চট্টগ্রামের অক্সিজেন এলাকার প্রাক্তন শিক্ষিকা বিবি শাহীজান ২০২৬ সালের জুনে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক ফিচারে দেখিয়েছেন, বাঙালি রান্নাঘরে হাতে বাটা ভেষজ ও মসলা কীভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়, বাড়তে থাকা বাজার এবং বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে। শিলপাটায় মায়ের মসলা বাটার শব্দ থেকে শুরু করে তাঁর লেখা পৌঁছেছে গবেষণাগার পর্যন্ত, আর শেষ হয়েছে ভেজাল মসলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভেষজ দিয়ে রোগ সারানোর ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তায়। এই প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হলো, পাশে রাখা হলো সেই সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, গবেষক ও সরকারি সূত্রের প্রকাশিত তথ্য।
লেখকের বক্তব্য: রান্নাঘর থেকে গবেষণাগার
শাহীজানের লেখা শুরু রান্নাঘর থেকে। তিনি লিখেছেন, শিলপাটার ওপর মায়ের হাতে মসলা বাটার শব্দ একসময় বাঙালি জীবনের পরিচিত দৃশ্য ছিল, আর আদা, রসুন, হলুদ, জিরা ও ধনিয়ার ঘ্রাণে ভরে উঠত ঘর। তাঁর ভাষায়, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি প্রতিদিনের রান্নার এসব উপাদান একদিন বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় হবে। এখন ভেষজ ও মসলা কেবল স্বাদ বাড়ানোর উপাদান নয়, বরং স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও গবেষণারও অংশ, এমনটাই তাঁর যুক্তি।
আধুনিক চিকিৎসা ছড়িয়ে পড়ার আগে গ্রামবাংলায় প্রচলিত ঘরোয়া প্রতিকারের কথাও তিনি লিখেছেন: সর্দি-কাশিতে আদা ও তুলসীপাতার রস, পেটের সমস্যায় জিরা, গলা ব্যথায় লবঙ্গ আর ক্ষতস্থানে হলুদ। তাঁর মতে, এসবই ছিল মানুষের প্রথম ভরসা, অনেক পরিবারে এখনো সে অভ্যাস টিকে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় হলুদ, তুলসী, আদা, দারুচিনি ও কালোজিরার ব্যবহার বহু শতাব্দীর পুরোনো বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। এগুলো পারিবারিক ঐতিহ্যের বর্ণনা; নিচের অংশগুলোতে দেখা যাবে, যেসব স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ গবেষণার প্রমাণ যাচাই করেছে তারা এমন বেশির ভাগ ব্যবহারকে এখনো অপ্রমাণিত বলছে, আর লেখক নিজেও লিখেছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ভেষজ বা মসলাকে রোগের বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
তাঁর লেখায় এসেছে মসলা বাণিজ্যের ইতিহাস, হলুদের কারকিউমিন, রসুনের অ্যালিসিন ও আদার জিঞ্জারলের মতো উপাদান নিয়ে গবেষণা, ভেষজ চা, মসলাভিত্তিক পানীয় ও হারবাল পণ্যের বাড়তে থাকা বাজার এবং বাংলাদেশে হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, আদা ও রসুনের উৎপাদনের কথা। লেখার শেষে তিনি সতর্ক করেছেন, ভেজাল মসলা, অনিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা ভোক্তার ঝুঁকি তৈরি করে; তাই নিরাপদ উৎপাদন, সঠিক সংরক্ষণ ও মানসম্মত বিপণনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং লোকজ জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
যে বাণিজ্য বদলে দিয়েছিল বিশ্ব ইতিহাস
শাহীজান মনে করিয়ে দিয়েছেন, গোলমরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ ও জায়ফল একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান পণ্যের মধ্যে ছিল এবং এসবের খোঁজে ইউরোপীয় নাবিকেরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করেছেন। মসলা বাণিজ্যের ইতিহাসও তা-ই বলে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে প্রাচীন মিশরীয়রা আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলের পান্ট দেশের সঙ্গে মসলার বাণিজ্য করত। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৬০০ সালের মধ্যে অস্ট্রোনেশীয় নাবিকেরা আজকের ইন্দোনেশিয়ার মালুকু দ্বীপপুঞ্জ থেকে লবঙ্গ ও জায়ফল দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের তামিল রচনায় গ্রিক বণিকদের ভারত থেকে বড় বড় বস্তা ভরে গোলমরিচ কেনার বর্ণনা আছে।
সপ্তম ও অষ্টম শতক থেকে ইয়েমেন ও ওমানের আরব বণিকেরা ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথে প্রাধান্য বিস্তার করেন, আর বহু শতাব্দী ধরে ইতালির সমুদ্রবন্দর-প্রজাতন্ত্রগুলো, বিশেষ করে ভেনিস ও জেনোয়া, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপের মসলা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। মসলার উৎসে সরাসরি পৌঁছানোর সমুদ্রপথ খুঁজতেই পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে পর্তুগিজদের অভিযান। ১৪৮৮ সালে বার্তোলোমেউ দিয়াস উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আসেন, আর ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা ভারতের মালাবার উপকূলের কালিকটে পৌঁছান। ১৫১১ সালে আফোনসো দে আলবুকার্ক পর্তুগালের হয়ে মালাক্কা দখল করেন, আর ১৫১২ সালের শুরুতে আন্তোনিও দে আব্রেউর অভিযান জায়ফলের উৎস বান্দা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো প্রথম ইউরোপীয় দল হয়। বঙ্গোপসাগরও ছিল এই বিনিময় জালের অংশ। শাহীজান যেমন বলেছেন, মসলা বাণিজ্য বিশ্ব অর্থনীতি ও ঔপনিবেশিক শক্তির বিস্তারকে প্রভাবিত করেছে।
লোকজ প্রতিকার থেকে আধুনিক ওষুধ
লেখকের মূল ভাবনা, অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী প্রতিকারের জ্ঞান আধুনিক বিজ্ঞানকে পথ দেখাতে পারে, তার পরিচিত উদাহরণও আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যাসপিরিন ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ আর্টেমিসিনিনকে এমন যুগান্তকারী ওষুধের তালিকায় রেখেছে, যাদের উৎস ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা।
আর্টেমিসিনিন এর সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। ম্যালেরিয়ার নতুন চিকিৎসা খুঁজতে ১৯৬৭ সালের মে মাসে চীনে প্রজেক্ট ৫২৩ নামে একটি গোপন কর্মসূচি শুরু হয়, আর ১৯৬৯ সালের শুরুতে চীনা বিজ্ঞানী তু ইউইউ এর একটি গবেষক দলের প্রধান হন। পুরোনো চিকিৎসাগ্রন্থ ঘেঁটে তাঁর দল মিষ্টি নাগদানা বা সুইট ওয়ার্মউড (Artemisia annua) এবং চিকিৎসক গে হংয়ের আনুমানিক ৩৪০ খ্রিস্টাব্দের একটি লেখার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে এক মুঠো গাছ পানিতে ভিজিয়ে রস নিংড়ে পান করার কথা ছিল। তু দেখতে পান, প্রচলিত গরম পানির পদ্ধতির বদলে কম তাপমাত্রায় নির্যাস নিলে কার্যকর উপাদানটি নষ্ট হয় না, এবং ১৯৭২ সালে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা বিশুদ্ধ যৌগটি আলাদা করে নাম দেন আর্টেমিসিনিন। ম্যালেরিয়ার নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের জন্য ২০১৫ সালে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের অর্ধেক পান; বাকি অর্ধেক পান উইলিয়াম সি. ক্যাম্পবেল ও সাতোশি ওমুরা।
আর্টেমিসিনিনের শিক্ষা উল্টো দিকেও সত্য। কার্যকর ওষুধটি এসেছে বছরের পর বছর গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট যৌগ আলাদা করে, পরীক্ষা করে ও মান নির্ধারণ করে, ঘরোয়া প্রতিকার থেকে সরাসরি নয়। ঐতিহ্য আর প্রমাণের মধ্যে এই ফারাকটিই পরের অংশগুলোতে দেখা যাবে।

হলুদ, রসুন, আদা ও দারুচিনি নিয়ে গবেষণা কী বলছে
শাহীজান লিখেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কারকিউমিন, অ্যালিসিন, জিঞ্জারল ও দারুচিনির সক্রিয় উপাদান নিয়ে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) অংশ ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (এনসিসিআইএইচ) এসব গবেষণা পর্যালোচনা করে যে তথ্যপত্র প্রকাশ করে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সেগুলোর সিদ্ধান্ত এসব মসলার জনপ্রিয় ভাবমূর্তির চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক ছিল।
হলুদ আদা-পরিবারের গাছ, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়; এর মাটির নিচের কাণ্ড বা রাইজোম রান্নায় ব্যবহৃত হয়, আর কারকিউমিন নামের যৌগ একে হলুদ রং দেয়। এনসিসিআইএইচ জানায়, আয়ুর্বেদিক, চীনা, ইসলামি ও থাই চিকিৎসায় বদহজম, সর্দি, চর্মরোগ, বাত ও যকৃতের রোগে হলুদ ব্যবহারের ইতিহাস আছে। সংস্থাটির ২০২৫ সালের এপ্রিলের সারসংক্ষেপে বলা হয়, ফ্যাটি লিভার, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরলে হলুদ বা কারকিউমিন নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, কিন্তু কোনো স্বাস্থ্যগত উদ্দেশ্যে এটি উপকারী কি না, তা নিশ্চিত করে বলার মতো যথেষ্ট জানা নেই। হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ব্যথা ও আড়ষ্টতা কমাতে মুখে খাওয়া কারকিউমিনের পক্ষে প্রাথমিক কিছু ইতিবাচক প্রমাণ আছে, তবে আরও মানসম্পন্ন গবেষণা দরকার। ২০১৭ সালে জার্নাল অব মেডিসিনাল কেমিস্ট্রিতে নেলসন ও সহকর্মীদের একটি পর্যালোচনা আরও সংশয়ী ছিল: হলুদের মধ্যে কারকিউমিন থাকে বড়জোর প্রায় পাঁচ শতাংশ, কারকিউমিনয়েড নিয়ে ১২০টির বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে, অথচ কারকিউমিনের কোনো ডাবল-ব্লাইন্ড, প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল সফল হয়নি। লেখকেরা কারকিউমিনকে অস্থিতিশীল, সহজে বিক্রিয়াশীল এবং শরীরে খুব কম শোষিত হয় এমন যৌগ বলে বর্ণনা করেন।
রসুন নিয়ে এনসিসিআইএইচের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির সারসংক্ষেপ বলছে, উচ্চ কোলেস্টেরলের রোগীদের ক্ষেত্রে রসুনের সাপ্লিমেন্ট মোট ও এলডিএল কোলেস্টেরল সামান্য কমাতে পারে এবং উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের রক্তচাপ সামান্য কমাতে পারে; তবে রসুন পাকস্থলীর ক্যানসার ঠেকায় বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, এমন প্রমাণ দুর্বল। আদা নিয়ে একই সংস্থা বলছে, গর্ভাবস্থার বমি বমি ভাব ও বমিতে এটি সহায়ক হতে পারে এবং মাসিকের ব্যথার তীব্রতা কমাতে পারে, কিন্তু যানবাহনে চলার সময়ের বমিভাব এবং কেমোথেরাপি বা অস্ত্রোপচারের পরের বমিভাবে এর কার্যকারিতা অনিশ্চিত।
দারুচিনি আসে সিনামোমাম গাছের শুকনো বাকল থেকে। এনসিসিআইএইচ শ্রীলঙ্কার "আসল" সিলন দারুচিনি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জন্মানো ক্যাসিয়া দারুচিনিকে আলাদা করে দেখায়, আর ২০২৪ সালের নভেম্বরের সারসংক্ষেপে বলে, ডায়াবেটিস ও ওজন কমানোসহ কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় দারুচিনির উপকার বর্তমান প্রমাণে স্পষ্টভাবে সমর্থিত নয়। অর্থাৎ বিজ্ঞান এসব মসলাকে খুঁটিয়ে দেখেছে, আর ২০২৬ সাল পর্যন্ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সৎ উত্তর ছিল: উপকার সম্ভব, সামান্য, অথবা এখনো অপ্রমাণিত।

প্রাকৃতিক মানেই সব সময় নিরাপদ নয়
ভেষজ যেন চিকিৎসকের চিকিৎসার বিকল্প না হয়, শাহীজানের এই সতর্কবার্তা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের অবস্থানের সঙ্গেই মেলে। এনসিসিআইএইচ জোর দিয়ে বলে, "প্রাকৃতিক" মানেই সব সময় নিরাপদ নয়: কিছু উদ্ভিজ্জ পণ্য যকৃতের ক্ষতি করে, কিছু প্রেসক্রিপশনের ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, আর কিছু সাপ্লিমেন্টে লেবেলে না লেখা ওষুধ বা উপাদান পাওয়া গেছে। যেকোনো ভেষজ বা সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের কথা নিজের চিকিৎসককে জানানোর পরামর্শ দেয় সংস্থাটি।
মসলার তথ্যপত্রগুলোতে এর নির্দিষ্ট উদাহরণ আছে। এনসিসিআইএইচ বলছে, সাধারণভাবে তৈরি হলুদ বা কারকিউমিন মুখে খাওয়া নির্ধারিত মাত্রায় দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সম্ভবত নিরাপদ, কিন্তু কারকিউমিন সহজে শোষণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পণ্য খেয়ে কিছু মানুষের যকৃতের ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে, আর গর্ভাবস্থায় হলুদের সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দেওয়া হয় না। রসুনের সাপ্লিমেন্ট রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা অ্যাসপিরিন সেবনকারী কিংবা অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতিতে থাকা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; কাঁচা রসুন ত্বকে লাগালে তীব্র জ্বালা ও রাসায়নিক পোড়া হতে পারে। আদা পেটে অস্বস্তি, বুকজ্বালা ও ডায়রিয়া ঘটাতে পারে, আর নিয়মিত ওষুধ খান এমন মানুষকে আদা ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। ক্যাসিয়া দারুচিনিতে কুমারিন নামের একটি রাসায়নিক থাকতে পারে, যা যকৃতের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত; সিলন দারুচিনিতে এটি থাকে খুব সামান্য। রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে মসলা খাওয়া আর ঘন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া এক বিষয় নয়।
কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে, গর্ভাবস্থায় বা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এবং নিয়মিত ওষুধ খেলে, চিকিৎসা হিসেবে ভেষজ বা মসলার সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশল ও প্রমাণের ঘাটতি
শাহীজান যে ভেষজ চিকিৎসার প্রসারের কথা বলেছেন, তা বিশ্ব স্বাস্থ্যনীতিতেও দৃশ্যমান। ২০২২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভারত সরকারের সহায়তায় গুজরাটের জামনগরে গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা ও প্রমাণের কেন্দ্র হিসেবে। সংস্থাটির হিসাবে, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্য দেশ ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবহারের তথ্য জানিয়েছে; ঐতিহ্যবাহী, পরিপূরক ও সমন্বিত চিকিৎসা শত কোটি মানুষ ব্যবহার করলেও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য গবেষণা তহবিলের এক শতাংশেরও কম এ খাতে যায়।
২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের অনুরোধে তৈরি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার বৈশ্বিক কৌশল ২০২৫-২০৩৪ ২০২৫ সালের মে মাসে জেনেভায় ৭৮তম বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদে অনুমোদিত হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বুলেটিন অব দ্য ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের এক নিবন্ধে এর চারটি লক্ষ্য তুলে ধরা হয়: প্রমাণের ভিত্তি শক্ত করা, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করা, নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতিকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা, এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান সুরক্ষা ও তার সুফল ভাগাভাগির জন্য বিভিন্ন খাতের অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
একই নিবন্ধে দেখা যায়, জাতীয় নীতি কত দ্রুত বদলেছে। ২০২৩ সালে সংস্থার জরিপে সাড়া দেওয়া ১০৬টি সদস্য দেশের ৯০টি জানায়, ঐতিহ্যবাহী, পরিপূরক ও সমন্বিত চিকিৎসা নিয়ে তাদের জাতীয় নীতি আছে, যেখানে ১৯৯৯ সালে এমন দেশ ছিল ২৫টি; আর ভেষজ ওষুধ নিয়ন্ত্রণের কাঠামো থাকার কথা জানায় ১১৬টি সদস্য দেশ, ১৯৯৯ সালে যা ছিল ৬৫টি। তবু সাড়া দেওয়া ১০৬টি দেশের ১০১টি, অর্থাৎ ৯৫ শতাংশ, গবেষণা-তথ্যের অভাবকে প্রধান বাধা বলেছে। ব্যাপক ব্যবহার আর সীমিত প্রমাণের এই ফারাকেই শাহীজানের আহ্বান, লোকজ জ্ঞানের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয়, সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশে মসলা: উৎপাদন, আমদানি ও গবেষণা
শাহীজান ভেষজ ও মসলাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছেন, যেখানে হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, আদা, রসুনসহ নানা মসলা উৎপাদিত হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত এবং দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত তথ্যে এর পরিমাণ বোঝা যায়। মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তৎকালীন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদারের হিসাবে, দেশে বছরে ৪৯ দশমিক ৩০ লাখ টন মসলা উৎপাদিত হতো, আর বার্ষিক চাহিদা ছিল ৫৮ দশমিক ৫০ লাখ টন; ফলে প্রায় ৯ দশমিক ২০ লাখ টন, অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ, আমদানি করতে হতো। দেশে ব্যবহৃত প্রায় ৫০ ধরনের মসলার ৩০টি দেশেই চাষ হতো। তাঁর উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মসলা চাষের জমি বেড়েছে ১ দশমিক ৭ গুণ, ফলন ৫ দশমিক ৪ গুণ আর উৎপাদন ৯ দশমিক ১ গুণ।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মসলা গবেষণা কেন্দ্র নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বগুড়ার শিবগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সালে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রটি ৭০ একর জমিতে কাজ করে এবং মাগুরা, কুমিল্লা ও জয়দেবপুরে এর আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং লালমনিরহাট, ফরিদপুর, খাগড়াছড়ি ও জৈন্তাপুরে উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। কেন্দ্র ও বারির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এটি মসলার ৫১টি উচ্চফলনশীল জাত ও ১৫৬টি উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিল। একই অনুষ্ঠানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহিদা আক্তার জানান, "উন্নত জাতের মসলা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ" শীর্ষক একটি প্রকল্পের লক্ষ্য এসব জাত আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে উৎপাদন পাঁচ শতাংশ বাড়ানো ও আমদানি কমানো।
ঔষধি গাছ ও ভেষজ শিল্প
রান্নার মসলার বাইরে ঔষধি গাছের চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণেও সম্ভাবনা দেখেছেন শাহীজান। ২০২২ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফার্মাকোলজিতে প্রকাশিত মোছা. আফিয়া আখতারের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশে জন্মানো অসংখ্য ঔষধি গাছের মধ্যে অন্তত প্রায় এক হাজারটিকে লোকজ চিকিৎসকেরা চিকিৎসায় উপযোগী বলে মনে করেন, এবং দেশের আয়ুর্বেদিক, ইউনানি ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এসব সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি।
এই গাছনির্ভর শিল্প আকারে উল্লেখযোগ্য হলেও রপ্তানিতে ছোট। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক লেখায় ড. তারেক সালাহউদ্দিন আনুষ্ঠানিক ঐতিহ্যবাহী ওষুধ খাতে ২০১টি আয়ুর্বেদিক, ২৭৫টি ইউনানি ও ৪০টি হারবাল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেন এবং বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে জানান, হোমিওপ্যাথিসহ আনুষ্ঠানিক ভেষজ ওষুধের বাজার প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি মার্কিন ডলার। তাঁর হিসাবে, কাঁচামাল হিসেবে ঔষধি গাছের রপ্তানি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার। একাধিক সংস্থার মধ্যে ভাগ হয়ে থাকা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা খাতটিকে পিছিয়ে রেখেছে বলে তিনি যুক্তি দেন।
ঔষধি গাছ চাষের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ নাটোরে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মঙ্গাবেতে মোহাম্মদ আল-মাসুম মোল্লার প্রতিবেদনে লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের কথা বলা হয়, যা ঔষধি গ্রাম নামে পরিচিত। ১৯৯৫ সালে স্থানীয় কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলা নিজের জমিতে ঔষধি গাছ লাগানো শুরু করলে এর সূচনা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দশক ধরে সেখানে ১,৩০০-র বেশি কৃষক ঔষধি গাছ চাষ করছেন, প্রায় ১৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির গাছ জন্মায়। ঘৃতকুমারী (অ্যালোভেরা), অশ্বগন্ধা, কালমেঘ, তুলসী, শতমূলী ও বাসক সেখানকার ফসলের মধ্যে রয়েছে; গ্রামগুলো থেকে বছরে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঔষধি গাছ বিক্রি হয়, আর ক্রেতাদের মধ্যে আছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, একমি, হামদর্দ ও তাইওয়ান ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ।
ভেজাল: হলুদে সিসার শিক্ষা
ভেজাল মসলা নিয়ে শাহীজানের সতর্কবার্তার একটি নথিভুক্ত বাংলাদেশি উদাহরণ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনা ফরসাইথ ও স্টিভ লুবির নেতৃত্বে, ঢাকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বির সঙ্গে মিলে করা গবেষণায় দেখা যায়, কিছু হলুদ প্রক্রিয়াজাতকারী হলুদকে আরও উজ্জ্বল ও বিক্রয়যোগ্য করতে লেড ক্রোমেট মেশাচ্ছিলেন; এটি একটি শিল্প-রঞ্জক, যা সাধারণত খেলনা ও আসবাব রাঙাতে ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালে এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ ও এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ভেজাল হলুদের সঙ্গে বাংলাদেশে মানুষের রক্তে সিসার মাত্রা বৃদ্ধির যোগসূত্র পাওয়া যায়।
এরপর ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়: গবেষণার ফল সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়, গণবিজ্ঞপ্তি ও সরাসরি বৈঠকের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সতর্ক করা হয়, আর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দ্রুত সিসা শনাক্তের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভেজালবিরোধী নিয়ম প্রয়োগ করে। স্ট্যানফোর্ড ২০২৪ সালের মে মাসে জানায়, বাংলাদেশের বাজারে সিসাযুক্ত হলুদের নমুনার হার ৪৭ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে এবং হলুদকলের শ্রমিকদের রক্তে সিসার মাত্রা ৩০ শতাংশ কমেছে।
ঝুঁকিটা বড়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে, সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই যা ক্ষতিকর নয়, আর সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করে বুদ্ধিমত্তা ও মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। হলুদের এই ঘটনাই দেখায়, কেন শাহীজান খাতটির ভবিষ্যৎ ভাবনায় গবেষণার পাশাপাশি নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণকে জায়গা দিয়েছেন।

ছবি: ROCKY / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (বিবি শাহীজানের ফিচার, জুন ২০২৬), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (হলুদ, রসুন, আদা, দারুচিনি ও সাপ্লিমেন্ট বিষয়ক তথ্যপত্র), জার্নাল অব মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি (নেলসন ও সহকর্মী, ২০১৭), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সেন্টার; সিসা বিষক্রিয়া তথ্যপত্র), বুলেটিন অব দ্য ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (নভেম্বর ২০২৫), দ্য ডেইলি স্টার (৩১ জুলাই ২০১৬, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫), ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফার্মাকোলজি (২০২২), মঙ্গাবে (২১ জুলাই ২০২৩), স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (কিং সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট; স্ট্যানফোর্ড গ্লোবাল হেলথ, ২ মে ২০২৪), উইকিপিডিয়া (মসলা বাণিজ্য; তু ইউইউ)




মন্তব্য
(০)