ ভাঙেনি।
হাওর মহাপরিকল্পনা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান
হাওরের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনো রূপে কয়েক দশক ধরে আছে। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ‘হাওর উন্নয়ন বোর্ড’ গঠিত হয় এবং ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তা বিলুপ্ত করা হয়। ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ আবার গঠিত হয়; ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর মন্ত্রিসভা বোর্ডটিকে মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত অধিদপ্তরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই মন্ত্রণালয় অধিদপ্তর গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে।
বোর্ডের ২০১২ সালের মহাপরিকল্পনা ২০ বছরের, অর্থাৎ ২০৩১-৩২ অর্থবছর পর্যন্ত একটি কাঠামো ঠিক করে, যাতে বন্যা ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, সড়ক যোগাযোগ ও বনায়ন অন্তর্ভুক্ত। দ্য ডেইলি স্টার ২০২১ সালের জুনে জানায়, পরিকল্পনায় ৩৬টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে, যার কিছু শেষ হয়েছে এবং কিছু চলমান; পত্রিকাটি অধিদপ্তরের কৃষি, পানি ও পরিবেশ বিভাগের পরিচালক ড. আলী মুহাম্মদ ওমর ফারুকের বক্তব্য তুলে ধরে, যিনি বলেন, কিছু প্রকল্প শেষ হলেও সেগুলোর কোনো প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়নি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের নভেম্বরে জানায়, পরিকল্পনার বসতি অংশ, অর্থাৎ ১ হাজার ৩৯৬ হেক্টরে ৩৮টি বসতি এলাকা ও ৩৮টি পরিবেশবান্ধব গ্রাম, খুব সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে; অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, এ বিষয়ে তখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে সমন্বিত হাওর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে দাবি লেখক তুলেছেন, এবং হাওরের উন্নয়ন রাস্তা ও বড় প্রকল্পে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার যে অভিযোগ করেছেন, তা এমন একটি পরিকল্পনার দিকেই ইঙ্গিত করে, যা কাগজে আগে থেকেই ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২ মের প্রতিবেদনে এআইআরডির আবদুল হাই চৌধুরীও একই ধরনের কথা বলেন: হাওর ও জলাভূমি অধিদপ্তরকে ‘কাগুজে’ অস্তিত্ব থেকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (সাঈদ উজ্জ্বলের কলাম, ৯ মে ২০২৬), দ্য ডেইলি স্টার (বাংলা সংস্করণ, ২৯ এপ্রিল, ১ মে ও ৮ মে ২০২৬; ইংরেজি সংস্করণ, ৯ এপ্রিল ২০২২ ও ২৮ জুন ২০২১), প্রথম আলো (৩ ও ৪ মে ২০২৬), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (২৯ এপ্রিল ও ২ মে ২০২৬), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, হাওর মহাপরিকল্পনা (২০১২), ইরি (রাইস টুডে, মে ২০২৫; সংবাদ, ডিসেম্বর ২০২৫), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (১০ নভেম্বর ২০২৩; ১২ আগস্ট ২০২৫), ঢাকা ট্রিবিউন (৮ এপ্রিল ২০১৭)




মন্তব্য
(০)