টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রথম দিকে পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের ১২ জেলায় জমির ফসল তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনের বরাতে জাগো নিউজ ২৪ ১২ জুলাই জানায়, শনিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত এসব জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের বেশি জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছিল।
তলিয়ে যাওয়া ফসলের মধ্যে ছিল আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পাট, গ্রীষ্মকালীন সবজি, মরিচ, আদা, হলুদ ও ফলসহ আরও কয়েকটি ফসল। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওইসব এলাকায় আরও প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমির দাঁড়িয়ে থাকা ফসল তখনো পানিতে ডুবে ছিল।
ক্ষতিগ্রস্ত ১২ জেলা ও আবহাওয়ার আভাস
কৃষি বিভাগের তালিকায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো ছিল:
- চট্টগ্রাম বিভাগ: চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান
- সিলেট বিভাগ: সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ
- রাজশাহী বিভাগ: সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁ
- খুলনা বিভাগ: যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর
পরিস্থিতি তখনো কাটেনি। ১২ জুলাই রোববার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে আবারও অতিভারী বর্ষণের আভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। এতে দেশের আসন্ন কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কৃষকদের মতে, পানি আরও চার-পাঁচ দিন জমে থাকলে আউশ ধান ও সবজি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।
সময়টা কৃষকের জন্য কেন কঠিন, তা ধানের মৌসুম দেখলে বোঝা যায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে আউশ ধান কাটা হয় জুলাই-আগস্টে, আর রোপা আমন কাটা হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারিতে। ফলে জুলাইয়ের এই বন্যায় একদিকে মাঠে থাকা আউশ, অন্যদিকে আমনের চারা তৈরির বীজতলা একসঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ে।

চট্টগ্রামে মৎস্য ও কৃষিতে বড় ধাক্কা
কৃষির বাইরে মৎস্য খাতেও বড় বিপর্যয় নেমে আসে। চট্টগ্রাম বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও চিংড়ির ঘেরের মাছ ভেসে যায়। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য উদ্ধৃত করে জাগো নিউজ জানায়, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩২০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতির মুখে পড়ে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১১ জুলাই জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনের বরাতে জানায়, মাছ ভেসে গিয়ে জেলার মৎস্য খাতে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বাঁশখালী উপজেলায়, যেখানে ২ হাজার ৫০০টি পুকুর, ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে গিয়ে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম পত্রিকাটিকে বলেন, অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তখনো পাওয়া যায়নি।

একই দিনে প্রকাশিত চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আলাদা প্রাথমিক হিসাবে দেখা যায়, জেলায় চলতি মৌসুমে ৩০ হাজার ২২.৫ হেক্টর জমিতে আউশের আবাদ হয়েছিল, যার ৯ হাজার ৪৩.৫ হেক্টর অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমনের বীজতলার ৯৬০.৬৬ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমিও ক্ষতির মুখে পড়ে; অধিদপ্তরের হিসাবে জেলায় মোট ১৫ হাজার ৯১১.১৬ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, তথ্য সংগ্রহ তখনো চলছিল এবং প্রকাশিত হিসাবটি ছিল প্রাথমিক।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা ও চারার প্রস্তুতি
কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছিল। ১১ জুলাই শনিবার সকালে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে বৃক্ষমেলা উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, তালিকা শেষ হলে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতির ধরন অনুযায়ী কৃষকদের বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার কথা বলা হয়।
তবে মন্ত্রী এই বন্যায় খুব বেশি ক্ষতির আশঙ্কা করেননি। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, “এখন বোরো ধান কাটা শেষ। তারপরও যে আবার চারা লাগানো শুরু হয়েছে, সেটির বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু যে চারাগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে সেগুলো যদি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে তাহলে পঁচে যাবে। আমরা ধরে নিতে পারি যে চারা রোপণ হয়েছে তার ২৫ শতাংশ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।”
মন্ত্রী জানান, কত জমির ধান ডুবেছে এবং তা আবার রোপণ করতে কত চারা লাগবে, সে তথ্য সংগ্রহ করে মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি নিয়েছে। উঁচু এলাকায় চারা উৎপাদনের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, “হয়তো কৃষকের ঘরে বীজ ধান আর নাও থাকতে পারে, তাই আমরা চারাটি সরবরাহ করার চেষ্টা করব।”
ছবি: Sumon Mallick / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, ঢাকা টাইমস, বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)