২০২৬ সালের ২৭ জুন, শনিবার সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে 'ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক হয়। সেখানে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের খুবই সামান্য অংশ বিদেশে রপ্তানি হয় এবং শুধু উদ্যোক্তাদের চেষ্টায় তা বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতি আরও কার্যকর করতে হবে।
তাঁর মতে, বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোকে নতুন বাজার তৈরি এবং রপ্তানিকারকদের সহায়তায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বিদেশি ক্রেতা ও কূটনীতিকদের নিয়মিত ফল উৎপাদন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগও বাড়ানো দরকার বলে তিনি মনে করেন।
আমের বাইরেও নতুন বাজারের তাগিদ
চীনের সঙ্গে আম রপ্তানির সমঝোতা স্মারকের প্রসঙ্গ টেনে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শুধু আম নয়, কাঁঠালসহ অন্য ফলের জন্যও নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের আম রপ্তানির সম্ভাবনা অনেক হলেও বাস্তবে রপ্তানির পরিমাণ এখনো অত্যন্ত কম।
চীনের বাজারে আম পাঠানোর পথ খুলতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৯ সালে চীনে আম রপ্তানির অনুমোদন চেয়ে আবেদন করে এবং চীনের সাধারণ শুল্ক প্রশাসন (জিএসিসি) ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রপ্তানি নিবন্ধন দেয়। এরপর ২০২৫ সালের ২৮ মে প্রথমবারের মতো চীনে আমের চালান পাঠানো হয়। সে সময় কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছিলেন, ওই বছর প্রায় ৫০ টন আম চীনে রপ্তানি হবে এবং পরিমাণ বাড়াতে আলোচনা চলছে; কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়েও সরকার কাজ করছিল। নিউ এজ জানায়, চীন পেয়ারা ও কাঁঠাল আমদানিতেও আগ্রহ দেখিয়েছিল।
উৎপাদন ও রপ্তানির ব্যবধানও ছিল বড়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৫ সালের মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে প্রায় ২৭ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়, অথচ ২০২৩-২৪ সালে আম রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৩২১ টন।

মাঠ থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত দুর্বলতা
ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন ফলের জাত উদ্ভাবন করলেও সেগুলো সব সময় মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না। অনেক কৃষক সময়মতো প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা কারিগরি সহায়তা পান না। তাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জনবল ও সক্ষমতা বাড়িয়ে কৃষকদের সেবার মান উন্নত করার কথা বলেন তিনি।
মৌসুমে ফলের দাম কমে গেলেও অমৌসুমে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় বলে জানান তিনি। এই বৈষম্য কমাতে কার্যকর কোল্ড চেইন, আধুনিক গুদাম ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, এসব নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।

রপ্তানি অবকাঠামো ও সমন্বিত উদ্যোগ
রপ্তানিযোগ্য ফল উৎপাদন এলাকায় বিশেষ রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তোলা, ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) সুবিধা সম্প্রসারণ, উড়োজাহাজে কার্গো জায়গা নিশ্চিত করা এবং পরিবহন ব্যয় কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, উদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ খাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না।

বৈঠকে যাঁরা অংশ নেন
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ২০২৫ সালে চীনে প্রথম আমের চালান পাঠানোর সময়ও এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। তখন তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, চীন ওই চালানে সন্তুষ্ট হলে পরের চালান পাঠানো হবে।
ছবি: Mahmudul Karim Farsad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউ এজ





মন্তব্য
(০)