সিলেট অঞ্চলের মাটি মূলত অম্লীয়, আর এমন মাটিতে লেবু, কমলা ও মাল্টার মতো টক জাতীয় (সাইট্রাস) ফল ভালো হয়। তাই চা-বাগানে ঘেরা সিলেটকে লোকমুখে লেবু-কমলার অঞ্চল বলা হয়। কিন্তু জাগো নিউজ ২৪-এর সিলেট প্রতিনিধি আহমেদ জামিলের ২০২৬ সালের ২৭ জুন প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদন বলছে, ফল চাষে সিলেট বিভাগে তখন সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছিল আম ও কাঁঠাল। তবে আবাদ ও ফলন বেশি হলেও এই দুই ফল সিলেটের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব রাখতে পারছিল না; আম-কাঁঠালের জন্য সিলেটের মানুষকে তখনও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলায় অন্তত ৫১ ধরনের ফল উৎপাদন হয়। আম, কাঁঠাল, আনারস ও তরমুজ বাণিজ্যিকভাবে চাষ না হওয়ায় রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছিল না; বিদেশে যাচ্ছিল কেবল অল্প পরিমাণে উৎপাদিত জারা লেবু।
অম্লীয় মাটির হিসাব
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত গবেষকদের হিসাবে সিলেট অঞ্চলের ২৬ শতাংশ মাটির পিএইচ ৪.৫-এর নিচে, ৬৬ শতাংশের ৪.৫ থেকে ৫.৫ এবং বাকি ৮ শতাংশের ৫.৬ থেকে ৬.৫। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সিলেটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দীপ্ত চক্রবর্ত্তী জাগো নিউজকে বলেন, মাটির পিএইচ ৭-এর কম হলে তাকে অম্লীয় বলা হয় এবং কম পিএইচের মাটি লেবুজাতীয় ফলের জন্য উপযুক্ত। ধানের জন্য এটি সমস্যা নয়, তবে ফল ও সবজিতে বড় বাধা।
এর এক মাস আগে, ২০২৬ সালের ২৫ মে বণিক বার্তা এসআরডিআইয়ের একটি জরিপের খবর দেয়। ৫০টি উপজেলার ২৮ হাজার ৯১২টি স্থানের মাটির নমুনা পরীক্ষার ওই জরিপে বিভাগগুলোর মধ্যে সিলেটে অম্লতা ছিল সবচেয়ে বেশি: সেখানে ১৯.১৭ শতাংশ জমি অতি তীব্র অম্লীয় (পিএইচ ৪.৫-এর নিচে) এবং ৫৭.৬২ শতাংশ জমি তীব্র অম্লীয়।

আম কেন বেশি, তবু বাণিজ্যিক চাষ নেই
খাদিমনগরের হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রকিবুল ইসলাম রুমন বলেন, গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জে প্রচুর আনারস হচ্ছে, তবে আম, কাঁঠাল বা তরমুজ চাষ করতে হলে আগে ডলোচুন দিয়ে মাটির অম্লতা কমিয়ে নিতে হয়; তা না হলে গাছ বড় হলেও ফলন আশানুরূপ হয় না। মাটি প্রস্তুতের নিয়ম জানতে কৃষকেরা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিতে পারেন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, আমের শিকড় মাটির অনেক গভীর থেকে খাবার নিতে পারে বলে বাড়ির আশপাশে আমগাছ বেশি দেখা যায়। কিন্তু বেশি বৃষ্টি, আর্দ্রতা ও কুয়াশায় রোগবালাই, পোকা ও ফল ঝরা বেশি হওয়ায় সিলেটে কেউ বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ করেন না। দীপ্ত চক্রবর্ত্তীর মতে, সিলেটে এক বছর আমের ভালো ফলন হলে পরের বছর ঘাটতি পড়ে। অন্যদিকে সিলেট ও মৌলভীবাজারের পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর কাঁঠাল হলেও তা বাণিজ্যিক বাগানে নয়, টিলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়; তাই কাঁঠাল বাণিজ্যিকীকরণের বড় সুযোগ আছে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সিলেটের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেনের মতে, অম্লতা বড় বাধা নয়, তবে আম-কাঁঠালের বাণিজ্যিক চাষে মাটির পিএইচ, জৈব পদার্থ, সুষম সার, সমন্বিত বালাই দমন ও উন্নত জাতে নজর দিতে হয়।

জেলাভিত্তিক ফলন, ২০২৪-২৫ অর্থবছর
কৃষি বিভাগের তথ্যে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি ফল হয় মৌলভীবাজারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চার জেলায় প্রধান ফলের হিসাব:
- মৌলভীবাজার: আম ২ হাজার ২৩৯ হেক্টরে ২৮ হাজার ৮১৫ মেট্রিক টন; কাঁঠাল ২ হাজার ১২১ হেক্টরে; লেবু ১ হাজার ৭৪৪ হেক্টরে ২৮ হাজার ২৪৪ টন।
- সিলেট: আবাদ সবচেয়ে বেশি আমের, উৎপাদনে শীর্ষে তরমুজ, ৬৬৪ হেক্টরে ২৭ হাজার ৮৮৮ টন; কাঁঠাল ৫৬৯ হেক্টরে ১৯ হাজার ৯১৫ টন; লেবু ২৮১ হেক্টরে ৩ হাজার ৫৫৮ টন; জারা লেবু ১২৭ হেক্টরে ১ হাজার ১৩৭ টন।
- হবিগঞ্জ: কাঁঠাল ৯৬০ হেক্টরে ১৩ হাজার ৫৫ টন; আম ১ হাজার ২৬০ হেক্টরে ৮ হাজার ১৩৭ টন; লেবু ৬৩৬ হেক্টরে ৪ হাজার ৩৮৩ টন।
- সুনামগঞ্জ: তরমুজ ৫৭৬ হেক্টরে ১৪ হাজার ৭৫৫ টন; কাঁঠাল ১৯৬ হেক্টরে ৭ হাজার ২০ টন; আম ৪৩৩ হেক্টরে ৫ হাজার ৭১৩ টন; লেবু ১৬২ হেক্টরে ২ হাজার ২৩১ টন।

জারা লেবুর রপ্তানি আটকে প্যাকেজিংয়ে
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৪ সালের এপ্রিলে জানায়, জারা লেবু বড়, ডিম্বাকার ও সুগন্ধি একটি সাইট্রন, যা কয়েক শতাব্দী ধরে সিলেটের খাবারের অনুষঙ্গ; লেবুর এই ঐতিহ্যের কারণে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) সিলেটে সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলে, আর সিলেটের লেবু যায় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সিলেটি অধ্যুষিত দেশে।
সিলেটের ফল আমদানি-রপ্তানিকারক মো. আবুল কালাম জাগো নিউজকে বলেন, একসময় সাতকরা ও জারা লেবু লন্ডনে যেত, এখন যায় শুধু জারা লেবু, তাও মূলত ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে, কারণ ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওয়্যারহাউজ প্যাকেজিং ব্যবস্থা নেই। এই বিমানবন্দর থেকে প্রথম কার্গো ফ্লাইট ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল তৈরি পোশাক নিয়ে দুবাই হয়ে স্পেনের সারাগোসায় যায় বলে ইত্তেফাক সেদিন জানায়।
বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, প্যাকেজিং ব্যবস্থা ছাড়া বিমানবন্দরে সব সুবিধা আছে; এর অভাবে কেবল ইউরোপ ও আমেরিকায় কাঁচামাল পাঠানো যায় না, অন্য দেশে সিলেট থেকেই পাঠানো যায়। আগের দুই মাস ধরে সিলেটে কার্গো ফ্লাইট স্বাভাবিক ছিল বলেও তিনি জানান।

ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বণিক বার্তা, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক





মন্তব্য
(০)