সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

দশ মিনিটে পাকা আমের লাচ্ছি: দই, আম আর মধুর সহজ রেসিপি

২০২৫ সালের মে মাসে বাজারে পাকা আম আসতে শুরু করলে জাগো নিউজ ২৪ দই, পাকা আম, মধু বা সিরাপ, বরফ ও গোলাপজলে দশ মিনিটের লাচ্ছির রেসিপি দেয়। সঙ্গে সেই মৌসুমের আম পাড়ার সময়সূচি ও উপকরণের পুষ্টিতথ্য।

দশ মিনিটে পাকা আমের লাচ্ছি: দই, আম আর মধুর সহজ রেসিপি
রান্নাবান্না

২০২৫ সালের ১৫ মে, তীব্র গরমের মধ্যে মৌসুমের প্রথম পাকা আম যখন দেশের বাজারে আসতে শুরু করেছে, তখন জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগ পাকা আমের লাচ্ছির একটি ছোট রেসিপি প্রকাশ করে। দই আর আম ব্লেন্ড করে বানানো এই ঠান্ডা পানীয়তে বাড়তি চিনির বদলে মধু বা সিরাপ দেওয়া হয়, আর পত্রিকাটির ভাষায় এটি বানাতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট। নিচে রেসিপিটি হুবহু পত্রিকার দেওয়া পরিমাণেই রাখা হলো। সঙ্গে আছে সেই মৌসুমের প্রেক্ষাপট: লাচ্ছি আসলে কী, সেই মাসে রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় ২০২৫ সালের আম পাড়া কীভাবে শুরু হচ্ছিল, সরকারি খাদ্য-তালিকা অনুযায়ী উপকরণগুলোতে কী আছে, এবং মধু ও অন্যান্য মিষ্টি উপকরণ নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সতর্কতা।

রেসিপি


পানীয়টিতে লাগে পাঁচটি উপকরণ, গরমের দিনে বাংলাদেশের রান্নাঘরে যার সবই সাধারণত হাতের কাছে থাকে। নিচের পরিমাণগুলো মূল রেসিপির। এতে কয় গ্লাস লাচ্ছি হবে তা বলা নেই; আমের আকার আর শেষে কতটা ঠান্ডা পানি মেশানো হলো, তার ওপর পরিমাণ নির্ভর করবে।

উপকরণ


  • দই: ২ কাপ
  • পাকা আম: ২টি
  • মধু বা সিরাপ: ৩ টেবিল চামচ
  • আইস কিউব: ৬টি
  • গোলাপজল: ১/৮ টেবিল চামচ

প্রস্তুত প্রণালি


  • আমগুলোর খোসা ছাড়িয়ে আঁটি থেকে যতটা সম্ভব শাঁস কেটে নিন।
  • আমের শাঁস ও বাকি সব উপকরণ ব্লেন্ডারে নিয়ে মসৃণ করে ব্লেন্ড করুন।
  • মিশ্রণ বেশি ঘন মনে হলে অল্প ঠান্ডা পানি যোগ করে আবার ব্লেন্ড করুন।
  • লাচ্ছি গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করুন।
  • চাইলে পরিবেশনের আগে ওপরে ছোট ছোট আমের টুকরা বা কয়েকটি পুদিনাপাতা দিয়ে সাজিয়ে নিতে পারেন।

রেসিপিতে বলা হয়েছে, গোলাপজল ঐচ্ছিক: বাসায় না থাকলে বা এর ঘ্রাণ পছন্দ না হলে বাদ দিলেই চলবে। মূল লেখায় পানীয়টিকে অতিরিক্ত চিনি ছাড়া বলা হয়েছে, আর সত্যিই এতে আলাদা করে চিনি দেওয়া হয় না। এর মিষ্টতা আসে পাকা আম এবং তিন টেবিল চামচ মধু বা সিরাপ থেকে। নিচের পুষ্টি অংশে যেমন বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মধু ও সিরাপের চিনিকে "ফ্রি সুগার" হিসেবে গণ্য করে, প্যাকেটের চিনির সঙ্গে একই দলে। তাই এই লাচ্ছিকে চিনিমুক্ত পানীয় নয়, বরং একটি মিষ্টি পানীয় হিসেবে দেখাই ঠিক।

লাচ্ছি আসলে কী


লাচ্ছি হলো দইভিত্তিক একটি পানীয়, যার ঘনত্ব অনেকটা স্মুদির মতো এবং যা ঠান্ডা অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। বিশ্বকোষীয় সূত্র অনুযায়ী এর উৎপত্তি ভারতীয় উপমহাদেশের পাঞ্জাব অঞ্চলে। পাঞ্জাবি ও হিন্দি-উর্দুতে লাচ্ছি শব্দের অর্থ পানির সঙ্গে মেশানো দই, আর পাঞ্জাবে একে গ্রীষ্মের সবচেয়ে প্রিয় পানীয় বলা হয়েছে। প্রচলিত লাচ্ছি বানানো হয় দই, পানি আর মসলা একসঙ্গে ব্লেন্ড করে; মসলার মধ্যে জিরা ও এলাচ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। পাঞ্জাবে প্রথাগতভাবে মহিষের দুধের দই দিয়ে লাচ্ছি বানানো হতো, আর পরিবেশন করা হয় কুলহার নামের মাটির ভাঁড়ে।

লাচ্ছির মোটামুটি দুটি ধারা আছে। নোনতা লাচ্ছিতে দই-পানির মিশ্রণে লবণ, গোলমরিচ ও জিরা দেওয়া হয়। মিষ্টি লাচ্ছির স্বাদ আনা হয় এলাচ, গোলাপজল ও জাফরান দিয়ে। এ ছাড়া আম বা স্ট্রবেরির মতো ফল দইয়ের মিশ্রণে ব্লেন্ড করে ফলের লাচ্ছি বানানো হয়, যার মধ্যে আমের লাচ্ছিই সবচেয়ে পরিচিত। ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশের দুগ্ধজাত খাবারের তালিকাতেও লাচ্ছির নাম আছে। জাগো নিউজ ২৪-এর রেসিপিটি মিষ্টি ও ফলের লাচ্ছির মাঝামাঝি: এতে প্রচলিত মিষ্টি লাচ্ছির গোলাপজল আছে, কিন্তু ঘনত্ব আসে পুরো আমের শাঁস থেকে, আর পানির বদলে দেওয়া হয় বরফ; মিশ্রণ বেশি ঘন হলে তবেই অল্প ঠান্ডা পানি মেশাতে বলা হয়েছে।

বাজারে পাকা আম: রাজশাহীর ২০২৫ সালের ক্যালেন্ডার


রেসিপির শুরুর বাক্য "বাজারে চলে এসেছে পাকা আম" ছিল সেই সপ্তাহেরই খবর। দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে আম পাড়া শুরুর দিন প্রত্যেক চাষির ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না। জেলা প্রশাসন একটি "ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার" প্রকাশ করে, যেখানে কোন জাতের আম কবে থেকে পাড়া ও বিক্রি করা যাবে তা বেঁধে দেওয়া থাকে, যাতে অপরিপক্ব বা ভেজাল আম ক্রেতার হাতে না পৌঁছায়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৪ সালের মে মাসে জানায়, অপরিপক্ব ও ভেজাল আম বাজারজাতকরণ রোধে রাজশাহী জেলা প্রশাসন ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর এই ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করে আসছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা আমবাগান ও বাজার তদারকি করেন, আর কেউ ক্যালেন্ডার লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে রাজশাহী জেলা প্রশাসন কৃষি কর্মকর্তা, আমচাষি, ব্যবসায়ী ও আম পরিবহনে যুক্তদের সঙ্গে "আম পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও সংগ্রহ বিষয়ে মতবিনিময়" সভা শেষে নিরাপদ, বিষমুক্ত ও পরিপক্ব আম নিশ্চিত করতে সে বছরের ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে। ১৫ মের আগে আম বাজারজাত করা নিষিদ্ধ করা হয়। সময়সূচি ছিল এমন:

  • ১৫ মে: সব ধরনের গুটি (দেশি, বীজের চারা থেকে জন্মানো) আম
  • ২০ মে: গোপালভোগ
  • ২৫ মে: রানীপছন্দ ও লক্ষণভোগ
  • ৩০ মে: হিমসাগর, যার আরেক নাম খিরসাপাত
  • ১০ জুন: ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো
  • ১৫ জুন: আম্রপালি ও ফজলি
  • ৫ জুলাই: বারি আম-৪
  • ১০ জুলাই: আশ্বিনা
  • ১৫ জুলাই: গৌড়মতি
  • সারা বছর: কাটিমন ও বারি আম-১১, যা যেকোনো মৌসুমে পাড়া যায়

আম পাড়া শুরুর এই তারিখ ২০২৪ সালের মতোই (১৫ মে) ছিল; ২০২৩ সালে তা শুরু হয়েছিল ৪ মে, আর ২০২২ সালে ১৩ মে। প্রশাসন জানায়, কোনো দুর্যোগ হলে চাষিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে আগাম আম পাড়তে পারবেন। সভায় দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সেই মৌসুমে জেলায় ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছিল; সম্ভাব্য মোট উৎপাদন ধরা হয় ২ লাখ ৬০ হাজার ৬ মেট্রিক টন, আর সম্ভাব্য বিক্রি প্রায় ১ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা।

ক্যালেন্ডারের তারিখ মানে আম পাড়ার সবচেয়ে আগের দিন, সেদিনই যে বাজারে পাকা আম মিলবে এমন নিশ্চয়তা নয়। ২০২৩ সালে প্রথম আলো দেখেছিল, ঘোষিত ৪ মে পার হওয়ার দুই দিন পরও রাজশাহীর স্থানীয় বাজারে পাকা গুটি আম ওঠেনি। চাষিরা বলেছিলেন, গুটি আম তখনো পাকেনি; বাঘার একটি আগাম জাতকে নমুনা ধরে তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরের বড় আমের হাটে পাকা গুটি আম উঠতে আরও দিন দশেক লাগবে বলে তখন জানানো হয়।

রাজশাহীর একটি আমগাছ। ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রাজশাহীর একটি আমগাছ। ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সাতক্ষীরা, যেখানে মৌসুম শুরু হয় সবার আগে


দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরায় আম পাকে দেশের অন্য এলাকার আগে। ২০২৫ সালের ১৪ মে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাতক্ষীরার উপপরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, মাটি ও আবহাওয়ার কারণে এ জেলায় আমগাছে মুকুল অন্য এলাকার চেয়ে আগে আসে এবং আমও আগে পাকে। সে বছরের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখীসহ অন্যান্য দেশি জাতের আম ৫ মে থেকে পাড়া শুরু হয়। দেশ রূপান্তর জানায়, হিমসাগরের জন্য প্রথমে ২০ মে এবং ল্যাংড়ার জন্য ২৫ মে নির্ধারিত ছিল।

২০২৫ সালের ১৪ মে সন্ধ্যায় আমচাষি ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভার পর সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক হিমসাগর পাড়ার দিন পাঁচ দিন এগিয়ে পরদিন বৃহস্পতিবার, ১৫ মে নির্ধারণ করেন; এই রেসিপিও প্রকাশিত হয় সেদিনই। তিনি বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার আম আগে পাকতে শুরু করায় দিন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে; অন্য জাতের তারিখ অপরিবর্তিত থাকে। একই সভায় ডিএই মৌসুমের হিসাব দেয়: জেলায় ৪ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫ হাজার ২৯৯টি বাগানে ১৩ হাজার ১০০ জন চাষি আম চাষ করেছেন, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৬২ হাজার ৮০০ টন, এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ জমিতে হিমসাগর, আর বিদেশে হিমসাগর রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৭০ মেট্রিক টন।

দেশ রূপান্তর ১৫ মে সকালে জানায়, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের প্রভাবে হিমসাগর আগেভাগে পেকে যায়; চাষিরা বলছিলেন, পাকা আম গাছ থেকে ঝরে পড়ছে, আর অনেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই আম পেড়ে বাজারে তুলতে বাধ্য হন। ১৪ মে রাতে সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বাজারে পত্রিকাটি দেখে, হিমসাগরে বাজার ভরে গেছে এবং প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। চাষিদের দাবি, সময়মতো বাজারে তুলতে পারলে প্রতি মণে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পাওয়া যেত। কয়েকজন ব্যবসায়ী পত্রিকাটিকে বলেন, তাঁদের ধারণা কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর চাপেই প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ডিএইর উপপরিচালক বলেন, হিমসাগর পেকে গেছে বলে যা বলা হচ্ছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়, কারণ সব গাছে একসঙ্গে আম পাকে না; তবু সবার চাপের মুখে ক্যালেন্ডার বদলানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, মূল লক্ষ্য নিরাপদ আম ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া, আর কেউ কাঁচা আম কৃত্রিম উপায়ে পাকিয়ে বাজারজাত করার চেষ্টা করলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

২০২৫ সালের মৌসুম চলছিল ২০২৪ সালের চেয়ে আগে। দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, ২০২৪ সালে সাতক্ষীরার ক্যালেন্ডার শুরু হয় ৯ মে গোপালভোগ, বোম্বাই, গোলাপখাস, বৈশাখীসহ স্থানীয় জাত দিয়ে; এরপর ১১ মে গোবিন্দভোগ, ২২ মে হিমসাগর, ২৯ মে ল্যাংড়া এবং ১০ জুন আম্রপালি।

কাটা হিমসাগর আম; ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তোলা। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
কাটা হিমসাগর আম; ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তোলা। ছবি: Salil Kumar Mukherjee / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বাংলাদেশের আম


বাংলাপিডিয়া জানায়, আম (Mangifera indica) অ্যানাকার্ডিয়েসি গোত্রের গাছ; কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে এটি বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় ফল। সংস্কৃতে এর একটি নাম "আম", যার অর্থ মজুদ খাদ্য বা রসদ; আর ইংরেজি ম্যাঙ্গো শব্দটি এসেছে তামিল থেকে, পর্তুগিজদের "মাঙ্গা" হয়ে। বাংলাদেশে প্রায় ১০০ জাতের আম আছে, যা দুই ভাগে পড়ে: কলম করে বংশবিস্তার করা উন্নত জাত, যেমন ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, আশ্বিনা, লক্ষণভোগ ও মোহনভোগ; আর বীজের চারা থেকে জন্মানো দেশি বা গুটি আম, যার স্বীকৃত কোনো জাতনাম নেই এবং স্বাদেরও নিশ্চয়তা নেই। রাজশাহীর প্রতিটি ক্যালেন্ডার শুরু হয় এই গুটি আম দিয়েই। কলমের গাছে চতুর্থ বছরে প্রথম ফল ধরে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরের গবেষণা কেন্দ্রে আম নিয়ে গবেষণা করে; ক্যালেন্ডারে থাকা বারি আম-৪ ও বারি আম-১১ এই প্রতিষ্ঠানেরই জাত।

সরকারি হিসাবে আমের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রথম আলো জানায়, ডিএইর হিসাবে সে বছর দেশে আমের উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ২৪ লাখ মেট্রিক টন; দেশে প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমিতে আমগাছ রয়েছে, গাছের মোট সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। ভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাব করা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মতে দেশে বছরে আম হয় ১২ লাখ টনের মতো। দুই সংস্থার হিসাবই বলছে, প্রতিবছর উৎপাদন বাড়ছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ছাড়িয়ে নওগাঁ তখন সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদনকারী জেলা, আর সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত জাত আম্রপালি। বাগানমালিকেরা বারি-৪, বারি-১১, কিং অব চাকাপাত, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, তাইওয়ান গ্রিন ও মিয়াজাকির মতো নতুন জাতের বাগান করছিলেন, আর বারোমাসি জাত কাটিমনের চারার বিক্রি দ্রুত বাড়ছিল। ডিএইর কর্মকর্তারা জানান, একবার পরিণত হলে আমগাছে ৫০ থেকে ৬০ বছর ফল পাওয়া যায়, আর ২০২৩ সালে এক কেজি আম উৎপাদনে গড়ে খরচ হয় ২০ টাকা। একই প্রতিবেদনে বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২-এর বরাতে বলা হয়, ২০২২ সালে দেশের একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৯৫ দশমিক ৪ গ্রাম ফল খেয়েছেন, যা ২০১০ সালে ছিল ৪৪ দশমিক ৭ গ্রাম। দেশে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে বাজারে আম উঠতে শুরু করে, পাওয়া যায় আগস্ট পর্যন্ত।

দেশের কয়েকটি আম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে; এই স্বীকৃতি বোঝায়, পণ্যের বিশেষ গুণ তার উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে যুক্ত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত (হিমসাগর) ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে জিআই সনদ পায়; জেলার চাষিদের পক্ষে বারি ২০১৭ সালে এর আবেদন করেছিল। জামদানি ও ইলিশের পর এটি ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় জিআই পণ্য। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আমও জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে, আর ২০২৩ সালের ২৫ জুন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আমকে জিআই সনদ দেয়, একই সঙ্গে বগুড়ার দইকেও।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি হর্টিকালচার কেন্দ্রে পুরোনো আমগাছ। ছবি: Shamim Ahammed sumon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি হর্টিকালচার কেন্দ্রে পুরোনো আমগাছ। ছবি: Shamim Ahammed sumon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

লাচ্ছির ভিত্তি দই


লাচ্ছির অন্য প্রধান উপকরণ দই বাঙালির খাবারের পরিচিত অংশ। দইয়ের সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা বগুড়া, যাকে প্রায়ই "দইয়ের রাজধানী" বলা হয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বগুড়ার দই জিআই সনদ পাওয়ার সময় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, জেলায় ছোট-বড় প্রায় ৪০০ কারখানায় দিনে গড়ে ৫০ টন দই তৈরি হয়, আর ঈদের মতো উৎসবে চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। রেসিপিতে শুধু দই বলা হয়েছে; টক দই না মিষ্টি দই, তা বলা নেই। কোনটি নেওয়া হলো তার ওপর তৈরি লাচ্ছির মিষ্টতা বদলে যাবে।

মাটির পাত্রে বগুড়ার দই। ছবি: RockyMasum / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
মাটির পাত্রে বগুড়ার দই। ছবি: RockyMasum / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

উপকরণে কী আছে


নিচের হিসাব যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদানের তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রাল থেকে নেওয়া, প্রতিটি উপকরণের প্রতি ১০০ গ্রামের জন্য। এগুলো উপকরণের তথ্য, তৈরি লাচ্ছি নিয়ে কোনো দাবি নয়।

  • তাজা আম: ৬০ কিলোক্যালরি, ৮৩.৫ গ্রাম পানি, ১৫ গ্রাম শর্করা যার ১৩.৭ গ্রাম চিনি, ১.৬ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ০.৮ গ্রাম প্রোটিন, ৩৬.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৫৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (আরএই), ৪৩ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট ও ১৬৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম। তথ্যভান্ডারে এক কাপ আমের টুকরার ওজন ধরা হয়েছে ১৬৫ গ্রাম।
  • পূর্ণ ননিযুক্ত দুধের সাধারণ দই: ৬১ কিলোক্যালরি, ৩.৫ গ্রাম প্রোটিন, ৩.৩ গ্রাম চর্বি, ৪.৭ গ্রাম চিনি (দুধের নিজস্ব চিনি) ও ১২১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম।
  • মধু: ৩০৪ কিলোক্যালরি ও ৮২.৪ গ্রাম শর্করা, যার ৮২.১ গ্রাম চিনি। তথ্যভান্ডারে এক টেবিল চামচ মধুর ওজন ধরা হয়েছে ২১ গ্রাম।

চিনি নিয়ে ২০১৫ সালের নির্দেশিকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের কম ফ্রি সুগার থেকে নেওয়ার সুপারিশ করে, এবং বলে যে এটি ৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ দিনে মোটামুটি ২৫ গ্রাম বা ছয় চা-চামচে নামালে বাড়তি উপকার মেলে। সংস্থাটির সংজ্ঞায় ফ্রি সুগার হলো উৎপাদক, রাঁধুনি বা খাদ্যগ্রহণকারী খাবার ও পানীয়তে যে চিনি যোগ করেন, তার সঙ্গে মধু, সিরাপ ও ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি। তাজা ফলের চিনি এবং দুধে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি এই নির্দেশিকার আওতায় পড়ে না, কারণ এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাবের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এই লাচ্ছিতে আমের শাঁস ও দইয়ের চিনি সীমার বাইরে, কিন্তু মধু বা সিরাপের চিনি সীমার মধ্যে গণ্য হবে।

মধু নিয়ে আরেকটি সতর্কতা আছে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) পরামর্শ দেয়, এক বছর বয়স পার না হওয়া পর্যন্ত শিশুকে মধু দেওয়া উচিত নয়, কারণ মধুতে কখনো কখনো এমন ব্যাকটেরিয়া থাকে যা শিশুর অন্ত্রে বিষ তৈরি করে ইনফ্যান্ট বটুলিজম নামের মারাত্মক অসুখ ঘটাতে পারে। তাই ছোট শিশুর জন্য লাচ্ছি বানালে মধু বাদ দিতে হবে। যাঁদের ডায়াবেটিস আছে বা যাঁদের চিনি কিংবা ক্যালরি কমাতে বলা হয়েছে, তাঁরা এমন মিষ্টি পানীয় খাবেন কি না এবং কতটা খাবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পানীয়টি নিরাপদ রাখতে


ব্লেন্ড করা পানীয় রান্না হয় না, তাই এর নিরাপত্তা নির্ভর করে উপকরণের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার "নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি" এর মূল কথাগুলো বলে দেয়: পরিচ্ছন্ন থাকা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, ভালোভাবে রান্না করা, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা, এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা। লাচ্ছির ক্ষেত্রে এর মানে পরিষ্কার হাত, পরিষ্কার ব্লেন্ডার ও গ্লাস, নিরাপদ খাওয়ার পানিতে বানানো বরফ ও পানি, আর ঠান্ডা থাকতে থাকতেই দ্রুত পরিবেশন। ভালো, ঠিকমতো পাকা আম বেছে নেওয়াও এর অংশ। আম পাড়ার ক্যালেন্ডারের উদ্দেশ্যও এটাই: ২০২৫ সালের মে মাসে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক দেশ রূপান্তরকে যেমন বলেছেন, লক্ষ্য হলো নিরাপদ আম ভোক্তার কাছে পৌঁছানো, আর কাঁচা আম কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বিক্রির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও প্রশাসন জানিয়েছে।

ছবি: Nithyasrm / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)