পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ২০২৬ সালের ২১ মে বৃহস্পতিবার রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিটি হাটে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে মাঝারি আকারের গরুর সামনে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা খামারি ও ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর ছিল হাটটি। খামারিরা জাগো নিউজকে জানান, সামর্থ্য ও পরিবারের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে অনেক ক্রেতাই বড় গরুর বদলে মাঝারি গরুর দিকে ঝুঁকছেন। ছোট গরুর বিক্রিও ভালো হচ্ছিল।
২১ মে হাটে ক্রেতারা যা খুঁজছিলেন
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ মে দুপুরে রাজশাহী সিটি হাট ঘুরে দেখা যায়, বড় গরুর তুলনায় মাঝারি গরুর সামনেই ক্রেতাদের ভিড় বেশি। বিশেষ করে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে থাকা গরুগুলোর প্রতি আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন জেলা থেকে আনা দেশি গরুর পাশাপাশি খামারে লালন-পালন করা মাঝারি আকারের গরুর সরবরাহও ছিল পর্যাপ্ত। এতে ক্রেতারা যেমন পছন্দমতো গরু খুঁজে পাচ্ছিলেন, তেমনি বিক্রেতারাও ভালো বিক্রির আশা করছিলেন।
হাটে ছোট আকারের গরুর বিক্রিও বেশ ভালো হচ্ছিল। সীমিত বাজেট ও ছোট পরিবারের কথা বিবেচনায় রেখে অনেকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে গরু কিনছিলেন। তুলনামূলক কম দামের কারণে এসব গরুর প্রতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা আনিসুর রহমান মিলন ১ লাখ ৫ হাজার টাকায় একটি মাঝারি গরু কেনেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বড় গরু কেনা অনেকের পক্ষেই কঠিন। তাই পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও বাজেট বিবেচনায় তাঁর কাছে মাঝারি গরুই ভালো মনে হয়েছে। হাটে তিনি পছন্দমতো গরু পেয়েছেন এবং দামও মোটামুটি সহনীয় বলে জানান।
হাটে মাঝারি ও ছোট গরু দেখতে আসা শামীম পাটোয়ারী বলেন, আগের তুলনায় এবার বড় গরুর দাম অনেক বেশি, তাই বেশির ভাগ মানুষ মাঝারি গরুর দিকেই ঝুঁকছেন। তাঁদের বাজেটের মধ্যেও বেশ কিছু ভালো গরু দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
এর পেছনে শহরটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। জাগো নিউজকে তাঁরা বলেন, রাজশাহী ঢাকার মতো বড় বাণিজ্যিক শহর নয়; এখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই তুলনামূলক বেশি। আবার শিক্ষা নগরী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় শহরটিতে শিক্ষক, চাকরিজীবী ও সুশীল সমাজের মানুষের বসবাসও বেশি। তাঁদের অনেকেই এককভাবে কোরবানি দেওয়ার জন্য মাঝারি কিংবা ছোট গরুকেই বেশি উপযোগী মনে করেন। ফলে অধিকাংশ ক্রেতা সাধ্য ও প্রয়োজন বিবেচনায় মাঝারি গরুর প্রতিই ঝুঁকছিলেন।
পদ্মাপাড়ের শিক্ষা নগরী রাজশাহী
রাজশাহী পদ্মা নদীর উত্তর তীরে, ভারত সীমান্তের কাছে অবস্থিত একটি মহানগর। এটি রাজশাহী বিভাগ ও রাজশাহী জেলা দুটিরই প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় শহর। দেশের বহু পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখানে থাকায় শহরটিকে কখনো কখনো শিক্ষা নগরী বলা হয়। রেশমের জন্যও রাজশাহীর পরিচিতি দীর্ঘদিনের। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় এই শহরে। রাজশাহী পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৭৬ সালে, সিটি করপোরেশন হয় ১৯৯১ সালে। সিটি করপোরেশন এলাকার চারদিকেই পবা উপজেলা।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী রাজশাহী শহরের জনসংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৫৩ হাজার ২৮৮, খানা ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৭টি। পুরো জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ১৫ হাজার ৯ জন, খানা ৭ লাখ ৭৫ হাজার ২৪৫টি; প্রতি খানায় গড়ে ৩ দশমিক ৬৭ জন। জেলার প্রায় ৩৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বাস করতেন। সাত বছর ও তার বেশি বয়সীদের মধ্যে জেলার সাক্ষরতার হার ছিল ৭৫ দশমিক ১৭ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ৭৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।
ওপরে উল্লেখ করা ক্রেতা যেখানে কর্মরত, সেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। শুরুতে অস্থায়ী ভবনে কার্যক্রম চললেও ১৯৬৪ সালে দপ্তরগুলো স্থায়ী ক্যাম্পাসে সরে যায়। শহরের পূর্ব দিকে মতিহারে এর মূল ক্যাম্পাস; ১২টি অনুষদের অধীনে রয়েছে ৫৯টি বিভাগ।

বাজার বুঝে গরু আনছেন খামারিরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৩৫টির মতো মাঝারি ও ছোট গরু নিয়ে রাজশাহীর সিটি হাটে আসেন খামারি কামাল মিয়া। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, রাজশাহীর বাজার বুঝেই এবার তিনি মাঝারি ও ছোট গরু বেশি এনেছেন। বড় গরুর তুলনায় এসব গরু দ্রুত বিক্রি হচ্ছে, আর দাম শুনে ক্রেতারাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
আরেক খামারি আব্দুল খালেক বলেন, খাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়লেও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা মাথায় রেখে তাঁরা মাঝারি গরুই বেশি প্রস্তুত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এবার ৩ থেকে ৫ মণ ওজনের গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। মণ দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত ওজনের একক, যা এখনো পশুর হাটে ব্যবহৃত হয়; বাংলাদেশে সাধারণভাবে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি।
খামারিরা জানান, রাজশাহীর বাজারে মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি থাকায় বড় গরুর একটি অংশ ঢাকাসহ দেশের বড় বড় পশুর হাটে পাঠানো হয়েছে। এরপরও সিটি হাটে পর্যাপ্ত গরুর সরবরাহ ছিল। হাট ইজারাদারদের ভাষ্য, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে বেচাকেনা আরও বাড়বে; তবে তখন পর্যন্ত হাটে গরুর সরবরাহ ভালো থাকায় ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই পক্ষই সন্তুষ্ট ছিলেন।
উৎপাদন খরচ বাড়ার কথা কয়েক সপ্তাহ ধরেই শোনা যাচ্ছিল। ১১ মে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী, তানোর, পবা ও দুর্গাপুর উপজেলার খামারিরা। তাঁরা জানান, দেশীয় পদ্ধতিতে পশু লালন-পালন করলেও গো-খাদ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেশি পড়েছে, তাই তাঁরা ন্যায্য দামের আশা করছেন। ১৮ মে এখন টিভিকে এক খামারি বলেন, এই কোরবানিতে কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা না পেলে খামারিদের লোকসান গুনতে হবে। এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো জানায়, রোজার আগেই রাজশাহীর বাজারে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা হয়েছে। এক মাংস বিক্রেতা তখন বলেন, একটি খড়ের আঁটি কিনতে হচ্ছে আট টাকায়, আর রাজশাহী সিটি হাটে গরু কিনলে সারচার্জ দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা, যা আগে ছিল ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা।
কামাল মিয়া যে জেলা থেকে গরু এনেছেন, সেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্তর-পশ্চিমের জেলা এবং রাজশাহী বিভাগের অংশ। এর উত্তর ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা, পূর্বে নওগাঁ এবং দক্ষিণ-পূর্বে রাজশাহী জেলা। ১৯৮৪ সালে এটি আলাদা জেলার মর্যাদা পায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের যে তথ্য বাংলা ট্রিবিউন ১১ মে প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, জেলায় খামার ১৩ হাজার ৯৪২টি; গরু ১ লাখ ১৭ হাজার ১০টি, ছাগল ৮৪ হাজার ৮০১টি ও ভেড়া ১২ হাজার ৯২২টি। জেলায় কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ২৪৪টি, চাহিদা ১ লাখ ২১ হাজার ২০২টি।
সিটি হাট: উত্তরাঞ্চলের বড় পশুর হাট
সমকাল ১১ মে রাজশাহী সিটি হাটকে উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর হাট হিসেবে পরিচিত বলে উল্লেখ করে। ১৮ মে এখন টিভিও একে উত্তরের সর্ববৃহৎ হাট বলে জানায়; তখন সেখানে বেচাকেনা জমতে শুরু করেছিল। খামারিরা এখন টিভিকে বলেন, রাজশাহী, বাগমারা, পাবনা, কুষ্টিয়া ও যশোর থেকে সব জাতের গরু এই হাটে আসে।
হাটটি তুলনামূলক নতুন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম আলো জানায়, ২০০১ সালের পর রাজশাহী নগরে সিটি হাট চালু হয়, পবা উপজেলার পুরোনো দামকুড়া হাট থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। হাটটি বসে সপ্তাহে রোববার ও বুধবার। পত্রিকাটির তথ্যমতে, তখন সিটি হাটে একটি গরুর ক্রেতার কাছ থেকে ৮০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০ টাকা টোল আদায় করা হতো। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার আগে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানায়, বছরের অন্য সময় সপ্তাহে দুই দিন বসলেও ঈদ উপলক্ষে হাটটিতে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলে।
আগের বছরগুলোর ঈদের প্রতিবেদনেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সালের ১ জুন বাসস জানায়, সিটি হাটে মাঝারি গরুই বেশি উঠেছে এবং ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায়ও সেগুলো; এসব গরু মূলত ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। মাঝারির চেয়ে একটু বড় গরু বিক্রি হচ্ছিল ২ লাখ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায়, আর ছোট গরু ৬৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায়। পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তখন বাসসকে জানান, রাজশাহীর হাটগুলোতে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ২১৩টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩ জুন বাংলা ট্রিবিউন জানায়, ঈদের আগে সিটি হাটের সাপ্তাহিক ‘বড় হাটের’ প্রথম দিনে বাইরের বড় ব্যবসায়ীরা না আসায় বেচাকেনা জমেনি; বিক্রেতারা বলেন, সে বছর এক লাখ টাকার নিচে কোরবানিযোগ্য গরু মিলবে না। এক ক্রেতা জানান, সাতজন মিলে প্রত্যেকে ১৫ হাজার টাকা করে তুলেছেন একটি গরু কেনার জন্য।
২০২৬ সালের মৌসুম নিয়ে ১৯ মে বাসস জানায়, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, সিটি হাট ও বানেশ্বর হাটসহ জেলার ছোট-বড় হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় তত বাড়ছে। হাটগুলোতে জাল নোট শনাক্তের মেশিন বসানো হয়েছে এবং কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা পশু শনাক্তে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নজরদারি রাখছে, আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা যাতে কেনা পশু নির্বিঘ্নে ট্রাকে করে নিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য প্রশাসন সহায়তার ব্যবস্থা করেছে।

২০২৬ সালের কোরবানিতে রাজশাহী জেলার পশু
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর রাজশাহীতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১১টি গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি গরু, ৩ হাজার ৪২৫টি মহিষ, ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ছাগল এবং ৪৩ হাজার ৪০৬টি ভেড়া। বিপরীতে জেলার চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি পশু। ফলে প্রায় ৯২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকছে, যা দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো হবে। একই তথ্য ১৯ মে প্রকাশ করে বাসস জানায়, উদ্বৃত্তের সঠিক সংখ্যা ৯১ হাজার ৯৫৩টি।
বাসস ও বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৬ হাজার ২৩৪টি গবাদিপশুর খামার রয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বাসসকে জানায়, এসব খামারে ক্ষতিকর হরমোন বা স্টেরয়েড ছাড়াই প্রাকৃতিক উপায়ে ও দেশীয় পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করা হয়েছে। তবে পশুখাদ্যের দাম চড়া থাকায় এবার উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে বলে জানান খামারিরা। ১৮ মে এখন টিভি জানায়, প্রাণিসম্পদ বিভাগ আশা করছে, চলতি বছর শুধু রাজশাহী জেলাতেই প্রায় এক হাজার কোটি টাকার গবাদিপশু বেচাকেনা হবে।
জেলার মজুত পশুর বড় অংশই ছাগল। বাসস জানায়, রাজশাহীর খামারগুলোতে লালন-পালন করা পশুর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গরু ও বিখ্যাত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছোট আকারের, আঁটসাঁট গড়নের ছাগল; সাধারণত কালো, তবে বাদামি, সাদা বা ধূসরও হতে পারে। এর পা খাটো, শিং ছোট। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পাঁঠার ওজন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কেজি, ছাগীর ২০ থেকে ২৫ কেজি। কম খাবারে পালন করা যায় এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে বলে জাতটি বাংলাদেশে জনপ্রিয়; ছাগী বছরে দুবার বাচ্চা দেয়, প্রতিবার এক থেকে তিনটি। এর মাংস ও চামড়ার মানও উঁচু।

কয়েক বছর ধরে জেলার পশুর সংখ্যা প্রায় একই সীমার মধ্যে রয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে বাংলা ট্রিবিউন জানায়, সে বছর রাজশাহীতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ৪ লাখ ৬৬ হাজার ১৯৬টি পশু; এর মধ্যে গরু ৮৩ হাজার ৩৬৫টি, মহিষ ৩ হাজার ৭৬৯টি ও ছাগল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৭৫৩টি। ২০২৫ সালের ১ জুন বাসস জানায়, সে বছর জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮৯৩টি পশু, যা জেলার চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি।
রাজশাহী বিভাগ ও সারা দেশের চিত্র
২০২৬ সালে দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোরবানিযোগ্য পশু ছিল রাজশাহী বিভাগে। ১১ মে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভাগীয় তথ্যমতে, বিভাগের আট জেলায় কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬২৮টি, চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ, উদ্বৃত্ত ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৯টি। বিভাগের ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৩টি ছোট-বড় খামারে এসব পশু লালন-পালন করা হয়েছে, আর বিভাগজুড়ে ৩০২টি হাটে এগুলো কেনাবেচা হওয়ার কথা।
একই তথ্য অনুযায়ী বিভাগে শীর্ষে ছিল নওগাঁ, যেখানে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৮৩৭টি চাহিদার বিপরীতে পশু ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৫টি। এরপর বগুড়া, যেখানে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০টি চাহিদার বিপরীতে পশু ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৩৭টি। পাবনায় পশু ছিল ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮টি, সিরাজগঞ্জে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৭২৩টি, নাটোরে প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার এবং জয়পুরহাটে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৩টি। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বরাতে ১১ মে সমকাল জানায়, বিভাগের মজুতে ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৭৮৩টি ষাঁড়, ২ লাখ ৯ হাজার ৯৪০টি বলদ, ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৯০টি গাভি, ২০ হাজার ৬৬১টি মহিষ ও ২৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৩৮টি ছাগল, এর বাইরে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি ভেড়াসহ অন্যান্য পশু।
জাতীয় পর্যায়ে ৩ মে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি; ফলে ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ৫ হাজার ৬৫৫টি। মন্ত্রী জানান, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে, এর মধ্যে ঢাকায় ২৭টি; আর আগের কয়েক বছরের মতো এবারও অনলাইনে পশু বিক্রি হবে, যার জন্য কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না।
৪ মে সমকাল এই হিসাবকে আগের বছরগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখায়। কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশু ছিল ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি, যার মধ্যে ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি অবিক্রীত ছিল; ২০২৪ সালে ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি; ২০২৩ সালে ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি এবং ২০২২ সালে ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি। ২০২৫ সালে কোরবানি হয় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পত্রিকাটিকে জানান, উপজেলা কার্যালয়ের মাঠকর্মীদের সংগ্রহ করা তথ্য থেকে, স্তরায়িত দৈব নমুনায়নের ভিত্তিতে প্রতি উপজেলার অন্তত ১ শতাংশ নমুনা নিয়ে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে।
ঈদের তারিখ চূড়ান্ত হয় ১৮ মে। সেদিন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং জানানো হয়, ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে ২৮ মে বৃহস্পতিবার, প্রথম আলো জানায়।
সীমান্ত ও ভারতীয় গরুর প্রসঙ্গ
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান জাগো নিউজকে বলেন, একসময় ভারতীয় গরু আসায় স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। এবার সীমান্তে বাড়তি নজরদারি নেওয়া হয়েছে, যাতে অবৈধভাবে গরু প্রবেশ করতে না পারে; স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে এবার পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, আর হাটগুলোতে নজরদারি ও মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।
সরকারের নীতিও ছিল একই দিকে। প্রথম আলো জানায়, ৩ মের সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ অতীতে সীমান্তঘেঁষা কিছু হাটের মাধ্যমে বিদেশি পশু প্রবেশ করত। আজকের পত্রিকা জানায়, ৯ মে নাটোরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, পশু আমদানি করলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আমদানির পরিকল্পনা সরকারের নেই, আর প্রতিবেশী দেশ থেকে পশু যাতে ঢুকতে না পারে সে জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) ইতিমধ্যে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৯ মে বাসস জানায়, সরকারি নির্দেশনায় এবার সীমান্ত দিয়ে কোনো ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করতে পারছে না এবং সীমান্তের হাটগুলোও বন্ধ থাকছে।
এই পরিবর্তন এক দিনে আসেনি। ১১ মে সমকালকে রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক বলেন, গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ভারতীয় পশুর প্রয়োজন হয় না, দেশের পশুতেই চাহিদা পূরণ হয়। ব্যবসায়ীরা পত্রিকাটিকে জানান, একসময় হাটগুলোতে প্রচুর ভারতীয় সাদা ‘বলডার’ গরু উঠত, কিন্তু চোরাচালান বন্ধ হওয়ার পর দেশীয় খামারিরাই এখন বড় ভরসা। বাংলা ট্রিবিউনও ১১ মে জানায়, একসময় সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের হাটগুলোতে ভারতীয় গরুর আধিপত্য থাকলেও সীমান্তে কঠোর নজরদারির কারণে গত কয়েক বছরে সেই প্রবণতা বন্ধ হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে গবাদিপশু পালনে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।
২১ মে সকালে প্রতিদিনের বাংলাদেশ জানায়, অবৈধ গরু প্রবেশ রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আটটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত জেলায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন ও চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। রাতের আঁধারে চোরাচালান ঠেকাতে ড্রোন, সার্চলাইট ও থার্মাল ডিভাইস ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলছে।

কোরবানির বিধান, গরুর জাত ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর
বড় গরু, মাঝারি গরু নাকি ভাগে কোরবানি, এই বাছাইয়ের পেছনে কোরবানির বিধানেরও ভূমিকা আছে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হয়; ঈদের নামাজের পর থেকে পরের দিনগুলোতেও কোরবানি দেওয়া যায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, একটি উট, গরু বা মহিষ সাতজনের নামে কোরবানি দেওয়া যায়, আর একটি ভেড়া বা ছাগল কেবল একজনের নামে। কোরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স থাকতে হয় এবং অন্ধত্ব, ভাঙা পা বা শিংয়ের মতো ত্রুটিমুক্ত হতে হয়। প্রথা অনুযায়ী মাংস তিন ভাগ করা হয়: এক ভাগ নিজের পরিবারের, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের এবং এক ভাগ দরিদ্রদের জন্য। বাংলাদেশে সাধারণত গরু, ছাগল ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশের বেশির ভাগ গরু দেশি জেবু ধরনের। দেশি গরু খাঁটি বা সংকর জাতের তুলনায় কম রোগাক্রান্ত হয় এবং গরম সহ্য করতে পারে; উন্নত দেশি ধরনের মধ্যে রয়েছে পাবনা গরু, রেড চিটাগাং, মুন্সিগঞ্জের গরু ও নর্থ বেঙ্গল গ্রে। উৎপাদন বাড়াতে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, শাহিওয়াল ও সিন্ধির মতো বিদেশি জাতের সঙ্গে দেশি গরুর সংকরায়ণ করা হয়েছে।
রাজশাহীর পশুর হিসাব দিয়েছে যে দপ্তর, সেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সংস্থা, যা দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের দায়িত্বে রয়েছে। ১৭৯৫ সালে গঠিত একটি ভেটেরিনারি ইউনিট থেকে এর সূচনা, যা ১৮৮৩ সালে সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্টে পরিণত হয়। প্রতিটি উপজেলায় অধিদপ্তরের কার্যালয় আছে, যেখান থেকে মানুষ প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি সেবা পান। ২০২৬ সালের ঈদের আগে মন্ত্রণালয় জানায়, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ ছাড়া কোনো পশুকে হাটে তোলা যাবে না, আর ঢাকার প্রতিটি বড় হাটে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় একাধিক ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম থাকবে, ২০ মে বাসস জানায়।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলা ট্রিবিউন, সমকাল, প্রথম আলো, এখন টিভি, আজকের পত্রিকা, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)