সৌন্দর্যের জন্য অনেকেই ঘরে টবে ছোট গাছ রাখেন। কিন্তু এসব গাছ কি শরীর ও মনের জন্যও ভালো? ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউনের বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল। তখন পর্যন্ত প্রকাশিত গবেষণা বলছিল, ঘরের গাছ মন ভালো রাখা ও মানসিক চাপ কমানোয় সহায়ক হতে পারে; তবে ঘরের বাতাস পরিশুদ্ধ করার যে দাবি প্রচলিত, তার পক্ষে প্রমাণ দুর্বল।
মন ও শরীরে গাছের প্রভাব নিয়ে গবেষণা
অস্ট্রেলিয়ার এডিথ কোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডানিকা-লি লারকোম্ব ও পিয়ের হরউইৎস ২০১৭ সালের জুলাইয়ে দ্য কনভারসেশনে লেখেন, গাছ মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ, পেশির টান ও হৃদযন্ত্রের কাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দাদের ঘরে গাছ রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লেখায় তাঁরা আগের গবেষণার বরাত দিয়ে এ কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এস. এইচ. পার্ক ও আর. এইচ. ম্যাটসনের একটি গবেষণা ২০০৯ সালে জার্নাল অব অল্টারনেটিভ অ্যান্ড কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনে প্রকাশিত হয়। পাইলসের অস্ত্রোপচারের পর সেরে ওঠা ৯০ জন রোগীকে দৈবচয়নে দুই দলে ভাগ করা হয়; অর্ধেকের কক্ষে জীবন্ত গাছ রাখা হয়। গাছ ও ফুলসহ কক্ষের রোগীদের সিস্টোলিক রক্তচাপ কম ছিল এবং তাঁরা ব্যথা, উদ্বেগ ও ক্লান্তি কম বলে জানান। কক্ষ নিয়েও তাঁদের সন্তুষ্টি বেশি ছিল।
গাছের যত্ন নেওয়ার কাজটিও চাপ কমাতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার চুংনাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের একটি গবেষণা ২০১৫ সালে জার্নাল অব ফিজিওলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজিতে প্রকাশিত হয়। এতে ২৪ জন তরুণ একবার কম্পিউটারে কাজ করেন, আরেকবার ঘরের একটি গাছ নতুন টবে স্থানান্তর করেন। গাছের কাজের পর তাঁরা বেশি স্বস্তি ও প্রশান্তি বোধ করেন, আর তাঁদের ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। গবেষকদের মতে, গাছের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সময় কাটানো মানসিক কাজের তুলনায় শারীরিক ও মানসিক চাপ কমাতে পারে।

সবুজের কাছে থাকা ও নারীদের মৃত্যুহার
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গাছপালার কাছে বেশি থাকা নারীদের মৃত্যুহার কম। এ বিষয়ে বহুল আলোচিত গবেষণাটি করেন হার্ভার্ড টি. এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের পিটার জেমস ও তাঁর সহকর্মীরা, যা ২০১৬ সালে এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারস্পেক্টিভস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নার্সেস হেলথ স্টাডির ১,০৮,৬৩০ জন নারীকে ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়; এ সময়ে ৮,৬০৪ জন মারা যান।
উপগ্রহচিত্রে বাড়ির চারপাশের ২৫০ মিটারের সবুজ মাপা হয়। সবচেয়ে বেশি সবুজে ঘেরা এলাকার নারীদের দুর্ঘটনা ছাড়া অন্য কারণে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম সবুজের এলাকার নারীদের চেয়ে ১২ শতাংশ কম ছিল। এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্বাসতন্ত্রের রোগে মৃত্যুর হার ৩৪ শতাংশ এবং ক্যানসারে মৃত্যুর হার ১৩ শতাংশ কম ছিল। গবেষকদের বিশ্লেষণে এর পেছনে শারীরিক পরিশ্রম, সূক্ষ্ম বস্তুকণার দূষণ, সামাজিক মেলামেশা ও বিষণ্নতার ভূমিকা দেখা যায়। মনে রাখা দরকার, গবেষণাটি বাড়ির আশপাশের গাছপালা নিয়ে, ঘরের টবের গাছ নিয়ে নয়; আর এটি একটি সম্পর্ক দেখায়, সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না।

নাসার ১৯৮৯ সালের গবেষণা ও ঘরের বাতাস
ঘরের গাছ বাতাস পরিশুদ্ধ করে, এই ধারণার উৎস যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসার একটি গবেষণা। ১৯৮৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘ইন্টেরিয়র ল্যান্ডস্কেপ প্ল্যান্টস ফর ইনডোর এয়ার পলিউশন অ্যাবেটমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করেন নাসার স্টেনিস স্পেস সেন্টারের বি. সি. উলভারটন ও তাঁর সহকর্মীরা। অ্যাসোসিয়েটেড ল্যান্ডস্কেপ কন্ট্রাক্টরস অব আমেরিকার সঙ্গে যৌথ এই গবেষণায় মহাকাশ স্টেশনের মতো বদ্ধ পরিবেশের কথা ভেবে বেনজিন, ফরমালডিহাইড ও ট্রাইক্লোরোইথিলিনের মতো উদ্বায়ী জৈব যৌগ দূর করার পরীক্ষা চালানো হয়।
কিন্তু সাধারণ ঘর বা অফিস বদ্ধ কক্ষ নয়। ২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রায়ান কামিংস ও মাইকেল ওয়ারিং ছোট বদ্ধ কক্ষে চালানো ১২টি প্রকাশিত গবেষণার ১৯৬টি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের হিসাবে, সাধারণ ভবনে বাইরের বাতাস ঢুকে যে হারে উদ্বায়ী যৌগ সরিয়ে দেয়, সেই হারে কাজ করতে প্রতি বর্গমিটার মেঝেতে ১০ থেকে ১০০০টি টবের গাছ লাগবে। ড্রেক্সেলের বিজ্ঞপ্তিতে ওয়ারিং বলেন, গাছ চমৎকার, কিন্তু ঘর বা অফিসের বাতাসের মানে প্রভাব ফেলার মতো দ্রুত এরা বাতাস পরিষ্কার করতে পারে না।

অর্থাৎ ২০১৯ সাল পর্যন্ত গবেষণা অনুযায়ী ঘরের গাছের উপকার মূলত মনের প্রশান্তি ও চাপ কমানোয়; ঘরের বাতাসের মানের ক্ষেত্রে বাইরের বাতাস চলাচলের ভূমিকাই অনেক বড়। ঘরের গাছ কোনো রোগের চিকিৎসা নয়; উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ছবি: MarDe / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য কনভারসেশন, জার্নাল অব অল্টারনেটিভ অ্যান্ড কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন, জার্নাল অব ফিজিওলজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজি, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারস্পেক্টিভস, এনবিসি নিউজ, নাসা, জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি, ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)