নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ক্রমেই দেশি মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। হাওর, নদী, খাল-বিলে জাল ফেলে দিন শেষে প্রায় খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা, আর লোকসানে টিকতে না পেরে অনেকে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিনমজুরি বা খেতমজুরিতে যাচ্ছেন।
গবেষণা সংস্থা বারসিকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ছয় দশক আগেও নেত্রকোনার হাওরে অন্তত ১১৫ প্রজাতির দেশি মাছ ছিল। এর মধ্যে ২৯ প্রজাতি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে, এখন দেখা মেলে মাত্র ৬১ প্রজাতির। অবশিষ্টগুলোর মধ্যে ৪৩টি বিপন্ন, ১১টি চরম বিপন্ন এবং ১২টি তীব্র সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে।
মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী ও কলমাকান্দার হাওরে জেলেদের দুর্দশা চোখে পড়ে। মদনের প্রবীণ জেলে ওয়াহাব মিয়া (৭০) ছয় দশক ধরে মাছ ধরছেন; তিনি এমন সংকট আগে দেখেননি। জেলেরা বলছেন, মাছ পড়ুক বা না পড়ুক, নৌকা, জ্বালানি তেল ও জাল মেরামতের খরচ রোজই লাগে, ফলে জমানো পুঁজি হারিয়ে অনেকে দেনায় পড়ছেন।
মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বিচার আহরণ, বর্ষায় ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা ধ্বংস, ‘চায়না দুয়ারী’ ও মিহি ফাঁসের কারেন্ট জালের ব্যবহার, বিষ, গ্যাস ট্যাবলেট ও বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ ধরা এবং কৃষিজমির কীটনাশক ও রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানিতে হাওরে মেশা এই সংকটের প্রধান কারণ। সরকারি নথিতে জেলায় একসময় ১৩৫টি হাওর, ৮২৪টি বিল, ১১৫টি নদী ও ৪৩৯টি প্রাকৃতিক খালের উল্লেখ থাকলেও পলি জমা, দখল ও জলাশয় সংকুচিত হওয়ায় মাছের আবাস নষ্ট হয়েছে।
দেশি মাছের জোগান কমায় স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও লোকসানে পড়েছেন; বাজারের চাহিদা মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে খামারের চাষের মাছের ওপর। স্থানীয় পরিবেশকর্মী অহিদুর রহমানের মতে, প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জাল ও ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা এখনই বন্ধ না হলে বাকি প্রজাতিগুলোও হারিয়ে যাবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হারুন-অর-রশিদ জানান, হাওরে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম তৈরি এখন সময়ের দাবি। মদন ও খালিয়াজুরীতে বর্তমানে কোনো সরকারি মৎস্য অভয়াশ্রম নেই; নতুন অভয়াশ্রমের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অবৈধ জাল বন্ধ ও আবাসস্থল রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দরকার বলেও তিনি মনে করেন।
প্রতিবেদন: কৃষি সময়ের নেত্রকোনা সংবাদদাতা।
ছবি: Redmin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: কৃষি সময়




মন্তব্য
(০)