সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

দেশীয় জাত ও আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদ খাতের অগ্রগতি ও করণীয় নিয়ে বিশ্লেষণ

২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর দেশে প্রথম জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ শেষ হওয়ার পরদিন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের এক গণযোগাযোগ কর্মকর্তা লেখেন, উন্নত জাত ও প্রযুক্তি খাতটিকে বদলে দিয়েছে, তবে দেশীয় জাত রক্ষা এবং প্রাণিজ আমিষ গরিবের নাগালে আনা জরুরি।

দেশীয় জাত ও আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদ খাতের অগ্রগতি ও করণীয় নিয়ে বিশ্লেষণ
লাইভস্টক

দেশে প্রথমবারের মতো পালিত জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ শেষ হওয়ার পরদিন, ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর, জাগো নিউজ ২৪ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের একজন গণযোগাযোগ কর্মকর্তার লেখা একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। সপ্তাহের প্রতিপাদ্য "দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদে হবে উন্নতি" ছিল লেখাটির শিরোনাম। লেখকের বক্তব্যের তিনটি দিক: জাত উন্নয়ন ও প্রযুক্তি কয়েক দশকের মধ্যে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনকে বদলে দিয়েছে; খাতটি শিল্পে রূপ নিলেও দেশীয় জাত রক্ষা করতে হবে; আর দুধ, মাংস ও ডিম দরিদ্র পরিবারের নাগালে না এলে এই অর্জন জাতির স্বাস্থ্যে কাজে আসবে না। লেখক যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। এই প্রতিবেদনে সেগুলো অধিদপ্তরের প্রকাশিত সারণি, সপ্তাহটি নিয়ে সে সময়ের সংবাদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রাণী নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রের পাশে রেখে দেখা হয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ


লেখক শুরু করেন এই কথা দিয়ে যে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি কৃষি হলেও প্রাণিসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন গ্রামীণ জনপদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, যা কালের পরিক্রমায় অর্থনীতির মজবুত ভিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং অল্প সময়ের মধ্যেই খাতটি দেশে প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান জোগানদাতা হয়ে উঠেছে। লেখকের মতে, পুষ্টি নিরাপত্তা, সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাত অনবদ্য ভূমিকা রাখছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে লেখক জানান, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান ১.৮১ শতাংশ, প্রবৃদ্ধির হার ৩.১৯ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে অংশ ১৬.৫৪ শতাংশ এবং অর্থমূল্যে প্রাণিসম্পদ জিডিপির আকার ৯১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অধিদপ্তরের "লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫" নামের এক পাতার সারসংক্ষেপে এই সংখ্যাগুলোই আছে; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য থেকে অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখা এটি তৈরি করেছে। সারসংক্ষেপে সংখ্যাগুলোকে সাময়িক বলা হয়েছে; জিডিপিতে অংশ, প্রবৃদ্ধি ও কৃষিজ জিডিপিতে অংশ স্থির মূল্যে এবং ৯১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা চলতি মূল্যে হিসাব করা। একই পাতায় এ খাতে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ২০ শতাংশ এবং আংশিক কর্মসংস্থান ৫০ শতাংশ বলে উল্লেখ আছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে অধিদপ্তরের সারণিতে এই প্রবৃদ্ধির ধরন বোঝা যায়। স্থির মূল্যে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অংশ ২০১৭-১৮ সালে ছিল ২.১৭ শতাংশ, যা বছর বছর কমে ২০২৪-২৫ সালে ১.৮১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, কারণ অর্থনীতির অন্য খাতগুলো আরও দ্রুত বেড়েছে; অথচ খাতটির নিজস্ব প্রবৃদ্ধির হার এ সময় বছরে ২.৯০ থেকে ৩.১৯ শতাংশের মধ্যে ছিল। চলতি মূল্যে খাতটির আকার ২০১৭-১৮ সালের ৩৯ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা থেকে ২০২১-২২ সালে ৬৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে ৯১ হাজার ৩৬ কোটি টাকায় উঠেছে। কৃষিজ জিডিপিতে এর অংশ সামান্য ওঠানামা করেছে, ২০১৭-১৮ সালের ১৬.৫১ শতাংশ থেকে ২০২৪-২৫ সালে ১৬.৫৪ শতাংশ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর নিজেও পুরোনো প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে এর কাজ শুরু হয়; একই বছর বেঙ্গল ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউট ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশভাগের পর একে পূর্ব পাকিস্তানের পশুপালন পরিদপ্তর হিসেবে পুনর্গঠন করা হয় এবং ১৯৬০ সালে নাম হয় প্রাণিসম্পদ পরিদপ্তর। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার ফার্মগেটে কৃষি খামার সড়কে। আমিষের চাহিদা পূরণে ভেটেরিনারি সেবা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সেবা দেওয়া এবং গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এর দায়িত্ব।

গ্রামের ঐতিহ্য থেকে প্রযুক্তিনির্ভর খামার


লেখকের ভাষায়, আশির দশকের মতো খর্বাকায়, রুগ্‌ণ, হাড্ডিসার গরু এখন আর দেশের কোথাও দেখা যায় না, যা আধুনিক ব্যবস্থাপনা, প্রাণিসম্পদের বাণিজ্যিকীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান এবং সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রাণিসম্পদের বিস্তৃতি আজ গ্রাম থেকে শহরে। লাখো শিক্ষিত তরুণ ও উদ্যমী মানুষের স্বপ্ন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে, আর তাঁদের শ্রমঘন বিনিয়োগ তাঁদের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অবলম্বন দিয়েছে। গ্রামে প্রায় প্রতিটি পরিবারে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন একটি পরম্পরা এবং পারিবারিক পুষ্টি ও আয়ের অন্যতম উৎস; লেখকের মতে প্রতিদিনই হাজারো তরুণ এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন।

এই বিবর্তনের ধারায় প্রথাগত পশুপালনে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাণিজ্যিক খামার ক্রমাগত বাড়ছে। লেখক উল্লেখ করেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে, মোবাইল নেটওয়ার্ক ফোরজি থেকে ফাইভজিতে যাচ্ছে, এবং অনেক খামারির হাতেই এখন স্মার্টফোন। পোলট্রি ও ডেইরি খামারের ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ এবং বিক্রি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। ইন্টারনেটে যুক্ত ক্যামেরার মাধ্যমে যেকোনো জায়গা থেকে গরু বা মুরগির আচরণ দেখা যায় এবং সমস্যা দেখলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বড় খামারিরা ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সেন্সরের মাধ্যমে বাড়ি বা অফিসে বসেই শেডের বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করছেন।

লেখকের মতে, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির জাত উন্নয়ন, লাগসই সম্প্রসারণ সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আইওটির মাধ্যমে এই খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে এবং উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়েছে। মানুষের জীবনমান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে শখের পোষা পশুপাখি পালনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাংলাপিডিয়ার প্রাণিসম্পদ ভুক্তিতে সরকারি দিক থেকে একই ভিত্তিগুলোর কথা আছে: ভেটেরিনারি স্বাস্থ্য ও সহায়ক সেবা, টিকার মতো ভেটেরিনারি জৈবপণ্য সরবরাহ, মানসম্মত উৎপাদন উপকরণ, সম্প্রসারণ সেবা এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা, সঙ্গে জিনগত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজনন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর। জ্ঞানকোষটি বলছে, বাংলাদেশে এ খাতের উন্নয়নের দায়িত্ব সরকার, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও বেসরকারি খাত মিলে বহন করে।

বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) একটি ডেইরি খামারের শেডে গাভী। ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) একটি ডেইরি খামারের শেডে গাভী। ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

পশুপাখি কত, দুধ-মাংস-ডিম কত


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব দিয়ে লেখক জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫১.৭১ লাখ গরু, ১৫.৩২ লাখ মহিষ, ৩৯.৮১ লাখ ভেড়া, ২৭২.৯১ লাখ ছাগল এবং ৪ হাজার ৬৬.৫২ লাখ হাঁস-মুরগি পালিত হচ্ছে। অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ সালের সারসংক্ষেপে একই সংখ্যা আছে; সেখানে হাঁস-মুরগিকে ভাগ করে ৩ হাজার ৩৬০.৭০ লাখ মুরগি ও ৭০৫.৮২ লাখ হাঁস দেখানো হয়েছে। রোমন্থক প্রাণী (গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল) মিলিয়ে ৫৭৯.৭৩ লাখ এবং সব গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মিলিয়ে ৪ হাজার ৬৪৬.২৫ লাখ। দশ বছর আগে, ২০১৫-১৬ সালে, একই সারণিতে গরু ছিল ২৩৭.৮৫ লাখ, ছাগল ২৫৭.৬৬ লাখ এবং হাঁস-মুরগি ৩ হাজার ২০৬.৩৩ লাখ।

পশুর সংখ্যার চেয়ে উৎপাদন বেড়েছে দ্রুত। লেখক জানান, স্বাধীনতার পর ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদন ছিল ১০ লাখ মেট্রিক টন, মাংস ৫ লাখ মেট্রিক টন এবং ডিম ১৫০ কোটি। অসংখ্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তার বিনিয়োগ ও প্রচেষ্টা এবং প্রাণিসম্পদের বহুমাত্রিক আধুনিক সেবা সম্প্রসারণের ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ মেট্রিক টন দুধ, ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন মাংস এবং ২ হাজার ৪৪০ কোটি ডিম। অধিদপ্তরের সারণিতে ওই বছরের দুধ ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টন এবং ডিম ২ হাজার ৪৪০.৬৫ কোটি। সারণিতে এটাও দেখা যায় যে উৎপাদন সব সময় সরল রেখায় বাড়েনি: মাংস ২০১৫-১৬ সালে ছিল ৬১.৫২ লাখ টন, ২০২১-২২ সালে ৯২.৬৫ লাখ টনে ওঠে, ২০২২-২৩ সালে কমে ৮৭.১০ লাখ টন হয়, ২০২৩-২৪ সালে আবার ৯২.২৫ লাখ টন এবং ২০২৪-২৫ সালে ৮৯.৫৪ লাখ টন।

অধিদপ্তর উৎপাদনকে চাহিদার পাশেও রাখে। ২০২৪-২৫ সালের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, মাথাপিছু দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার ধরে দুধের চাহিদা ১৬২.৩৩ লাখ মেট্রিক টন, উৎপাদন ১৫৫.৩৮ লাখ মেট্রিক টন, আর প্রাপ্যতা মাথাপিছু দৈনিক ২৩৯.২৯ মিলিলিটার। মাথাপিছু দৈনিক ১২০ গ্রাম ধরে মাংসের চাহিদা ৭৭.৯২ লাখ মেট্রিক টন, উৎপাদন ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন, প্রাপ্যতা দৈনিক ১৩৭.৯০ গ্রাম। মাথাপিছু বছরে ১০৪টি ধরে ডিমের চাহিদা ১ হাজার ৮৫০.১৬ কোটি, উৎপাদন ২ হাজার ৪৪০.৬৫ কোটি, প্রাপ্যতা মাথাপিছু বছরে ১৩৭.১৯টি।

এই সারণি লেখকের মূল্যায়নের সঙ্গে মেলে: দেশ মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দুধেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এসেছে, যদিও দুধের উৎপাদন অধিদপ্তরের চাহিদার হিসাবের চেয়ে এখনো কিছুটা কম। লেখকের আশা, অল্প সময়েই দেশ দুধেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে; তাঁর মতে প্রাণিজ পণ্যের এই উৎপাদন দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, প্রোটিনের চাহিদাপূরণ ও খাদ্য ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে।

কোরবানির পশু, ঈদের ব্যবসা ও চামড়া


লেখক মনে করিয়ে দেন, একসময় কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে পার্শ্ববর্তী দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সেই চিত্র আর নেই। বিগত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দেশীয় উৎস থেকে এই চাহিদা শতভাগ পূরণ করেও পশু উদ্বৃত্ত থাকছে; আমদানিনির্ভরতা থেকে বাংলাদেশ গবাদিপশু উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক নানা মৌসুমি ব্যবসা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে, এবং লেখকের মতে এই ব্যবসায় লেনদেন হওয়া অর্থের সিংহভাগ সচ্ছল শ্রেণি থেকে প্রান্তিক মানুষের হাতে যায়।

২০২৫ সালের ঈদের জন্য অধিদপ্তরের হিসাব এর মাত্রা দেখায়। ২০২৫ সালের ৪ মে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, অধিদপ্তরের মূল্যায়নে কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশু ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি: ৫৬ লাখ ২ হাজার ৯০৫টি গরু ও মহিষ, ৬৮ লাখ ৩৮ হাজার ৯২০টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৫১২টি অন্যান্য পশু। প্রায় ২০ লাখ ৬৮ হাজার ১৩৫টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে ধারণা করা হয়, এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, কোরবানির পশু আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই।

দেশের অন্যতম রপ্তানিপণ্য চামড়ার বড় জোগানও আসে কোরবানি থেকে। লেখক ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য উদ্ধৃত করে জানান, বছরে প্রায় ৩০ কোটি বর্গফুট চামড়ার মধ্যে ২০ কোটি বর্গফুট রপ্তানি হয়, যার রপ্তানি আয় প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি লেখেন, দেশের ভেতরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকার। তবে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখন জোর দাবি, বলেন লেখক।

চামড়া শিল্প কোরবানির সঙ্গে কতটা জড়িত, বাংলাপিডিয়া তা বর্ণনা করেছে। দেশের কাঁচা চামড়ার প্রায় ৪০ শতাংশ আসে ঈদুল আজহায় জবাই হওয়া পশু থেকে; বাকিটা আসে বিয়ে, অন্যান্য উৎসব ও প্রতিদিনের মাংসের চাহিদা থেকে। ১৯৭০-এর দশক থেকে এ শিল্প বড় পরিসরে গড়ে ওঠে। জ্ঞানকোষটি কুষ্টিয়ার কালো ছাগলের চামড়াকে এর সূক্ষ্ম দানা ও টান সহ্য করার ক্ষমতার জন্য আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে; দেশীয় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল তাই মাংসের বাজারের মতো চামড়া শিল্পের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদুল আজহার আগে বিক্রির জন্য ঢাকায় আনা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। ছবি: Ragib Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঈদুল আজহার আগে বিক্রির জন্য ঢাকায় আনা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। ছবি: Ragib Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

পোলট্রি: কর্মসংস্থানে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত


লেখক জানান, পোলট্রি শিল্প এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানের খাত, যেখানে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। দেশে নিবন্ধিত ৮৫ হাজার ২২৭টি বাণিজ্যিক এবং প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার প্রান্তিক পোলট্রি খামার আছে, এবং প্রতিদিন গড়ে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে, যাকে লেখক নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য বলেছেন। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর জানায়, প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ঘোষণার জন্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টাও একই সংখ্যাগুলো দেন।

বাণিজ্যিক পোলট্রি কেন গ্রামের হাঁস-মুরগির চেয়ে এত আলাদা, বাংলাপিডিয়া তা ব্যাখ্যা করে। দেশি মুরগির মাংস ও ডিমের উৎপাদন তুলনামূলক কম, তাই ছোট-বড় খামারগুলো হোয়াইট লেগহর্ন, রোড আইল্যান্ড রেড ও প্লিমাউথ রকের মতো উন্নত জাতের দিকে গেছে, যেগুলো দেশি মুরগির চেয়ে বড় হয়; একটি হোয়াইট লেগহর্ন মুরগি বছরে প্রায় ২৩০টি ডিম দিতে পারে। কোয়েল পালনও জনপ্রিয় হয়েছে। গৃহপালিত মুরগির পূর্বপুরুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনমোরগ (রেড জাঙ্গল ফাউল), যাকে সম্ভবত চার হাজার বছরেরও আগে পোষ মানানো হয়; গৃহপালিত হাঁসের পূর্বপুরুষ বুনো মেটে হাঁস (ম্যালার্ড)।

খাদ্যের প্রশ্নও আলোচনায় ছিল। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ইউএনবি জানায়, সপ্তাহের একটি সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা পোলট্রি খাতের আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেন, বিশেষ করে পোলট্রি খাদ্যে ব্যবহৃত আমদানি করা ভুট্টা ও সয়াবিনের ক্ষেত্রে, এবং বলেন সমন্বিত উদ্যোগে এসব ফসল দেশের কৃষিতে যুক্ত করতে হবে। তিনি ক্ষুদ্র পোলট্রি খামারিদের সমস্যার কথাও তুলে ধরেন এবং বলেন, ছোট খামার টিকিয়ে রাখতে খাদ্যসংকটের সমাধান জরুরি।

প্রথম জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ


লেখক লেখেন, প্রাণিসম্পদের এসব অর্জন টেকসই ও আরও সমৃদ্ধ করতে মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্যোগে "দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদে হবে উন্নতি" প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো "জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫" পালিত হয়। কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একযোগে সারা দেশে সপ্তাহটি পালিত হয় এবং ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর শেষ হয়। দ্য ডেইলি স্টার ২৪ নভেম্বর জানায়, বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে সপ্তাহের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়; এতে ছিল সচেতনতামূলক প্রচার, র‍্যালি, সেমিনার, কর্মশালা, প্রদর্শনী ও প্রাণিসম্পদ পুরস্কার অনুষ্ঠান। জাতীয় প্রাণিসম্পদ পুরস্কার নীতিমালার আওতায় পাঁচটি শ্রেণিতে ১৫ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেওয়ার কথা, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানের জন্য স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক।

লেখকের ভাষায়, এবারের আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার, রোগ প্রতিরোধ, প্রাণীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সেবা, গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে খামারি ও উদ্যোক্তাদের সচেতন করা; অর্থাৎ নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন এবং এই খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা। সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা বলেন, সপ্তাহটি আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইউএনবি জানায়, ২৭ নভেম্বর ঢাকার শেরেবাংলা নগরে সপ্তাহ উপলক্ষে একটি র‍্যালি হয়, এরপর আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলা মাঠে "প্রাণিসম্পদ খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়" শীর্ষক সেমিনার হয়। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব; তিনি বলেন, সপ্তাহটির মূল লক্ষ্য জনসচেতনতা বাড়ানো এবং নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা। উপদেষ্টা বলেন, দেশীয় জাতের প্রাণী সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও উৎপাদনের মাধ্যমে সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কাজ করছে, এবং তিনি বিদেশ থেকে অনিরাপদ প্রাণিজ পণ্য আমদানি কমানোর আহ্বান জানান। লেখকের উপসংহার, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাত তার চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠবে।

দেশীয় যেসব জাত এখনো টিকে আছে


লেখকের যুক্তি, দেশীয় প্রাণিসম্পদ শুধু উৎপাদনশীলতার বিষয় নয়; গ্রামীণ খাদ্যচাহিদা, সংরক্ষণ সুবিধা, নারীর কর্মসংস্থান ও কৃষির ঐতিহ্যের সঙ্গে তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে এখন শিল্প হিসেবে দেখা হলেও উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এখনো গ্রামের সাধারণ মানুষের হাতে। শিল্পায়ন প্রয়োজন, তবে দেশীয় প্রজাতির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, বিশেষ করে সংকর জাত তৈরির সময় দেশীয় জাতের মৌলিক বৈশিষ্ট্য যেন হারিয়ে না যায়। দেশীয় মাছ, মাংস ও প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ, যা রক্ষা করা সময়ের দাবি; লেখকের মতে আশার কথা, পৃথিবীর অনেক দেশে যেসব প্রাণিসম্পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তার অনেকগুলো এ দেশে এখনো টিকে আছে।

ক্রেতারাও তা চান। লেখক লেখেন, মাংস, ডিম ও দুধ কেনার সময় উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সবার একটাই চাওয়া, দেশীয় প্রাণীর পণ্য; অথচ বাজারে তা এখন দুর্লভ। দুই দশক আগেও মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় সবটুকু আসত দেশি গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, হাঁস ও মুরগি থেকে; সময়ের সঙ্গে বাজারে এগুলোর প্রাপ্যতা ক্রমে কমে যাচ্ছে।

বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গরুর জাত প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে দীর্ঘ প্রাকৃতিক নির্বাচনে কয়েকটি উন্নত দেশি ধরন তৈরি হয়েছে: পাবনা গরু, রেড চিটাগাং, মুন্সীগঞ্জের গরু ও নর্থ বেঙ্গল গ্রে, যেগুলোর উৎপাদনক্ষমতা সাধারণ দেশি গরুর চেয়ে বেশি। দেশের বেশির ভাগ গরু নির্দিষ্ট জাতহীন দেশি জেবু, অর্থাৎ কুঁজওয়ালা বহুমুখী প্রাণী; এরা রোগ ও পরজীবী প্রতিরোধী, নিম্নমানের খড়-ঘাস ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে এবং কঠিন পরিবেশে মানিয়ে নেয়। উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে দেশি গরুকে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহীওয়াল, হারিয়ানা, সিন্ধি ও অন্যান্য জাতের সঙ্গে সংকরায়ণ করা হয়েছে। একটি পাবনা গাভী দিনে ৩ থেকে ৫ লিটার দুধ দিতে পারে।

কী হারানোর ঝুঁকি আছে, রেড চিটাগাং গরু তার উদাহরণ। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ও অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির বিজ্ঞানীদের ২০২১ সালের একটি পর্যালোচনা, যা ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাসটেইনেবল ফুড সিস্টেমস সাময়িকীতে প্রকাশিত, এদের ছোট আকারের, প্রধানত লালচে রঙের প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করেছে: প্রাপ্তবয়স্ক ষাঁড়ের ওজন প্রায় ৩৪২ কেজি, গাভীর প্রায় ১৮০ কেজি; ২২৮ দিনের দুগ্ধকালে গড়ে ৬১৮ লিটার দুধ, যাতে চর্বি ৪.৮ শতাংশ ও আমিষ ৩.৮ শতাংশ; বিএলআরআইয়ের পালে গড় ছিল ৮৩৮ লিটার। পর্যালোচনায় উদ্ধৃত গবেষণায় রেড চিটাগাং গাভীর প্রায় ২৮ শতাংশের মধ্যে সুপ্ত ওলান প্রদাহ (সাবক্লিনিক্যাল ম্যাস্টাইটিস) পাওয়া যায়, সংকর জাতে যা ৫৬ শতাংশ, এবং অন্ত্র ও রক্তের পরজীবীও এদের মধ্যে কম। ২০১৮ সালের এক জরিপে চট্টগ্রামের ছয়টি এলাকার গরুর ১৫ শতাংশ ছিল এই ধরনের। লেখকেরা হলস্টেইনসহ অন্যান্য গরুর সঙ্গে নির্বিচার সংকরায়ণকে প্রধান হুমকি বলেছেন এবং জানিয়েছেন, ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিএলআরআই এই জাতের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে একটি সরকারি প্রকল্প পরিচালনা করে।

ছোট রোমন্থক প্রাণীর মধ্যে দেশি জাতেরই আধিপত্য। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশের ছাগলের ৯০ শতাংশের বেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল: ছোট আকারের কালো ছাগল, প্রাপ্তবয়স্ক পাঁঠার ওজন ১৬ থেকে ১৮ কেজি ও ছাগীর ১২ থেকে ১৪ কেজি; প্রায় ১২ মাস বয়সে প্রথম বাচ্চা দেয় এবং সাধারণত বছরে দুবার বা দুই বছরে তিনবার বাচ্চা দেয়; এর মাংস নরম ও সুস্বাদু বলে কদর আছে, আর চামড়ার চাহিদা দেশে-বিদেশে। গ্রামে বেশির ভাগ ছাগল পালন করেন নারী ও শিশুরা। দেশি ভেড়া তিন ধরনের: যমুনা অববাহিকা, বরেন্দ্র ও উপকূলীয়; সবগুলোই নিম্নমানের খড়-ঘাস ভালোভাবে কাজে লাগায়, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মানিয়ে নেয় এবং সাধারণ রোগ সহ্য করতে পারে। ১৯৮৪ সালে সাভারে প্রতিষ্ঠিত বিএলআরআই পাবনা গরু, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, মহিষ, গয়াল এবং আধা-মুক্তভাবে চরে খাওয়া গ্রামীণ হাঁস-মুরগির নির্বাচনী প্রজনন কর্মসূচি চালায়।

কৃত্রিম প্রজনন ও রোগ নিয়ন্ত্রণ


দেশি গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচির বড় ভূমিকার কথা লিখেছেন লেখক। উন্নত জাতের ষাঁড়ের সিমেন দিয়ে দেশি গাভীর কৃত্রিম প্রজনন করা হচ্ছে, এবং এ জন্য প্রতিবছর প্রায় ৪২ লাখ ডোজ সিমেন সরবরাহ করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ায় দেশি গবাদিপশুর জিনগত মান ও উৎপাদনক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে, বলেন তিনি।

লেখকের দেওয়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোগ নিয়ন্ত্রণেও সরকার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে: লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) প্রতিরোধে ১৭ লাখ ডোজ টিকা, ক্ষুরারোগ (এফএমডি) নির্মূলে নির্দিষ্ট অঞ্চলে জোনিং কার্যক্রম এবং ছাগলের পিপিআর রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬ কোটি ডোজ টিকা প্রয়োগ। সপ্তাহের আগের সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টাও এই তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেন।

বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ) জানায়, লাম্পি স্কিন ডিজিজ গরু ও মহিষের একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যার কারণ ক্যাপরিপক্স ভাইরাস। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এটি হুমকি নয়, তবে জ্বর, চামড়ায় শক্ত গুটি, দুধ কমে যাওয়া, ওজন কমা, বন্ধ্যত্ব ও চামড়ার ক্ষতির মাধ্যমে বড় লোকসান ঘটায়; প্রধানত কামড়ানো মাছি, মশা ও আঁটুলির মতো রক্তচোষা পোকা এটি ছড়ায়। ২০২১ সালে ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হাসিব ও সহকর্মীদের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ এই রোগমুক্ত ছিল; প্রথম সংক্রমণের খবর চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়া উপজেলা থেকে তৎকালীন ওআইই (বর্তমানে ডব্লিউওএএইচ)-কে জানানো হয়। ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১৯টি বাণিজ্যিক খামারের ৩ হাজার ৩২৭টি গরুর ওপর তাঁদের জরিপে প্রায় ১০ শতাংশের মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা যায়, এবং দেশি গরুর চেয়ে সংকর গরু বেশি আক্রান্ত হয়েছিল; তবে লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, নমুনার বেশির ভাগই ছিল সংকর গরু।

ডব্লিউওএএইচের বর্ণনায় ক্ষুরারোগ গরু, শূকর, ভেড়া, ছাগল ও অন্যান্য দুই খুরওয়ালা প্রাণীর অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। এতে জ্বর হয়, মুখ, জিহ্বা, বাঁট ও পায়ে ফোসকা পড়ে, দুধ অনেক কমে যায়, আর বাছুরের মধ্যে মৃত্যুহার ২০ শতাংশ বা তার বেশি হতে পারে। এই ভাইরাসের সাতটি সেরোটাইপ আছে এবং প্রতিটির জন্য আলাদা টিকা লাগে। ডব্লিউওএএইচ পুরো দেশ বা দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চলকে ক্ষুরারোগমুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে; এ কারণেই জোনিং রোগ নির্মূলের পথে একটি ধাপ।

পিপিআর, যা অনেক সময় ছাগলের প্লেগ নামে পরিচিত, রিন্ডারপেস্ট ভাইরাসের ঘনিষ্ঠ একটি মরবিলিভাইরাসের কারণে হয় এবং ছাগল ও ভেড়াকে আক্রান্ত করে। এতে তীব্র জ্বর, মুখে যন্ত্রণাদায়ক ঘা, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া হয়, এবং আক্রান্ত প্রাণীর অনেকগুলো মারা যায়। কার্যকর টিকা আছে, যা আজীবন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দিতে পারে; ডব্লিউওএএইচ ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে রোগটি নির্মূলের লক্ষ্য নিয়েছে। পশুর টিকার সময়সূচি জানতে খামারিদের উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় হাতে গাভীর দুধ দোয়াচ্ছেন এক খামারি। ছবি: Reaid Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় হাতে গাভীর দুধ দোয়াচ্ছেন এক খামারি। ছবি: Reaid Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আমিষ, পুষ্টি এবং দুধ-মাংস-ডিমের দাম


মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমসহ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিলেও দেশের দেড় থেকে ২ কোটি মানুষ এখনো অপুষ্টিতে ভুগছে এবং এই সংখ্যা বাড়ছে, লিখেছেন লেখক। জাতিসংঘের বরাতে তিনি জানান, বাংলাদেশের অন্তত ১০ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে; তাঁর হিসাবে জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরলে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ ১ কোটি ৮০ লাখ, আর ২০ কোটি ধরলে ২ কোটি, যার বড় অংশ নারী ও শিশু।

বিশেষজ্ঞদের মত উদ্ধৃত করে লেখক জানান, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৮ থেকে ১ গ্রাম প্রোটিন দরকার; অর্থাৎ ৭৫ কেজি ওজনের একজন মানুষের প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭৫ গ্রাম প্রোটিন খেতে হবে। মাছ বা মাংসের ধরনভেদে প্রতি ১০০ গ্রামে ১৯ থেকে ২৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে; একটি মাঝারি আকারের ডিমে আকারভেদে ছয় থেকে আট গ্রাম; আর প্রতি ১০০ মিলিলিটার দুধে ৪ থেকে ৫ গ্রাম।

লেখক প্রাণিজ উৎসের প্রোটিনকে "ফার্স্ট ক্লাস" প্রোটিন বলেছেন, যাতে সব ধরনের অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে, আর উদ্ভিজ্জ প্রোটিনকে "সেকেন্ড ক্লাস", যাতে এক বা একাধিক অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের ঘাটতি থাকে। তাঁর মতে, বাড়ন্ত শিশুর দেহ গঠনে প্রাণিজ প্রোটিনের গুরুত্ব অপরিসীম; দেহ গঠনে যা যা দরকার তার সবই দুধে আছে, আর ডিম ও মাংসও ভূমিকা রাখে। বয়স, ওজন, স্বাস্থ্য ও গর্ভাবস্থাভেদে প্রোটিনের চাহিদা আলাদা হয়, তাই নিজের বা শিশুর খাদ্যতালিকা ঠিক করতে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

লেখক লক্ষ করেন, প্রাণিজ খাদ্য গ্রহণের হার বাড়ছে, কিন্তু তা সুষমভাবে বাড়ছে কি না এবং যাঁদের পুষ্টি দরকার তাঁরা প্রাণিজ আমিষের মাধ্যমে তা পাচ্ছেন কি না, সেদিকে নজর রাখতে হবে। অধিদপ্তরের প্রাপ্যতার হিসাবগুলো জাতীয় মাথাপিছু গড়; ধনী ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে দুধ, মাংস ও ডিম কীভাবে ভাগ হচ্ছে, তা এতে বোঝা যায় না। লেখকের উপসংহার, দুধ, ডিম ও মাংসের দাম দেশের দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে না পারলে বাংলাদেশ কখনোই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না, সুস্থ ও মেধাবী জাতিও গড়ে উঠবে না।

ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫), দ্য ডেইলি স্টার, ইউএনবি, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাসটেইনেবল ফুড সিস্টেমস (দাস ও অন্যান্য, ২০২১), ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স (হাসিব ও অন্যান্য, ২০২১), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)