২০২৪ সালের নভেম্বরে কয়েক দফা বন্যার পর তিস্তার পানি নেমে গেলে লালমনিরহাটে নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরে ভুট্টার বীজ বোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন কৃষকেরা। জাগো নিউজের ২৪ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্তীর্ণ চরে ভুট্টার পাশাপাশি আলু, পেঁয়াজ, রসুন, বাদাম ও নানা শাকসবজির চাষও শুরু হয়েছিল। আগাম ফসলে লাভের আশায় চাষিরা মাঠে নামলেও বীজ ও সারের বাড়তি দাম তাঁদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল।
বালুচরে বীজ বোনা, কোথাও গজিয়েছে চারা
সরেজমিনে দেখা গিয়েছিল, কোথাও কৃষকেরা সবে ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ ও রসুনের বীজ বুনছেন, কোথাও ভুট্টার চারা গজিয়ে গেছে। পোকামাকড় থেকে চারা বাঁচাতে অনেকে কীটনাশক স্প্রে করছিলেন। তিস্তা চরের কৃষক মহির আলী জাগো নিউজকে বলেছিলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ভুট্টা চাষ করে বেঁচে আছি। অন্য ফসলের চেয়ে ভুট্টা চাষ করে লাভবান হওয়া যায়।’
চর হলো নদীর বুকে বা তীরে পলি ও বালু জমে জেগে ওঠা ভূমি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশের নদীতে ভাঙন ও পলি জমার ধারায় নদীর মাঝে দ্বীপের মতো জেগে ওঠা চর (দ্বীপচর) কিংবা তীরের সঙ্গে লেগে থাকা চর (সংযুক্ত চর) প্রায়ই বসতি ও চাষাবাদের নতুন সুযোগ তৈরি করে। তবে চরগুলো ভাঙন ও বন্যার বড় ঝুঁকিতে থাকে: প্রতিবছর চরের বড় অংশ প্লাবিত হয়, আর বন্যা আগাম এলে খেতের ফসল নষ্ট হতে পারে। যমুনা, গঙ্গা, পদ্মা ও মেঘনার চরের তুলনায় তিস্তার চরের মোট আয়তন অনেক কম বলে উল্লেখ করেছে বাংলাপিডিয়া।

জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য ভুট্টা
রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলায় পাঁচটি উপজেলা: লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম। তিস্তা নদী জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানা ধরে বয়ে গেছে। ব্যাপক ফলনের কারণে ভুট্টা জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য হিসেবে স্থান পেয়েছে, আর পাঁচ উপজেলাজুড়েই এর চাষ হয়।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছিল, সেবারের রবি মৌসুমে জেলায় ৩২ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। জেলার তিনটি উপজেলায় চর উন্নয়ন প্রকল্প চালু হয়েছিল; এর আওতায় প্রতি ব্যাচে ৩০ জন করে ১৬টি ব্যাচে কৃষকদের চাষের প্রযুক্তি ও কলাকৌশলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল।
জেলায় ভুট্টা চাষের পরিসর বোঝা যায় আগের হিসাব থেকেও। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য দিয়ে জানিয়েছিল, সেই মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলায় ৩৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছিল, আগের বছর যা ছিল ৩৪ হাজার ৫৭০ হেক্টর; জেলায় প্রায় ৪০ হাজার কৃষক ভুট্টা চাষ করতেন। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিস্তার চরে ভুট্টার আবাদ শুরু হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি, আর ফসল তোলা শুরু হয় এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে।

বীজ ও সারের দামে দুশ্চিন্তা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর প্রতি কেজি ভুট্টা বীজের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়েছিল। হাতীবান্ধা উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘গতবারের চেয়ে এ বছর ভুট্টা বীজের দাম বেশি। প্রতি কেজি বীজ ৭০০-৮০০ টাকা করে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এভাবে সার ও বীজের দাম বাড়লে তো আমরা বিপাকে পড়বো।’
হাতীবান্ধা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছিলেন, ‘উপজেলার চর এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা চাষাবাদ হয়েছে। পাশাপাশি অন্য ফসলও চাষাবাদ হচ্ছে। ভুট্টাসহ অন্য ফসল চাষাবাদ করে কৃষকদের জীবন পরিবর্তন হচ্ছে।’
লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইখুল আরিফিন বলেছিলেন, ‘তিস্তার পানি নেমে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। চরের কৃষকেরা বসে নেই। জমি তৈরি করে বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করছেন। কৃষকদের মাঝে উৎপাদনের কলাকৌশল টেকনোলজি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’ আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ও পোকার আক্রমণ না হলে সে মৌসুমে বাম্পার ফলনের আশা করছিলেন কৃষকেরা।

ছবি: Noormsv / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)