সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

আমসহ কৃষিপণ্য রপ্তানির সব বাধা দূর করার আশ্বাস দিলেন কৃষিমন্ত্রী

২০২৬ সালের ২১ মে ঢাকায় বিএআরসি মিলনায়তনে আম রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আমসহ কৃষিপণ্য রপ্তানির সব বাধা দূর করার আশ্বাস দেন; রপ্তানির বড় সমস্যা হিসেবে তিনি উচ্চ এয়ার কার্গো ভাড়ার কথা বলেন।

আমসহ কৃষিপণ্য রপ্তানির সব বাধা দূর করার আশ্বাস দিলেন কৃষিমন্ত্রী
ফল

আমসহ কৃষিপণ্য রপ্তানির সব বাধা দূর করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। ২০২৬ সালের ২১ মে, বৃহস্পতিবার, রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে চলতি মৌসুমের আম রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম। আরও বক্তব্য দেন কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. সেলিম খান। আম রপ্তানির সম্ভাবনা ও এ পর্যন্ত প্রকৃত অর্জন নিয়ে একটি কী-নোট পেপার উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। মন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে আম রপ্তানির উদ্বোধন করেন এবং পরে উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) অনুসরণ করে আম উৎপাদনকারী চাষিদের হাতে গ্যাপ সার্টিফিকেট তুলে দেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী যা বললেন


জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কৃষিখাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিশাল সুযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য বিশ্বের অন্যতম উপযোগী দেশ হলেও নীতিগত ও আইনগত কিছু জটিলতার কারণে এ খাত এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

মন্ত্রী বলেন, সরকার কৃষি ও কৃষকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কৃষকদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ঋণ মওকুফ এবং খাল খননের মতো উদ্যোগকে তিনি কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কৃষিখাতে সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর উন্নত দেশগুলোও কৃষিখাতে ব্যাপক ভর্তুকি দিয়ে থাকে। একই সঙ্গে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পণ্যের মান বজায় রাখাকে তিনি আন্তর্জাতিক বাজারে সফলতার প্রধান শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন।

গবেষণা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বাংলাদেশের আদি ফলের স্বাদ ও গুণগত মান সংরক্ষণের ওপর জোর দেন। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফলের রং, স্থায়িত্ব ও সংরক্ষণক্ষমতা বাড়াতে কাজ করার জন্য তিনি বিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন কোনো জিনগত পরিবর্তন করা উচিত নয়, যাতে ফলের স্বাভাবিক স্বাদ নষ্ট হয়।

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন শুধু স্বাদ নয়, নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদক, রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

রাজশাহীর একটি আমগাছ। ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রাজশাহীর একটি আমগাছ। ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

এয়ার কার্গো ভাড়া: মন্ত্রীর চিহ্নিত বড় বাধা


রপ্তানি খাতের অন্যতম সমস্যা হিসেবে মন্ত্রী উচ্চ এয়ার কার্গো ভাড়ার কথা উল্লেখ করেন এবং জানান, এ সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগের বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখায়, আম রপ্তানির খরচে পরিবহন ভাড়া কতটা বড় অংশ জুড়ে আছে।

২০২৫ সালের জুনে, আগের মৌসুমের রপ্তানি শুরুর সময় একই প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেছিলেন, বিদেশে বাংলাদেশের আম প্রতি কেজি ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছে, অথচ প্রতি কেজির পরিবহন ভাড়াই ৩ থেকে ৪ ডলার। তখন ১৬ দিনে ২৫টি দেশে ৬০০ টন আম পাঠানো হয়েছিল, আর পরের তিন মাসে ৪ হাজার টন রপ্তানির আশা করছিল প্রকল্পটি।

২০২৬ সালের উদ্বোধনের এক মাস আগে, ২৪ এপ্রিল, কৃষিপণ্য বাণিজ্যের প্রকাশনা ফ্রেশপ্লাজা আরোত অ্যাগ্রো বিডি নামের একটি বাংলাদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বরাতে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে বিমান ভাড়া ৩০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ২ ডলারে দাঁড়িয়েছে, আর ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে ভাড়া ৫৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৫ থেকে ৫ দশমিক ৩ ডলার হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রপথে একটি কনটেইনারের খরচ ২ হাজার ৮০০ ডলার থেকে বেড়ে ৬ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ৪০০ ডলারে উঠেছে।

দেশের ভেতরে পণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও ছাড়পত্রের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। ২০২৫ সালের ৩১ মে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে কাস্টমস ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র এক জায়গা থেকে দেওয়া হবে, যাতে সময় ও খরচ দুটোই কমে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, তখন ঢাকার গাবতলীতে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সুবিধা চালু ছিল, শ্যামপুর ও পূর্বাচলে আরও স্থাপনা নির্মাণাধীন ছিল এবং যৌথ ছাড়পত্রের জন্য কাস্টমসের কার্যক্রম শ্যামপুরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। শ্যামপুরেই রয়েছে কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউস, যেখানে ২০২৩ সালের আম রপ্তানি মৌসুমের উদ্বোধন হয়েছিল।

উৎপাদন বিপুল, রপ্তানি সামান্য


বাংলাদেশ যে পরিমাণ আম উৎপাদন করে, তার খুব সামান্য অংশই বিদেশে যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে বণিক বার্তা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে জানায়, সেই মৌসুমে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ২৫ লাখ টন আম পাওয়ার আশা ছিল, যার মধ্যে আনুমানিক ৪০ হাজার টন রপ্তানির উপযোগী বিবেচিত হয়। অধিদপ্তরের একই হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ লাখ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৫ লাখ টন। ২০২৩ সালের মে মাসে তৎকালীন কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তার বাংলাদেশকে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

রপ্তানির পরিমাণ যেমন কম, তেমনি বছরভেদে ওঠানামাও বেশি। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য দিয়ে জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে আম রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল মাত্র ০ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার, আর রপ্তানির পরিমাণ ছিল সে বছরের মোট উৎপাদনের শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রেশপ্লাজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ১০০ টন, ২০২৪ সালে তা কমে ১ হাজার ৩২১ টনে নামে, আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ৬৬ শতাংশ বেড়ে রপ্তানি দাঁড়ায় ২ হাজার ১৯৪ টনে।

একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের আম গেছে ২৬টি দেশে। সবচেয়ে বেশি আম কিনেছে যেসব দেশ:

  • যুক্তরাজ্য: ৬৮৬ টন
  • সৌদি আরব: ৩৫৬ টন
  • ইতালি: ২৬৪ টন
  • কুয়েত: ১৬৭ টন
  • কাতার: ১৬৩ টন
  • নতুন গন্তব্য চীন: ৫ টন

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ২৩টি জেলায় আমের চাষ হয় এবং ৭২টি জাত চাষ করা হলেও রপ্তানি হয় মাত্র সাত বা আটটি জাত। মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই আম্রপালি; রপ্তানিযোগ্য অন্য জাতের মধ্যে রয়েছে হিমসাগর, ল্যাংড়া, বারি আম-৪ ও ফজলি। দেশের ভেতরে আমের বাজারের আকার ধরা হয় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) হিসাবে ২০২৪ সালে বিশ্বে তাজা আমের রপ্তানি ছিল ২১ থেকে ২২ লাখ টন, যার মধ্যে বাংলাদেশের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

২০২৬ মৌসুম নিয়ে ফ্রেশপ্লাজা ৮ মে জানায়, এবার মোট উৎপাদন ২৭ লাখ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে, আমের আবাদ বেড়ে ২ লাখ ৪ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে এবং রপ্তানির লক্ষ্য ৩ হাজার টন। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান প্রকাশনাটিকে বলেন, এ বছর মালয়েশিয়া ও জাপানসহ নতুন বাজার যুক্ত হতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আম সংগ্রহের মৌসুম চলে ৫ মে থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, প্রধানত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও দিনাজপুরে। রপ্তানির আম প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পরিপক্ব অবস্থায় পাড়া হয়, আর চাষিদের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১০ থেকে ১২ টন। রংপুরে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হয় ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে, যার আনুমানিক বাণিজ্যমূল্য ২৫০ কোটি টাকার বেশি, এবং এ আম এর আগেই মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বিক্রি হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি প্রচলিত আমের হাটে কাঁচা আমভর্তি সাইকেল। ছবি: Mahinur11 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি প্রচলিত আমের হাটে কাঁচা আমভর্তি সাইকেল। ছবি: Mahinur11 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

যে প্রকল্পের উদ্যোগে এই আয়োজন


উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজক রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প, যা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২২ থেকে ২০২৭ সাল মেয়াদে বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪৭ কোটি টাকা এবং এর আওতায় রয়েছে ১৫টি জেলার ৪৬টি উপজেলা। ২০২৩ সালের মে মাসে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, প্রকল্পের অধীনে ২ হাজার ৩০০টি প্রদর্শনী প্লট ও ২ হাজার ৩০০টি আমবাগান স্থাপন এবং বিদ্যমান বাগানে ১ হাজার ৮৪০টি সার ও বালাই ব্যবস্থাপনা স্থান তৈরির পরিকল্পনা ছিল। মানসম্মত আম উৎপাদনের জন্য ডাল ছাঁটাই (প্রুনিং), ফল ব্যাগিং ও বালাই ব্যবস্থাপনার মতো আধুনিক পদ্ধতি ছড়িয়ে দেওয়াও প্রকল্পের লক্ষ্য। চাষিদের ছোট কৃষিযন্ত্র দেওয়ার কথাও ছিল, যেমন আম পাড়ার যন্ত্র, হাইড্রলিক আম হারভেস্টার, গার্ডেন টিলার, হ্যান্ড স্প্রেয়ার ও ফুট পাম্প।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, প্রকল্পটির লক্ষ্য আমের উৎপাদন ৫ শতাংশ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা। সে সময় তৎকালীন কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তার বলেছিলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না হওয়ায় দেশের মোট আমের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়।

আম রপ্তানি মৌসুমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এখন প্রতিবছরের আয়োজনে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৫ মে ঢাকার শ্যামপুরের কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে প্রকল্পটি বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যৌথভাবে মৌসুমের উদ্বোধন করে। তখন প্রথম চালানে চারটি দেশে ১০ টন আম পাঠানো হয় এবং বছরের লক্ষ্য ধরা হয় ৪ হাজার টন; সচিব জানান, আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৭৫৭ টন। ২০২৫ সালের ২৯ মে, ২০২৬ সালের মতোই, উদ্বোধন হয় বিএআরসি মিলনায়তনে। ফ্রেশপ্লাজার উদ্ধৃত বাসসের তথ্য অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত পাঁচটি দেশে ১৩ টন আম পাঠানো হয়েছিল: যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সৌদি আরব, কাতার ও বাহরাইন।

গ্যাপ সনদ ও এর পেছনের নিয়ম


মন্ত্রী চাষিদের হাতে যে সনদ তুলে দেন, তা দেওয়া হয় বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা নীতিমালার আওতায়। সরকার ২০২০ সালের ২১ ডিসেম্বর এ নীতিমালা গ্রহণ করে, সঙ্গে ছিল ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল মেয়াদের পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা। উৎপাদন থেকে শুরু করে ফসল-উত্তর প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত ভালো চর্চা নিশ্চিত করা এ নীতির বিষয়, আর এর লক্ষ্য নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং রপ্তানির জন্য উচ্চমূল্যের ফসলের উৎপাদন বাড়ানো।

২০২০ সালের জুলাইয়ে নীতিমালাটি ঘোষণার সময় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয় চায় চাষ থেকে বিপণন পর্যন্ত কৃষি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে গ্যাপের নিয়ম মানা হোক। প্রতিবেদনে বর্ণিত সনদ ব্যবস্থার মূল দিকগুলো ছিল:

  • গ্লোবাল গ্যাপের আদলে প্রত্যেক সনদপ্রাপ্ত উৎপাদকের জন্য ১৩ অঙ্কের বাংলাদেশ গ্যাপ নম্বর
  • প্রতিবছর সনদ নবায়নের বাধ্যবাধকতা
  • একটি স্বতন্ত্র অ্যাক্রেডিটেশন সংস্থার তদারকি
  • আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা
  • চাষের প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ

একই প্রতিবেদনে এর কারণও তুলে ধরা হয়: ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানি আগের বছরের ৯০৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৮৬২ মিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। তৎকালীন কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেছিলেন, মাছ, সবজি, ফল ও পোলট্রি উৎপাদনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক তালিকায় ওপরের দিকে থাকলেও পণ্যের মান নিশ্চিত করতে না পারায় রপ্তানি আয়ে দেশ তলানিতে রয়ে গেছে।

দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালের জানুয়ারিতে জানায়, বাংলাদেশ গ্যাপের স্কিম মালিক করা হয়েছে বিএআরসিকে, আর কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি স্টিয়ারিং কমিটি, একটি কারিগরি কমিটি ও একটি সনদ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি অবজারভার জানায়, বিএআরসি আম ও কাঁঠালসহ ১৫টি ফসলের গ্যাপ প্রটোকল তৈরি করেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত পার্টনার প্রকল্প মাঠপর্যায়ে এ কাজে সহায়তা দিচ্ছে এবং পরের তিন বছরে ৩ লাখ হেক্টর জমিতে গ্যাপ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৭ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের একটি গ্যাপ যাচাই কার্যক্রম ১৮ জন কূটনীতিককে দেখানো হয়।

সরকার, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) অর্থায়নে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন মেয়াদে চলা পার্টনার প্রকল্প ২০২৫ সালের ৩১ মে গ্যাপ সনদপ্রাপ্ত আমের বাণিজ্য চালু করে; এর অংশীদারদের মধ্যে ছিল হর্টেক্স ফাউন্ডেশন।

চীন: আগে আম, অপেক্ষায় কাঁঠাল


মন্ত্রী চীনে কাঁঠাল রপ্তানির সম্ভাবনার কথাও বলেন। তিনি জানান, চীন বাংলাদেশ থেকে বড় পরিসরে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে দেশে একটি আধুনিক প্যাকিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চীনের বাজারে প্রথম ঢুকেছে আম। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চীন বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন দেয়। চীনের সরকারি বেল্ট অ্যান্ড রোড পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৮ মে তিন টন আমের প্রথম চালান হুনান প্রদেশের চাংশায় পৌঁছায়, এবং চাংশা হুয়াংহুয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তারা লেবেল ও উদ্ভিদস্বাস্থ্য সনদ যাচাই করে চালানটি ছাড় দেন। আমদানিকারক হুনান বাবাইলি হোল্ডিং গ্রুপের অনুমান ছিল, প্রথম বছরে ১০০ টনের বেশি আম আমদানি হবে। ফ্রেশপ্লাজার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের হিসাবে সে বছর চীনে গেছে ৫ টন বাংলাদেশি আম।

কাঁঠালের ক্ষেত্রে তখনো অপেক্ষা চলছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের কাঁঠাল ও পেয়ারার জন্য চীনের বাজার খুলতে দেশটি কাজ করছে।

কাঁঠাল (Artocarpus heterophyllus) বাংলাদেশের জাতীয় ফল এবং গাছে ধরা ফলের মধ্যে সবচেয়ে বড়; একটি কাঁঠালের ওজন ৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাপিডিয়ায় ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের তথ্যে দেখা যায়, দেশে ২৫ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হতো এবং বার্ষিক উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টন, যা তখন দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ। বাংলাপিডিয়া দেশে তিন ধরনের কাঁঠালের কথা বলে: শক্ত কোষের খাজা, খুব রসাল ও নরম কোষের গালা, আর এ দুয়ের মাঝামাঝি দোরসা। পাকা কাঁঠালের কোষ তাজা খাওয়া হয়, সিরায় সংরক্ষণ বা শুকিয়ে রাখা হয়, কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে রান্না হয়, আর বিচি সেদ্ধ বা ভেজে খাওয়া হয়।

গাছে ঝুলছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
গাছে ঝুলছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

বাংলাদেশে আম


আমের বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica, এটি অ্যানাকার্ডিয়েসি পরিবারের উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া বলছে, আমের উৎপত্তির ইতিহাস প্রাচীনকালের অতলে হারিয়ে গেছে, তবে ধারণা করা হয় এটি বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের আদি ফল। বাংলাপিডিয়া আমকে ফলের রাজা বলে উল্লেখ করেছে। আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ।

বাংলাপিডিয়ার তালিকায় দেশের উৎকৃষ্ট জাতের মধ্যে রয়েছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর ও খিরসাপাত, যেগুলো প্রধানত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে জন্মে। এর পাশাপাশি রয়েছে বীজ থেকে জন্মানো স্থানীয় দেশি বা গুটি আম, যার মান নিশ্চিত নয়। উত্তর-পশ্চিমের চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দেশের আমের রাজধানী বলা হয়। বর্তমানে রপ্তানির শীর্ষে থাকা আম্রপালি দশেরি ও নীলম জাতের সংকর, যা ১৯৭১ সালে দিল্লির ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে উদ্ভাবন করা হয়; এর শাঁস গাঢ় কমলা-লাল রঙের।

বিশ্বজুড়ে হিসাব দেখলে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যান ভান্ডার ফাওস্ট্যাটের তথ্যে ২০২৩ সালে আম, ম্যাঙ্গোস্টিন ও পেয়ারার মোট উৎপাদন ছিল ৬ কোটি ১০ লাখ টন। এর ৪৩ শতাংশই উৎপাদন করেছে ভারত; এরপর ছিল ইন্দোনেশিয়া, চীন, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও ব্রাজিল।

অনুষ্ঠানের দুই প্রতিষ্ঠান


উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত বিএআরসিতে। বিএআরসি ১৯৭৩ সালে সে বছরের রাষ্ট্রপতির আদেশ ৩২ অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা কার্যক্রমের সমন্বয় করে, গবেষণার অগ্রাধিকার ঠিক করে, কর্মসূচির মূল্যায়ন করে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। চারটি মন্ত্রণালয়ের অধীনের ১০টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এটি কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যার মহাপরিচালক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগ এবং রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ফ্রেশপ্লাজা, বণিক বার্তা, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি অবজারভার, বেল্ট অ্যান্ড রোড পোর্টাল (চীন), প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)