২০২৬ সালের ২৯ মে, শুক্রবার, পবিত্র ঈদুল আজহার পরদিন রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাঁচাবাজার, মাছ ও ফলের আড়তে বেচাকেনা ছিল খুবই কম। ঈদের ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীর প্রভাব পড়েছিল নিত্যপণ্যের আড়তেও। জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সেদিন যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখেন, প্রয়োজনীয় সবজি, মাছ ও ফলের বেশ কিছু দোকান খোলা ছিল, তবে সবজি, ফল ও মাছের নতুন কোনো আমদানি ছিল না। দোকানদাররা দোকান খুলে বসলেও পুরো আড়তই ছিল প্রায় ফাঁকা, আর পণ্যভেদে দাম ছিল কোথাও কম, কোথাও বেশি।
সেদিন বাজারে শসা ও ঢ্যাঁড়সের দাম কমেছিল, টমেটোর দাম ছিল আগের মতোই, আর বেড়েছিল কাকরোলের দাম। মাছের বাজারে ইলিশের দাম ঈদের আগের তুলনায় কিছুটা কমেছিল, তবে রুই, পাবদা ও টেংরার দাম বেড়েছিল এবং চিংড়ি বিকোচ্ছিল ঈদের সময়ের বাড়তি দরেই। আড়তদার ও মাছ বিক্রেতারা অবশ্য দাবি করেছিলেন, পরদিন থেকে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের দাম আবার বাড়তে পারে। তাদের যুক্তি ছিল, সেদিন বাজারে ক্রেতা প্রায় নেই; লোকজনের সমাগম বাড়লে মাছের দামও বাড়বে।
ঈদের ছুটি, কোরবানি আর ফাঁকা রাজধানী
সেবার দেশে ঈদুল আজহা পালিত হয়েছিল ২৮ মে, বৃহস্পতিবার। বাংলা ট্রিবিউনের ১৮ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা বসে। দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় কমিটি জানায়, ১০ জিলহজ অর্থাৎ ২৮ মে সারা দেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে। ফলে জাগো নিউজের প্রতিবেদক যেদিন যাত্রাবাড়ীর বাজারে যান, সেটি ছিল ঈদের দ্বিতীয় দিন।
সরকারি ছুটিও তখন চলছিল। দৈনিক ইত্তেফাকের ১৪ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদনে বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা সাত দিন সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। এর মধ্যে ২৫ মে ছুটি দেওয়া হয় নির্বাহী আদেশে, ৭ মে মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্তে; আর বদলে ২৩ ও ২৪ মে, শনি ও রোববার, অফিস খোলা রাখা হয়। অর্থাৎ ২৯ মে ছিল লম্বা ছুটির মাঝামাঝি একটি দিন, যখন রাজধানীর বহু বাসিন্দা তখনো গ্রামের বাড়িতে।
কোরবানির আয়োজনও ছিল বড়। বাংলা ট্রিবিউনের ২২ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হকের দেওয়া তথ্য তুলে ধরা হয়: সে বছর কোরবানির জন্য দেশে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু, বিপরীতে প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি এবং ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি। অধিদপ্তরের হিসাবে সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা ছিল।
ঈদের পরদিনের বাজারে এই কোরবানির প্রভাবের কথা বিক্রেতারাও বলেছেন। যাত্রাবাড়ী বাজারের আম বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, কোরবানির ঈদের পরের দিন গরু-ছাগল কাটাকাটির কাজ করে মানুষের শরীরে ধকল গেছে, সেটার প্রভাব তখনো শেষ হয়নি। তাই বাজারে ক্রেতা কম, পণ্যের চাহিদাও কম। আবার মাছ বিক্রেতারা জানান, সাধারণত ঈদের সময় মাংসের চাহিদা বেশি থাকায় মাছের চাহিদা কমে যায়।
সবজির বাজার: কমেছে শসা, বেগুন ও ঢ্যাঁড়সের দাম
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদের পরদিন যাত্রাবাড়ীতে মিষ্টি কুমড়া বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৪০ টাকায় আর লাউ ৪০ থেকে ৫০ টাকায়, যা ঈদের আগের চেয়ে কম। সেদিন দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী আড়ত থেকে সবজি ও লিচু কিনে কেরানীগঞ্জের নড়াইল বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুজন খুচরা বিক্রেতা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মাল তুলছিলেন। তাদের কেনা পণ্যের মধ্যে ছিল টমেটো, শসা, বেগুন, পটল, করলা, কচুর লতি, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ঢ্যাঁড়স ও লিচু।
তাদের একজন জানান, বাজারে তখনো সবজির নতুন সরবরাহ শুরু হয়নি, নতুন চালান আসতে আরও সময় লাগতে পারে। এই ফাঁকে অনেক বিক্রেতা আগের মজুত করা পণ্য দ্রুত বিক্রি করে দিতে কিছু জিনিসের দাম কমিয়েছিলেন।
বাজারের খুচরা বিক্রেতা কামরুল জাগো নিউজকে জানান, ঈদের পর সবজির দামে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। তার দেওয়া দরগুলো ছিল এ রকম:
- কাঁচা মরিচ: ঈদের আগে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১১০ টাকা, ঈদের পরদিন ৭৫ থেকে ৮০ টাকা।
- টমেটো: আগের মতোই কেজিপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ টাকা।
- শসা: কেজিতে ৪০ টাকা কমে ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
- পটল: কেজিপ্রতি ৪০ টাকা।
- বেগুন: ৮০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা।
- করলা: কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকা থেকে কমে ৮০ টাকা।
- ঢ্যাঁড়স: ৫০ থেকে ৬০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা, পাইকারিতে ২০ টাকা।
- লেবু: আগে হালিপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা, তখন ১৫ থেকে ২০ টাকা।
কামরুলের মতে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম, আর সেটিই দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি আরও বলেন, যেসব পণ্য মানুষ কম কিনছে, সেগুলোর দামই একটু কমছে। বাজার করতে আসা দিদারুল আলম চৌধুরী জানান, ঈদের পর অতিথি আসবেন বলে তিনি প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে এসেছেন। তার কথায়, ঈদের আগে অনেক পণ্যের দাম চড়া থাকলেও তখন তা অনেকটাই কমেছে, তবে আলু, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের দামে হেরফের হয়নি। যাত্রাবাড়ী বাজারের নিত্যপণ্য বিক্রেতা আজিজুল ইসলাম জানান, সেদিন মূলত ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং যাদের রেস্তোরাঁ খোলা, তারাই বাজারে কেনাকাটা করতে আসছিলেন।

ঈদের আগের সপ্তাহে কেমন ছিল ঢাকার বাজারদর
ঈদের ছয় দিন আগে, ২২ মে ২০২৬, বাংলা ট্রিবিউন পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার ও নারিন্দা বাজারের দর নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে; একই দিনে দৈনিক ইত্তেফাকেও একই দরের তথ্য প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের শিরোনামই ছিল ঈদ ঘিরে মসলার দামে অস্থিরতা আর নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কথা। এগুলো যাত্রাবাড়ীর বাজার নয়, তাই দুই দিনের দর সরাসরি মেলানো যায় না; তবে ঈদের আগে রাজধানীর বাজারের সাধারণ চিত্রটি এতে পাওয়া যায়।
বাংলা ট্রিবিউনের হিসাবে, সেদিন শসা বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকায়, টমেটো ৮০ থেকে ৯০ টাকায় এবং কাঁচা মরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। গোল বেগুন ১০০ টাকা, লম্বা বেগুন ৭০ টাকা এবং করলা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ সবজি তখন ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছিল, আর লেবুর বাজারে কিছুটা স্বস্তি ছিল, এক হালি লেবু ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।
মাছের বাজারে তখন এক কেজি আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়, আর ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। রুই ২৪০ থেকে ৩৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৩০ টাকা, চিংড়ি ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ টাকা এবং কই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কোরবানির রান্নার অনুষঙ্গ মসলার দামও তখন চড়া ছিল। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলাচ বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায়, লবঙ্গ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়, জিরা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় এবং দারুচিনি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। পোলাওয়ের চালের দামও আগের চেয়ে বেড়ে কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় উঠেছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এক ক্রেতা তখন বলেছিলেন, প্রায় সব জিনিসের দামই আগের চেয়ে অনেক বেশি।
ফলের বাজার: লিচু চড়া, আমের দাম আগের মতো
ঈদের পরদিন যাত্রাবাড়ীর ফলের আড়তে লিচুর দাম ছিল চড়া। নড়াইল বাজারে যাওয়া সেই দুজনের একজন, পলাশ, জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের আগে লিচুর এক খাঁচি ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা, সেটা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। তবে আমের দাম তুলনামূলক কম ছিল: হিমসাগর আম কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, নিম্নমানের আম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কাঁচা আম আকারভেদে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা, কোথাও ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছিল বলে তিনি জানান।
জাগো নিউজের প্রতিবেদক সেদিন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখেন, ঈদের ঠিক আগে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মধুফল লিচুর দাম মান ও আকারভেদে ৫০০, ৪৫০, ৪০০, ৩৫০, ৩০০, ২৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ছিল। ঈদের পরদিন যে লিচু আগে ২০০ টাকায় পাওয়া যেত তা বিক্রি হচ্ছিল ৩০০ টাকায়, আর ৩০০ টাকার লিচু বিক্রি হচ্ছিল ৪০০ ও ৫০০ টাকায়। আম বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম জানান, ক্রেতা কম থাকলেও নতুন আমদানি না থাকায় আমের দাম কমেনি, দাম আগের মতোই ছিল।
রাজশাহীর হিমসাগর নামার আগেই সাতক্ষীরার হিমসাগর বাজারে এসে গিয়েছিল। প্রথম আলোর ১৫ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম সুলতানপুর বড়বাজারে হিমসাগর আম সংগ্রহ ও বিক্রি শুরু হয়, আর প্রথম দিন প্রতি মণ হিমসাগর বিক্রি হয় ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। গাজীপুর ও নাটোর থেকে আসা পাইকারেরা সেখানে আম কিনছিলেন। প্রতিবেদনে এক পাইকার বলেন, রং, ঘ্রাণ আর স্বাদের জন্য ঢাকায় এই আমের চাহিদা অনেক বেশি।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সে বছর সাতক্ষীরায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ২৯৯টি বাগানে প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জন কৃষক আম চাষ করেছেন। মৌসুমে জেলায় প্রায় ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, যার প্রায় ৩৮ শতাংশই হিমসাগর, আর ১০০ মেট্রিক টন আম রপ্তানির লক্ষ্য ছিল। বিডিনিউজ২৪ ডটকমের ৫ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের আম ক্যালেন্ডারে ৫ মে থেকে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস ও বৈশাখী, ১৫ মে থেকে হিমসাগর, ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি সংগ্রহের সূচি দেওয়া হয়েছিল।
রাজশাহীতে অবশ্য হিমসাগরের সময় তখনো আসেনি। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ১৫ মে ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহী জেলা প্রশাসনের আম ক্যালেন্ডারে জ্যৈষ্ঠের প্রথম দিন থেকে গুটি জাতের আম নামানো শুরু হয়; গোপালভোগ ও লক্ষ্মণভোগ নামানোর তারিখ ছিল ২২ মে, রানীপছন্দের ২৫ মে এবং হিমসাগর বা খিরসাপাতের ৩০ মে। অপরিপক্ব আম বাজারজাত ঠেকাতে ও আমের মান ঠিক রাখতে এই সূচি দেওয়া হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সে মৌসুমে রাজশাহীতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল।
লিচু (বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis) সোপবেরি বা স্যাপিনডেসি গোত্রের একটি চিরসবুজ গাছের ফল। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এর বাণিজ্যিক জাতটি দক্ষিণ চীন, উত্তর ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় বুনো অবস্থায় জন্মায়, চীনে এর চাষের লিখিত প্রমাণ একাদশ শতক থেকে, আর পরে গাছটি দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলের বাইরের খোসা গোলাপি-লাল ও খসখসে, ভেতরের শাঁস মিষ্টি ও হালকা টক।

মাছের বাজার: ইলিশ কিছুটা কম, চড়া রুই-পাবদা
ঈদের পরদিন মাছের বাজারেও ছিল ক্রেতার খরা। বিক্রেতারা জানান, ঈদের সময় মাংসের চাহিদা বেশি থাকায় মাছের চাহিদা সাধারণত কমে যায়, তবে ইলিশ ও চিংড়ির চাহিদা বরাবরই থাকে। ঈদের সময় এই দুই ধরনের মাছের দাম কেজিতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। ঈদের পরদিন ইলিশের দাম কমলেও চিংড়ির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
বিক্রেতা স্বপন চন্দ্র দাস জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের দুদিন আগে বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা ঈদের পরদিন নেমে এসেছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ৪০০ গ্রামের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছিল ৯৫০ টাকায়, ৬০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার টাকায় এবং ৭০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ২০০ টাকায়।
গলদা চিংড়ির দাম আগের মতোই কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় স্থির ছিল। বড় আকারের গলদার কেজি বিক্রেতারা হাঁকছিলেন ১ হাজার ৬০০ টাকা, দরদামে তা ১ হাজার ৫০০ টাকায় ঠেকছিল। বাগদা চিংড়ি আকারভেদে ৮৫০, ৮০০, ৭৫০ ও ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল।
আড়তের পাবদা মাছ বিক্রেতা জুয়েল জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের আগে মাছের আমদানি বেশি ছিল, ক্রেতাও বেশি ছিল, তাই দাম ছিল কম। ঈদের পরদিন ক্রেতা কম, মাছের আমদানিও কম, তাই পাবদা বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৩৫০ টাকায়, যা ঈদের আগে ছিল ৩২০ টাকা। তিনি জানান, তারা সাধারণত পাইকারি বিক্রি করেন, কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় তখন খুচরাও বিক্রি করছিলেন।
আরেক মাছ বিক্রেতা জানান, ঈদের আগে রুই মাছের আমদানি ছিল ব্যাপক, দামও ছিল কম। ঈদের পরদিন ক্রেতা কম, কিন্তু বাজারে রুই-কাতলাও কম; যে রুই এসেছিল তার দাম বেশি। তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি ওজনের বড় রুই বিক্রি হচ্ছিল কেজিপ্রতি ৪৮০ টাকায়, ছোট আকারের রুই ৩৮০ ও ৩৫০ টাকায়। বড় টেংরা ৬৫০ টাকা আর মাঝারি টেংরা ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল, যা ঈদের আগে আরও কম ছিল। মাঝারি আকারের তেলাপিয়ার কেজি ছিল ২২০ টাকা।

ইলিশ: জাতীয় মাছের উৎপাদন ও চলমান নিষেধাজ্ঞা
ইলিশ (বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha) হেরিং জাতীয় ক্লুপেইডি গোত্রের মাছ এবং বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এটি সাগরের মাছ হলেও ডিম ছাড়তে উপকূল থেকে নদীতে উজিয়ে আসে, আর ডিম ফোটার পর বাচ্চা ইলিশ, যা বাংলাদেশে জাটকা নামে পরিচিত, আবার সাগরের দিকে নেমে যায়। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ইলিশকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
দেশ রূপান্তরের ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদনে সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন নেমে আসে ৫ লাখ টনে, যা আগের আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে ছিল, সে বছর ইলিশ উৎপাদন হয় ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন।
একই সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং দেশজ জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ। বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় বাংলাদেশের নদ-নদী, মোহনা ও সাগর থেকে, আর ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। প্রায় ৬ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত, আর ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ পরিবহন, বিক্রি, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মতো কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। মন্ত্রী বলেন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও মৎস্য সম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির কারণে ইলিশ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
ঈদের সময় সাগরে মাছ ধরাও বন্ধ ছিল। বাংলা ট্রিবিউন ও ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে। ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করাই ছিল এর লক্ষ্য। তার আগে ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২০টি জেলায় জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালিত হয়, যার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় চাঁদপুরে; সেবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী’।
জাটকা ধরার ওপর আট মাসের নিষেধাজ্ঞাও তখন বলবৎ ছিল। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ ধরা, পরিবহন, বাজারজাত, কেনাবেচা ও মজুত নিষিদ্ধ করা হয়। সংশোধিত মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী এই নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। মৎস্য অধিদপ্তর জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মিলে এটি কার্যকর করে।
যে মাছ ও সবজির দাম নিয়ে কথা
প্রতিবেদনে যে দুই ধরনের চিংড়ির কথা এসেছে, সেগুলো আলাদা প্রজাতি। গলদা চিংড়ি (Macrobrachium rosenbergii) বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির চিংড়িগুলোর একটি; এর লার্ভা দশা লোনাপানির ওপর নির্ভরশীল হলেও কিশোর অবস্থা থেকে এটি পুরোপুরি মিঠাপানিতে থাকে এবং ৩০ সেন্টিমিটারের বেশি লম্বা হতে পারে। বাগদা চিংড়ি (Penaeus monodon) সামুদ্রিক প্রজাতি, ইংরেজিতে ব্ল্যাক টাইগার শ্রিম্প নামে পরিচিত; এর কিশোর চিংড়ি সাধারণত বালুময় মোহনা ও ম্যানগ্রোভে থাকে, আর খাবারের জন্য এটি ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়।
পাবদা (Ompok pabda) মিঠাপানির একধরনের ক্যাটফিশ, বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ছোট স্রোতধারা, পুকুর ও হ্রদে পাওয়া যায়; এটি সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং মে থেকে আগস্টের মধ্যে ডিম ছাড়ে। রুই (Labeo rohita) কার্প গোত্রের বড় মাছ, দক্ষিণ এশিয়ার নদীতে পাওয়া যায় এবং এ অঞ্চলের মিঠাপানির মাছচাষে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। বর্ষাকালে এটি ডিম ছাড়ে, তবে চাষের জলাশয়ে এটি নিজে থেকে প্রজনন করে না বলে কৃত্রিম প্রজনন দরকার হয়।
সবজির মধ্যে শসা (Cucumis sativus) কিউকারবিটেসি বা লাউ-কুমড়া গোত্রের লতানো উদ্ভিদ। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এর আদি অঞ্চল ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, চীনের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তর থাইল্যান্ড জুড়ে বিস্তৃত, আর অন্তত তিন হাজার বছর ধরে এর চাষ হচ্ছে। শসার ফলের প্রায় ৯৫ শতাংশই পানি। পটল (Trichosanthes dioica) একই গোত্রের বহুবর্ষজীবী লতা, যার আদি অঞ্চল ভারতীয় উপমহাদেশ; বাংলাদেশে এটি গ্রীষ্মের গুরুত্বপূর্ণ সবজি এবং প্রায় সব জেলাতেই চাষ ও খাওয়া হয়। কাকরোল (Momordica dioica) এ গোত্রেরই আরেক সবজি, যার বংশবিস্তার হয় মাটির নিচের কন্দ থেকে।
যাত্রাবাড়ী: রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্ব প্রবেশমুখ
যাত্রাবাড়ী ঢাকা মহানগরের একটি থানা ও এলাকা, যার অবস্থান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শুরুর মুখে। উইকিপিডিয়ায় বাংলাপিডিয়া ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, থানাটির আয়তন ১৩ দশমিক ১৯ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে সবুজবাগ ও ডেমরা, দক্ষিণে কদমতলী ও শ্যামপুর, পূর্বে ডেমরা এবং পশ্চিমে গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুর থানা। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী যাত্রাবাড়ী থানায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৭টি খানা এবং ৪ লাখ ৯২ হাজার ১৮০ জন মানুষের বাস। এলাকাটি ইস্পাতের আসবাব শিল্পের জন্যও পরিচিত।
যাত্রাবাড়ীর আড়তে রাজধানীর বাইরের খুচরা বিক্রেতারাও যে কেনাকাটা করতে আসেন, ঈদের পরদিন জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তার একটি উদাহরণ ছিল: কেরানীগঞ্জের নড়াইল বাজারের বিক্রেতারা যাত্রাবাড়ী আড়ত থেকে সবজি ও লিচু কিনে অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আড়তে নতুন চালান না আসায় সেদিন তাদের কেনাকাটা চলছিল দোকানিদের আগের মজুত থেকেই।
ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৯ মে ২০২৬), বাংলা ট্রিবিউন (৬ এপ্রিল, ১৮ মে ও ২২ মে ২০২৬), দৈনিক ইত্তেফাক (১৪ মে ও ২২ মে ২০২৬), প্রথম আলো (১৫ মে ২০২৬), ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন (৬ এপ্রিল ও ১৫ মে ২০২৬), দেশ রূপান্তর (৭ এপ্রিল ২০২৬), বিডিনিউজ২৪ ডটকম (৫ মে ২০২৬), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (১ নভেম্বর ২০২৫), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)