২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাগো নিউজ জানায়, প্রতি বছরের মতো সেবারও নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সাবদী, মীরকুণ্ডি ও দিঘলদী এলাকা ফুলে ফুলে ছেয়ে গিয়েছিল। তবে সেই মৌসুমে আগের বছরগুলোর তুলনায় কম জমিতে ফুল চাষ হয়েছিল, আর বিক্রির মৌসুম চলে এলেও অনেক গাছে ফুল পুরোপুরি ফোটেনি। চাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, বর্ষার পানি জমি থেকে নামতে দেরি হওয়ায় চারা রোপণ পিছিয়ে যায়। বন্দর উপজেলা কৃষি অফিসার বলেন, সে বছর জাতীয় দিবসগুলো রমজান মাসে পড়েছে এবং সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারও ছিল; এ কারণে আগের বছরের চেয়ে ফুলের আবাদ কম হয়েছে এবং অনেক ফুলচাষি শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাবদী ও দিঘলদীর ফুলের মাঠ
প্রতিবেদনে এলাকাটিকে একটি বিশাল ফুলের বাগান হিসেবে বর্ণনা করা হয়। চোখ যেদিকে যায়, সেদিকেই ফুল আর ফুল। এ ফুল দেখতে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করছিলেন, আর ছুটির দিনে যেন দর্শনার্থীদের ঢল নামছিল। কৃষকেরা প্রতিবেদককে জানান, বন্দর উপজেলার দিঘলদী ও সাবদীসহ কয়েকটি এলাকায় বছরজুড়েই ফুল চাষ হয়; তবে শীত মৌসুমে, যখন চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন প্রায় সব চাষিই ফুল চাষ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিঘলদী ও সাবদী গ্রামের প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে জিপসি, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, চেরি, জাপানি, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা জাতের ফুল চাষ হচ্ছিল; এগুলো চাষিদের ব্যবহৃত স্থানীয় বাজারি নাম। মাঠের পর মাঠজুড়ে লাল গাঁদা আর গ্লাডিওলাস চোখে পড়ছিল। তবু অন্যান্য বছরের তুলনায় সে বছর ফুল চাষ কম হয়েছিল, আর বিক্রির মৌসুম শুরু হয়ে গেলেও ফুল পরিপূর্ণভাবে ফোটেনি।
দিঘলদী ও সাবদী এলাকার ফুলচাষিরা নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুলের চাহিদার অনেকটাই পূরণ করেন, পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকায়ও এখানকার ফুল যায়। জন্মদিন, বিয়ে, প্রয়াত মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আর গৃহসজ্জায় এসব ফুল ব্যবহার হয়। বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস, বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো দিনগুলোতে চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। নারায়ণগঞ্জে এ চাহিদার অনেকটাই পূরণ করে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদী, দিঘলদী ও মুকুলদী এলাকার ফুল।
আসমাউল হুসনা নামে এক দর্শনার্থী জাগো নিউজকে বলেন, 'শহরের কোলাহল ছেড়ে এই সুন্দর পরিবেশে আসতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বের হওয়া উচিত। জায়গাটা অনেক সুন্দর। হরেক রকমের ফুল দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।'
বর্ষার পর দেরিতে রোপণকে দায়ী করেন চাষিরা
পড়াশোনার পাশাপাশি ফুলের ক্ষেতে কাজ করেন দুর্জয় বারই। তাঁর মতে মৌসুমটি ছিল মাঝারি। তিনি বলেন, 'এ বছর মোটামুটি ফুলের চাষ হয়েছে। কারণ এ বছর বর্ষার পানি নামতে দেরি হওয়ায় সময়মতো ফুল গাছের চারা রোপণ করা যায়নি। যে কারণে ফুল বিক্রির সময় হয়ে গেলেও ফুল ফোটেনি। তারপরও আশা করি চালান উঠে যাবে।'
প্রায় ৪০ বছর ধরে ফুল চাষ ও ফুলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নকুল চন্দ্র হালদারও একই কারণ দেখান। তিনি বলেন, 'এ বছর অবস্থা তেমন ভালো না। বর্ষার পানির কারণে দুই মাস পিছিয়ে চারা রোপণ করা হয়েছে। দুই মাস আগে লাগাতে পারলে ফুল দুই মাস আগে আসতো। সামনে রোজা চলে আসছে। রোজার সময় ফুল তেমন বিক্রি হয় না। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি তেমন ভালো না।'
চাষিদের এই কথার পেছনে রয়েছে মাঠের প্রধান দুই ফুলের বেড়ে ওঠার ধরন। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, আফ্রিকান গাঁদার চারা প্রথমে বীজতলায় তৈরি করা হয় এবং বীজ বোনার প্রায় চার সপ্তাহ পর মাঠে লাগানো হয়; রোপণের প্রায় ৩০ দিন পর গাছের আগা কেটে দেওয়া হয়, যাতে গাছে বেশি ডালপালা হয়; রোপণের প্রায় ৬০ দিন পর থেকে প্রতি তিন দিন অন্তর ফুল তোলা শুরু হয়; আর পুরো ফসলের মেয়াদ প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০ দিন। একই নির্দেশিকা পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থাযুক্ত দোআঁশ মাটির পরামর্শ দেয় এবং সতর্ক করে যে জমিতে পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।
গ্লাডিওলাস বীজ থেকে নয়, কন্দ বা কর্ম থেকে জন্মায়। যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, জাতভেদে রোপণ থেকে ফুল আসতে গ্লাডিওলাসের ৬০ থেকে ১২০ দিন লাগে। এগুলো অন্য দেশের সাধারণ হিসাব, বন্দরের মাঠে মাপা তথ্য নয়; তবে এ থেকে বোঝা যায়, জমিতে কবে চারা বা কন্দ লাগানো গেল আর কবে ফুল বিক্রির উপযোগী হলো, এই দুইয়ের মধ্যে কেন চাষিরা সরাসরি সম্পর্ক দেখেন।

উপজেলা কৃষি অফিস যা বলেছিল
বন্দর উপজেলা কৃষি অফিসার তাসলিমা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, আগের বছরের তুলনায় সে বছর ফুলের আবাদ কম হয়েছে। তাঁর ভাষায়, 'কারণ এ বছর জাতীয় দিবসগুলো রমজান মাসে পড়েছে। সেই সঙ্গে সংসদ নির্বাচনের একটা ব্যাপার আছে। যে কারণে এ বছর ফুল চাষিরা শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'এ বছর নারায়ণগঞ্জ বন্দরে ৬৫ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতি বছরের মতো এবারও প্রায় ৪ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কৃষকেরা ফুল চাষ করেছেন।'
শীতকালীন সবজির দিকে ঝোঁকা উপজেলার চাষের ধরনের সঙ্গে মেলে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বন্দরের প্রধান ফসল হিসেবে আলু, ধান, পাট, সরিষা ও গমের নাম দিয়েছে, আর প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে আলু ও সরিষার নাম রয়েছে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, উপজেলার ৭.১৮ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যেখানে ব্যবসা ২৩.৪৭ শতাংশ ও চাকরি ২৯.০৫ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস; আর ৭০.১৬ শতাংশ পরিবারের নিজের কোনো কৃষিজমি নেই।
রমজান, জাতীয় দিবস ও ফুল বিক্রির মৌসুম
দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ধরা হয়েছিল ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ফুল ব্যবসার সবচেয়ে ব্যস্ত মাস ফেব্রুয়ারিতে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রজ্ঞাপিত ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা, যা দ্য ডেইলি স্টার প্রকাশ করে, ফুলের বাজারকে প্রভাবিত করে এমন অন্য দিনগুলোও নির্ধারণ করে দেয়। তালিকায় শবেবরাত ৪ ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি, শবেকদর ১৭ মার্চ, জুমাতুল বিদা ২০ মার্চ, ঈদুল ফিতর ২১ মার্চ, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২৬ মার্চ এবং বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল ধরা হয়। ধর্মীয় দিনগুলোর তারিখ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল বলে তা বদলাতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।
বাংলা বর্ষপঞ্জিতে বসন্তের প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুন ২০২০ সাল থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে; বাংলাদেশের বর্ষপঞ্জি সংশোধনের ফলে দিনটি ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে মিলে যায়, ২০১৯ সালের আগে তা পড়ত ১৩ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান রূপে এ উৎসব ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা শুরু করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী; ইউনেসকো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর দিনটি ঘোষণা করে এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বজুড়ে তা পালিত হচ্ছে।
ফুলের ব্যবসায় এই দিনগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আগের মৌসুমগুলোতেই স্পষ্ট হয়েছিল। ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ইউএনবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি বলেন, আগের বছর ফেব্রুয়ারির তিনটি উপলক্ষে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছিল, আর পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিতেই বিক্রি ১৩০ থেকে ১৫০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ব্যবসায়ীরা জানান, জাতভেদে সে বছর পাইকারি দাম আগের বছরের চেয়ে প্রতিটিতে ৫ থেকে ৪০ টাকা বেশি ছিল; গোলাপ ৫ থেকে ৬০ টাকা, জারবেরা ও গ্লাডিওলাস ২০ থেকে ৪০ টাকা এবং রজনীগন্ধা ৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
তারিখের এমন মিলে যাওয়া বিক্রিতে কী প্রভাব ফেলে, অন্য এলাকার ফুল ব্যবসায়ীরা তা আগেই দেখেছিলেন। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি যশোরের গদখালী পাইকারি বাজার থেকে জানায়, দাম আগের বছরের চেয়ে অনেক কম ছিল। গদখালীর ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, সে বছর শবেবরাত আর ভালোবাসা দিবস একই দিনে পড়ায় অনেক ক্রেতা ঝুঁকি নিচ্ছেন না। আর যশোরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একজন প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা বলেন, ফুল তোলার ভরা মৌসুম হওয়ায় চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি, তাই দাম কমেছে।
বন্দর উপজেলা, কলাগাছিয়া ও শীতলক্ষ্যা
বন্দর নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলার একটি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলার আয়তন ৫৪.৩৯ বর্গকিলোমিটার, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১২ হাজার ৮৪১। এর উত্তরে ও পূর্বে সোনারগাঁও উপজেলা, দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা, আর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ও শীতলক্ষ্যা নদী। বন্দর থানা গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে, উপজেলা হয় ১৯৯৩ সালে। গ্রামীণ এলাকা পাঁচটি ইউনিয়নে বিভক্ত: কলাগাছিয়া, ধামগড়, বন্দর, মদনপুর ও মুছাপুর। বাংলাপিডিয়া উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাটবাজারের মধ্যে সাবদী বাজার এবং ধর্মীয় স্থানের মধ্যে সাবদী মন্দিরের নাম দিয়েছে।
উপজেলার প্রধান নদী শীতলক্ষ্যা ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখানদী। নদীটি প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ, সারা বছর নৌচলাচলের উপযোগী, আর নারায়ণগঞ্জের কাছে এর প্রস্থ সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩০০ মিটার। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে নদীটি কলাগাছিয়ার কাছে ধলেশ্বরীতে মিশেছে; এই কলাগাছিয়া ইউনিয়নেই সাবদী, দিঘলদী ও মুকুলদীর অবস্থান। নদীর তীরে রয়েছে পুরোনো নিদর্শন, যেমন ১৪৮১ সালে নির্মিত বন্দর শাহী মসজিদ, কদম রসুল দরগাহ এবং সোনাকান্দা দুর্গ।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আয়তন ৬৮৪.৩৭ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া জেলার প্রধান নদী হিসেবে শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, বালু ও ধলেশ্বরীর নাম দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয় ১৮৮২ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে, আর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালের ৫ মে। শিল্প ও ব্যবসার জন্য বেশি পরিচিত এ জেলায় ১৪.৩৮ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।

আগের মৌসুমগুলোতে সাবদীর ফুল
কলাগাছিয়ার ফুলের গ্রামগুলো এর আগেও খবরে এসেছে। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ইউএনবি নারায়ণগঞ্জ থেকে জানায়, কলাগাছিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের চাষিরা উৎপাদন ভালো হওয়ায় সেই মৌসুমে ২০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করছিলেন। সংবাদ সংস্থাটি সাবদীকে 'ফুলের রাজ্য' বলে উল্লেখ করে এবং ব্রহ্মপুত্রের তীরের সাবদী, দিঘলদী ও মাধবপাশাকে ফুল চাষের গ্রাম হিসেবে নাম দেয়।
সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে কয়েক শ মানুষ ফুলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ইউনিয়নের ১০টি গ্রামে প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে ফুল চাষ হতো, আর সে বছর শুধু সাবদী গ্রামেই প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে ফুল লাগানো হয়েছিল। প্রায় ৪০ জাতের ফুল চাষ হতো, যার মধ্যে ছিল গাঁদা, চেরি, চন্দ্রমল্লিকা, জবা, সূর্যমুখী, ডালিয়া, কাঠমালতী, বেলি ও জারবেরা। চাষিরা পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও স্বাধীনতা দিবসকে লক্ষ্য করে ফুল তোলেন, আর নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও নরসিংদী থেকে ব্যবসায়ীরা ফুল কিনতে আসতেন।
দিঘলদীর এক চাষি ইউএনবিকে বলেন, সে বছর উৎপাদন খুব ভালো হয়েছে; আরেকজন বলেন, চাহিদা বেশি থাকলেও টাকার অভাবে তাঁরা বড় পরিসরে চাষ বাড়াতে পারছেন না। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত উপপরিচালক বলেন, জেলায় ফুল চাষ বাড়াতে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, অধিদপ্তর চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, এবং উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের ঋণ কমিটির মাধ্যমে ঋণসহ সহায়তা দেওয়া হবে।
বন্দরের মাঠে যে ফুলগুলো ফোটে
বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কাটা ফুলের ব্যবসার শুরু খুঁজে পায় মাজার ও পবিত্র স্থানে ভক্তদের কাছে ফুল বিক্রির মধ্যে। জ্ঞানকোষটি জানায়, স্বাধীনতার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কাটা ফুল জনপ্রিয় হতে থাকে, আর রাজধানী ও অন্যান্য শহরের চাহিদা মেটাতে কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন। নিয়মিত বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া দেশি কাটা ফুলের মধ্যে বাংলাপিডিয়া গোলাপ, নানা জাত ও রঙের গ্লাডিওলাস, হলুদ, লাল ও কমলা রঙের গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ও রজনীগন্ধার নাম দিয়েছে। বাণিজ্যিক ফুল চাষ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র চালু করেছে বলেও এতে উল্লেখ আছে। জ্ঞানকোষটি আরও জানায়, পাতাবাহার গাছ, কাটা ফুল (প্রধানত গোলাপ, রজনীগন্ধা, অর্কিড ও গ্লাডিওলাস) এবং মৌসুমি ফুলের বীজের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে, এ চাহিদা মেটাতে বেসরকারি নার্সারি গড়ে উঠছে, আর সীমিত পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে।
বন্দরের মাঠ রাঙানো গাঁদা ট্যাজেটিস (Tagetes) গণের উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া চাষ হওয়া প্রজাতি হিসেবে ট্যাজেটিস প্যাটুলা ও ট্যাজেটিস ইরেক্টার নাম দিয়েছে। ট্যাজেটিস ইরেক্টা, ইংরেজিতে যাকে আফ্রিকান বা মেক্সিকান গাঁদা বলা হয়, আসলে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার উদ্ভিদ। গাছটি প্রায় ৩০ থেকে ১১০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়, আর বাগানের শোভা ও কাটা ফুলের ব্যবসার জন্য এর বহু জাত পৃথিবীজুড়ে চাষ হয়।
গ্লাডিওলাস আইরিস পরিবারের বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদের একটি গণ, যা কর্ম বা কন্দ থেকে জন্মায়। বাজারে বিক্রি হওয়া বড় বড় ফুলের ডাঁটা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংকরায়ণ ও বাছাইয়ের ফল। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগ পরামর্শ দেয়, দীর্ঘ সময় ধরে কাটা ফুল পেতে ৭ থেকে ১৪ দিন পরপর ধাপে ধাপে কর্ম লাগাতে হবে, আর দূরের বাজারে পাঠানোর জন্য ডাঁটার সবচেয়ে নিচের কুঁড়িতে রং দেখা দিলেই কাটতে হবে। কাটা ডাঁটা সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার পানিতে রাখতে হয়; গ্লাডিওলাস মাধ্যাকর্ষণের দিকে বেঁকে যায় বলে খাড়া করে রাখতে হয়, আর ইথিলিনের প্রতি সংবেদনশীল বলে অন্য পণ্যের সঙ্গে রাখার সময় সাবধান থাকতে হয়।

চন্দ্রমল্লিকা (ক্রিস্যানথিমাম) অ্যাস্টারেসি বা সূর্যমুখী পরিবারের বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এর আদি নিবাস পূর্ব এশিয়া, বৈচিত্র্যের কেন্দ্র চীন, যেখানে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকেই এর চাষ শুরু হয়েছিল। এটি মৌসুমের শেষ দিকের ফুল, শরতে ফোটে, আর এর হাজার হাজার উদ্যানজাত রয়েছে। চাষিদের মুখের 'জিপসি' হলো জিপসোফিলা, ইংরেজিতে যাকে বেবিজ ব্রেথ বলা হয়; এটি কারনেশন পরিবারের একটি গণ, যার জিপসোফিলা প্যানিকুলাটা প্রজাতিটি তোড়া বা বুকেতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।

২০২৬ মৌসুমের আগে দেশের ফুলের বাজার
২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইউএনবির একটি প্রতিবেদন, যা ঢাকা ট্রিবিউন প্রকাশ করে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব উদ্ধৃত করে জানায়, দেশে ৩ হাজার ৯৩০ একর জমিতে ৩২ হাজার ১২০ টন ফুল উৎপাদিত হয়, যার ৬৭ শতাংশ গোলাপ। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি তখন বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ফুল বিক্রি ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা জানান, বেশির ভাগ বিক্রি হয় ঢাকার শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ের পাইকারি বাজারে, যেখানে যশোর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার থেকে ফুল আসে; গাঁদার দাম তখন প্রতি হাজার ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বলা হয়।
যশোরই দেশের সবচেয়ে বড় ফুলের কেন্দ্র। ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ইউএনবি ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে জানায়, পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও অমর একুশে ঘিরে চাষিরা ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা করছিলেন। ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার জানান, সে বছর ৬৩০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছে, আর যশোরের ফুলচাষি ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি বলেন, মূল মৌসুম চলে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। তখন গ্লাডিওলাস প্রতিটি ১৫ থেকে ১৭ টাকা আর গাঁদা প্রতি হাজার ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সমবায় সমিতির সভাপতির হিসাবে ওই অঞ্চলে বছরে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়, আর ভালোবাসা দিবস থেকে পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত পুরো উপলক্ষের মৌসুমে চাষিরা ১০০ কোটি টাকার বিক্রির আশা করছিলেন।
এক বছর পর, ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গদখালী থেকে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে বলা হয়, সেখানে প্রায় ৩ হাজার কৃষক ৬৩৭ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করেন। সেদিন পাইকারি বাজারে গ্লাডিওলাস প্রতিটি ৬ থেকে ১২ টাকা, গাঁদা ৩ থেকে ৬ টাকা, আর জিপসি প্রতি মুঠো ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। পত্রিকাটি জানায়, গদখালী বাজার সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে ১২, ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি, আর সেদিন এক হাজারের বেশি চাষি বাজারে ফুল নিয়ে এসেছিলেন।
ছবি: মাহবুবুর রহমান খোকা / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ, ইউএনবি, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ বিভাগ, মিসিসিপি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ বিভাগ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)