২০২৬ সালের ঈদুল আজহার আগে, ২৩ মে শনিবার, বগুড়ার পশুর হাটগুলোতে কোরবানির পশুর কেনাবেচা পুরোদমে চলছিল। জাগো নিউজের বগুড়া প্রতিবেদকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার ছোট-বড় অর্ধশতাধিক হাটে তখন কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছিল। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেই ক্রেতা ও বিক্রেতারা অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত হার উপেক্ষা করে প্রতিটি গরু ও ছাগল থেকে বাড়তি হাসিল, অর্থাৎ হাটের খাজনা, আদায় করছেন ইজারাদারের লোকজন। ভুক্তভোগীরা এই অবস্থাকে বলছিলেন 'হাসিল সন্ত্রাস'। প্রতিবেদন বলছে, এমন অভিযোগ উঠেছিল জেলার প্রায় সব বড় পশুর হাট নিয়ে।
জাগো নিউজ জানায়, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পশুর হাটে হাসিলের হার নির্ধারিত থাকে। স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনায় গরু, মহিষ ও অন্যান্য বড় পশুর জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক এবং ছাগল-ভেড়ার জন্য তার চেয়ে কম হার ঠিক করা আছে। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অভিযোগ ছিল, বগুড়ার বিভিন্ন হাটে বাস্তবে এই হার অনেকাংশেই মানা হচ্ছিল না।
সাবগ্রাম হাটে কত টাকা নেওয়া হচ্ছিল
২৩ মে বিকেলে বগুড়া সদর উপজেলার সাবগ্রাম পশুর হাটে গিয়ে জাগো নিউজের প্রতিবেদক দেখেন, প্রতিটি গরু বিক্রিতে ক্রেতার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ একটি গরুর কেনাবেচায় মোট ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় হচ্ছিল। ব্যবসায়ীরা বলেন, এই অঙ্ক সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি। ছাগলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়: প্রতিটি ছাগলে ক্রেতার কাছ থেকে ৫০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছিল।
হাসিল আদায়ের দায়িত্বে থাকা মোকছেদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, তাঁদের যেভাবে নিতে বলা হয়েছে, সেভাবেই তাঁরা হাসিল নিচ্ছেন; বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে, তা ইজারাদার বলতে পারবেন। গরুর হাসিল আদায়কারী সাগর বলেন, ইজারাদার যে অঙ্ক ঠিক করে দিয়েছেন, তাঁরা সেটাই নিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিটি মেমোতে আদায়কারীদের কমিশন থাকে, তাঁরা কেবল আদায়কারী, নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ তাঁদের নেই।
সাবগ্রাম হাটের ইজারাদার আব্দুল কাইয়ুম সরকার বাড়তি হাসিলের কারণ হিসেবে ইজারার খরচের কথা বলেন। জাগো নিউজকে তিনি জানান, ১ কোটি ৫ লাখ ৩ হাজার টাকায় তিনি হাটটি ইজারা নিয়েছেন, এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১০ শতাংশ আয়কর ও ১০ শতাংশ জামানত দিতে হয়। তাঁর দাবি, বাজার পরিস্থিতিও খুব ভালো নয়, লোকসানের ঝুঁকি আছে, তাই সরকারি হারে হাসিল নেওয়া সম্ভব নয়। রসিদে হাসিলের অঙ্ক কেন লেখা হয় না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেউ চাইলে লিখে দেওয়া হয়, না চাইলে লেখা হয় না।
জাগো নিউজের প্রতিবেদক অবশ্য দেখেন, বেশির ভাগ রসিদেই হাসিলের অঙ্ক লেখা থাকছিল না; লেখা থাকছিল কেবল পশুর দাম ও নাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
সদরের ধাওয়াপাড়া এলাকার রেজা ১২ হাজার ৫০০ টাকায় একটি ছাগল কিনে ৫০০ টাকা হাসিল দেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একটি ছাগলের জন্য ৫০০ টাকা হাসিল কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়, বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে। ছাগল বিক্রি করতে আসা ছাইফুল ইসলাম বলেন, আগে হাসিল নেওয়া হতো শুধু ক্রেতার কাছ থেকে, এখন বিক্রেতার কাছ থেকেও নেওয়া হচ্ছে; গরু বা ছাগল বিক্রি করে টাকা না দিয়ে হাট থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।
মহাস্থানসহ অন্য হাটের অভিযোগ
জাগো নিউজ জানায়, শুধু সাবগ্রাম নয়, শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান হাটেও একই চিত্র ছিল। সেখানে গরুপ্রতি ক্রেতা ও বিক্রেতার কাছ থেকে মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত হাসিল নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, গরুর দাম যা-ই হোক, একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক ধরেই টাকা নেওয়া হচ্ছিল। মহাস্থান হাটে গরু বিক্রি করতে আসা এক খামারি বলেন, হাটে অনেক গরু বিক্রি হয়, তবু হাসিল না দিলে খারাপ ব্যবহার করা হয়, আর প্রতিবাদ করলে ঝামেলা করা হয়।
সূত্রাপুর এলাকার মিজান সরকার জাগো নিউজকে বলেন, তিনি ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় একটি ষাঁড় কিনে ১ হাজার ২০০ টাকা হাসিল দিয়েছেন, আর বিক্রেতা সদর উপজেলার টেংরা গ্রামের শামিম হোসেনকেও দিতে হয়েছে ২০০ টাকা। প্রতিবেদক হাটে দেখেন, প্রবেশের পর কয়েকজন লোক একসঙ্গে ঘিরে ধরে টাকা আদায় করছেন। ক্রেতা-বিক্রেতারা অভিযোগ করেন, কেউ প্রশ্ন তুললে রসিদ দিতে দেরি করা হয়, পশু ওঠানো-নামানো নিয়ে ঝামেলা করা হয় কিংবা উচ্চস্বরে কথা বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই ধরনের অভিযোগ ওঠে শহরের ঘোড়াধাপ ও জয়বাংলা হাট, শেরপুরের ভবানীপুর হাট, দুপচাঁচিয়ার তালোড়া ও ধাপের হাট, নন্দীগ্রামের ভাটরা হাট, কাহালুর মালঞ্চা হাট এবং গাবতলীর কয়েকটি পশুর হাট নিয়েও। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ঈদ সামনে রেখে হাটগুলোতে কার্যত একটি 'হাসিল সিন্ডিকেট' সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। খামারিদের অভিযোগ, বাড়তি হাসিলের চাপ শেষ পর্যন্ত পশুর দামে গিয়ে পড়ে; এতে সাধারণ ক্রেতাকে বেশি দাম দিতে হয়, আর প্রকৃত খামারির লাভ কমে যায়।
জাগো নিউজের এই প্রতিবেদনের আগে, ২১ মে, প্রথম আলোও মহাস্থান হাট নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশ করে। ২০ মে বুধবার হাটের দিন ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে পত্রিকাটি জানায়, প্রতিটি গরু কেনাবেচায় ইজারাদারের লোকজন মোট ১ হাজার ৪০০ টাকা হাসিল নিয়েছেন: ক্রেতার কাছ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে আরও ২০০ টাকা। ছাগল কেনাবেচায় ক্রেতার কাছ থেকে ৫০০ এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০, মোট ৭০০ টাকা নেওয়া হয়। সেখানেও রসিদে হাসিলের অঙ্ক লেখা ছিল না। শহরের খান্দার এলাকার এক ক্রেতা প্রথম আলোকে বলেন, ৪০ হাজার টাকায় একটি ছাগল কিনে তাঁকে ৫০০ টাকা হাসিল দিতে হয়েছে, বিক্রেতাকেও দিতে হয়েছে ২০০ টাকা।

প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া হার ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য
জাগো নিউজ জানায়, এবার কোরবানির পশুর হাটে বড় গরুর জন্য ৮০০ টাকা এবং ছোট গরুর জন্য ৬০০ টাকা হাসিল নির্ধারণ করেছিল স্থানীয় প্রশাসন, আর এই হাসিল নেওয়ার কথা শুধু পশুর ক্রেতার কাছ থেকে। প্রথম আলো শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সূত্রে আরও বিস্তারিত জানায়: মহাস্থান হাটে ১ লাখ টাকার বেশি দামের গরুর জন্য ৮০০ টাকা, ১ লাখ টাকার কম দামের গরুর জন্য ৬০০ টাকা, মহিষের জন্য ১ হাজার টাকা এবং খাসি, ভেড়া ও ছাগলের জন্য ২৫০ টাকা হাসিল নির্ধারণ করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, এই হারের তোয়াক্কা না করে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনের কাছ থেকেই ইচ্ছেমতো হারে হাসিল নেওয়া হচ্ছিল।
মহাস্থান হাটের ইজারাদার আশরাফুল ইসলাম বাড়তি আদায়ের কথা অস্বীকার করেননি। জাগো নিউজ ও প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এ হাটে সারা বছর গরুর ক্রেতার কাছ থেকে ৭৫০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ টাকা হাসিল নেওয়া হয়, ঈদ উপলক্ষে একটু বেশি হারে নেওয়া হচ্ছে। বিক্রেতার কাছ থেকে হাসিল নেওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সব হাটেই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে হাসিল নেওয়া হয়; অন্যরা নিচ্ছে, তিনিও নিচ্ছেন।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, গরুর জন্য ৮০০ ও ৬০০ টাকা এবং ছাগল বা ভেড়ার জন্য ২৫০ টাকা হাসিল বেঁধে দেওয়া হয়েছে; নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই, এবং তাঁরা ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। এর আগে প্রথম আলোকে তিনি বলেছিলেন, খোঁজ নিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ক্রেতা-বিক্রেতারা জাগো নিউজকে বলেন, এত অভিযোগের পরও মাঠে প্রশাসনের দৃশ্যমান তদারকি ছিল খুব কম; বিভিন্ন হাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মনিটরিং দল খুব একটা চোখে পড়েনি। পশুর হাট তদারকি ও বাড়তি হাসিলের বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি বলে জানায় জাগো নিউজ।
সে সময় জেলার প্রায় সব পশুর হাট গবাদিপশুতে ভরা ছিল; ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের পশু উঠেছিল। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছিল, কেনাবেচার সঙ্গে বাড়তি হাসিলের অভিযোগও বাড়ছিল। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাবি ছিল, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, রসিদে হাসিলের অঙ্ক লেখা বাধ্যতামূলক করা এবং সরকারি হাসিলের তালিকা প্রকাশ্যে টানানো না হলে এই 'হাসিল সন্ত্রাস' বন্ধ হবে না।
মহাস্থান হাট: উত্তরাঞ্চলের পুরোনো পশুর হাট
মহাস্থান পশুর হাট বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায়। প্রথম আলো একে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম বৃহৎ পশু কেনাবেচার হাট বলে বর্ণনা করেছে। স্থানীয় লোকজনের বরাতে পত্রিকাটি জানায়, কয়েক শ বছরের পুরোনো এ হাটে প্রতি বুধবার পশুর হাট বসে, আর প্রতিবছর কোরবানির সময় এখানে কেনাবেচা সবচেয়ে বেশি জমে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী, ব্যাপারী ও ক্রেতারা এ হাটে আসেন; তাঁরা এখান থেকে গরু কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ফেনীসহ বড় শহরগুলোর পশুর হাটে সরবরাহ করেন।
২০ মে হাটের দিনে প্রথম আলো দেখেছে, সেখানে বড় গরুর সরবরাহ বেশি থাকলেও ক্রেতা ছিল কম, অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা ও দাম দুই-ই ছিল বেশি। ব্যবসায়ী ও ব্যাপারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ছোট ও মাঝারি গরুর দাম ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং বড় গরুর দাম গড়ে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি ছিল। হাটে জয়পুরহাটের এক খামারি ১ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের একটি হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড়ের দাম চেয়েছিলেন ১০ লাখ টাকা, ক্রেতারা বলেছিলেন ৪ লাখ টাকা। ঢাকা থেকে আসা এক ব্যাপারী পত্রিকাটিকে জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এবার ট্রাকভাড়াও বেড়েছে।
হাটটি যে মহাস্থান গ্রামে, সেখানেই দেশের প্রাচীনতম নগর-প্রত্নস্থল মহাস্থানগড়। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার উত্তরে বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের পাশে, করতোয়া নদীর তীরে এর অবস্থান। এটি প্রাচীন পুণ্ড্রনগর, যা পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চলের রাজধানী ছিল। ১৯৩১ সালে এখানে পাওয়া ব্রাহ্মী লিপিতে প্রাকৃত ভাষায় লেখা একটি চুনাপাথরের ফলক থেকে জানা যায়, নগরটি অন্তত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকেও ছিল। দুর্গনগরীর অংশটি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতক পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে। লাল মাটির বরেন্দ্র অঞ্চলের ওপর, আশপাশের জমি থেকে উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় জায়গাটি তুলনামূলকভাবে বন্যামুক্ত।
শিবগঞ্জ বগুড়া জেলার সবচেয়ে উত্তরের উপজেলা, যার আয়তন ৩১৪ দশমিক ৯২ বর্গকিলোমিটার। উপজেলাটি ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৪৫৬। করতোয়া নদী উপজেলার ভেতর দিয়ে দক্ষিণে বয়ে গেছে, আর উত্তরে রংপুর বিভাগ ও পশ্চিমে জয়পুরহাট জেলা এর সীমানা।

বগুড়ায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত ৭ লাখ ৪০ হাজার পশু
১৬ মে দৈনিক ইনকিলাব জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য প্রকাশ করে। সে অনুযায়ী, ২০২৬ সালের কোরবানির জন্য বগুড়ায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা লালন-পালন হয়েছিল ৫ হাজার ২০০টি খামারে। এর মধ্যে ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৪টি গরু, ২ হাজার ১৫৫টি মহিষ, ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৯টি ছাগল এবং ৫৪ হাজার ২৯টি ভেড়া। আগের বছর জেলায় প্রস্তুত ছিল ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪২টি পশু। খামারিরা পত্রিকাটিকে জানান, আগের বছর প্রত্যাশিত লাভ না হওয়ায় এবার পশুর সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৫টি কমেছে।
একই প্রতিবেদনে খামারিরা অভিযোগ করেন, ভুসি, ধানের কুঁড়া, খৈল ও খড়সহ সব ধরনের গোখাদ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, ফলে প্রতিটি গরু লালন-পালনের খরচ আগের বছরের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ভোগান্তি এড়াতে অনেক খামারি অনলাইন ও অফলাইন দুই পদ্ধতিতেই পশু বিক্রি করছিলেন, খামার থেকে সরাসরি ক্রেতার ঠিকানায় পশু পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। হাটে আসা ক্রেতারা বলেন, দাম আগের বছরের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও সব আকারের গরুর সরবরাহ পর্যাপ্ত ছিল।
বগুড়া সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রায়হান ইনকিলাবকে জানান, নিরাপদ কোরবানির পশু নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ খামারিদের কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ দিচ্ছে, আর রোগাক্রান্ত পশু শনাক্ত করতে প্রতিটি পশুর হাটে বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারি মেডিকেল দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ১৭ মে বগুড়ায় প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের এক সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশে ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি গবাদিপশু আছে, যা প্রত্যাশিত চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ বেশি; তাই ঈদের জন্য পশু আমদানির প্রয়োজন নেই। বাসস জানায়, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু ঢোকা ঠেকাতে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনকে নজরদারি বাড়াতে নির্দেশ দেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
বগুড়া রাজশাহী বিভাগের একটি জেলা। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার আয়তন ২ হাজার ৮৯৮ দশমিক ৬৮ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১২টি। উত্তরে জয়পুরহাট ও গাইবান্ধা, পূর্বে যমুনা নদী ও জামালপুর, দক্ষিণে চলনবিল, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ এবং পশ্চিমে নওগাঁ ও নাটোর জেলা। প্রধান নদী করতোয়া, যমুনা, নাগর, বাঙালি ও ইছামতী। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩৭ লাখ ৩৪ হাজার ২৯৭। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যার ওপর নির্ভর করে ৫৭ দশমিক ৩২ শতাংশ মানুষ, আর ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। জেলার পূর্বাংশে যমুনার পলিমাটির এলাকায় পাট, আমন ধান, আখ ও ডাল জন্মায়, পশ্চিমাংশের উঁচু জমি ধানের জন্য উপযোগী।
দেশজুড়ে কোরবানির পশুর চাহিদা ও সরবরাহ
৩ মে সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৬ সালের কোরবানির জন্য দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু আছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, আর চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ছিল ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, এ বছর কোরবানির পশু নিয়ে সংকটের আশঙ্কা নেই, আর দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি পশু থাকায় আমদানিও করা হবে না।
দেশ রূপান্তর ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে সারা দেশে ৩ হাজার ৬৭৮টি পশুর হাট বসবে এবং সেখানে ভেটেরিনারি সেবা দল থাকবে; বড় হাটে থাকবে একাধিক দল। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ২৭টি হাটের জন্য ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল দল ও ২টি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল দল রাখার কথা বলা হয়। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিশেষ ট্রেনে পশু পরিবহনের ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়। মন্ত্রী বলেন, অনলাইনে পশু বেচাকেনায় খাজনা বা হাসিল দিতে হবে না, আর রাস্তা ও পশুর হাটে চাঁদাবাজি ঠেকাতে সরকার কঠোর থাকবে, যাতে চাঁদাবাজির কারণে পশুর দাম না বাড়ে।
আগের বছরের হিসাবও তখন জানা ছিল। মন্ত্রণালয়ের তথ্যে, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের ১০ জুন জানায়, সেবার দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছিল; এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি, ছাগল ও ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং অন্যান্য ৯৬০টি। অবিক্রীত ছিল ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু। ২০২৪ সালে কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি পশু।
একই হিসাবে ২০২৫ সালে বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পশু কোরবানি হয়েছিল রাজশাহী বিভাগে, ২৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭১টি। বগুড়া এই বিভাগেরই জেলা। অধিদপ্তর জানিয়েছিল, প্রতিটি উপজেলার ছোট, মাঝারি ও বড় তিনটি গ্রাম থেকে অন্তত এক শতাংশ নমুনা নিয়ে স্তরায়িত দৈব নমুনায়ন পদ্ধতিতে এই হিসাব করা হয়।
২০২৬ সালের ঈদের তারিখ ঠিক হয় ১৮ মে। সেদিন সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় জানানো হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে; ফলে ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে বলে বাসস ও বাংলা ট্রিবিউন জানায়। বগুড়ার হাটগুলোতে হাসিল নিয়ে অভিযোগ উঠছিল এই ঈদের ঠিক আগের সপ্তাহে।

হাট ইজারা ও টোল নিয়ে আইন যা বলে
হাট-বাজার স্থাপন ও ব্যবস্থাপনার জন্য দেশে প্রযোজ্য আইন হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ১০ নং আইন)। জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয় ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, আর আইনটি বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি। এর মাধ্যমে পাকিস্তান আমলের ১৯৫৯ সালের হাটস অ্যান্ড বাজারস (এস্টাবলিশমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন) অর্ডিন্যান্স রহিত হয়। আইনের সংজ্ঞায় হাট ও বাজার বলতে এমন স্থানকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন বা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কৃষিপণ্য, ফলমূল, পশু, হাঁস-মুরগি, ডিম, মাছ-মাংস ও দুধসহ নানা পণ্য কেনাবেচা হয়।
আইনের ৭ ধারায় টোল নির্ধারণের নিয়ম আছে। জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার হাটের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক, আর সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পণ্যের কেনাবেচার মূল্যমান যাচাই-বাছাই করে টোল, কর, রেইট, ফি বা মাশুলের হার ঠিক করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে এবং সরকারের অনুমোদন নিয়ে তা প্রচার করবে। অনুমোদিত এই হার ইজারা বিজ্ঞপ্তি, দরপত্রের সিডিউল এবং ইজারাগ্রহীতার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে সংযোজন করতে হবে। অর্থাৎ ইজারাদার কোন পশুতে কত টাকা নিতে পারবেন, তা ইজারার চুক্তিরই অংশ।
৫ ধারা অনুযায়ী, হাটের দৈনন্দিন কার্যক্রম, টোল ও ফি আদায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ তত্ত্বাবধানের জন্য জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে হাট ও বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যায়। ৪ ধারায় বলা আছে, ধর্মীয় বা অন্য বিশেষ উৎসবে জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমোদন নিয়ে স্থায়ী অবকাঠামো না বানিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্থায়ী হাট বসানো যাবে; কোরবানির মৌসুমের অস্থায়ী পশুর হাট এই বিধানের আওতায় পড়ে। ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া, চুক্তিপত্র ও ইজারালব্ধ অর্থ ব্যবস্থাপনা বিধি দিয়ে ঠিক করার কথা ৬ ধারায়।
আইনের দণ্ডের ধারাটি (১২ ধারা) মূলত হাটের সরকারি খাস জমি অবৈধ দখল ও তার ওপর অবৈধ স্থাপনা নিয়ে: এ অপরাধে অনধিক এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে, আর ১৫ ধারা অনুযায়ী এসব অপরাধ মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যায়। বাড়তি হাসিলের বিষয়ে আইনের মূল ব্যবস্থা হলো অনুমোদিত হারের তালিকা প্রচার করা এবং তা ইজারার চুক্তিতে যুক্ত রাখা।
ঢাকায় হাসিলের নিয়ম ছিল ভিন্ন রকম। ২০ মে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ইজারাদারদের সঙ্গে সভায় বলেন, পশু বিক্রির অর্থ থেকে ইজারাদার ৫ শতাংশ হাসিল নিতে পারবেন, এর বাইরে গরু বিক্রেতার কাছ থেকে আর কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি জানান, অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে প্রায় ১০০ জন কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, আর কোরবানির হাট নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ দিনের জন্য বসবে। আগের বছর, ২০২৫ সালের ১ জুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারও বলেছিলেন, ইজারাদারেরা শুধু নির্ধারিত হাসিলই নিতে পারবেন, অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগের বছরেও বগুড়ার হাটে একই অভিযোগ
বগুড়ার পশুর হাটে বাড়তি হাসিলের অভিযোগ ২০২৬ সালেই প্রথম ওঠেনি। ২০২৪ সালের ১৩ জুন প্রথম আলো দুপচাঁচিয়া উপজেলার ধাপ সুলতানগঞ্জ হাট থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পত্রিকাটি জানায়, কয়েক শ বছরের পুরোনো এই হাটে প্রতি বৃহস্পতিবার পশুর হাট বসে, আর ঈদুল আজহার আগে সেদিন লাখো পশু বিক্রির জন্য ওঠে। হাটের ক্রেতা-বিক্রেতারা তখনো অভিযোগ করেছিলেন, ইজারাদারের লোকজন ইচ্ছেমতো হাসিল নিচ্ছেন।
সাভার থেকে আসা এক ক্রেতা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, প্রশাসন মাইকে ৫০০ টাকা হাসিলের কথা ঘোষণা করলেও ইজারাদারের লোকজন তাঁর কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়েছেন, আর প্রশাসনকে অভিযোগ করেও লাভ হয়নি। দুপচাঁচিয়ার তৎকালীন ইউএনও পত্রিকাটিকে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) হাটে পাঠানো হয়েছিল; তিনি অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের দায়ে ইজারাদারের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন।
সাভার থেকে আসা আরেক ক্রেতা সে সময় বলেছিলেন, অন্য বছর বগুড়া থেকে ঢাকার গাবতলী হাট পর্যন্ত এক ট্রাক গরু নিতে মহাসড়কে পথে পথে পাঁচ হাজার টাকার বেশি চাঁদা দিতে হতো; সেবার মহাসড়কে চাঁদাবাজি কমলেও মহাস্থান ও ধাপ সুলতানগঞ্জসহ বড় হাটগুলোতে ইজারাদারের বাড়তি আদায় নিয়ে তাঁরা অতিষ্ঠ ছিলেন। একই প্রতিবেদনে মহাস্থান হাটের এক ট্রাকমালিক জানান, মহাস্থান থেকে গাবতলী পর্যন্ত গরু পরিবহনের ট্রাকভাড়া আগের বছরের ১৫ হাজার থেকে বেড়ে ২৫ হাজার টাকা এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ৪০ হাজার টাকা হয়েছিল।
২০২৪ সালের সেই মৌসুমে দামের গতি ছিল ২০২৬ সালের উল্টো দিকে। প্রথম আলো জানায়, সরবরাহ বেশি থাকায় ধাপ সুলতানগঞ্জ হাটে আগের বছরের তুলনায় মাঝারি গরুর দাম গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং বড় গরুর দাম ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কম ছিল, আর খামারিরা বলছিলেন খরচ উঠছে না। দুই বছরের দুই রকম বাজারেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের একটি অভিযোগ একই থেকে গিয়েছিল: প্রশাসনের ঘোষিত হারের চেয়ে বেশি হাসিল আদায়।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দৈনিক ইনকিলাব, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দেশ রূপান্তর, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ গেজেট (হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)