বাংলা বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস আষাঢ় বর্ষা ঋতুর মাস; বাংলাদেশের সংশোধিত বর্ষপঞ্জিতে মাসটি ১৫ জুন শুরু হয় এবং ৩১ দিনের। আষাঢ় শুরুর কয়েক দিন আগে, ২০২৬ সালের ১২ জুন জাগো নিউজ ২৪-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসের প্রচুর বৃষ্টি ও আর্দ্রতা নতুন চারা রোপণ ও বেড়ে ওঠার জন্য উপযোগী সময়। এ সময় বাগানে বা টবে বেলি, জুঁই, গন্ধরাজ, দোলনচাঁপা, হাস্নাহেনা, রেইন লিলি, দোপাটি, স্থলপদ্ম ও অলকানন্দা লাগানো যায়। বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়ায় এসব গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং ফুল দেয়।
বর্ষার সুগন্ধি ফুল: বেলি, জুঁই, গন্ধরাজ, হাস্নাহেনা ও দোলনচাঁপা
বর্ষাকালে সুগন্ধি ফুলের কদর সবচেয়ে বেশি। বেলি ও জুঁইয়ের মিষ্টি সুবাস সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। বেলির বৈজ্ঞানিক নাম Jasminum sambac; উদ্ভিদটির আদি নিবাস ভারত ও ভুটান। এর ফুল সাধারণত সন্ধ্যায় ফোটে এবং সকালে বুজে যায়। চাষ করা বেলিগাছে সাধারণত বীজ হয় না, তাই কাটিং ও দাবা কলমের মতো অযৌন পদ্ধতিতেই এর চারা তৈরি হয়।
গন্ধরাজ (Gardenia jasminoides) বর্ষার শুরুতে ও গ্রীষ্মের শেষ দিকে সবচেয়ে ভালো ফোটে; এর সাদা পাপড়ি ও কড়া সুবাস সহজেই চোখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশনের তথ্য অনুযায়ী, গন্ধরাজের জন্য জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ, অম্লীয় ও পানি সরে যায় এমন মাটি দরকার; উজ্জ্বল পরোক্ষ আলো বা আংশিক ছায়ায় এটি ভালো থাকে। এর শিকড় অগভীর, তাই বড় গাছের শিকড়ের কাছে না লাগানোই ভালো। ডালের কাটিং বা দাবা কলমে এর চারা করা যায়।

হাস্নাহেনা (Cestrum nocturnum) রাতে চারপাশে তীব্র মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়, তাই একে রাতরানিও বলা হয়। গাছটির আদি নিবাস মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছে। বেগুন ও আলুর গোত্র সোলানেসির অন্য গাছের মতো এতেও বিষাক্ত অ্যালকালয়েড থাকে, তাই শিশুরা যেন এর ফল না খায়।
দোলনচাঁপা (Hedychium coronarium) আদা গোত্রের গাছ, আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট এক্সটেনশন জানায়, গ্রীষ্ম ও শরতে এর গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা, প্রজাপতির মতো সুগন্ধি ফুল ফোটে। এটি উষ্ণ, আর্দ্র, জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ মাটি পছন্দ করে, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকা পানি বা সব সময় ভেজা মাটি সহ্য করে না। কন্দমূল (রাইজোম) ভাগ করে বা বীজ থেকে এর চারা হয়।

টবে ও বাগানে রঙিন ফুল: রেইন লিলি, দোপাটি, অলকানন্দা ও স্থলপদ্ম
রেইন লিলি (Zephyranthes গণ) কন্দজাতীয় বহুবর্ষজীবী গাছ, আদি নিবাস আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চল। বৃষ্টির কয়েক দিনের মধ্যে একসঙ্গে ফুল ফোটে বলেই এর এমন নাম; টবেও এটি সুন্দর ফোটে। মূল কন্দের পাশে জন্মানো ছোট কন্দ আলাদা করে সহজে নতুন গাছ করা যায়।
দোপাটি (Impatiens balsamina) আষাঢ়ের জনপ্রিয় ফুল, আদি নিবাস ভারত ও শ্রীলঙ্কা। সাদা, গোলাপি, লাল ও দুই রঙা দোপাটি টবের জন্য ভালো। গাছটি আর্দ্র জায়গা পছন্দ করে এবং খরা সহ্য করতে পারে না। বীজ থেকেই এর চারা হয়; পাকা ফল ছুঁলেই ফেটে বীজ ছিটকে পড়ে, তাই বীজ সংগ্রহে সাবধান থাকতে হয়।

অলকানন্দা বা অ্যালামান্ডার সোনালি হলুদ, শিঙার মতো ফুল বর্ষাজুড়ে ফুটতে দেখা যায়। এটি জোরালো লতানো গাছ, অবলম্বন পেলে জড়িয়ে ওপরে ওঠে। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট এক্সটেনশনের তথ্যমতে, দিনে ছয় ঘণ্টা বা তার বেশি সরাসরি রোদ, জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ দোআঁশ মাটি ও ভালো নিষ্কাশন এর জন্য দরকার; ডালের কাটিং থেকে চারা হয়। এর কষ ত্বক ও চোখে জ্বালা ধরাতে পারে, তাই ছাঁটাইয়ের সময় সাবধান থাকা ভালো।
স্থলপদ্ম (Hibiscus mutabilis) বর্ষার শেষ দিকে ও শরতে ফুল দেয়; এর চারা আষাঢ়ে রোপণ করা যায়। এর ফুল সকালে সাদা বা গোলাপি থাকে এবং দিন গড়ানোর সঙ্গে রং গাঢ় হয়। গাছটি দ্রুত বাড়ে এবং কাটিং থেকে সহজে চারা হয়।

রোপণের সময় যা মনে রাখবেন
- বর্ষায় কাটিং বা ডাল থেকে সহজে নতুন ফুলগাছ তৈরি করা যায়; বেলি, গন্ধরাজ, অলকানন্দা ও স্থলপদ্মের চারা এভাবেই করা হয়।
- এ সময় সুগন্ধি ফুলের চারা বা বীজও রোপণ করা যায়; দোপাটির চারা হয় বীজ থেকে।
- টবে অবশ্যই ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখুন, যেন পানি জমে না থাকে; দোলনচাঁপার মতো গাছ জমে থাকা পানি সহ্য করে না।
- দোআঁশ মাটির সঙ্গে জৈব সার, পচা গোবর বা ভার্মি কম্পোস্ট মিশিয়ে মাটি তৈরি করুন।
- অতিরিক্ত বৃষ্টিতে কচি চারা যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
ছবি: Mokkie / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন (এক্সটেনশন গার্ডেনার প্ল্যান্ট টুলবক্স), উইকিপিডিয়া (বাংলা বর্ষপঞ্জি ও উদ্ভিদ পরিচিতি)





মন্তব্য
(০)