পবিত্র রমজানে আমদানি করা তাজা ফলের দাম মানুষের নাগালে রাখতে সরকার মার্চের মাঝামাঝি সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর কমিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ, বুধবার রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে জাগো নিউজ জানায়, শুল্ক-কর কমানোর পর আমদানি করা ফলের দাম কমার বদলে আরও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আপেল ও কালো আঙুরের দাম।
ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, সেদিন আপেলের দাম কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত এবং কালো আঙুরের দাম কেজিতে ১০০ টাকার বেশি বেড়েছিল। মাল্টা ও কমলার দাম বেড়েছিল কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকার মতো। কোনো আমদানি করা ফলের কেজি তখন ৩০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছিল না, ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা ও বেদানা কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
জানুয়ারিতে শুল্ক বৃদ্ধি, মার্চে আংশিক ছাড়
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি শতাধিক পণ্য ও সেবার বিভিন্ন পর্যায়ে শুল্ক ও ভ্যাট বাড়ায়, যার তালিকায় আমদানি করা ফলও ছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৩ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর তাজা ফল আমদানিতে মোট শুল্ক-কর দাঁড়ায় ১৩৬.২০ শতাংশ। এর মধ্যে ছিল ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ও ৫ শতাংশ আগাম কর। রোজার আগেই তাই বিভিন্ন ফলের দাম বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১৭ মার্চ রাতে আদেশ জারি করে তাজা ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করে এবং ৫ শতাংশ আগাম কর পুরোপুরি মওকুফ করে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, এই ছাড় তাজা বা শুকনা কমলালেবু, আঙুর, আপেল, নাশপাতি ও লেবুজাতীয় ফলের ক্ষেত্রে ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকার কথা। এর কয়েক দিন আগে আলাদা প্রজ্ঞাপনে ফল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। এনবিআর জানায়, রমজানে দাম স্থিতিশীল রাখতে বৃহত্তর জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এর পরও বাজারে আমদানি করা ফলের দাম কমেনি।

কোন ফলের দাম কত ছিল
২৬ মার্চ বাজারভেদে সবুজ আপেলের কেজি বিক্রি হচ্ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়, কিছুদিন আগে যা ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। গালা আপেল বিক্রি হচ্ছিল ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকায়, আগে ছিল ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা। বড় আকারের আপেল কিছুটা কম দামে, ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছিল।
কিছুদিন আগে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া কালো আঙুরের দাম উঠেছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। সবুজ আঙুর বিক্রি হচ্ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়, আগে ছিল ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা। মাল্টার কেজি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, আগে ছিল ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা। কমলা ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা হয়েছিল। বেদানার কেজি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা ছিল; এর দাম নতুন করে বাড়েনি।

ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও ক্রেতারা যা বলেন
সেগুনবাগিচার ফল ব্যবসায়ী নান্নু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, সব ধরনের ফলের দাম বাড়তি। সেদিন আড়ত থেকে এক কার্টন আপেল তাঁকে ৭০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে; এক কার্টনে প্রায় ১৮ কেজি আপেল থাকে। তাঁর ভাষ্য, ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে আপেলের দাম কেজিতে ১০০ টাকা বেড়েছে। আড়তে ফলের মজুত কম বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তাই সামনে দাম আরও বাড়তে পারে বলে তাঁর ধারণা। সেগুনবাগিচার আরেক ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, রোজার শুরু থেকেই দাম বাড়তি, আর দাম বাড়ায় মানুষ কেনা কমিয়ে দিয়েছে; অনেকে দাম শুনে চলে যাচ্ছেন।
রামপুরার ফল ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী বলেন, কিছুদিন আগেও তিনি সবুজ আপেল ৩৫০ টাকা কেজি বিক্রি করেছেন, কিন্তু আড়তে দাম এত বেড়েছে যে এখন ৪২০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব নয়। আগে ৩০০ টাকায় বিক্রি করা কমলা তিনি তখন বিক্রি করছিলেন সাড়ে ৩০০ টাকায়। বিক্রি কমে যাওয়ায় দোকানে তরমুজ ও কলাও রাখতে শুরু করেছেন বলে জানান তিনি। রামপুরা বাজারে কমলা কিনতে আসা আমেনা বেগম বলেন, সাড়ে ৩০০ টাকা কেজি দামে ফল কিনে খাওয়া সম্ভব নয়, তাই না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
আমদানিকারকেরা এর আগে দামের জন্য করভার, টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করেছিলেন। নিউ এজের ৫ মার্চের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন শুল্ক, টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির কারণে আমদানি করা তাজা ফলের দাম সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে; ১০০ টাকার ফল আমদানিতে ১৩৬ টাকার বেশি শুল্ক-কর দিতে হয়। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ফলের চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদনে মেটে।

ছবি: Yahya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউ এজ





মন্তব্য
(০)