ঢাকার দোহার উপজেলার বানাঘাটা গ্রামের নিকড়া বটতলা এলাকার এমদাদুল হক সিঙ্গাপুরে ১২ বছর কাজ করে দেশে ফিরেছিলেন। জমানো টাকায় শুরু করা ব্যবসায় লোকসানে সব হারানোর পর কেঁচো জৈব সার (ভারমিকম্পোস্ট) তৈরি করে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। প্রথম আলো ২০১৬ সালের অক্টোবরে দোহার থেকে তাঁর এই গল্প তুলে ধরে।
দোহার ঢাকা জেলার সবচেয়ে দক্ষিণের উপজেলা। এর দক্ষিণ সীমা ঘেঁষে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। উপজেলার আয়তন ১৬১ দশমিক ৪৯ বর্গকিলোমিটার; একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন নিয়ে এটি গঠিত। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানে ২ লাখ ২৬ হাজার ৪৩৯ জন মানুষের বাস ছিল।

প্রবাস থেকে ফিরে লোকসান
জীবিকার তাগিদে নব্বইয়ের দশকে এমদাদুল বিদেশে যান। দেশে ফিরে জমানো টাকায় বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানির ব্যবসা শুরু করেন, কিন্তু তাতে অবস্থার উন্নতি হয়নি। এমদাদুলের ভাষ্য, লোকসান হলেও তিনি নতুন উদ্যমে আবার টাকা খাটাতেন। এভাবে নয় বছরে তাঁর অনেক টাকা লোকসান হয়, জমানো টাকাও ফুরিয়ে যায়; সংসার চালাতে হতো ধারদেনা করে।
এমন সময় তিনি কেঁচো সারের কথা জানতে পারেন। বিষয়টি বুঝতে তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) যান, সেখানে এক কৃষিবিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। বারি ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান; ধান, পাট, আখ ও চা ছাড়া অন্য সব ফসল নিয়ে এটি গবেষণা করে।
দুটি চাড়ি থেকে তিনটি হাউস
২০১৪ সালের শুরুতে একটি মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে এমদাদুল ১০ কেজি ধারণক্ষমতার দুটি চাড়ি (মাটির পাত্র) দিয়ে কাজ শুরু করেন। দুটি চাড়িতে দেন ১৪ কেজি গোবর, চার কেজি খড়কুটো ও ২০০ গ্রাম কেঁচো। তা থেকে মোট ১২ কেজি সার পান। প্রথম দিকে সেই সার নিজের কলাবাগানে দিতেন। ধীরে ধীরে কৃষকদের মধ্যে সারটির চাহিদা বাড়ে, তিনিও উৎপাদন বাড়াতে থাকেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনের সময় তিনি সিমেন্টের তৈরি তিনটি হাউসে সার তৈরি করছিলেন, প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৭০০ কেজি। এতে রাখা হয়েছিল ১ হাজার ৫০০ কেজি গোবর, ৪০০ কেজি কলাগাছের টুকরা ও ২০০ কেজি খড়কুটো; কেঁচো দেওয়া হয়েছিল ৬ কেজি, যা বেড়ে তখন ১২ কেজির বেশি হয়েছিল। একবারের সার তৈরি হতে সময় লাগে দেড় মাস।

নিকড়া বটতলা মোড়ে এমদাদুলের একটি ছোট দোকান আছে, সেখানে তিনি কীটনাশক ও কেঁচো সার বিক্রি করেন; অনেক কৃষক বাড়ি থেকেও সার নিয়ে যান। নিজের দেড় বিঘা জমিতে তিনি নরসিংদীর অমৃতসাগর কলা চাষ করেন, ছোট একটি পেঁপের বাগানেও এই সার দেন। তাঁর ভাষ্য, এতে কলার মান ভালো হয়, ফলনও বেশি হয়। এমদাদুল বলেন, ‘এ সার উৎপাদনে খরচ খুব বেশি না। আর এটা অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। এ সার আমাকে আশার আলো দেখিয়েছে।’
নিকড়া গ্রামের কৃষক মুজাহার হোসেন বলেন, ‘আমার দেড় বিঘা জমিতে ধান চাষের সময় কেঁচো সার ব্যবহার করছি। এই সার ব্যবহার কইরা সুফল পাইছি। এখন থেকে এই সারই জমিতে দিমু।’ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এমদাদুল উপজেলায় কেঁচো সার উৎপাদনে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। এখন কৃষকের মধ্যে এ সার জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কেউ কৃষি অফিসের সাহায্য চাইলে আমরা সাহায্য করি। যাদের কেঁচোর প্রয়োজন হয়, তাদের কেঁচোও সরবরাহ করা হয়।’
কেঁচো সার কী
কেঁচো সার হলো কেঁচোর মাধ্যমে জৈব বর্জ্য পচিয়ে তৈরি পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব সার। গবাদিপশুর গোবর, খড় ও কৃষির নানা উচ্ছিষ্ট এর কাঁচামাল। এই সার মাটিতে বাতাস চলাচল ও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়, উপকারী অণুজীব যোগ করে এবং গাছের বৃদ্ধি ও ফলনে সহায়তা করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় লাল কেঁচো আইসেনিয়া ফেটিডা।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আইপিএসের ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষিবিজ্ঞানীরা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে কেঁচো সার চালু করেন। তখন থাইল্যান্ড থেকে ইউড্রিলাস ইউজেনি ও আইসেনিয়া জাতের কেঁচো আনা হয়, পরে দেশেই সেগুলোর বংশবিস্তার করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়ে আসছে।
খরচের দিকটিও কৃষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৯ সালের অক্টোবরে রাঙামাটি থেকে জানায়, সেখানে এক কেজি কেঁচো সার তৈরিতে প্রায় ৭ টাকা খরচ হতো এবং স্থানীয় বাজারে তা কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হতো, যেখানে এক কেজি রাসায়নিক সারের দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো, আইপিএস (ইন্টার প্রেস সার্ভিস), দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)