২০২৬ সালের জুলাইয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস দেয় যে দেশের অধিকাংশ এলাকায় ১২ থেকে ১৪ জুলাই ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে, আর ১৫ ও ১৬ জুলাই অনেক এলাকায় তীব্রতা কিছুটা কমলেও অঞ্চলভেদে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় আমন বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ পর্যায়ের কৃষকদের জন্য করণীয় জানিয়ে কৃষি পরামর্শ দেয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। জাগো নিউজ ১৩ জুলাই পরামর্শটি প্রকাশ করে।
১২ জুলাই আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, আগের দিন থেকে সেদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার এবং ভোর ৬টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত আরও ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কার কথাও জানায় অধিদপ্তর। ব্রির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আমনের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় মধ্য জুলাই থেকে আগস্টের মাঝামাঝি; ফলে এই বৃষ্টি পড়ে ঠিক বীজতলা ও রোপণের মৌসুমে।
বৃষ্টির সময় ব্রির করণীয়
- ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকা এলাকায় নতুন বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ আপাতত স্থগিত রাখা এবং বৃষ্টির তীব্রতা কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করা, কারণ প্রবল বৃষ্টি ও স্রোতে চারা ভেসে যেতে বা নষ্ট হতে পারে।
- বীজতলা ও রোপণ করা জমির পানি নিষ্কাশনের নালা পরিষ্কার ও সচল রাখা।
- সদ্য রোপণ করা জমিতে পানি জমলে দ্রুত বের করা, তবে একবারে সব পানি না সরিয়ে অল্প পানির স্তর রাখা, যাতে চারা হেলে না পড়ে বা ভেসে না যায়।
- বীজতলা ডোবার আশঙ্কা থাকলে চারার বয়স ও অবস্থা বুঝে উঁচু, নিরাপদ জায়গায় বিকল্প বীজতলা করা; প্রয়োজনে মাটি তুলে জমির সাধারণ পৃষ্ঠ থেকে ১৫-২০ সেন্টিমিটার উঁচু বেড বানানো।
- ভারী বৃষ্টির আগে বা বৃষ্টির মধ্যে ইউরিয়াসহ কোনো সার, কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক না দেওয়া; এতে সার ধুয়ে যায় এবং বালাইনাশকের কার্যকারিতা কমে।

বীজ ও বীজতলা নির্বাচন
বন্যা বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্বল্পমেয়াদি ও স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী আমন জাত বেছে নিতে এবং ভালো মানের, পরিপক্ক ও পূর্ণ দানার বীজ ব্যবহার করতে বলেছে ব্রি। ব্রির কৃষিতত্ত্ব বিভাগ ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২-কে বন্যা সহনশীল জাত হিসেবে উল্লেখ করে।
ব্রির পরামর্শ অনুযায়ী লবণ-পানি পরীক্ষায় অপুষ্ট ও ভাসমান বীজ বাদ দিয়ে সুস্থ বীজ বাছাই করতে হবে। প্রয়োজনে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করে পরিষ্কার পানিতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা জাগ দিয়ে অঙ্কুরিত বীজ বুনতে হবে। কোন ছত্রাকনাশক কতটুকু দিতে হবে, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত। বন্যার পূর্বাভাস থাকলে বীজতলাকে বৃষ্টির সরাসরি আঘাত থেকে বাঁচাতে অস্থায়ী পলিথিন বা ছাউনি দেওয়া যায়, তবে পানি নিষ্কাশন ও বাতাস চলাচল নিশ্চিত করে বৃষ্টি কমলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে।
দীর্ঘ জলাবদ্ধ এলাকায় বিকল্প বীজতলা
জমি দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকলে ব্রি দাপোগ, ভাসমান বা ট্রে-ভিত্তিক বীজতলার পরামর্শ দিয়েছে, এমন জায়গায় যেখানে বন্যার পানি ঢোকার আশঙ্কা কম এবং পানি নিষ্কাশনের সুযোগ আছে। ব্রির কৃষিতত্ত্ব বিভাগ জানায়, বন্যাকবলিত অবস্থায় ভাসমান বীজতলা চারা উৎপাদনের একটি অন্যতম বিকল্প: বাঁশ বা কলাগাছের ভেলায় ২-৩ সেন্টিমিটার মাটির আস্তরের ওপর বীজ বুনে ২০-২৫ দিনের মধ্যে মানসম্পন্ন চারা পাওয়া যায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, দাপোগ পদ্ধতির উৎপত্তি ফিলিপাইনে। মাঠে বা সিমেন্টের মেঝেতে পলিথিন বা কলাপাতা বিছিয়ে তার ওপর পাতলা কাদা বা মাটির স্তরে চারা তোলা হয় এবং ১০ থেকে ১৪ দিনে চারা রোপণের উপযোগী হয়। পানির উৎস কাছে থাকলে এ বীজতলা প্রায় যেকোনো জায়গায় করা যায়।

পানি নামার পর করণীয়
পানি নেমে গেলে বীজতলা ও রোপণ করা জমি ভালোভাবে দেখে মৃত, দুর্বল বা ভেসে যাওয়া চারার জায়গায় দ্রুত সুস্থ ও সবল চারা লাগিয়ে গ্যাপ পূরণ করতে বলেছে ব্রি। ব্রির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের তথ্যমতে, বন্যার পানি নামার পর অপেক্ষাকৃত ভালো জমির প্রতি গোছা থেকে ২-৩টি কুশি আলাদা করে নতুন জমিতে রোপণ করা যায়, আর বন্যা-পরবর্তী সময়ে আলোক সংবেদনশীল জাত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোপণ করা যেতে পারে।
মেঘলা ও আর্দ্র আবহাওয়া দীর্ঘ হলে বীজতলা ও জমিতে রোগবালাইয়ের লক্ষণ নিয়মিত দেখতে হবে, তবে রোগ বা পোকা নিশ্চিত না হয়ে বালাইনাশক দেওয়া যাবে না। বৃষ্টি কমে জমি স্বাভাবিক হলে এবং পরের ২-৩ দিন ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা না থাকলে নতুন বীজতলা, রোপণ, গ্যাপ পূরণ ও সার ব্যবস্থাপনা সারতে বলেছে ব্রি; সারের মাত্রা জানতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া ভালো। এসব কাজের সময় ঠিক করতে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক সর্বশেষ আবহাওয়া ও বন্যা সতর্কবার্তা অনুসরণের কথাও বলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ছবি: MdRamjanAliWiki / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)




মন্তব্য
(০)