রংপুর জেলায় বাণিজ্যিকভাবে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের চাষ দিন দিন বাড়ছে। ২০২৬ সালের ২৯ মে জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাজারে খড় ও কারখানায় তৈরি গো-খাদ্যের বিকল্প হিসেবে এই ঘাস জেলার খামারিদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় প্রথাগত ধান চাষের চেয়ে নেপিয়ার ঘাসে কয়েক গুণ বেশি লাভ হচ্ছে বলে কৃষকেরা জানান, আর সে কারণেই তাঁরা ধানের জমিতে মাঠের পর মাঠ ঘাস লাগাচ্ছেন।
প্রতিবেদক জেলার বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও রংপুর সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন, এক সময়ের ফসলি জমি, পতিত জমি আর বাড়ির আশপাশ এখন নেপিয়ার ঘাসে সবুজ। দূর থেকে এসব ক্ষেত ধানক্ষেতের মতো দেখায়, কিন্তু আসলে এগুলো গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য লাগানো উন্নত জাতের ঘাসের ক্ষেত।
কৃষকদের হিসাবে ধান আর ঘাসের লাভ
স্থানীয় কৃষকেরা জাগো নিউজকে যে হিসাব দেন, তাতে এক একর জমিতে বছরে দুবার ধান চাষ করে খরচ বাদে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ করাও কঠিন। অথচ একই জমিতে বছরে চার থেকে পাঁচবার ঘাস কেটে বিক্রি করে খরচ বাদে লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। এই হিসাব কৃষকদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে দেওয়া, কোনো সরকারি সমীক্ষার ফল নয়।
বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের কৃষক মমদেল হোসেন জানান, আগে খড়ের দাম বেশি থাকায় গরু পালা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন তিনি নিজের দুই বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করেন। তাঁর ভাষায়, 'নিজের খামারের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত ঘাস বাজারে বিক্রি করে প্রতি বিঘায় (৩০ শতাংশ) বছরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা বাড়তি লাভ হচ্ছে। ঘাস বিক্রির টাকায় এখন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ খুব সহজেই চলে যাচ্ছে।'
কৃষকেরা বলেন, ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় এই ঘাস চাষে সার, কীটনাশক ও মজুরির খরচ অনেক কম লাগে, আর একবার চারা রোপণ করলে চার থেকে পাঁচ বছর ধরে একটানা ফলন পাওয়া যায়। ঘাসচাষিদের ভাষ্য, ধান কাটার পর আবার নতুন করে জমি তৈরি থেকে শুরু করে নানা কাজ করতে হয়; তাতে খরচ হয়, কিন্তু সে অনুযায়ী লাভ আসে না। অন্যদিকে নেপিয়ার একবার লাগালে চার-পাঁচ বছর বিক্রি করা যায়, মাঝে শুধু জমি পরিচর্যার খরচ বহন করতে হয়।
রংপুর সদর উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক খয়বার আলী জাগো নিউজকে নিজের চাষের অভিজ্ঞতা জানান। তাঁর মতে, উঁচু জমিতে এই ঘাস ভালো হয়, আর একবার ঘাসের মুড়া লাগালে চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ঘাস পাওয়া যায়। তিনি সারি থেকে সারির দূরত্ব সাড়ে তিন থেকে চার ফুট রাখার কথা বলেন। সারা বছরই ঘাস লাগানো যায়, তবে বর্ষাকালে লাগালে ভালো হয় বলে তিনি জানান। লাগানোর সময় তিনি জমিতে প্রচুর গোবর সার দেন, এবং তাঁর অভিজ্ঞতায় রোপণের প্রায় ৫০ দিনের মাথায় প্রথমবার ঘাস কাটা যায়।
পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের বগুড়াপাড়ার কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, 'আগে বাজারে কেনা ভুসি আর খৈল খাওয়াতে গিয়ে লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যেত। গত বছর থেকে এক বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ শুরু করি। এখন গরুর খাবারের পেছনে খরচ অর্ধেক হয়ে গেছে, আর গাভীর দুধের পরিমাণও আগের চেয়ে বেড়েছে।'

হাটে আঁটি বেঁধে ঘাসের কেনাবেচা
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বাজারগুলোতে এখন ধানের মতোই নেপিয়ার ঘাস আঁটি বেঁধে বাণিজ্যিকভাবে কেনাবেচা হচ্ছে। রংপুর নগরীর খামার মোড়ে ঘাস বিক্রেতা সবুর আলী জানান, তিনি কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি গোছা নেপিয়ার ঘাস ৪ টাকা করে কিনে বাজারে এনে ৯ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি করেন। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদের সময় এই ঘাসের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায় বলে তিনি জানান। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় সেই কোরবানির মৌসুমেই, যখন খামারিরা ঈদের বাজারের জন্য গরু মোটাতাজা করেন।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের দুগ্ধশিল্পের অগ্রগতি ধরে রাখতে নেপিয়ারের মতো উন্নত জাতের সবুজ ঘাস চাষের বিকল্প নেই। তাঁদের মত, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কাটিং সরবরাহ আরও সহজলভ্য করা গেলে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
মিঠাপুকুর ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আমজাদ সরকার জাগো নিউজকে বলেন, নেপিয়ার দ্রুত বাড়ে এবং একবার রোপণ করলে বছরে প্রায় চার থেকে ছয়বার কাটা যায়। তাঁর দাবি, সাধারণ ঘাসের তুলনায় নেপিয়ারে প্রোটিন ও আঁশ অনেক বেশি, যা গাভীর দুধ বাড়াতে ও গবাদিপশুর দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তিনি আরও বলেন, যেকোনো পরিত্যক্ত জমি, রাস্তার ধার বা বাড়ির আঙিনায় সামান্য সার ও সেচ দিয়েই এই ঘাস চাষ করা যায়, আর এতে রোগবালাইয়ের উপদ্রবও কম। ঘাসটির পুষ্টিমান নিয়ে গবেষকেরা কী বলেন, তা নিচে পুষ্টি অংশে তুলে ধরা হলো।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব ও বক্তব্য
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জাগো নিউজ জানায়, জেলায় গবাদিপশু ও খামারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। খামারিদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর গো-খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের কাটিং (কাণ্ড) বিতরণ করা হচ্ছে এবং চাষ পদ্ধতি নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
দপ্তরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জেলায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০৭ দশমিক ৪০ একর জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে, অর্থাৎ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় চলমান অর্থবছরে, ১৩৭ দশমিক ৯০ একরের বেশি জমিতে নেপিয়ার চাষ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার মেট্রিক টন।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাজমুল হুদা জাগো নিউজকে বলেন, 'সারাদেশেই গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে উচ্চ ফলনশীল নেপিয়ার ঘাস। বাজারে কৃত্রিম গো-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পশুপালনে খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। এই পরিস্থিতিতে খড়ের বিকল্প এবং পুষ্টিকর সমাধান হিসেবে নেপিয়ার ঘাস চাষে ঝুঁকছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ডেইরি ফার্মের মালিকরা।' তাঁর হিসাবে, নেপিয়ার চাষ করে একদিকে পশুর পুষ্টির চাহিদা মেটানো যাচ্ছে, অন্যদিকে খামারিদের উৎপাদন খরচ কমছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
নাজমুল হুদা আরও বলেন, নেপিয়ার ঘাস গবাদিপশুর জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর; এটি খাওয়ালে গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ে এবং পশুর রোগবালাইও কম হয়। রংপুরের গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে এবং দুগ্ধশিল্পের অগ্রগতি ধরে রাখতে নেপিয়ার চাষ সামনে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
রংপুর জেলা: তিস্তা অববাহিকার কৃষিনির্ভর জনপদ
রংপুর জেলা দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের অংশ। আট জেলা নিয়ে গঠিত এই বিভাগের সদর দপ্তর রংপুর শহর। জেলার উত্তরে নীলফামারী, দক্ষিণে গাইবান্ধা, পূর্বে কুড়িগ্রাম আর পশ্চিমে দিনাজপুর। জেলার মাটির প্রায় ৮০ শতাংশ তিস্তা অববাহিকার পলিমাটি, বাকিটা বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি। ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর রংপুর জেলা ভেঙে পাঁচটি জেলা করা হয়।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ৩১ লাখ ৬৯ হাজার ৬১৪, খানা ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৩০৭টি; জনসংখ্যার ৩২ দশমিক ৫৫ শতাংশ শহরে বাস করেন। জেলায় একটি সিটি করপোরেশন, তিনটি পৌরসভা (বদরগঞ্জ, হারাগাছ ও পীরগঞ্জ) এবং আটটি উপজেলা রয়েছে: বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, রংপুর সদর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে যে পাঁচ উপজেলায় ঘাসচাষের বিস্তারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এর মধ্যেই।
বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে প্রতিবছরের বন্যার কারণে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত, তেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়নি বলে উইকিপিডিয়ার জেলা নিবন্ধে উল্লেখ আছে। বন্যার এই ইতিহাস নেপিয়ার চাষের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক, কারণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে এই ঘাস জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। খয়বার আলীর অভিজ্ঞতায় উঁচু জমিতে ভালো ফলনের যে কথা এসেছে, তা এর সঙ্গে মেলে।

নেপিয়ার ঘাস কী
নেপিয়ার ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম Cenchrus purpureus; আগের নাম Pennisetum purpureum। ইংরেজিতে একে এলিফ্যান্ট গ্রাস বা উগান্ডা গ্রাসও বলা হয়। এটি আফ্রিকার তৃণভূমির আদি বাসিন্দা, পোয়েসি (Poaceae) পরিবারের বহুবর্ষজীবী সি-ফোর (C4) ঘাস। গাছটি লম্বা হয় এবং বাঁশের মতো ঘন ঝাড় তৈরি করে। এর বীজ খুব কমই পুরোপুরি তৈরি হয়, তাই সাধারণত কাণ্ডের কাটিং দিয়ে এর চাষ করা হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, পানি ও পুষ্টির চাহিদা কম বলে এটি অনাবাদি জমিও কাজে লাগাতে পারে।
পশুখাদ্যের আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার ফিডিপিডিয়া জানায়, এটি গ্রীষ্মমণ্ডলের সবচেয়ে উৎপাদনশীল পশুখাদ্য ঘাসগুলোর একটি এবং প্রধানত কেটে এনে খাওয়ানোর (কাট অ্যান্ড ক্যারি) পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়। ২৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর বছরে দেড় হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি এর জন্য উপযোগী; ১৫ ডিগ্রির নিচে বৃদ্ধি থেমে যায়। এটি ভালো নিষ্কাশনের মাটি পছন্দ করে, দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় টিকতে পারে না; নিষ্কাশন খারাপ হলে উঁচু বেডে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। মাটির অম্লমান (পিএইচ) ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ২ পর্যন্ত এটি জন্মাতে পারে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য সাধারণত এক থেকে তিন মাস পরপর ঘাস কাটা হয়। কাটার ব্যবধান বেশি হলে কাণ্ডের ভাগ বাড়ে, তখন ঘাস চিবানো ও হজম করা পশুর জন্য কঠিন হয়। পূর্ব আফ্রিকার দুগ্ধখামারিদের কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পশুখাদ্য ফসল।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৪ সালের জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নেপিয়ার আসে ১৯৯০-এর দশকে, স্কুলের কৃষিশিক্ষা বইয়েও এর কথা পড়ানো হতো; তবে দেশজুড়ে এর চাষ ছড়িয়েছে মূলত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা তখন পত্রিকাটিকে জানান, দেশের সব উপজেলাতেই এখন নেপিয়ার চাষ হচ্ছে, যদিও মোট কত জমিতে চাষ হয় সেই হিসাব তিনি দিতে পারেননি।

বিএলআরআইয়ের উদ্ভাবিত জাত ও চাষের নির্দেশনা
সাভারের বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিএলআরআই) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন পশুখাদ্য ঘাসের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৩ সালের 'প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি উৎপাদন প্রযুক্তি নির্দেশিকা (পরিমার্জিত)' অনুযায়ী, শুরুতে আন্তর্জাতিক প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএলআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়ার সিএসআইআরও থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করা হয়। পরে কয়েক দফায় নেপিয়ারের কয়েকটি জাত সংগ্রহ করে দেশের আবহাওয়ায় চাষ, বাছাই ও উন্নয়ন করা হয়।
এই কাজের ফলে বিএলআরআই নেপিয়ার-১ (নেপিয়ার বাজরা), বিএলআরআই নেপিয়ার-২ (নেপিয়ার অ্যারোসা), বিএলআরআই নেপিয়ার-৩ (হাইব্রিড নেপিয়ার) এবং বিএলআরআই নেপিয়ার-৪ সহ মোট ১২টি জাত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, নেপিয়ার-১ এবং নেপিয়ার-৪ দুটোই উন্নত অ্যাকসেশন বাছাই করে তৈরি। এগুলো বহুবর্ষজীবী, একবার লাগালে তিন থেকে চার বছর ঘাস কাটা যায়।
বিএলআরআই জানায়, বছরের যেকোনো সময় নেপিয়ার লাগানো যায়, তবে ফাল্গুন থেকে আষাঢ় মাস উত্তম সময়। কার্তিক বা অগ্রহায়ণে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাটিং বিছিয়ে দিলেও সহজে ঘাস জন্মায়, এবং তখন একই সঙ্গে মিশ্র ফসল হিসেবে মাসকলাই বা খেসারির বীজ বোনা যায়। দেশের প্রায় সব ধরনের মাটিতে, এমনকি পাহাড়ি ঢাল ও সীমিত লবণাক্ত জমিতেও এ ঘাস জন্মে; তবে জলাবদ্ধ জমি এর জন্য উপযোগী নয়। বাথান এলাকায় অক্টোবর-নভেম্বরে এবং অন্য এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে মিল রেখে মার্চ-এপ্রিলে রোপণের কথাও নির্দেশিকায় আছে।
নির্দেশিকায় নেপিয়ার-১ এর জন্য এক সারি থেকে আরেক সারির দূরত্ব ৭০ সেন্টিমিটার (প্রায় দুই ফুট) এবং এক কাটিং থেকে আরেক কাটিংয়ের দূরত্ব ৩৫ সেন্টিমিটার (প্রায় এক ফুট) রাখতে বলা হয়েছে; পাকচং ও নেপিয়ার হাইব্রিডের বেলায় সারির দূরত্ব তিন ফুট আর কাটিংয়ের দূরত্ব দেড় ফুট দিলে গাছ ভালোভাবে ছড়াতে পারে। কাটিং ৪৫ ডিগ্রি কোণে রোপণ করতে হয়। শুকনো মৌসুমে মাটির আর্দ্রতা বুঝে ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর সেচ দিতে হয়। খয়বার আলী যে সাড়ে তিন থেকে চার ফুট সারির দূরত্বের কথা বলেছেন, তা বিএলআরআইয়ের সুপারিশের চেয়ে কিছুটা বেশি।
নেপিয়ার-১ গ্রীষ্মকালে ৩৫ থেকে ৪৫ দিন এবং শীতকালে ৬০ থেকে ৭০ দিন পরপর কাটা যায়; নেপিয়ার-৪ গ্রীষ্মে ৩৫ থেকে ৪০ দিন আর শীতে ৪০ থেকে ৫০ দিন পরপর। প্রথম বছরে চার থেকে পাঁচবার এবং পরের বছরগুলোতে ছয় থেকে সাতবার ঘাস কাটা যায়। বিএলআরআইয়ের হিসাবে নেপিয়ার-১ এর বার্ষিক ফলন হেক্টরপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টন এবং নেপিয়ার-৪ এর ২২০ থেকে ২৫০ টন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এক একর জমিতে বছরে ১৮০ থেকে ১৯০ টন নেপিয়ার উৎপাদন করা যায় বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪ সালে জানায়।
জমি তৈরির সময় ও প্রতিবার ঘাস কাটার পর কতটা জৈব ও রাসায়নিক সার দিতে হবে, নির্দেশিকায় তারও মাত্রা দেওয়া আছে। মাটি ও জমির অবস্থাভেদে প্রয়োজন বদলায়, তাই চাষ শুরুর আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় বা উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
পুষ্টিমান, খাওয়ানোর নিয়ম ও সংরক্ষণ
বিএলআরআইয়ের নির্দেশিকায় ৫০ দিন বয়সী নেপিয়ার-১ ঘাসের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে (নেপিয়ার-৪ এর জন্যও একই মান দেওয়া আছে), তাতে প্রতি ১০০ কেজি কাঁচা ঘাসে পানি থাকে ৭৫ থেকে ৮০ কেজি এবং আমিষ ১ দশমিক ১৫ থেকে ১ দশমিক ২০ কেজি। প্রতি ১০০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য একটি গরু দিনে ৮ থেকে সাড়ে ৮ কেজি ঘাস খায়। দানাদার খাদ্য ছাড়া শুধু এই ঘাস খাইয়ে ষাঁড়ের দৈহিক ওজন দিনে ২৯৬ গ্রাম বাড়ে, আর দানাদার খাদ্যসহ খাওয়ালে দেশি গাভীতে দুধ উৎপাদনের হিসাব সাড়ে তিন থেকে চার কেজি।
খাওয়ানোর নিয়ম সম্পর্কে নির্দেশিকা বলছে, ঘাস কেটে টুকরো টুকরো করে খাওয়ানো যায়, আবার দুই-তিন ইঞ্চি করে কেটে খড়ের সঙ্গে মিশিয়েও দেওয়া যায়। নেপিয়ার শুকিয়ে রাখলে পুষ্টিমান কমে যায়, কিন্তু সাইলেজ (কাঁচা ঘাস প্রক্রিয়াজাত করে বায়ুরোধী অবস্থায় সংরক্ষণ) করলে পুষ্টিমান অটুট থাকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপ্রকল্প পরিচালক মো. তায়েবুর রহমান ২০২৪ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, গরুর প্রতি ১০০ কেজি জীবন্ত ওজনের জন্য দিনে ৫ থেকে ৬ কেজি নেপিয়ার এবং দেড় থেকে দুই কেজি 'হে' (শুকনো সংরক্ষিত ঘাস) দরকার। খেসারি ও মাসকলাইয়ের হে-তে প্রায় ২০ শতাংশ আমিষ থাকে এবং সাইলেজ এক বছর পর্যন্ত রাখা যায় বলেও তিনি জানান।
নেপিয়ারকে অনেকে প্রোটিনসমৃদ্ধ ঘাস বলে উল্লেখ করলেও গবেষকেরা এর পুষ্টিমানের সীমাবদ্ধতার কথাও বলেন। অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র গবাদিপশু খামারিরা নেপিয়ারের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল, কিন্তু এর নিম্ন পুষ্টিমান পশুর উৎপাদনশীলতা সীমিত করে। বিএলআরআইয়ের সঙ্গে তাদের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, রোপণের ঘনত্ব আর কত দিন পরপর কাটা হবে তা পরিকল্পিতভাবে ঠিক করলে ঘাসের অপরিশোধিত আমিষ ও বিপাকযোগ্য শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এ বিষয়ে সাভারে বিএলআরআইয়ে অধ্যাপক ক্যামেরন ক্লার্ক পাঁচ দিনের একটি প্রশিক্ষণ দেন, যাতে কৃষক, তরুণ গবেষক ও প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মিলিয়ে ৫০ জন অংশ নেন; প্রশিক্ষণে অর্থায়ন করে ক্রফোর্ড ফান্ড।
ভৈরবের এক খামারিও ২০২৪ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, দেশি ঘাসে নেপিয়ারের চেয়ে বেশি আমিষ থাকে, কিন্তু সেই ঘাস প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় না এবং নেপিয়ারের মতো এত বেশি ফলনও দেয় না। অর্থাৎ নেপিয়ারের আসল সুবিধা হলো অল্প জমিতে প্রচুর সবুজ ঘাস পাওয়া; এর পুষ্টিমান অনেকটাই নির্ভর করে জাত, পরিচর্যা আর কত দিন পরপর কাটা হচ্ছে তার ওপর।
গো-খাদ্যের দাম ও সরকারি উদ্যোগ
কারখানায় তৈরি পশুখাদ্যের দাম কেন খামারিদের ভাবায়, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, পশুখাদ্যের উপকরণের প্রায় ৭৫ শতাংশই ভুট্টা ও সয়াবিন মিল: ভুট্টা ৫০ শতাংশ এবং সয়াবিন মিল ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তখন দেশে ব্যবহৃত ভুট্টার অর্ধেক দেশে উৎপাদিত হতো, বাকিটা আমদানি করতে হতো; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় সব ধরনের খাদ্য উপকরণের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়।
২০২৪ সালের জুনে একই পত্রিকার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষিজমি কমে যাওয়ায় দেশে চারণভূমি প্রায় নেই; কেবল এক-দুটি গরুর ছোট খামারিরাই খোলা মাঠে গরু চরাতে পারেন। বড় খামারগুলো আমদানিনির্ভর দানাদার খাদ্যের ওপর ভরসা করে, আর ভুসির দাম কয়েক বছরে অনেক বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা নেপিয়ারের দিকে ঝুঁকেছেন। সীমান্ত দিয়ে অনানুষ্ঠানিক গরু আসার বিষয়ে ভারত সরকার কড়া অবস্থান নেওয়ার পর দেশে গরু পালন বেড়েছে, আর তার সঙ্গে বেড়েছে গো-খাদ্যের চাহিদা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর তখন 'প্রমোটিং হাইব্রিড গ্রাস কাল্টিভেশন ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন ফর লাইভস্টক' নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পাকচং নামের হাইব্রিড নেপিয়ার জাত সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মো. তায়েবুর রহমান পত্রিকাটিকে বলেন, যথেষ্ট নেপিয়ার ও হে উৎপাদন করা গেলে বিদেশ থেকে গো-খাদ্য আমদানির প্রয়োজন হবে না। রংপুরে বিনামূল্যে কাটিং বিতরণ ও প্রশিক্ষণের যে কথা জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানিয়েছে, তা এই সরকারি উদ্যোগেরই অংশ।
একই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের কৃষি জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অংশ ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রির অবদান ছিল ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। হাঁস-মুরগি বাদে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ৫ কোটি ৩৫ লাখ থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ কোটি ৭১ লাখে দাঁড়ায়।
ঘাসচাষের একটি খরচের দিকও প্রতিবেদনটিতে উঠে আসে। ভৈরবের যে কৃষক আগে নিজের জমিতে ধান, আলু ও গম চাষ করতেন, ঘাস লাগানোর পর পরিবারের খাওয়ার জন্যও তাঁকে এসব ফসল কিনতে হচ্ছে। রংপুরে ধানের জমি ঘাসে চলে যাওয়ার খবরেও এই বিনিময়ের প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক।

উত্তরাঞ্চলে আগের অভিজ্ঞতা: গাইবান্ধার পলাশবাড়ী
রংপুর বিভাগে ধানসহ অন্য ফসলের জায়গায় নেপিয়ার চাষের ঘটনা নতুন নয়। ২০২১ সালের ৩১ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরবাড়ী ইউনিয়নের সুলতানপুর বাড়াইপাড়া গ্রামের ২০০ কৃষকের মধ্যে ১৫০ জনই ঘাস চাষ করেন। গ্রামবাসীর ভাষ্য, প্রায় দুই দশক আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে পাওয়া চারা দিয়ে গ্রামের এক কৃষক প্রথম নেপিয়ার চাষ শুরু করেন; পরে তা উপজেলার ৩০ থেকে ৪০টি গ্রামে এবং জেলার সাত উপজেলার হাজারো কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
সেখানকার কৃষকেরা পত্রিকাটিকে জানান, এক বিঘা জমি থেকে প্রতি মাসে পাঁচ-ছয় কেজি ওজনের প্রায় তিন হাজার আঁটি ঘাস কাটা যায়, আর প্রতি আঁটি তখন বিক্রি হতো ৮ থেকে ১০ টাকায়। গ্রামের প্রধান ফসল এক সময় তামাক থাকলেও ঘাস সেই জায়গা নিয়েছে বলে এক কৃষক জানান। আরেক কৃষক বলেন, আগের বছরের বন্যায় খড়ের তীব্র অভাবের সময় এই ঘাসই তাঁদের গবাদিপশু বাঁচিয়েছে। প্রতিদিন সকালে ভ্যানে করে ঘাস গাইবান্ধা, জয়পুরহাট ও বগুড়ার হাটে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও তাঁরা জানান।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তখন জানান, জেলায় ঘাসের আবাদ ৩৭৩ হেক্টর এবং তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। পলাশবাড়ী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার হিসাবে, জেলার মোট ঘাসের ৪০ শতাংশ চাষ হয় ওই উপজেলায় এবং ঘাসচাষের ফলে তামাক চাষ কমেছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, ঘাসকে ফসল হিসেবে ধরা হয় না বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের সরকারি বরাদ্দ নেই; বিষয়টি দেখে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়। রংপুরেও কাটিং বিতরণ ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হাতেই।
ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি উৎপাদন প্রযুক্তি নির্দেশিকা ২০২৩), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ফিডিপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)