২০২৫ সালের ১ জুলাই জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগে প্রকাশিত হয় 'ম্যাঙ্গো ডিলাইট' নামের একটি ঠান্ডা মিষ্টান্নের রেসিপি। এতে পরিবেশনের গ্লাসে প্রথমে বিস্কুট গুঁড়ার একটি স্তর, তার ওপর পাকা আমের মণ্ড আর মালাই দিয়ে স্তর সাজানো হয়, আর শেষে ওপরে ছড়ানো হয় বাদাম কুচি ও পুদিনা পাতা। পত্রিকাটি একে বিদেশি ঢঙের সহজ একটি মিষ্টি হিসেবে তুলে ধরে, যা গ্রীষ্মে বাজার ভরে থাকা পাকা আম দিয়ে ঘরেই বানানো যায়। এর জন্য চুলা বা ওভেন লাগে না: মিশ্রণ তৈরি করে গ্লাসে চেপে বসিয়ে দিলে বাকি কাজ করে ফ্রিজ, বিশ মিনিট করে দুই দফায়। রেসিপিটি প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের আমের মৌসুমের মাঝামাঝি, যখন ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি বাজারে চলে এসেছে এবং নাবি জাতগুলো আসতে বাকি মাত্র কয়েক দিন।
নিচে রেসিপিটি জাগো নিউজ যেভাবে ছেপেছিল হুবহু সেভাবেই দেওয়া হলো। এরপর রয়েছে এটি কোন ধরনের মিষ্টান্ন, মালাই কী, রেসিপি প্রকাশের সময় বাজারে কোন কোন জাতের আম ছিল, আম ফলটির পরিচয় এবং সেই গ্রীষ্ম পর্যন্ত সরকারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের আম উৎপাদন নিয়ে যা জানিয়েছিল তার বিবরণ।
উপকরণ
জাগো নিউজ ছয়টি উপকরণের তালিকা দিয়েছিল। পরিমাণগুলো পত্রিকার নিজের, কোনো পরিবর্তন করা হয়নি; রেসিপিতে কত গ্লাস হবে তা বলা নেই।
- বিস্কুট গুঁড়া: ১ কাপ
- গলানো মাখন: ২ টেবিল চামচ
- আইসিং সুগার: ১ চা চামচ
- পাকা আমের মণ্ড: ১ কাপ
- মালাই: ১ কাপ
- সাজানোর জন্য বাদাম কুচি ও পুদিনা পাতা
প্রস্তুত প্রণালী
- বিস্কুট গুঁড়া, গলানো মাখন আর আইসিং সুগার একসঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
- মিশ্রণটি একটি সার্ভিং গ্লাস বা কাপের তলায় চেপে চেপে বিছিয়ে দিন।
- গ্লাসটি ২০ মিনিট ফ্রিজে রেখে দিন।
- ২০ মিনিট পর বের করে ওপরে আমের মণ্ড ও মালাইয়ের স্তর দিন।
- আবার আরও ২০ মিনিট ফ্রিজে রাখুন।
- শেষে ফ্রিজ থেকে বের করে ওপরে বাদাম কুচি ও পুদিনা পাতা ছড়িয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা ম্যাঙ্গো ডিলাইট পরিবেশন করুন।
ফ্রিজে দুই দফা রাখার কাজ দুই রকম। প্রথম দফায় তলার স্তরটি জমে যায়: গুঁড়াগুলোকে বেঁধে রাখার জন্য যে মাখন গলানো হয়েছিল, ঠান্ডায় তা আবার শক্ত হয়ে ওঠে, ফলে ওপরের নরম স্তরগুলোর ভার নিয়েও তলাটি ভেঙে পড়ে না। দ্বিতীয় দফায় আম আর মালাই ঠান্ডা হয়, যাতে রেসিপির কথামতো মিষ্টান্নটি ঠান্ডা অবস্থায় পরিবেশন করা যায়।
স্তরে সাজানো, চুলা ছাড়া মিষ্টান্ন
ম্যাঙ্গো ডিলাইট এমন এক ধরনের ঠান্ডা মিষ্টান্নের দলে পড়ে, যা বেক করা হয় না, শুধু সাজিয়ে জমানো হয়: নিচে বিস্কুট বা গুঁড়ার স্তর, মাঝে ফলের স্তর, ওপরে ক্রিমের স্তর, তারপর ঠান্ডায় জমিয়ে নেওয়া। এ ধরনের মিষ্টান্নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত হলো ফিলিপাইনের ম্যাঙ্গো ফ্লোট, যার আরেক নাম ক্রেমা দে মাঙ্গা বা ম্যাঙ্গো রয়্যাল। বিশ্বকোষের বর্ণনায় এটি একটি 'আইসবক্স কেক', অর্থাৎ বেক না করে ঠান্ডায় জমানো কেক, যা গ্রাহাম ক্র্যাকার, ফেটানো ক্রিম, কনডেন্সড মিল্ক আর পাকা কারাবাও আমের স্তরে তৈরি। পরিবেশনের আগে কয়েক ঘণ্টা ঠান্ডা করা হয়, আর আইসক্রিমের মতো স্বাদ পেতে চাইলে জমিয়েও খাওয়া যায়। সেখানকার রাঁধুনিরা আমের বদলে স্ট্রবেরি, আনারস, কলা বা চেরি দিয়েও একই মিষ্টান্ন বানান।
জাগো নিউজের সংস্করণটি একই ধারণার ছোট ও দ্রুত রূপ। এটি বড় পাত্রে না বানিয়ে আলাদা আলাদা গ্লাসে বানানো হয়; গোটা ক্র্যাকারের বদলে গুঁড়া চেপে তলা তৈরি হয়; কনডেন্সড মিল্কের বদলে মিষ্টি আসে তলার মিশ্রণে দেওয়া মাত্র এক চা চামচ আইসিং সুগার থেকে; আর ক্রিম হিসেবে থাকে দক্ষিণ এশিয়ার রান্নাঘরের পরিচিত মালাই। পুরো আইসবক্স কেকের যেখানে কয়েক ঘণ্টা লাগে, সেখানে এর দুই দফায় বিশ মিনিট করে লাগে, কারণ গ্লাসের পাতলা তলা আর দুটি স্তর গভীর পাত্রের চেয়ে অনেক দ্রুত ঠান্ডা হয়।
আইসিং সুগার, যা পাউডার সুগার বা কনফেকশনার্স সুগার নামেও বিক্রি হয়, সাধারণ চিনিকেই মিহি গুঁড়া করে তৈরি। রেসিপিতে এটি দেওয়া হয় তলার মিশ্রণে, যেখানে মিহি চিনি গুঁড়া ও মাখনের সঙ্গে সমানভাবে মিশে যায়। ওপরের বাদাম কুচি দেয় মচমচে ভাব, আর পুদিনা পাতা আমের মিষ্টতা ও মালাইয়ের ভারী স্বাদের পাশে আনে সতেজতা।
মালাই কী
মালাই ভারতীয় উপমহাদেশের এক ধরনের জমাট ক্রিম, যা মূলত এ অঞ্চলের মিষ্টান্নে ব্যবহৃত হয়। সমসত্ত্ব না করা (নন-হোমোজেনাইজড) পূর্ণ ননির দুধ প্রায় ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গরম করে প্রায় এক ঘণ্টা সেই তাপে রেখে তারপর ঠান্ডা করলে ওপরে চর্বি ও জমাট প্রোটিনের একটি পুরু, হলদেটে স্তর জমে; সেটিই তুলে নেওয়া হয় মালাই হিসেবে। তথ্যসূত্রগুলোর হিসাবে মালাইয়ে দুধের চর্বি থাকে প্রায় ৫৫ শতাংশ। এর জন্য ৫ থেকে ১২ শতাংশ চর্বিযুক্ত মহিষের দুধকে সবচেয়ে ভালো ধরা হয়, তবে ৩ থেকে ৫ শতাংশ চর্বির গরুর দুধ দিয়েও মালাই হয়।
পরিচিত অনেক মিষ্টির ভিত্তি এই মালাই, যেমন রসমালাই, যেখানে ছানার বল মালাইয়ে ভেজানো থাকে, আর মালাই কুলফি ও মালাই পেড়া। ফিলিপাইনের ম্যাঙ্গো ফ্লোটে ফেটানো ক্রিম যে ভূমিকা রাখে, ম্যাঙ্গো ডিলাইটে মালাই সেই ভূমিকাই রাখে: ফলের টক-মিষ্টি ঝাঁঝ নরম করে দেওয়া একটি ঠান্ডা, ভারী স্তর। রেসিপিতে শুধু 'মালাই, ১ কাপ' বলা আছে, তাই ঘরে দুধ জ্বাল দিয়ে তোলা মালাই বা দোকান থেকে কেনা ক্রিম দুটোই ব্যবহার করা যায়।
রেসিপি প্রকাশের সময় বাজারে কোন আম
রেসিপিতে শুধু 'পাকা আমের মণ্ড' লেখা, কোনো জাতের নাম নেই। তবে ২০২৫ মৌসুমের আম সংগ্রহের ক্যালেন্ডার থেকে বোঝা যায়, রেসিপিটি প্রকাশের সময় বাংলাদেশের বাজারে কোন আম পাওয়া যেত। কয়েক মৌসুম ধরে আম অঞ্চলের জেলা প্রশাসন প্রতিটি জাত কোন তারিখ থেকে পাড়া যাবে তা ঠিক করে দেয়, যাতে শুধু পরিপক্ব আমই বাজারে আসে। ২০২৫ সালের ৭ মে রাজশাহী জেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে কৃষি কর্মকর্তা, আমচাষি, ব্যবসায়ী ও পরিবহনকারীদের নিয়ে সভা করে মৌসুমের ক্যালেন্ডার ঠিক করে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী এর উদ্দেশ্য ছিল 'নিরাপদ, রাসায়নিকমুক্ত ও পরিপক্ব আম' সংগ্রহ নিশ্চিত করা।
সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫ মে থেকে সব ধরনের আগাম জাতের আম পাড়া শুরু করা যেত। ঢাকা ট্রিবিউনের বিবরণে নির্দিষ্ট জাতগুলোর তারিখ ছিল এমন:
- গোপালভোগ: ২০ মে থেকে
- রানীপছন্দ বা লক্ষ্মণভোগ: ২৫ মে থেকে
- হিমসাগর বা খিরসাপাত: ৩০ মে থেকে
- ল্যাংড়া: ১০ জুন থেকে
- আম্রপালি ও ফজলি: ১৫ জুন থেকে
- বারি আম-৪: ৫ জুলাই থেকে
- আশ্বিনা: ১০ জুলাই থেকে
- গৌড়মতি: ১৫ জুলাই থেকে
- কাটিমন ও বারি আম-১১: সারা বছর
এক সপ্তাহ পর জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসসও একই ক্যালেন্ডার জানায়, যেখানে মৌসুমের শেষ জাত হিসেবে ইলামতি পাড়ার তারিখ ছিল ২০ আগস্ট। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে চাষিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে আগেই আম পাড়তে পারতেন। আগাম আম পাড়া শুরুর তারিখ ২০২৪ সালে ছিল ১৫ মে, ২০২৩ সালে ৪ মে এবং ২০২২ সালে ১৩ মে।
অর্থাৎ ১ জুলাই জাগো নিউজ যখন রেসিপিটি প্রকাশ করে, তখন ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে বাজারে, হিমসাগরের মৌসুম প্রায় শেষের দিকে, আর নাবি জাত বারি আম-৪ ও আশ্বিনা আসার কথা কয়েক দিনের মধ্যেই। এর যেকোনোটি পুরোপুরি পাকা হলে রেসিপির দরকারি নরম, মিষ্টি মণ্ড পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের আমের জাত
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত রয়েছে। অভিজাত জাত হিসেবে সেখানে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, আশ্বিনা, কিষাণভোগ, কুয়াপাহাড়ি, লতা বোম্বাই, বোম্বাই, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ ও মিছরিভোগের নাম আছে। স্বীকৃত জাতের নাম নেই এমন বীজের চারা থেকে হওয়া গাছের আমকে বলা হয় দেশি বা গুটি আম; এগুলোর স্বাদ নিশ্চিত নয়। উন্নত জাতগুলোর চাষ হয় মূলত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আম গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে বাসসের এক প্রতিবেদনে চাষিদের লাগানো আরও অনেক জাতের নাম আসে: আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্ণরেখা, মিছরিদানা, নীলাম্বরী, কালীভোগ ও কাঁচামিঠা থেকে শুরু করে হাঁড়িভাঙা, লখনা, তোতাপুরি, বারোমাসি, কেন্ট ও আলফানসো, সঙ্গে বারির উন্নত জাতগুলো।
বারির উদ্ভাবিত দুটি জাত মৌসুমের চেহারা বদলে দিয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২১ সালের আগস্টে জানায়, আম্রপালি নামে পরিচিত বারি আম-৩ ভারতে দশেরি ও নীলমের সংকরায়ণে তৈরি একটি জাত; বারি এটি অবমুক্ত করে ১৯৯৬ সালে, ২০০৯-১০ সাল থেকে এটি ব্যাপকভাবে বাজারে আসছে এবং অন্তত ৩০টি জেলায় এর চাষ হয়। এটি বাজারে আসে ১৫ জুনের দিকে, থাকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ফ্লোরিডার এম৩৮৯৬ জাতের সঙ্গে দেশি আশ্বিনার সংকরায়ণে তৈরি বারি আম-৪ অবমুক্ত হয় ২০০৩ সালে; সে সময় এর চাষ হতো ৪ থেকে ৫ হাজার হেক্টরে, আর জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে দেরিতে পাকে বলে এর চাহিদা ছিল বেশি। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী বারি তখন পর্যন্ত ১৭টি এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ২৫টি আমের জাত উদ্ভাবন করেছিল, আর রাজশাহী অঞ্চলের চাষিরা একসময়ের ফজলি ও আশ্বিনার বাগানে বারি আম-৩ ও বারি আম-৪ লাগাচ্ছিলেন। বারি আম-১১ সারা বছর ফল দেয় এমন একটি জাত।
আম ও বাংলাদেশে তার স্থান
আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica), গোত্র অ্যানাকার্ডিয়েসি। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় প্রজাতিটি বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের আদি প্রজাতি, আর আমকে বলা হয় 'ফলের রাজা'। ইংরেজি 'ম্যাঙ্গো' শব্দটি ষোড়শ শতকে পর্তুগিজ 'মাঙ্গা' থেকে এসেছে, যা নেওয়া হয়েছিল মালয়ালম 'মাঙ্গা' থেকে। আরব ও পারস্যের বণিকেরা নবম ও দশম শতকে আমকে পূর্ব আফ্রিকায় নিয়ে যান, আর ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজরা গোয়া থেকে আফ্রিকা হয়ে ব্রাজিলে এর বিস্তার ঘটায়।
আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ, আর আম ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জাতীয় ফল। বাংলাপিডিয়া বলছে, আম খাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় তাজা অবস্থায়; কাঁচা আম তরকারি ও ডালে দেওয়া হয়, আর কাঁচা-পাকা দুই রকম আম থেকেই জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয়। পাকা আম ব্যবহারের নতুন ও বিদেশ থেকে আসা উপায়গুলোর একটি ম্যাঙ্গো ডিলাইট, যার পাশে আছে পাকা আম বা মণ্ড, ঘোল ও চিনি দিয়ে তৈরি ম্যাঙ্গো লাচ্ছি এবং ফিলিপাইনের ম্যাঙ্গো ফ্লোট।

সংখ্যায় ২০২৫ সালের আম
এমন মিষ্টান্নের মণ্ড যে ফসল থেকে আসে, তার আকার বোঝা যায় ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাসসের প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব থেকে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২ লাখ ২ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি থেকে আম উৎপাদিত হয় ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টর থেকে ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন। ২০২৫ মৌসুমের জন্য ডিএই ২ লাখ ৫ হাজার ৩৪ হেক্টরে ২৭ লাখ টনের রেকর্ড উৎপাদন লক্ষ্য ঠিক করে। সরকারের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, আমের চাষ হয় মূলত রাজশাহী, নওগাঁ, সাতক্ষীরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ ১৫টি জেলায়, আর মৌসুমের আম পাড়া শুরু হয় সাতক্ষীরার গোপালভোগ দিয়ে। ২০২৫ সালের ২১ মে ঢাকায় এক ব্রিফিংয়ে কৃষিসচিব জানান, ২০২২-২৩ সালে উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭ লাখ টন এবং ২০২৩-২৪ সালে সাড়ে ২৪ লাখ টন।
জেলার আম ক্যালেন্ডারের সভায় দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালে শুধু রাজশাহী জেলাতেই আমের চাষ হয় ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টরে; হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ধরা হয় ১৩ দশমিক ২৬ টন, সম্ভাব্য উৎপাদন ২ লাখ ৬০ হাজার ৬ টন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বাসস ২০২৫ সালের মে মাসে জানায়, জেলার সবচেয়ে বড় আমের বাজার রাজশাহীর বানেশ্বর বাংলাদেশের 'আমের রাজধানী' নামে পরিচিত, আর জেলার মোট আমের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয় বাঘা উপজেলায়। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আশা করেছিল, অঞ্চলের আমের বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। মৌসুমের শুরুতে বড় আকারের দেশি আম মণপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং ছোটগুলো ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, যা আগের বছরের চেয়ে কিছুটা কম।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রাধান্য অনেক পুরোনো। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাতে জানায়, দেশের মোট আম উৎপাদনের ৬৭ শতাংশ হয় উত্তর-পশ্চিমের বিভাগগুলোতে, মূলত রাজশাহীতে; এরপর দক্ষিণ-পশ্চিমের খুলনা।

ভৌগোলিক নির্দেশক ও রপ্তানি
বাংলাদেশের দুটি আম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। জিআই হলো সেই আইনি স্বীকৃতি, যা কোনো পণ্যের নামকে তার উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে যুক্ত করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত, যা হিমসাগর নামেও পরিচিত, ইলিশ ও জামদানির পর দেশের তৃতীয় জিআই পণ্য: জেলার চাষিদের পক্ষে বারি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবেদন করে, আর ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের সনদ হস্তান্তর করা হয়। ফজলি নিবন্ধিত হয় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিআই পণ্য হিসেবে, যার সনদ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল। বারির গবেষকেরা ২০১৯ সালে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, চাষের দিক থেকে আশ্বিনার পরেই খিরসাপাতের স্থান।
উৎপাদিত আমের খুব সামান্য অংশই বিদেশে যায়। বাসসের প্রকাশিত ডিএইর হিসাব অনুযায়ী রপ্তানি হয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩০৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৫৭ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১০০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৩২১ টন; ২০২৫ সালের রপ্তানি লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫ হাজার টন, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স ও কানাডাসহ প্রায় ৩৮টি দেশে। চীন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন দেয়, আর চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবর অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২৮ মে তিন টনের প্রথম চালান হুনান প্রদেশের চাংশায় পৌঁছায়; আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রথম বছরে ১০০ টনের বেশি আম আনার আশা করেছিল। সিনহুয়া আরও জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে ফলে ব্যাগিং পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।
পুষ্টি ও চিনি
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদানের তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালের হিসাবে প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা (রান্না না করা) পাকা আমে থাকে ৮৩ দশমিক ৪৬ গ্রাম পানি, ৬০ কিলোক্যালরি শক্তি, ১৪ দশমিক ৯৮ গ্রাম শর্করা, যার ১৩ দশমিক ৬৬ গ্রাম চিনি, ১ দশমিক ৬ গ্রাম খাদ্যআঁশ, শূন্য দশমিক ৮২ গ্রাম আমিষ ও শূন্য দশমিক ৩৮ গ্রাম চর্বি। একই ১০০ গ্রামে আছে ৩৬ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১৬৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৪৩ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট এবং ৬৪০ মাইক্রোগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন, যা থেকে শরীর ভিটামিন এ তৈরি করে।
ম্যাঙ্গো ডিলাইটের অন্য স্তরগুলো এই হিসাব বদলে দেয়: মাখন ও মালাইয়ে চর্বি বেশি, আর বিস্কুট ও আইসিং সুগার যোগ করে চিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৫ সালের মার্চে সুপারিশ করে, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু সবার খাবারে 'ফ্রি সুগার' মোট শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখা উচিত, আর তা ৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ দিনে প্রায় ২৫ গ্রাম বা ছয় চা চামচে নামালে বাড়তি উপকার মেলে। ডব্লিউএইচওর সংজ্ঞায় ফ্রি সুগারের মধ্যে পড়ে রাঁধুনি বা প্রস্তুতকারকের যোগ করা চিনি, যেমন এই রেসিপির আইসিং সুগার, এবং মধু, সিরাপ ও ফলের রসের চিনি; তাজা ফল ও দুধে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি এর মধ্যে পড়ে না। এমন মিষ্টান্ন মৌসুমের একটি বিশেষ আয়োজন, প্রতিদিনের খাবার নয়; যাঁদের ডায়াবেটিস আছে বা খাবার নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা এ ধরনের মিষ্টি খাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নিরাপদ ফল, নিরাপদ মালাই
আম ক্যালেন্ডারের উদ্দেশ্য যতটা মানের, ততটাই খাদ্য নিরাপত্তার: অপরিপক্ব আম সময়ের আগে পেড়ে বাজারে বিক্রি ঠেকানো। রাঁধুনির জন্য এর অর্থ, ঠিকভাবে পাকা আম বেছে নেওয়া। ম্যাঙ্গো ডিলাইট কখনো রান্না হয় না, তাই এর নিরাপত্তা নির্ভর করে কাঁচামাল আর ঠান্ডা রাখার ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি' (২০০৬) এখানে প্রযোজ্য নিয়মগুলো এক জায়গায় বলে দেয়: পরিচ্ছন্ন থাকুন, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন, ভালোভাবে রান্না করুন, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন, এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। এই রেসিপিতে শেষ দুটিই সবচেয়ে জরুরি: পরিষ্কার, ভালো ফল ও টাটকা মালাই, আর গ্রীষ্মের গরমে বাইরে ফেলে না রেখে মিষ্টান্নটি আবার ফ্রিজে তুলে রাখা।
ছবি: Obsidian Soul / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, সিনহুয়া, বাংলাপিডিয়া, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উইকিপিডিয়া (ম্যাঙ্গো ফ্লোট, মালাই, আম)





মন্তব্য
(০)