কালো জাম গ্রীষ্মের ফল, বছরে মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাজারে পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ১৬ জুন, ভরা মৌসুমে, বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক জাম খাওয়ার সময় পাঁচটি বিষয়ে সাবধান থাকার পরামর্শ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরামর্শগুলো দিয়েছিলেন ভারতীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথশটসে (Healthshots) লেখা পুষ্টিবিদরা। জামের সঙ্গে বা জাম খাওয়ার ঠিক পরে কী খাওয়া বা পান করা হচ্ছে, তা নিয়েই ছিল সতর্কতাগুলো: পানি, হলুদ, খালি পেট, দুধজাতীয় খাবার আর আচার।
এই প্রতিবেদনে প্রথমে পাঁচটি সতর্কতা যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সেভাবে তুলে ধরা হলো। তারপর প্রতিটি সতর্কতা এবং জাম নিয়ে সাধারণত যেসব স্বাস্থ্যগুণের দাবি করা হয়, সেগুলো ওই তারিখ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) মতো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং পিয়ার-রিভিউড গবেষণা কী বলেছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সঙ্গে আছে জামগাছের পরিচয়, দেশে কোথায় কত জাম হয় এবং ফলটিতে কী কী থাকে। এর কোনোটিই চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়: হজমের অসুখ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো রোগ থাকলে, কিংবা নিয়মিত ওষুধ খেলে খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রকাশিত পাঁচ সতর্কতা
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুষ্টিবিদরা বলেছেন, জাম খাওয়ার সময় অনেকেই এই ভুলগুলো করেন এবং এর ফলে গ্যাস্ট্রিক ও অম্বল থেকে শুরু করে পেটের গুরুতর সমস্যা হতে পারে। তাঁদের পাঁচটি পরামর্শ ছিল:
- খাওয়ার পরপরই পানি: জামের সঙ্গে বা খাওয়ার পরপরই পানি পান করলে হজমে সমস্যা হতে পারে, তাই জাম খাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট পর পানি পান করার পরামর্শ দেন তাঁরা।
- হলুদ: তাঁদের মতে, হলুদের কারকুমিন ও জামের অম্লতা মিলে পেটে গ্যাস, বদহজম বা অ্যাসিডিটি হতে পারে; আর জাম ও হলুদ দুটিই রক্ত পাতলা করতে সাহায্য করে বলে যাঁরা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান, তাঁদের রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে। তাই জাম খাওয়ার পর হলুদযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে বলেন তাঁরা।
- খালি পেট: সকালে খালি পেটে জাম খেলে গ্যাস্ট্রিক, অম্বল ও বদহজম হতে পারে, তাই ভরা পেটে খাওয়াই ভালো বলে তাঁরা জানান।
- দুধ, দই ও পনির: তাঁদের ভাষ্য, জামের ট্যানিন ও অম্লীয় উপাদান দুধের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পেটে ভারী ভাব, গ্যাস বা অ্যাসিডিটি তৈরি করতে পারে; দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড জামের অম্লতার সঙ্গে মিশে পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়া ঘটাতে পারে; আর কিছু ক্ষেত্রে জামের ট্যানিন দুধের ক্যালসিয়াম ও আয়রন শোষণে বাধা দেয়। তাঁরা যোগ করেন, এসব প্রভাব সাধারণত মৃদু ও ব্যক্তিভেদে আলাদা; যাঁদের পাকস্থলী সংবেদনশীল বা ল্যাকটোজ সহ্য হয় না, তাঁদের এই মিশ্রণ এড়ানো উচিত; জাম ও দুধের মধ্যে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট ব্যবধান রাখা ভালো; এবং আয়ুর্বেদে এই মিশ্রণ না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
- আচার: তাঁদের মতে, জাম খাওয়ার পর আচারের মতো টক বা মসলাদার খাবার খেলে অম্বল ও বদহজম হতে পারে।
এগুলো পুষ্টিবিদদের নিজস্ব পরামর্শ, প্রকাশিত হয়েছিল সাধারণ লাইফস্টাইল পরামর্শ হিসেবে। নিচের অংশগুলোতে ফলটি সম্পর্কে যা জানা আছে এবং পরামর্শের কোন অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশিত গবেষণা কিছু বলে, তা দেখা হয়েছে।
জাম কী
জাম হলো সিজিজিয়াম কুমিনি (Syzygium cumini) নামের চিরসবুজ গাছের ফল; গাছটি মির্টেসি (Myrtaceae) পরিবারের। ইংরেজিতে এর অনেক নাম: জাভা প্লাম, ব্ল্যাক প্লাম, জাম্বোলান, ইন্ডিয়ান ব্ল্যাকবেরি ইত্যাদি। ২০১২ সালে এশিয়ান প্যাসিফিক জার্নাল অব ট্রপিক্যাল বায়োমেডিসিনে প্রকাশিত এম. আয়ানার ও পি. সুবাশ-বাবুর এক পর্যালোচনায় গাছটিকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও আশপাশের এশীয় অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদ বলা হয়েছে, যার মধ্যে আছে ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া।
জুলিয়া এফ. মর্টনের ১৯৮৭ সালের তথ্যগ্রন্থ ‘ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস’ (অনলাইনে প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়) অনুযায়ী, জামগাছ দ্রুত বাড়ে, ভারতে ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এবং সাধারণত মাটির কাছাকাছি কয়েকটি কাণ্ডে ভাগ হয়ে যায়। চামড়ার মতো পুরু, চকচকে পাতা কচি অবস্থায় গোলাপি আভার হয় এবং তাতে হালকা তারপিনের গন্ধ থাকে। সুগন্ধি ফুল ফোটে থোকায়; পাপড়ি প্রথমে সাদা, পরে গোলাপি হয়ে দ্রুত ঝরে পড়ে।
ফল ধরে থোকায়, কয়েকটি থেকে ১০-৪০টি পর্যন্ত। প্রতিটি ফল গোল বা লম্বাটে, ১.২৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা; পাকার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ থেকে হালকা ম্যাজেন্টা, তারপর গাঢ় বেগুনি বা প্রায় কালো হয়। পাতলা, চকচকে খোসার নিচে বেগুনি বা সাদা রসালো শাঁস, মাঝে একটি বীজ, যা ৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে; তবে কোনো কোনো ফলে দুই থেকে পাঁচটি বীজ থাকে, কোনোটিতে একটিও থাকে না। মর্টন লিখেছেন, ফলটি সাধারণত কষা, কখনো কখনো খাওয়ার অযোগ্য রকমের কষা, আর স্বাদ টক থেকে বেশ মিষ্টি পর্যন্ত হয়। তাঁর তথ্যমতে, ভারতে প্রধান ফলন পাকে মে মাসের শেষ থেকে জুন ও জুলাই জুড়ে।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া কালো জামকে দেশের খুব প্রচলিত ও জনপ্রিয় অপ্রধান ফলগাছের তালিকায় রেখেছে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এটি বড় গাছ, পাকা ফল প্রায় কালো, লম্বাটে, মার্বেলের আকারের, বীজ ফলের প্রায় অর্ধেক আকারের, আর ফল তোলা হয় জুলাইয়ে। বাংলাপিডিয়া জামকে (Syzygium cumini) দেশের কাঠ উৎপাদনকারী গাছের তালিকাতেও রেখেছে।

গাছটি কষ্টসহিষ্ণু। মর্টনের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এটি জন্মায়, তবে প্রায় ৬০০ মিটারের ওপরে ফল ধরে না; বেশি বৃষ্টিতে সবচেয়ে ভালো বাড়ে, জলাবদ্ধতা সইতে পারে, একবার শিকড় গেড়ে বসলে খরাও সয়; তবে ফুল ও ফল ধরার সময় শুষ্ক আবহাওয়া পছন্দ করে। বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়, তবু বীজ থেকেই সাধারণত চারা করা হয়। বীজের চারায় ফল আসে ৮ থেকে ১০ বছরে, কলমের গাছে ৪ থেকে ৭ বছরে। ফুলে প্রচুর মধু থাকে বলে মৌমাছি আসে, পাতা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, বাকল থেকে রং ও ট্যানিন মেলে, আর শক্ত ও টেকসই সারকাঠ ভারতে কড়িকাঠ, খুঁটি, নৌকা ও রেলের স্লিপার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

দেশে কত জাম হয়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তাদের কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থে (ইয়ারবুক অব অ্যাগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিকস) জামকে ‘ব্ল্যাক বেরি’ নামে হিসাব করে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ২০২৩ সালের সংস্করণে ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জাতীয় হিসাব এমন:
- ২০২০-২১: জামবাগানের জমি ১৩,৭৫১.০১ একর, উৎপাদন ৫৬,৯২৮.২১ মেট্রিক টন।
- ২০২১-২২: ১৩,৩৫৭.২৯ একর, উৎপাদন ৫৪,১৩৫.৮৮ মেট্রিক টন।
- ২০২২-২৩: ১২,৬২৬.১৫ একর, উৎপাদন ৫৩,৩৪৩.৯৩ মেট্রিক টন।
দেশের জামের বেশির ভাগই বাগানের নয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৫৩,৩৪৩.৯৩ টনের মধ্যে বর্ষগ্রন্থ বাগানের বাইরের উৎপাদন দেখিয়েছে ৫২,৪৮৫.৫০ টন, আর বাগানের ভেতরের ৮৫৮.৪৩ টন। অর্থাৎ বাংলাদেশে জাম মূলত বসতবাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধার ও পরিকল্পিত বাগানের বাইরের নানা জায়গার গাছের ফল। তুলনার জন্য, একই বর্ষগ্রন্থে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমের উৎপাদন ১৪,৮২,৯৩৭.০৪ টন এবং তালিকাভুক্ত সব ফল মিলিয়ে উৎপাদন ৫৬,৫৮,৮৫৪ টন।
২০২২-২৩ অর্থবছরের জেলাভিত্তিক সারণিতে কুষ্টিয়া অনেক এগিয়ে, উৎপাদন ৭,৩৩২ টন। এরপর ময়মনসিংহ (৩,৭৪০ টন), সুনামগঞ্জ (৩,১৪৯ টন), রাজবাড়ী (২,৯৫০.৭৫ টন), হবিগঞ্জ (২,১০০ টন) ও জামালপুর (২,০০৬ টন)। বিভাগভিত্তিক হিসাবে খুলনায় ১২,৩০০.৫৭ টন, ঢাকায় ৮,৬৪০.৩১ টন, ময়মনসিংহে ৮,৫৪৫ টন এবং চট্টগ্রামে ৭,০৪৭.৫৭ টন জাম উৎপাদিত হয়।
জামে কী আছে
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালে (‘Java-plum, (jambolan), raw’, এসআর লিগ্যাসি) ১০০ গ্রাম কাঁচা জামের পুষ্টিমান এমন:
- শক্তি: ৬০ কিলোক্যালরি; পানি: ৮৩.১ গ্রাম।
- শর্করা: ১৫.৬ গ্রাম; আমিষ: ০.৭২ গ্রাম; চর্বি: ০.২৩ গ্রাম।
- ভিটামিন সি: ১৪.৩ মিলিগ্রাম।
- ক্যালসিয়াম: ১৯ মিলিগ্রাম; পটাশিয়াম: ৭৯ মিলিগ্রাম; ফসফরাস: ১৭ মিলিগ্রাম; ম্যাগনেশিয়াম: ১৫ মিলিগ্রাম; সোডিয়াম: ১৪ মিলিগ্রাম; আয়রন: ০.১৯ মিলিগ্রাম।
মূল প্রতিবেদনের একটি দাবির জন্য এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ: জামের আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত করে। ইউএসডিএর হিসাবে দেখা যায়, ফলটিতে এসব খনিজ আছে, তবে অল্প পরিমাণে; জাম হাড় বা দাঁত মজবুত করে, এমন কথা কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সূত্রে পাওয়া যায়নি, তাই দাবিটি এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে। এশিয়া ও ক্রান্তীয় আমেরিকার বিশ্লেষণ নিয়ে মর্টনের সারণিতে প্রতি ১০০ গ্রামে ভিটামিন সি ৫.৭ থেকে ১৮ মিলিগ্রাম।
জামের গাঢ় বেগুনি রঙ আসে অ্যান্থোসায়ানিন থেকে। আয়ানার ও সুবাশ-বাবুর ২০১২ সালের পর্যালোচনায় ফলে ডেলফিনিডিন, পেটুনিডিন ও ম্যালভিডিনের গ্লাইকোসাইড এবং সেই সঙ্গে গ্যালিক অ্যাসিড, সাইট্রিক ও ম্যালিক অ্যাসিড আর গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ ও র্যাফিনোজ শর্করার উল্লেখ আছে। মর্টন জানিয়েছেন, ফলে ট্যানিন এবং সামান্য অক্সালিক অ্যাসিডও আছে; জাম খেলে মুখ যে কষা লাগে, তার কারণ এই ট্যানিন।

জাম ও রক্তে শর্করা: গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জাম ক্যানসার প্রতিরোধ করে, রক্ত পরিশোধন করে, নানা সংক্রমণ রোধ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। খাদ্য হিসেবে ফলটির ক্ষেত্রে এসব দাবির পক্ষে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি, তাই সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে জাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে দাবি শোনা যায়, তা ডায়াবেটিস নিয়ে, এবং সে বিষয়ে গবেষণা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথাগত চিকিৎসায় জামের ফল, বাকল, পাতা ও বীজ ব্যবহৃত হয়। আয়ানার ও সুবাশ-বাবুর পর্যালোচনায় আয়ুর্বেদে ডায়াবেটিস, আমাশয় ও ডায়রিয়ায় এবং ইউনানি চিকিৎসায় যকৃতের টনিক হিসেবে ও মাড়ি-দাঁতের যত্নে এর ব্যবহারের কথা আছে। কিন্তু একই পর্যালোচনা বলছে, ডায়াবেটিস নিয়ে বেশির ভাগ কাজ হয়েছে প্রাণীর ওপর, প্রায়ই এমন অপরিশোধিত নির্যাস দিয়ে যার রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করা হয়নি; কীভাবে কাজ করে তা পুরোপুরি বোঝা যায়নি, এবং আরও ক্লিনিক্যাল গবেষণা দরকার। ১৯৮৭ সালে মর্টন লিখেছিলেন, বীজের নির্যাস রক্তে শর্করা কমায় এমন প্রতিবেদন যেমন আছে, তেমনি তা নিয়ে আপত্তিও আছে; তাঁর উল্লেখ করা এক গবেষণায় কুকুরের শরীরে ইনজেকশন দিলে নির্যাস রক্তে শর্করা কমিয়েছিল, কিন্তু মুখে খাওয়ালে কমায়নি।
মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার ফল আশাব্যঞ্জক নয়। ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রের হসপিতাল দে ক্লিনিকাসের একদল গবেষক ২০০০ সালে জার্নাল অব এথনোফার্মাকোলজিতে জানান, জামপাতার চা ডায়াবেটিস নেই এমন ৩০ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবকের গ্লুকোজ সহনশীলতা পরীক্ষায় রক্তে শর্করার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি, স্বাভাবিক বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুরেও নয়; তাঁদের উপসংহার, আপাতত রক্তে শর্করা কমানোর চিকিৎসা হিসেবে জাম্বোলানের সুপারিশ করা যায় না। একই দলের দ্বৈত-অন্ধ, দৈবচয়নভিত্তিক পরীক্ষা ২০০৬ সালে জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড থেরাপিউটিকসে প্রকাশিত হয়। তাতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২৭ জন রোগীকে ২৮ দিন পর্যবেক্ষণ করা হয়: ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্লাইবুরাইডে খালি পেটে রক্তের শর্করা কমেছে, কিন্তু জামপাতার চা বা প্লাসিবোতে বদলায়নি।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পাঠকের জন্য এসব সূত্র থেকে দুটি কথা আসে। জাম প্রাকৃতিক শর্করাযুক্ত ফল, ইউএসডিএর হিসাবে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১৫.৬ গ্রাম শর্করা, এবং এটি চিকিৎসকের দেওয়া চিকিৎসার বিকল্প নয়। ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের ঠিক করে দেওয়া ওষুধ ও খাদ্যতালিকা মেনে চলুন, আর জামসহ যেকোনো ফল তাতে কীভাবে রাখবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন।
পাঁচ সতর্কতা যাচাই
পাঁচটির মধ্যে দুটি পরামর্শ নিয়ে কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া যায়নি: জাম খাওয়ার পর পানি পানের আগে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করা, আর খালি পেটে জাম না খাওয়া। এ দুটি পুষ্টিবিদদের নিজস্ব পরামর্শ হিসেবেই থাকছে। বাকি তিনটি যেসব বিষয় ছুঁয়ে যায়, সেগুলো নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ লেখে।
হলুদ। এনআইএইচের অংশ ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (এনসিসিআইএইচ) হলুদকে আদা পরিবারের উদ্ভিদ বলে বর্ণনা করে, যার মাটির নিচের কাণ্ড রান্নায় ব্যবহৃত হয় এবং যার হলুদ রঙ আসে কারকুমিন থেকে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ হালনাগাদ করা তাদের তথ্যপত্রে মুখে খাওয়া হলুদের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে বমিভাব, বমি, অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও পেটের গোলমালের কথা আছে; সহজে শোষিত হয় এমন কিছু হলুদ পণ্য খাওয়া কিছু মানুষের যকৃতের ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে; আর গর্ভাবস্থায় হলুদের সাপ্লিমেন্ট অনিরাপদ হতে পারে বলে বলা হয়েছে। যেকোনো ওষুধ খেলে কোনো ভেষজ পণ্য ব্যবহারের আগে স্বাস্থ্যসেবাদাতার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। জাম রক্ত পাতলা করে, এমন কথা কোনো কর্তৃপক্ষের সূত্রে পাওয়া যায়নি; রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান এবং জাম বা হলুদ নিয়ে নিশ্চিত নন, এমন কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দুধ ও ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা। এনআইএইচের আরেক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে) জানায়, দুধের প্রাকৃতিক শর্করা ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা থেকে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা হয়, কারণ ক্ষুদ্রান্ত্র ল্যাকটেজ এনজাইম যথেষ্ট তৈরি করে না। এর উপসর্গের মধ্যে আছে পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া, গ্যাস, বমিভাব, পেটব্যথা, পেটে গুড়গুড় শব্দ ও বমি, আর দুধ বা দুধজাত খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এগুলো শুরু হতে পারে। অর্থাৎ ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু মানুষের ক্ষেত্রে জামের সঙ্গে খাওয়া হোক বা না হোক, দুধজাত খাবারেই এসব উপসর্গ হতে পারে।
ট্যানিন ও আয়রন। উদ্ভিজ্জ পলিফেনল, যার মধ্যে ট্যানিনও পড়ে, খাবারের এমন উপাদানের অন্যতম যা আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলে বলে জানা। সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি জুরিখের আর. হুরেল ও আই. এগলি ২০১০ সালে আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত পর্যালোচনায় ফাইটেট, পলিফেনল ও ক্যালসিয়ামকে আয়রন শোষণে বাধাদানকারী এবং অ্যাসকরবিক অ্যাসিডকে (ভিটামিন সি) সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁরা যোগ করেন, নানা রকম খাবারের পূর্ণ খাদ্যতালিকা নিয়ে করা গবেষণায় কোনো একক উপাদানের প্রভাব তুলনামূলক কম, আর খাবারের গঠনের চেয়ে মানুষের শরীরে আয়রনের মজুতের অবস্থাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মর্টন আলাদাভাবে সতর্ক করেছেন, ট্যানিনসমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ পণ্য অতিরিক্ত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
অম্বল ও মসলাদার খাবার। ২০২০ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ পর্যালোচিত এনআইডিডিকের অ্যাসিড রিফ্লাক্স (গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ, জিইআরডি) বিষয়ক নির্দেশনা বলছে, জিইআরডিতে আক্রান্ত কিছু মানুষ দেখেন যে কিছু খাবার বা পানীয়ে তাঁদের উপসর্গ শুরু হয় বা বাড়ে; এর মধ্যে আছে লেবুজাতীয় ফল ও টমেটোর মতো অম্লীয় খাবার, মসলাদার খাবার, বেশি চর্বিযুক্ত খাবার, চকলেট, পুদিনা, কফি ও অ্যালকোহল। রাতে উপসর্গ হলে শোয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা আগে খাওয়া শেষ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। অম্বলের প্রবণতা যাঁদের আছে, তাঁদের জন্য মসলাদার ও টক খাবারে সাবধানতার পক্ষে এটি সমর্থন জোগায়; তবে জাম নিয়ে আলাদা করে এতে কিছু বলা নেই।
জাম খাওয়া ও ব্যবহার
মর্টন লিখেছেন, মিষ্টি বা হালকা টক স্বাদের ভালো মানের জাম কাঁচা খাওয়া হয়, অথবা টার্ট, সস ও জ্যাম বানানো হয়; আর ফলটিকে লবণপানিতে ভিজিয়ে রেখে, কিংবা খোঁচা দিয়ে লবণ মাখিয়ে এক ঘণ্টা রেখে দিলে কষা ভাব কমে। জামের রস আঙুরের রসের মতো, তা দিয়ে শরবত, সিরাপ ও স্কোয়াশ হয়; সাদা শাঁসের জামে যথেষ্ট পেকটিন থাকায় শক্ত জেলি হয়, বেগুনি শাঁসের জামে বাড়তি পেকটিন লাগে। ভারতে জামের সিরকা ব্যাপকভাবে তৈরি হয়, আর গোয়া ও ফিলিপাইনে জাম থেকে ওয়াইন তৈরি হয়েছে।
জাম যেহেতু মূলত কাঁচা খাওয়া হয়, খাদ্য পরিচ্ছন্নতার মৌলিক নিয়মগুলো এখানে প্রযোজ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি’ হলো: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, ভালোভাবে রান্না করা, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা, এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা।
বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় ফল
বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্যভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস নির্দেশিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের উদ্যোগে। ২০১৩ সালে এটি হালনাগাদ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস (বারডেম), কারিগরি সহায়তা দেয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এফএওর সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, নির্দেশিকার খাদ্য পিরামিডে শাকসবজি ও ফলের স্থান দ্বিতীয় স্তরে, যা উদারভাবে খাওয়ার মতো খাবার। গ্রীষ্মে জামের মতো মৌসুমি ফল তা পূরণের একটি উপায়; তবে কোনো রোগ থাকলে কতটা ও কখন খাবেন, তা চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শে ঠিক করুন।
ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, হেলথশটস (জাগো নিউজ ২৪-এর বরাতে), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, জুলিয়া এফ. মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস (পারডু বিশ্ববিদ্যালয়), বাংলাপিডিয়া, এশিয়ান প্যাসিফিক জার্নাল অব ট্রপিক্যাল বায়োমেডিসিন (আয়ানার ও সুবাশ-বাবু, ২০১২), জার্নাল অব এথনোফার্মাকোলজি (তেইশেইরা ও অন্যরা, ২০০০), জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড থেরাপিউটিকস (তেইশেইরা ও অন্যরা, ২০০৬), এনসিসিআইএইচ, এনআইডিডিকে, আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন (হুরেল ও এগলি, ২০১০), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)





মন্তব্য
(০)