২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে, রমজান মাস চলাকালে, আমের মূল মৌসুমের কয়েক সপ্তাহ আগেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে বিক্রি হচ্ছিল আগাম জাতের কাটিমন আম। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ২ মার্চ জানায়, ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত এই জেলার বেশির ভাগ বাগানে তখনো মুকুলের সময় চলছিল, কিন্তু কয়েকটি ব্যতিক্রমী বাগানে এর মধ্যেই গাছে ঝুলছিল কাটিমন আম। পবিত্র রমজানকে ঘিরে এই আগাম আমের চাহিদা বেড়েছিল কয়েকগুণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসন্ত মানেই গাছে গাছে মুকুলের সমারোহ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চের শুরুতে চারদিকে ছিল সোনালি মুকুল আর কচি পাতার মেলা, বাতাসে আমের মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। চাষিরা তখন বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত ছিলেন: মুকুল রক্ষা, নিয়মিত স্প্রে, সেচ আর বাগান পরিচ্ছন্ন রাখা। এর মধ্যেই হাতে গোনা কয়েকটি বাগানের কাঁচা ও পাকা কাটিমন আম বাজারে ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছিল।
বাংলাদেশে ১৪৪৭ হিজরির রমজান শুরু হয় ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ ও কক্সবাজারে নতুন চাঁদ দেখা যাওয়ার পর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয় বলে সেদিন বাসস জানায়। জাগো নিউজের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় রমজানের মধ্যেই, ২ মার্চ, যখন ইফতারের জন্য ফলের চাহিদা ছিল নিয়মিত।
নাচোলের ঘিওনে ৪০ বিঘার কাটিমন বাগান
প্রতিবেদনে উঠে আসা বাগানগুলোর একটি শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের। তিনি নাচোল উপজেলার ঘিওন গ্রামে ৪০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে সেখানে কাটিমন আমের বাগান গড়ে তুলেছেন। সঠিক ছাঁটাই, সময়মতো সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং নিয়মিত তদারকির ফলে মার্চের শুরুতেই তার বাগানে ফলন এসেছিল। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছিল আকারে বড় সবুজ কাটিমন আম।
হাবিবুর রহমান জানান, ওই মৌসুমে তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকার আম বিক্রির আশা করছিলেন। রমজানকে ঘিরে আগাম আমের চাহিদা থাকায় বাজারদরও ছিল তুলনামূলক বেশি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগাম বাজার ধরতে পারলে লাভ বেশি হয়। এবার ফলন ভালো, দামও ভালো পাচ্ছি। আশা করছি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারবো।’
শুধু হাবিবুর রহমান নন, প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলার আরও অনেক চাষি তখন কাটিমন চাষে ঝুঁকছিলেন। তাদের মতে, এই জাতের আম তুলনামূলক দ্রুত ফলন দেয়, গাছের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং রোগবালাই কম হয়। স্বাদে মিষ্টি, আঁশ কম ও দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। রমজানে ইফতারে ফলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাটিমনের বিক্রি আরও বেড়েছিল।
বাগানটি যে নাচোল উপজেলায়, তার আয়তন ২৮৩.৬৭ বর্গকিলোমিটার। জেলার পূর্ব দিকের এই উপজেলার চারপাশে রয়েছে গোমস্তাপুর, নবাবগঞ্জ সদর, তানোর ও নিয়ামতপুর উপজেলা। বাংলাপিডিয়া নাচোলের প্রধান ফলের তালিকায় প্রথমেই রেখেছে আম, সঙ্গে কাঁঠাল, লিচু, কালোজাম, তাল, নারকেল, তরমুজ ও বরই, আর লিখেছে, উপজেলার ৭৩.২৭ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। হাবিবুর রহমান যে শিবগঞ্জের বাসিন্দা, সেটি জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা, আর একই সূত্র অনুযায়ী সেখানকার প্রধান রপ্তানিপণ্যের মধ্যে আম রয়েছে।
কাটিমন জাতটি কেন আলাদা
কাটিমন থাইল্যান্ডের একটি আমের জাত, যা বাংলাদেশে চাষ হয় বছরে একাধিকবার মুকুল ও ফল দেওয়ার ক্ষমতার জন্য। দ্য ডেইলি স্টার ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রায় ছয় বছর আগে থাইল্যান্ড থেকে জাতটি দেশে আনেন এবং এটি দ্রুত দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। এর গাছ ছোট: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার একটি বাগানে পত্রিকাটি এমন গাছ দেখেছিল, যেগুলো ছয় ফুটের বেশি উঁচু নয়। সবে এক বছর বয়সেই কোনো কোনো গাছে আম ধরেছিল, অন্যগুলোতে তখন মুকুল বা কুঁড়ি।
কৃষি বিশেষজ্ঞরাও জাতটির বৈশিষ্ট্য একইভাবে বর্ণনা করেছেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষজ্ঞরা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, বিদেশি এই জাতের গাছে একই সঙ্গে আম এবং ফুল বা কুঁড়ি থাকে, প্রচলিত জাতের বছরে একবারের বিপরীতে এটি বছরে তিন থেকে চারবার ফলন দেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলামও বাসসকে একই কথা বলেন। বাসসের সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচলিত জাতের আম সাধারণত মে থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত একবারই সংগ্রহ করা যায়, কিন্তু কাটিমন গাছে বছরে কয়েকবার ফল আসে। এতে তিন থেকে চার মাসের প্রচলিত মৌসুমের বাইরেও চাষিদের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। এসব প্রতিবেদনে আরেকটি সুবিধার কথাও এসেছে: অন্য জাতের তুলনায় কাটিমন আম বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায়।
২০২৬ সালের মৌসুমের আগেও জাতটি ছিল নতুন, আর সরকারি মহল ছিল সতর্ক। বাসস ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে লেখে, অঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত আমের তুলনায় কাটিমন নতুন ও বিদেশি জাত, বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে এটি কতটা লাভজনক, তা তখনো যাচাই করা হচ্ছিল। রোগবালাইয়ের ঝুঁকি ও অঞ্চলের জন্য এর উপযোগিতা বুঝতে বিজ্ঞানীরা জাতটি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ২০২২ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রাজশাহীর তৎকালীন উপপরিচালক মোজদার হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, সারা বছর ফলন নেওয়ার জন্য বাড়তি ব্যবস্থাপনা খরচের কারণে জাতটি বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হতে পারে। তিনি চাষিদের এর বদলে বারি-১১ চাষের পরামর্শ দেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২১-২২ সালে সারা দেশে ৭০০ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ হয়, যার ৫২৩ হেক্টরই রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায়: রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর। দ্য ডেইলি স্টারের তখনকার প্রতিবেদন অনুযায়ী দিনাজপুর, রংপুর ও ঠাকুরগাঁওয়েও এ আম চাষ হচ্ছিল এবং প্রায় ২৫০ জন চাষি জাতটি চাষ করছিলেন। চাহিদা বাড়ায় অনেক চাষি বাগানের পাশে নার্সারি গড়ে কাটিমনের চারা বিক্রি করছিলেন। তবু তখন দেশের বার্ষিক আম উৎপাদনের ১ শতাংশও কাটিমন ছিল না।
‘আমের রাজধানী’তে মুকুলের মৌসুম
প্রতিবেদনের সময় চাষিরা বাগানে যে পরিচর্যা করছিলেন, তা আমগাছের বার্ষিক চক্রেরই অংশ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আমের ফুল ধরে ডালের মাথায় বড় মঞ্জরিতে, প্রতিটি মঞ্জরিতে ১০০ থেকে ২৫০টি ফুলের কুঁড়ি থাকতে পারে, আর প্রায় এক হাজার ফুলের মধ্যে মাত্র এক-দুটি পরিপক্ব আমে পরিণত হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চে, যখন গাছে ফুল আসে, তখন কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধরায় ক্ষতি করে। ফল বড় হওয়ার সময় হালকা বৃষ্টি উপকারী, কিন্তু ঝড়, বিশেষ করে শিলাবৃষ্টিতে কাঁচা আম ঝরে পড়ে।
একই সূত্রে বলা হয়েছে, নার্সারি থেকে পরিপক্ব অবস্থা পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় তিন ডজন পোকা আমগাছ আক্রমণ করে। এর মধ্যে রয়েছে আমের হপার বা শোষক পোকা, আমের ভোমরা পোকা, কাণ্ড ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা এবং ফলের মাছি। অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, আগামরা ও পাউডারি মিলডিউর মতো ছত্রাকজনিত রোগেও যথেষ্ট ক্ষতি হয়। আক্রান্ত মুকুলে আম ধরে খুব কম, কখনো একেবারেই ধরে না। কৃষিবিদেরা ২০২০ সালে প্রথম আলোকে বলেন, হপার পোকা আর অ্যানথ্রাকনোজ রোগ আমের প্রধান শত্রু। স্প্রে বা বালাই দমনে কী করতে হবে, সে বিষয়ে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নিউমার্কেটে ক্রেতা ও বিক্রেতা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নিউমার্কেট ফল বাজারে গিয়ে জাগো নিউজ দেখতে পায়, অন্যান্য ফলের পাশে জায়গা করে নিয়েছে কাটিমন আম। ইফতারের জন্য অন্য ফলের সঙ্গে কাটিমনও কিনছিলেন ভোক্তারা।
শহরের পশ্চিম পাঠানপাড়া মহল্লার বাসিন্দা ফারুক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আম হল প্রকৃতির একটি অসাধারণ উপহার। এর রসালো স্বাদ শুধু মুখেই নয়, মনকেও প্রশান্তি দান করে। গরমের দুপুর বা সন্ধ্যার পর ইফতারের সময় যখন প্রথমে ঠান্ডা আম খাওয়া হয়, তখন সেই স্বাদ যেন একেবারেই অনন্য। তাই ৩০০ টাকা দিয়ে এককেজি আম কিনলাম।’
নিউমার্কেট এলাকার ফলের দোকানি রুহুল আলী বলেন, ‘রমজানের শুরু থেকেই কাটিমন আমের চাহিদা চোখে পড়ার মতো বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই ক্রেতারা বাজারে এসে এই রসালো আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ইফতারের জন্য ভোক্তারা অন্যান্য ফলের সঙ্গে কাটিমন আমকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।’
শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক জাগো নিউজকে বলেন, আগে মৌসুমের শুরুর দিকে বাজারে বিদেশি আমের ওপর নির্ভরতা ছিল। তার ভাষায়, ‘এখন দেশেই কাটিমন উৎপাদন হওয়ায় আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। এতে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও লাভবান হচ্ছেন।’ প্রতিবেদনে এর পক্ষে আমদানির কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি, তাই এটি তার মত হিসেবেই উল্লেখ করা হলো।

অসময়ের আম ও রমজানের বাজার
২০২৬ সালের আগের কয়েক বছরেও দেশের নানা প্রান্তে রমজানে আগাম ও অসময়ের আম ক্রেতা পেয়েছে। আগের প্রতিবেদনগুলো দেখায়, বারোমাসি জাতের চাষিদের কাছে রোজার মাস কীভাবে বিক্রির মৌসুম হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের মার্চে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যশোরের শার্শা উপজেলা থেকে জানায়, বারি-১১ ও কাটিমন জাতের বারোমাসি আম চাষ করা এক চাষি প্রতি কেজি আম বিক্রি করছিলেন ৪০০ টাকায়। স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিনি ২০১৮ সালে তিন বিঘা জমিতে কাটিমনের বাগান করেন এবং সে বছর জানুয়ারি থেকেই আম তুলতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের মার্চে, আরেক রমজানে, একই সংবাদমাধ্যম জানায়, রোজাকে লক্ষ্য করে তিনি প্রতি কেজি ৩৫০ টাকায় আম বিক্রি করছিলেন। শার্শার কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বারি-৪, বারি-১১ ও কাটিমন জাতের গাছে বছরে তিনবার ফলন হয় এবং অসময়ে আম আসায় চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন। কর্মকর্তাদের হিসাবে উপজেলায় আমের আবাদ ছিল ৯৫৯ হেক্টরে, যার মধ্যে কাটিমন ২ হেক্টরে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রতিবেদনের কয়েক দিন আগে, ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, প্রথম আলো জানায়, কক্সবাজারের টেকনাফে কাঁচা আম বিক্রি হচ্ছিল প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়, আর রমজানের কারণে রোজাদারদের অনেকেই চড়া দামে তা কিনছিলেন। টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মতে, সেই আম কাটিমন নয়, টেকনাফের আর্দ্র উপকূলীয় আবহাওয়ায় জন্মানো স্থানীয় একটি বারোমাসি ধরন। তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, ‘দেশে বারোমাসি কাটিমন জাতের আম আছে। এগুলো সারা বছর ফলন দেয়। এই জাতের আমও সেই রকম।’
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে, মূল মৌসুম শেষ হওয়ার পর, রাজশাহীতে কাটিমন বিক্রি হচ্ছিল প্রতি মণ ৮ হাজার টাকায়, অর্থাৎ প্রতি কেজি ২০০ টাকায়, জানায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাসস জানায়, রাজশাহীর তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় ছয় হাজারের বেশি কাটিমন গাছের বাগান থাকা শিবগঞ্জের এক চাষি তখন প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় আম বিক্রি করছিলেন। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে পাওয়া ২০২৬ সালের শুরুর রমজানের বাজারদর ছিল অসময়ের সেই দামের চেয়ে অনেক বেশি।
কাটিমন ও বারি আম-১১: দেশের দুই বারোমাসি আম
বাংলাদেশে বছরে একাধিকবার ফল দেওয়া আম কেবল কাটিমন নয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কেন্দ্রে নিজস্ব বারোমাসি জাত বারি আম-১১ উদ্ভাবন করেছে। প্রথম আলো ২০২০ সালের ডিসেম্বরে জানায়, কয়েক বছরের গবেষণার পর ২০১৪ সালের জুনে জাতীয় বীজ বোর্ড থেকে জাতটির নিবন্ধন মেলে। পত্রিকাটির উদ্ধৃত গবেষণা সূত্র অনুযায়ী, বারি আম-১১ সারা বছর ফুল ও ফল দেয়, তবে বছরের তিনটি সময়ে ফুল ও ফল তুলনামূলক বেশি হয়: ফেব্রুয়ারি-মার্চ, মে-জুন ও আগস্ট-সেপ্টেম্বর। আমগুলো মাঝারি আকারের, প্রতিটির ওজন ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম, এক থোকায় পাঁচ থেকে ছয়টি আম থাকে, পাকলে হলুদ হয়, আর এর মিষ্টতা মাপা হয়েছে ১৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
বারির তৎকালীন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ফল গবেষণা ও উদ্যানতত্ত্ব) মো. শরফুদ্দিন ২০২০ সালে প্রথম আলোকে বলেন, থাইল্যান্ডের কাটিমন ও বারি-১১, দুটি বারোমাসি জাতেরই তখন চাষ হচ্ছিল। তার মতে, বারি-১১ মধ্যম মানের সুস্বাদু আম; জুন-জুলাইয়ে যখন ফল আসে, তখন একটু আঁশ থাকে, কিন্তু অসময়ে, অর্থাৎ শীতে যখন ফল আসে, তখন আঁশ থাকে না এবং দামও ভালো পাওয়া যায়। পত্রিকাটি জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায় তখন চার-পাঁচ বছর ধরে কাটিমনের চাষ চলছিল, আর বিজ্ঞানীরা গুণাগুণ ও উৎপাদনক্ষমতায় দেশে উদ্ভাবিত বারি-১১-কে এগিয়ে রাখছিলেন।
মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও দুই জাতের কথা একসঙ্গে বলেছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, দেশে কাটিমন বা বারি-১১ জাতের আম বছরে তিনবার আসে। ২০২২ সালের আগস্টে বাসস মেহেরপুর থেকে জানায়, ২০২১ সালের শুরুতে দুই বিঘা জমিতে লাগানো থাই কাটিমনের চারায় তখনই একই গাছে মুকুল, গুটি ও পরিপক্ব আম দেখা যাচ্ছিল। প্রতিবেদনে আমের আঁটি ছোট ও আঁশবিহীন বলে বর্ণনা করা হয়, আর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, গবেষণার মাধ্যমে জাতটি চাষি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অল্প পরিমাণে হলেও কাটিমন রপ্তানির বাজারেও পৌঁছেছে। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৩ সালের আগস্টে রাজশাহীভিত্তিক একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রাশিয়ায় অন্তত ৩০০ কেজি আম পাঠায়, যার মধ্যে ১০০ কেজি কাটিমন ও ২০০ কেজি গৌরমতি। আমগুলো সংগ্রহ করা হয় নাচোল উপজেলার কুন্দুয়া গ্রামের একটি বাগান থেকে। বাগানমালিক পত্রিকাটিকে বলেন, গৌরমতি ও কাটিমন জাতের ফল সারা বছর থাকে, কিন্তু সর্বাধিক লাভের জন্য আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আম পাড়া হয়, যখন অন্য সব জাতের মৌসুম শেষ হয়ে যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: আমের জেলা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী বিভাগের একটি জেলা, দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ১,৭০২.৫৫ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, পূর্বে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলা। জেলাটি বরেন্দ্রভূমি, দিয়ারা ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত, প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও পাগলা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নবাবগঞ্জ ছিল মালদহ জেলার একটি থানা; দেশভাগের সময় এটি রাজশাহী জেলার মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হয়। পাঁচ উপজেলার মধ্যে শিবগঞ্জ সবচেয়ে বড়, আয়তন ৫২৫.৪৩ বর্গকিলোমিটার, আর শিবগঞ্জের কানসাট হাট উপজেলার সবচেয়ে পরিচিত হাটগুলোর একটি।
জেলাটিকে প্রায়ই আমের রাজধানী বলা হয়। বাসস ২০২৫ সালের জুনে জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপপরিচালক ড. ইয়াসীন আলী সে বছর ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলেন, যার বাজারমূল্য প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। একই প্রতিবেদনে বরেন্দ্রভূমির প্রাকৃতিকভাবে লাল ও উঁচু-নিচু মাটির কথা বলা হয়, যেখানে ১৫ থেকে ২০ বছর আগে কেবল ধান চাষ করা যেত। জেলার শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলায় শত শত একর জমিতে আমবাগান গড়ে উঠেছে বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
প্রথম আলো ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী আম উৎপাদনে দেশের শীর্ষ দুই জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ, আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সুপরিচিত ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগরের জন্য। ২০২৩ সালের এপ্রিলে পত্রিকাটি জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতি হেক্টরে আম হয় ৮ থেকে ৯ টন, যেখানে নওগাঁয় হয় ১৫ থেকে ১৮ টন। বারি, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), কানাডার সেইন্ট মেরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের আইআইটির গবেষকদের একটি গবেষণা, যা বিজ্ঞান সাময়িকী সাসটেইনেবিলিটিতে প্রকাশিত হয় এবং প্রথম আলো ২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশ করে, নাটোর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে এমন অঞ্চলে রেখেছে, যেখানে দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের পরে আম পাকে।
জেলার তিনটি আম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাতি আম জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়; বারির পক্ষে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক সনদ গ্রহণ করেন। পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ২০২৩ সালের ২৫ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আমকে জিআই সনদ দেয়, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে অধিদপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানান। জেলায় বারির আম গবেষণার কাজও চলে: বাংলাপিডিয়া জানায়, চারা উৎপাদন, ফলন ও সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার জন্য বারির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরে বাগান ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেছে।

দেশে আম উৎপাদনের চিত্র
আম বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ফল, আর সরকার আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করেছে। প্রথম আলো ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ১২ লাখ টনের বেশি আম উৎপাদিত হয়, দ্বিতীয় অবস্থানে কাঁঠাল, প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব এর চেয়ে বেশি: সে বছর সাড়ে ২৩ লাখ টন আম, যার ছয় লাখ টনই আম্রপালি। পত্রিকাটি উল্লেখ করে, দুই সংস্থার উৎপাদনের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ডিএই সে বছর ২ লাখ হেক্টর জমিতে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদনের আশা করছিল; আগের বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৭০ হাজার হেক্টরে ২৩ লাখ টন।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী গবেষকেরা দেশে ৮০০টির বেশি আমের জাতের কথা উল্লেখ করেন, যার ২১টি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হয়। বেশির ভাগ জাতের মৌসুম ছোট। কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ২০২০ সালে প্রথম আলোকে বলেন, মে থেকে আগস্টের মধুমাসে দেশের মোট ফলের জোগানের ৬০ শতাংশ পাওয়া যায়, আর বাকি আট মাসে পাওয়া যায় ৪০ শতাংশ; তার মতে, বারি-১১ ব্যাপক হারে চাষ করে সেই ঘাটতি পূরণের পথ দেখা যাচ্ছে। প্রথম আলো ২০২৩ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব উদ্ধৃত করে জানায়, আম দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফসল, পৃথিবীর মোট আমের প্রায় ৮০ ভাগ এ অঞ্চলে হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী আমগাছ সারা দেশেই জন্মায়, বেশির ভাগই বসতবাড়ির আঙিনায়, আর দেশের উন্নত জাতের আম মূলত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে হয়। কলমের গাছে রোপণের চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে এবং প্রায় ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত গাছ ফলবান থাকে। আমের জন্য মাটির উপযুক্ত পিএইচ ৫.৫ থেকে ৭.৫, আর যেখানে মাটি গভীর পর্যন্ত ভেজানোর মতো বৃষ্টি হয় এবং একটি স্পষ্ট শুষ্ক মৌসুম থাকে, সেখানে আমগাছ ভালো জন্মায়।
কৃষি বিভাগের সহায়তা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপপরিচালক ড. ইয়াসীন আলী জাগো নিউজকে বলেন, কাটিমন আমের চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার এবং ফল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। কৃষি বিভাগের মতে, পরিকল্পিতভাবে চাষ বাড়ানো গেলে কাটিমন আম দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
ছবি: NahidHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, যুগান্তর, বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)