মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চল কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ এবং ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার করলে ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালের ২৯ জুন ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘বিল্ডিং ফুড সিকিউরিটি, ক্রিয়েটিং জবস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই হিসাব দেওয়া হয়। প্রতিবেদনের ভাষ্য, শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা গড়া, পুষ্টির উন্নতি, খাদ্য অনিরাপত্তা মোকাবিলা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্পষ্ট সুযোগ অঞ্চলটির সামনে আছে, আর এই কর্মসংস্থান তরুণদের কাজের সংকট মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
খাদ্য অনিরাপত্তা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অঞ্চলটির জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ তখন কোনো না কোনো মাত্রার খাদ্য অনিরাপত্তায় ছিল, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ৪২ শতাংশ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখত না, যাদের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বহু মানুষও ছিল। সরাসরি ক্ষুধার প্রধান কারণ সংঘাত হলেও খাবারের দাম সাধ্যের বাইরে থাকা ও অপুষ্টি পুরো অঞ্চলজুড়েই ব্যাপক সমস্যা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০৫০ সালের মধ্যে অঞ্চলটিতে খাদ্যের চাহিদা ৬৭ শতাংশ বাড়বে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, তাই অদূর ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও নীতি সংস্কার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দরকার বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
খাদ্য নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞাটি ১৯৯৬ সালের বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনের: সব মানুষ সব সময় সক্রিয় ও সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়ার শারীরিক ও আর্থিক সুযোগ পেলে তবেই খাদ্য নিরাপত্তা আছে বলা যায়। প্রতিবেদনটির মতে, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ ছেড়ে বিভিন্ন খাতের নীতি, প্রণোদনা ও কর্মসূচিকে দীর্ঘ সময় ধরে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিলেই কেবল রূপান্তরমূলক অগ্রগতি সম্ভব।
পানিসাশ্রয়ী সেচ ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের হিসাব
প্রতিবেদনের মূল হিসাব হলো, পানিসাশ্রয়ী সেচ ও কৃষি উদ্ভাবনে আঞ্চলিক বিনিয়োগ বছরে ১ হাজার ২০০ কোটি (১২ বিলিয়ন) ডলার বাড়ালে এবং সঙ্গে উচ্চাভিলাষী ও সুসংহত নীতি সংস্কার হলে দেশীয় খাদ্য সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এতে ২০৫০ সালের মধ্যে ফল ও সবজির উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি হতে পারে এবং দানাশস্যের ফলন বাড়তে পারে ৭২ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সহনশীল ও সুব্যবস্থাপিত বাণিজ্য অঞ্চলটিকে রপ্তানি বাজার গড়তে, পানির চাহিদায় ভারসাম্য আনতে এবং কম রাজস্ব ব্যয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
পানিসাশ্রয়ী সেচের একটি পরিচিত উদাহরণ ড্রিপ বা ফোঁটা সেচ। এটি এক ধরনের ক্ষুদ্র সেচব্যবস্থা, যেখানে পানি ধীরে ধীরে ফোঁটায় ফোঁটায় সরাসরি গাছের শিকড়ের অংশে পৌঁছায়, ফলে বাষ্পীভবন কমে এবং পানি ও পুষ্টি উপাদান সাশ্রয় হয়। আধুনিক এই পদ্ধতির প্লাস্টিকের ড্রিপার ইসরায়েলে উদ্ভাবন করেন সিমচা ব্লাস ও তাঁর ছেলে; ১৯৫৯ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক ব্যবস্থাটি বসানো হয়।


খামার থেকে মূল্যশৃঙ্খলে সরছে কাজ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অঞ্চলটির কৃষি-খাদ্য খাতে তখনই প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ কাজ করতেন, যা মোট কর্মীর প্রায় প্রতি দশজনে তিনজন। খামারে সরাসরি কাজ কমছিল, কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস ও খাদ্যসেবায় কর্মসংস্থান বাড়ছিল বৈশ্বিক হারের দ্বিগুণ গতিতে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বেশি দামের ফসল ও খামারের আয় বাড়লে ভালো মানের কাজ আসতে পারে, আর পুরো মূল্যশৃঙ্খলজুড়ে তৈরি হতে পারে নতুন কাজের সুযোগ।
প্রতিবেদনের জন্য করা জরিপে দেখা যায়, প্রচলিত ধারণার উল্টো, বেশির ভাগ মানুষ কৃষি-খাদ্য খাতের কাজকে ভালো আয়ের সুযোগ হিসেবে দেখেন, বিশেষ করে তরুণদের জন্য।

খাদ্য অপচয়, পুষ্টি ও বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা
লজিস্টিকসে বিনিয়োগ ও ভোক্তাদের জন্য ভালো প্রণোদনা খাদ্য অপচয় কমাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এতে লাখো মানুষের খাবার জোটে এবং রাজস্ব ও প্রাকৃতিক সম্পদ সাশ্রয় হয়। অপুষ্টি মোকাবিলায় চাহিদা ও সরবরাহকে স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঘোরাতে দৃঢ় পদক্ষেপও চাওয়া হয়।
বিশ্বব্যাংকের প্ল্যানেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক মেস্কি ব্রানে বলেন, ‘এই প্রতিবেদন দেখায়, খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে, শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার ভিত গড়তে এবং লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে অঞ্চলটি অদূর ভবিষ্যতেই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের সেচ ও কৃষিতে বিনিয়োগ করে এবং ‘অ্যাগ্রিকানেক্ট’ উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের নতুন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ দেশগুলোকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে। অ্যাগ্রিকানেক্ট হলো ক্ষুদ্র কৃষকের কৃষি বদলে দেওয়া, কর্মসংস্থান তৈরি ও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের একটি উদ্যোগ।
প্রতিবেদনের ভৌগোলিক পরিসর বিশ্বব্যাংকের অঞ্চল বিভাজন অনুসরণ করে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে বিশ্বব্যাংক পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণের জন্য আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে, সংক্ষেপে যা ‘মেনাপ’ নামে পরিচিত।

ছবি: Mr Masri / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, বিশ্বব্যাংকের অ্যাগ্রিকানেক্ট পাতা, উইকিপিডিয়া (মেনাপ, খাদ্য নিরাপত্তা, ড্রিপ সেচ)





মন্তব্য
(০)