রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিজয়-২৪ হলের গাছ থেকে পাড়া লিচু প্যাকেটে ভরে হলের প্রতিটি কক্ষে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ মে, শুক্রবার দুপুরে হল সংসদের নেতারা শিক্ষার্থীদের কক্ষে কক্ষে গিয়ে এই লিচু পৌঁছে দেন বলে সেদিন জাগো নিউজ ২৪ জানায়। হলের গাছগুলো থেকে প্রায় পাঁচ হাজার লিচু সংগ্রহ করে পিএইচডি ব্লকসহ ১৩৫টি কক্ষে এবং হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়; প্রতিটি কক্ষে গেছে ২৫ থেকে ৩০টি করে টাটকা লিচু। বিতরণের সময় হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. জামিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
হলের লিচু যেভাবে ভাগ হলো
জাগো নিউজ ২৪-কে দেওয়া হল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হল চত্বরের গাছগুলো থেকে লিচু পেড়ে গুনে গুনে প্যাকেটে ভরা হয় এবং সমান ভাগে বণ্টন করা হয়। প্যাকেটগুলো যায় হলের ১৩৫টি আবাসিক কক্ষে, যার মধ্যে পিএইচডি ব্লকও ছিল, আর যায় হলে যাঁরা কাজ করেন সেই কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে। প্রতিটি কক্ষে ২৫ থেকে ৩০টি লিচু পৌঁছানোর হিসাবও একই হল সূত্রের।
বিজয়-২৪ হল সংসদের ভিপি রাসেল মিয়া জাগো নিউজ ২৪-কে জানান, আগের বছরও হলে একই কাজ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, 'গত বছরও আমরা বিজয়-২৪ হলের প্রতিটি লিচু গাছের ফল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বণ্টন করেছিলাম। সেই ধারাবাহিকতায় এবছরও শিক্ষার্থীদের সহায়তায় গাছ থেকে লিচু সংগ্রহ করা হয়েছে। পরে সেগুলো প্রতিটি রুমে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।'
হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জামিরুল ইসলাম এই ফলনকে একটি গাছের প্রচুর ফল ধরার ফল হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'হলের একটি লিচু গাছে এবছর প্রচুর ফল ধরেছিল। আমরা সেগুলো সব শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করতে চেয়েছিলাম। লিচু সংগ্রহ করে প্রতিটি রুমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দেওয়া হয়েছে। সবাই মিলে উৎসবমুখর পরিবেশে এটি উপভোগ করেছি।' হল সূত্র লিচু সংগ্রহের কথা বলেছে হলের একাধিক গাছ থেকে, আর প্রাধ্যক্ষ বলেছেন একটি গাছের কথা; প্রতিবেদনে দুটি বক্তব্যই এসেছে।
বিতরণটি হয়েছে লিচু মৌসুমের একেবারে শুরুতে। রাজশাহীতে সাধারণত এপ্রিলের শেষে দেশি লিচু প্রথম বাজারে ওঠে। ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস রাজশাহী মহানগরীর সাহেব বাজারে দেশি লিচু বিক্রি হতে দেখে, তখন ১০০টি লিচুর দাম ছিল ৫০০ টাকা। সেখানকার এক বিক্রেতা বলেছিলেন, আগাম আসা দেশি লিচু কিছুটা টক, কয়েক দিন পর যেগুলো আসবে সেগুলো বেশি মিষ্টি হবে।
বিজয়-২৪ হল ও হল সংসদ
বিজয়-২৪ হল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হল। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা হলটির নাম বদলে 'বিজয়-২৪ হল' লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে দেন। পরে ২০২৫ সালের ২২ মে, বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩৯তম সিন্ডিকেট সভায় ১২টি স্থাপনার পুনর্নামকরণ ও নতুন নামকরণের সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে এই নাম আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় বলে পরদিন প্রথম আলো জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ইফতিখারুল আলম মাসউদ সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, নাম পরিবর্তন নিয়ে কিছু শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাও করেছিলেন।
যে হল সংসদের নেতারা লিচু পৌঁছে দিয়েছেন, সেটি ২০২৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসা নির্বাচিত ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), ১৭টি হল সংসদ এবং সিনেটে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোট হয়; দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, মোট ৯০৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন: কেন্দ্রীয় সংসদের ২৩টি পদে ২৪৮ জন, ১৭টি হল সংসদে ৫৯৭ জন এবং সিনেটের পাঁচটি পদে ৫৮ জন। কেন্দ্রীয় সংসদ ও সিনেটের ব্যালটের পাশাপাশি প্রত্যেক ভোটার নিজের হল সংসদের ১৫টি পদে ভোট দেন। ২৮ হাজার ৯০১ জন যোগ্য ভোটারের মধ্যে ভোট দেন ২০ হাজার ১৮৭ জন। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ. নজরুল ইসলাম উপাচার্যের কাছে ফলাফলের গেজেট হস্তান্তর করেন।
৩০ হাজার গাছের ক্যাম্পাস
বিজয়-২৪ হলের লিচুগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে বড় ও গাছে ভরা এক ক্যাম্পাসে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৫৩-এর অধীনে, যা ১৯৫৩ সালের ১৬ জুন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ক্যাম্পাস মতিহারে, এর জন্য অধিগ্রহণ করা ২৯৮.২ হেক্টর জমিতে; ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। বাংলাপিডিয়া একে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে; ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে এর অনুষদ ছিল ৯টি, বিভাগ ৫৯টি, আর শিক্ষক ১ হাজার ১৫০ জন ও শিক্ষার্থী ৩৮ হাজার ২৯১ জন।
২০২০ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসের গাছ গোনে। ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জাগো নিউজ ২৪ জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকল্প ২০২০ সালের ৩ থেকে ১৪ মে এই বৃক্ষশুমারি চালায়। শুমারির জন্য ক্যাম্পাসকে ৯টি এলাকায় এবং সেগুলোকে ৩৮টি উপ-অঞ্চলে ভাগ করা হয়। গোনা হয় মোট ৩০ হাজার ১৯১টি গাছ। এর মধ্যে ছিল ১০ হাজার ৩২৫টি মেহগনি, ৩ হাজার ৪১৫টি আম, ১ হাজার ২৩টি নারিকেল, ৯৩৪টি জাম, ৭৮৬টি কাঁঠাল ও ১৬৫টি লিচু গাছ। বাকি ১৩ হাজার ৫৪৩টি গাছ নানা প্রজাতির, যার মধ্যে আছে জারুল, কৃষ্ণচূড়া, আমলকী, হরীতকী, লটকন, কামরাঙা, মাল্টাসহ আরও অনেক গাছ।
শুমারির উদ্যোক্তা ছিলেন কৃষি প্রকল্প উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ও তখনকার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনন্দ কুমার সাহা। তিনি জানান, গুল্ম ও বিরুৎ শুমারির বাইরে রাখা হয়েছে এবং খুব কম সংখ্যায় থাকা প্রজাতিগুলোকে অন্যান্যের মধ্যে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে চার ধরনের গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে: কাঠের গাছ, ফলের গাছ, ঔষধি গাছ এবং ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ পত্রিকাটিকে বলেন, লাগানো গাছ বেঁচে আছে কি না, বেড়ে উঠছে কি না, তা বৃক্ষশুমারির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

রাজশাহীর লিচুবাগান ও ২০২৬ সালের মৌসুম
রাজশাহী জেলার প্রায় সব এলাকাতেই লিচুর চাষ হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাজশাহী বাসসকে জানায়, জেলার ৯টি উপজেলা ও মহানগর এলাকায় মোট ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়েছে, আর সে বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। সবচেয়ে বেশি জমি ছিল বাগমারা উপজেলায়, ১১৫ হেক্টর, সেখানে লক্ষ্যমাত্রা ৮২৫ মেট্রিক টন। এরপর পুঠিয়ায় ৭৮ হেক্টর, পবায় ৭৫, দুর্গাপুরে ৭০, মোহনপুরে ৫২, চারঘাটে ৪৫, তানোরে ৩০ ও বাঘায় ২৮ হেক্টর। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যে মতিহারে, সেখানে লিচুর জমি ছিল ২০ হেক্টর, গোদাগাড়ীতে ১৯ হেক্টর এবং রাজশাহী মহানগরীতে ১০ হেক্টর।
ডিএই জানায়, দেশি লিচুর পাশাপাশি রাজশাহীতে উচ্চফলনশীল চায়না-৩ এবং বোম্বাই ও মাদ্রাজি জাতের লিচুর চাষ হচ্ছে, আর জেলার কোনো কোনো জায়গায় মানুষ বাড়িতেও লিচুগাছ লাগাচ্ছেন। ডিএই রাজশাহীর তখনকার উপপরিচালক উম্মে সালমা বাসসকে বলেন, লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর রাজশাহীতে লিচুর চাষ বাড়ছে।
২০২৬ সালের মৌসুমে এসে হিসাব খুব একটা বদলায়নি। ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল আজকের পত্রিকা ডিএই রাজশাহীর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৫ সালে জেলার ৫৩০ হেক্টর বাগান থেকে ৩ হাজার ৭৬৮ টন লিচু উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৬ সালে বাগানের জমি সামান্য কমে ৫২৮ হেক্টর হয়েছে, তবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে আগের বছরের উৎপাদনের চেয়ে কিছুটা বেশি।
কিন্তু সেই এপ্রিলে আবহাওয়া চাষিদের দুশ্চিন্তায় ফেলে। মাসের শুরু থেকেই রাজশাহীতে মৃদু থেকে মাঝারি দাবদাহ চলছিল। রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের উচ্চ পর্যবেক্ষক শহীদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে জানান, ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল, বুধবার বেলা ৩টায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে, যা ছিল মৌসুমের সর্বোচ্চ; আগের দিন মঙ্গলবার ছিল ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি। এর মধ্যে মাঝে মাঝে হঠাৎ বৃষ্টিও হয়েছে: তার আগের রোববার ৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, আর ৮, ৯ ও ১০ এপ্রিলও অল্প বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।
নগরের চণ্ডীপুর এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস চত্বরে এবং রায়পাড়ার একটি বাগানে পত্রিকাটি দেখতে পায়, কয়েক দিনের মধ্যে পাকার উপযোগী লিচুর প্রায় প্রতিটি থোকায় দু-একটি লিচু ফেটে গেছে, কিছু লিচুর গায়ে কালচে ও খয়েরি দাগ পড়েছে, আর ছোট লিচু ঝরে মাটিতে পড়ে আছে। রায়পাড়ার বাগানি রফিকুল ইসলাম বলেন, গরমে লিচু ঝরে পড়া বা ফেটে যাওয়া নতুন কিছু নয়, তবে এবার এর মাত্রা অস্বাভাবিক বেশি; তাঁর ধারণা, ফলন কম হবে।
দাবদাহে লিচু কেন ফাটে
ডিএই রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে কারণটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় তীব্র গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টি হলে লিচুর ভেতরের অংশ দ্রুত স্ফীত হয়, কিন্তু খোসা সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ফেটে যায়; মাঠপর্যায় থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। গাছ রক্ষায় তিনি খরার সময়ও গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দেওয়ার এবং প্রয়োজনে গাছে পানি স্প্রে করার পরামর্শ দেন, আর বলেন, হরমোন, বোরন বা জিংক প্রয়োগ করলে কিছুটা প্রতিকার মিলতে পারে। তিনি কোনো মাত্রা উল্লেখ করেননি; এসব উপকরণ ব্যবহার করতে চাইলে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ফসলটি নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থের বর্ণনাও একই কথা বলে। উদ্ভিদবিদ জুলিয়া এফ. মর্টন তাঁর 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস' (১৯৮৭) গ্রন্থে লিখেছেন, গরম, শুষ্ক ও জোরালো বাতাসে লিচুর ফুল ঝরে যায় এবং ফলের খোসা ফেটে যায়; বৃষ্টি আর গরম-শুষ্ক আবহাওয়া পালা করে এলেও ফল ফাটে, বিশেষ করে গাছের রোদের দিকে। বাংলাপিডিয়াও বলছে, লিচুগাছের বৃদ্ধির জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া দরকার, আর শুষ্ক গরম বাতাস ফলের জন্য ক্ষতিকর।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০০১ সালের এক বিশেষজ্ঞ পরামর্শসভায় উপস্থাপিত এবং ২০০২ সালে এফএও প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক নিবন্ধেও একই চাপের কথা আছে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে ফুল আসা, ফল ধরা ও ফল বড় হওয়ার সময় সম্পূরক সেচ দরকার, কারণ এ সময় মাটির আর্দ্রতা ও বাতাসের আর্দ্রতা খুব কম থাকে এবং ফুল আসার পর তাপমাত্রা বাড়ে। ফলন্ত বেশির ভাগ গাছে বাড়তি পানি দেওয়া হয় না, ফলে দীর্ঘ খরায় ফল ঝরে ফলন কমে। বোরো ধানের সেচকে অগ্রাধিকার দিতে হয় বলে খুব কম চাষিই ফল ধরার সময় লিচুবাগানে সেচ দিতে পারেন, আর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেলে অগভীর নলকূপও অচল হয়ে পড়ে।

লিচুর জাত, পাকার সময় ও পাড়ার নিয়ম
লিচুর বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis, এটি সোপবেরি বা স্যাপিন্ডেসি গোত্রের গাছ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, লিচুর আদি নিবাস দক্ষিণ চীন; সপ্তদশ শতকের শেষ নাগাদ এটি বার্মা ও ভারতে পৌঁছায়। গাছটি চিরসবুজ, অনেক শাখা-প্রশাখাযুক্ত ও গোলাকার মাথার, উচ্চতা ১২ থেকে ১৫ মিটার। বাংলাদেশের সব জেলাতেই লিচু জন্মাতে পারে, আর দেশের গাছে ধরা ফলের মধ্যে উৎপাদনে আমের পরেই লিচুর স্থান। বাংলাপিডিয়া প্রধান উৎপাদন এলাকার তালিকায় প্রথমেই রাজশাহীর নাম রেখেছে, এরপর রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জ।
এফএওর নিবন্ধটি লিখেছিলেন সমন্বিত উদ্যান ও পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের জাতীয় প্রকল্প পরিচালক এস. বি. এম. আবু বকর সিদ্দিকী। তাতে বলা হয়, ধারণা করা হয় উনিশ শতকের গোড়ায় বার্মা থেকে লিচু বাংলাদেশে আসে, আর বিশ শতকের গোড়ায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে চীনা জাত এবং মুজাফফরপুরী ও বোম্বাইয়ের মতো ভারতীয় জাত আনা হয়। তখন চাষ হওয়া জাতগুলোর মধ্যে ছিল দেশের সবচেয়ে পুরোনো উচ্চফলনশীল জাত বোম্বাই, এর সঙ্গে রাজশাহী, মাদ্রাজি, মঙ্গলবাড়ি, কদমি, কালীপুরী, মুজাফফরপুরী, বেদানা ও চায়না-৩। বোম্বাই ও মুজাফফরপুরী পাকে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে; সেরা জাত বলে বিবেচিত কিন্তু সবচেয়ে কম ফলনের বেদানা, যার চাষ দিনাজপুরেই সীমিত, পাকে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে; আর নাবি জাত চায়না-৩ পাকে জুনের শেষ সপ্তাহে।
লিচুর জাত উদ্ভাবনেও রাজশাহীর ভূমিকা আছে। এফএওর নিবন্ধে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহীর বিনোদপুর কেন্দ্র থেকে বারি লিচু-১ জাত অবমুক্ত করে। জাতটিকে বলা হয়েছে উচ্চফলনশীল, নিয়মিত ফলদানকারী ও অত্যন্ত আগাম; এর খাওয়ার উপযোগী অংশ ৬৭ থেকে ৭৩ শতাংশ, গাছপ্রতি বছরে ফলন ৮৫ থেকে ৯৭ কেজি, আর একেকটি ফলের ওজন প্রায় ১৯.৫ গ্রাম। জাতটি রাজশাহী অঞ্চলের জন্য সুপারিশ করা হয়। বারি লিচু-২ ও বারি লিচু-৩ এসেছে সিলেটের আকবরপুর কেন্দ্র থেকে, দেশের পূর্বাঞ্চলের জন্য।
লিচু পাড়া প্রসঙ্গে এফএওর নিবন্ধে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, আমের মতো লিচু পাড়ার পর আর মানে ভালো হয় না, তাই পুরোপুরি পাকলেই কেবল পাড়া উচিত। পাকা চেনা যায় তিনভাবে: রং সবুজাভ থেকে গোলাপি-লালে বদলায়, খোসার ছোট ছোট উঁচু দানাগুলো চ্যাপ্টা হয়ে আসে, আর খোসা তুলনামূলক মসৃণ হয়। জাত ও আবহাওয়াভেদে সাধারণত ফল ধরার ৫৫ থেকে ৬০ দিন পর লিচু পাড়ার উপযোগী হয়। একই গাছের সব ফল একসঙ্গে পাকে না বলে থোকাগুলো কয়েক দফায় পাড়া হয়, আর কয়েকটি পাতাসহ থোকা ধরে কাটা হয়। পাকার সময় বাদুড় ও পাখি বড় ক্ষতি করে; এ কারণেও অনেক চাষি ফল পাকার আগেই গাছ মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করে দেন।
নিবন্ধ অনুযায়ী, লিচুগাছ প্রায় পাঁচ বছর বয়সে ফল দিতে শুরু করে, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত ফলন বাড়তে থাকে, আর বাংলাদেশে ৬০ থেকে ৭০ বছরের পুরোনো গাছও সন্তোষজনক ফলন দিতে দেখা গেছে। ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী ভালো একটি বোম্বাই গাছে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার লিচু ধরতে পারে।

পাড়ার পর লিচু টাটকা রাখা
গাছ থেকে পাড়ার পর লিচু দ্রুত নষ্ট হয়। মর্টন লিখেছেন, সদ্য পাড়া লিচু ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় মাত্র তিন থেকে পাঁচ দিন রং ও মান ধরে রাখে। টাটকা রাখতে সাধারণত বোঁটার কিছু অংশ ও কয়েকটি পাতাসহ থোকা কাটা হয়, কারণ একটি একটি করে টেনে ছিঁড়লে খোসা ছিঁড়ে যায় এবং ফল তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়। বৃষ্টির ঠিক পরে লিচু পাড়া হয় না, কারণ ভেজা ফল খুব দ্রুত পচে।
এফএওর নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ভালো মানের লিচু শহরের বাজারে যায় লিচুপাতা বিছানো বাঁশের ঝুড়িতে; আলগা করে ভরা এমন ঝুড়িতে লিচু প্রায় ৪৮ ঘণ্টা টাটকা থাকে। দূরের বাজারের জন্য লিচু পাড়া হয় বিকেলে, যখন সবে লাল হতে শুরু করেছে; মাঠেই ঝুড়িতে ভরে রাতের মধ্যে পাইকারি বাজারে পৌঁছানো হয়। মর্টন আরও লিখেছেন, চীন ও ভারতে পাতা বা অন্য নরম আস্তরণ দেওয়া ঝুড়ি বা ক্রেটে লিচু ভরা হয়, আর খুব ঠেসে ভরা উচিত নয়।
লিচুতে কী আছে, গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, লিচুর খাওয়ার অংশ, অর্থাৎ বীজ ঘিরে থাকা সাদা শাঁস, ফলের ওজনের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ; এতে প্রধানত শর্করা, সঙ্গে আমিষ, চর্বি, ভিটামিন বি ও সি, ক্যালসিয়াম ও লৌহ থাকে। চীন, ভারত ও ফিলিপাইনের বিশ্লেষণ একত্র করে মর্টন দেখিয়েছেন, ১০০ গ্রাম টাটকা লিচুর শাঁসে ৬৩ থেকে ৬৪ ক্যালরি, ৮১.৯ থেকে ৮৪.৮ শতাংশ পানি, ১৩.৩ থেকে ১৬.৪ গ্রাম শর্করা, ১৭০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম এবং ২৪ থেকে ৬০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার লিচু উৎপাদন এলাকায় শিশুদের একটি মৌসুমি অসুস্থতা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি লিচু উৎপাদনকারী এলাকায় অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোমের প্রাদুর্ভাবে ১৪টি শিশু আক্রান্ত হয়, যাদের ১৩টি মারা যায়। ২০১৭ সালে আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে প্রকাশিত ওই প্রাদুর্ভাবের গবেষণায় একে এমন লিচুবাগানের সংস্পর্শের সঙ্গে যুক্ত পাওয়া যায়, যেখানে নিয়মিত কীটনাশক ব্যবহার করা হতো, যার কয়েকটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ; গবেষণার কেস-কন্ট্রোল অংশে লিচু খাওয়ার সঙ্গে অসুস্থতার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
ভারতের সবচেয়ে বড় লিচু উৎপাদন এলাকা মুজাফফরপুরে ২০১৪ সালের এক অনুসন্ধানের ফল ২০১৭ সালে দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত হয়। তাতে ৩৯০টি অসুস্থ শিশুর কথা আছে, যাদের ১২২টি মারা যায়। অসুস্থতাকে লিচু খাওয়া ও রাতের খাবার না খাওয়ার সঙ্গে এবং লিচুতে থাকা প্রাকৃতিক বিষ হাইপোগ্লাইসিন এ ও মিথিলিনসাইক্লোপ্রোপাইলগ্লাইসিনের (এমসিপিজি) সঙ্গে যুক্ত পাওয়া যায়। ওই অঞ্চলের জন্য গবেষকেরা শিশুদের লিচু খাওয়া কমানো, শিশুরা যেন রাতের খাবার পায় তা নিশ্চিত করা এবং সন্দেহজনক রোগীর রক্তে শর্করার ঘাটতি দ্রুত পূরণের সুপারিশ করেন। এসব ফল নির্দিষ্ট প্রাদুর্ভাবের; ফল খেয়ে কেউ অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
ছবি: Nakib Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), আজকের পত্রিকা, বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), পারডু বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টার ফর নিউ ক্রপস অ্যান্ড প্ল্যান্ট প্রোডাক্টস (জে. এফ. মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস), আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন, দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ





মন্তব্য
(০)