একজন কৃষক কোন জাতের ধান লাগালেন, কত টাকার সার কিনলেন, কবে সেচ দিলেন, ফলন কত হলো, ধান বিক্রি করলেন কত দামে। প্রতিটি মৌসুমে দেশের লাখো খেতে এমন অসংখ্য তথ্য তৈরি হয়, আর বেশির ভাগই হারিয়ে যায় কৃষকের স্মৃতিতে বা কোনো খাতার পাতায়। সেই হারিয়ে যাওয়া তথ্যকে গবেষণার সম্পদে পরিণত করতেই একসঙ্গে কাজ শুরু করেছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ) এবং শাইখ সিরাজ ইনিশিয়েটিভ (এসএসআই)। বাংলাদেশের কৃষি ও সামাজিক গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করতে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও গবেষণায় ব্যবহারের লক্ষ্যে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দুই প্রতিষ্ঠানের এই যৌথ উদ্যোগের যাত্রা শুরুর কথা জানানো হয়েছে।
কী থাকবে ডেটাব্যাংকে
এই উদ্যোগের আওতায় কৃষকের কাছ থেকে সংগৃহীত মাঠপর্যায়ের তথ্য, কৃষি ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য একটি সুসংগঠিত ও ব্যবহারযোগ্য ডেটাব্যাংকে সংরক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংগৃহীত তথ্য গবেষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের গবেষণা পরিচালনা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।
ডেটাব্যাংক কথাটা অনেকের কাছে প্রযুক্তির জটিল কোনো বিষয় মনে হতে পারে। আসলে এর মূল ভাবনা পরিচিত। একটি গ্রন্থাগারে যেমন বই বিষয় ধরে সাজিয়ে রাখা হয়, যাতে দরকারি বইটি খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি ডেটাব্যাংকে তথ্য সাজিয়ে রাখা হয় নির্দিষ্ট নিয়মে। কোন এলাকার তথ্য, কোন মৌসুমের, কোন ফসলের, কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকে। ফলে একজন গবেষক বছরের পর বছর ধরে সংগৃহীত তথ্য একই কাঠামোয় পাশাপাশি রেখে তুলনা করতে পারেন।
'সুসংগঠিত ও ব্যবহারযোগ্য' শব্দ দুটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে নানা প্রকল্প, সংস্থা আর গবেষণায় বিপুল তথ্য সংগৃহীত হয়, কিন্তু সেগুলো প্রায়ই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, ভিন্ন ভিন্ন ছকে, কখনো কাগজের ফাইলে। প্রকল্প শেষ হলে সেই তথ্য আর খুঁজে পাওয়া যায় না। একটি কেন্দ্রীয়, সুশৃঙ্খল তথ্যভান্ডার সেই অপচয় কমাতে পারে।

এখানে 'ডেটা' শব্দটিও একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। বাংলায় একে তথ্য বা উপাত্ত বলা হয়। কৃষকের জমির পরিমাণ, ফসলের নাম, খরচের অঙ্ক, ফলনের হিসাব, এমনকি পরিবারের সদস্যসংখ্যা, এসবই উপাত্ত। আলাদা আলাদাভাবে এগুলো সাধারণ কিছু সংখ্যা বা শব্দ। কিন্তু একই নিয়মে হাজারো কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে পাশাপাশি সাজালে এগুলো থেকেই বেরিয়ে আসে প্রবণতা, তুলনা আর কারণের সূত্র।
কৃষকের মাঠের ছোট্ট তথ্য, বড় সিদ্ধান্তের ভিত্তি
কৃষকের মাঠ থেকে সংগ্রহ করা একটি ছোট তথ্যও কখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বা সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। সেই তথ্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংগ্রহ, যাচাই, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হলে দেশের কৃষির বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এবং কৃষকের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার পথ খুলতে পারে।
একটা উদাহরণ ভাবা যাক। কোনো এলাকায় পরপর কয়েক মৌসুম কৃষকেরা জানাচ্ছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁদের ধানখেতে একই রোগ দেখা দিচ্ছে। একজন কৃষকের অভিজ্ঞতা হয়তো কাকতালীয় মনে হবে। কিন্তু শত শত কৃষকের তথ্য একসঙ্গে সাজালে একটি ধরন বা প্যাটার্ন চোখে পড়ে: কোন আবহাওয়ায়, কোন জাতে, কোন চাষপদ্ধতিতে রোগটি বেশি হচ্ছে। সেই ধরন থেকেই গবেষক প্রশ্ন তৈরি করেন, আর সম্প্রসারণকর্মী আগাম সতর্কতা দিতে পারেন। তথ্য এভাবেই অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানে রূপ দেয়।
তবে শর্ত একটাই: তথ্য হতে হবে নির্ভরযোগ্য। এ কারণেই উদ্যোগটির বর্ণনায় সংগ্রহের পাশাপাশি 'যাচাই' শব্দটি এসেছে। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড়ানো গবেষণা ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হয় কৃষককেই।
সংখ্যার পেছনে মানুষ
শাইখ সিরাজ ইনিশিয়েটিভের কাছে কৃষি তথ্য শুধু সংখ্যা বা পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একজন কৃষকের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা; রয়েছে একটি পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা এবং বাংলাদেশের কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি উদ্যোগটির নামের সঙ্গে যুক্ত মানুষটির দীর্ঘ কাজের ধারাবাহিকতা বলেই মনে হয়। শাইখ সিরাজ চার দশকের বেশি সময় ধরে টেলিভিশনের পর্দায় কৃষকের কথা তুলে ধরছেন। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'মাটি ও মানুষ', আর ২০০৪ সাল থেকে চ্যানেল আইয়ের 'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ' অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দেশের নানা প্রান্তের কৃষকের মাঠে গেছেন, তাঁদের সমস্যা আর সাফল্যের কথা শুনেছেন। উন্নয়ন সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদক এবং ২০১৮ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ে সাংবাদিকতার জন্য ২০০৯ সালে তিনি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এ এইচ বুর্মা অ্যাওয়ার্ডও পান। বাজেটের আগে কৃষকের দাবি-দাওয়া নিয়ে 'কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট' শিরোনামে তাঁর আয়োজিত সংলাপগুলোতে বছরের পর বছর দেশের নানা অঞ্চলের কৃষক নিজেদের সমস্যার কথা বলেছেন। শাইখ সিরাজ ইনিশিয়েটিভের ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় দেওয়া হয়েছে কৃষি তথ্যকে খাদ্য নিরাপত্তায় রূপান্তরের লক্ষ্য দিয়ে।
টেলিভিশনের ক্যামেরা যে অভিজ্ঞতাকে দর্শকের সামনে আনে, ডেটাব্যাংক সেই অভিজ্ঞতাকেই স্থায়ী, তুলনাযোগ্য ও বিশ্লেষণযোগ্য রূপে ধরে রাখতে পারে। একটি প্রতিবেদন কয়েক দিন পর পুরোনো হয়ে যায়, কিন্তু সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষিত তথ্য বছরের পর বছর গবেষণার কাজে লাগে।
বিশ্ববিদ্যালয় আর মাঠের মধ্যে সেতু
এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও একাডেমিক গবেষণার মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ তৈরি করা। নির্ভরযোগ্য কৃষি ও সামাজিক তথ্য গবেষকদের হাতের নাগালে আনার মাধ্যমে গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্যের ব্যবহার আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত, দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এর ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়টির চারটি স্কুল রয়েছে: ব্যবসায় ও অর্থনীতি; প্রকৌশল ও ভৌত বিজ্ঞান; মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান; এবং স্বাস্থ্য ও জীববিজ্ঞান। উন্নয়ন, পরিবেশ ও কৌশলগত গবেষণা নিয়ে কাজ করা ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানও আছে এখানে। অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের গবেষকদের জন্য মাঠপর্যায়ের কৃষি ও সামাজিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
২০২০ সালের হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতেন। ২০১৭ সালে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় এনএসইউ জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউট, যাকে দেশের প্রথম জিনোম গবেষণা ইনস্টিটিউট হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জিন নিয়ে গবেষণা থেকে শুরু করে উন্নয়ন ও পরিবেশ গবেষণা পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে কাজ করা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মাঠের কৃষি তথ্যের সংযোগ গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে গবেষণার প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত, নির্ভুল ও হালনাগাদ ডেটার অভাব। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও সামাজিক বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট গবেষকেরা নির্ভরযোগ্য ডেটা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। ফেসবুকভিত্তিক সংবাদ পাতা ডেইলি এনএসইউও এই সহযোগিতাকে কৃষি গবেষণা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এসএসআইয়ের সঙ্গে এনএসইউর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সাধারণত নিজেরাই ছোট পরিসরে জরিপ চালিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। এতে সময়, অর্থ আর লোকবল লাগে অনেক, আর নমুনার আকারও থাকে সীমিত। অন্যদিকে যাঁরা বছরের পর বছর মাঠে কাজ করেন, তাঁদের হাতে থাকে কৃষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আর মাঠের বাস্তব জ্ঞান। এই দুই শক্তি এক জায়গায় এলে গবেষণার প্রশ্ন যেমন মাঠের বাস্তবতা থেকে উঠে আসতে পারে, তেমনি গবেষণার ফলও ফিরে যেতে পারে মাঠে।
তথ্যের ঘাটতি: পুরোনো এক সমস্যা
বাংলাদেশে কৃষি তথ্যের ঘাটতি নতুন আলোচনা নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি শুমারি ২০১৯ অনুযায়ী দেশে কৃষিনির্ভর খানার সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখ, যা ২০০৮ সালের প্রায় দেড় কোটির চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। কিন্তু দ্য ডেইলি স্টারের এক বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছিল, শুমারিতে খানার সংখ্যা এসেছে, আলাদা করে কৃষকের সংখ্যা নয়; ফলে নীতি প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যে একটি ফাঁক থেকে যায়।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত ওই শুমারির চূড়ান্ত ফলাফলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে আসে। দেশে কৃষিশ্রমিক খানার সংখ্যা ৯২ লাখ। নিট আবাদযোগ্য জমি ১ কোটি ৮৬ লাখ একর, যা ২০০৮ সালের ১ কোটি ৯০ লাখ একরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বা ৪ লাখ ১৬ হাজার একর কম। অর্থাৎ কৃষিনির্ভর পরিবার বাড়ছে, অথচ চাষের জমি কমছে; এই চাপ বোঝার জন্য খানাভিত্তিক তথ্যের চেয়ে বেশি কিছু দরকার।
একই প্রতিবেদনে জানানো হয়, শুমারিতে বাণিজ্যিক পোলট্রি খামার ও বাণিজ্যিক প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের তথ্যও আসেনি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আব্দুল বায়েস তখন মন্তব্য করেন, কৃষকের সংখ্যা জানার জন্য প্রশ্নপত্রে একটি প্রশ্ন যোগ করাই যথেষ্ট ছিল; আর বাণিজ্যিক উৎপাদনের তথ্য না থাকার ঘাটতিকে তিনি 'গ্রহণযোগ্য নয়' বলে উল্লেখ করেন। দেশের সবচেয়ে বড় কৃষি জরিপেই যখন এমন ফাঁক থাকে, তখন নিয়মিত, মাঠপর্যায়ের বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়।
কৃষি এখনো দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের খাত। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী দেশের কর্মজীবী মানুষের ৪৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে তথ্য হতে হবে বিস্তারিত, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য।
এই হারও স্থির নয়। ২০১৬-১৭ সালের জরিপে কৃষিতে নিয়োজিত মানুষের হার ছিল ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ; ২০২২ সালে তা বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, করোনা মহামারির সময় অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছিলেন। এমন ওঠানামা বোঝার জন্যও দরকার নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য।
আমদানির সিদ্ধান্তের উদাহরণটি ধরা যাক। বিবিএসের হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন প্রথমবারের মতো চার কোটি টন ছাড়িয়ে ৪ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছায়, আর সেই বছর কোনো চাল আমদানি হয়নি; আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার টন। উৎপাদনের হিসাব কয়েক লাখ টন এদিক-ওদিক হলেই আমদানির প্রয়োজন নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে। তথ্যের নির্ভুলতা তাই সরাসরি বাজার আর ভোক্তার পকেটের সঙ্গে জড়িত।
ফসলের উৎপাদন হিসাব নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিবিএসের হিসাবে একই ফসলের উৎপাদনে পার্থক্য থাকার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে একাধিকবার আলোচিত হয়েছে। উৎপাদনের হিসাব ঠিক না হলে আমদানির সিদ্ধান্ত, মজুতের পরিকল্পনা আর বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, সবকিছুতেই ভুলের ঝুঁকি বাড়ে। মাঠ থেকে সরাসরি সংগৃহীত, যাচাই করা তথ্য এ ধরনের অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও বিশ্বব্যাংক মিলে ২০১৯ সাল থেকে '৫০x২০৩০' নামে একটি উদ্যোগ চালাচ্ছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার ৫০টি নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে কৃষি তথ্যের ঘাটতি পূরণ করা। ওই উদ্যোগের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এসব দেশের সরকার কৃষিতে বিপুল বিনিয়োগ করে, কিন্তু অনেক সময় ভালো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই; এর ফল উৎপাদনশীলতায় ক্ষতি, কৃষকের আয়ে ঘাটতি এবং শেষ পর্যন্ত আরও ক্ষুধা ও দারিদ্র্য।
উদ্যোগটির কাজ তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত ভাগে সাজানো: তথ্য উৎপাদন, পদ্ধতি ও সরঞ্জাম তৈরি এবং তথ্যের ব্যবহার। দাতা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশের সম্পদ মিলিয়ে দশ বছরে এর খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, সেই তথ্য যাতে সত্যিই সিদ্ধান্তে কাজে লাগে, সেটাও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিসরে। এনএসইউ ও এসএসআইয়ের উদ্যোগের ঘোষিত লক্ষ্যেও সংগ্রহের সঙ্গে ব্যবহারের কথা একসঙ্গে এসেছে।
দেশে কৃষি তথ্য এখন আসে কোথা থেকে
বর্তমানে দেশের কৃষি তথ্যের প্রধান সরকারি উৎস বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ প্রকাশ করে, যেখানে ফসলের আবাদি জমি, উৎপাদন, ফলনসহ নানা হিসাব থাকে। প্রায় এক দশক পরপর হয় কৃষি শুমারি, যার সর্বশেষটি ২০১৯ সালের। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠকর্মীদের মাধ্যমে প্রতি মৌসুমে ফসলের আবাদ ও উৎপাদনের প্রাক্কলন করে।
প্রযুক্তির সুবাদে তথ্যের নতুন উৎসও তৈরি হয়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারে (১৬১২৩) প্রতিদিন কৃষকেরা ফোন করে ফসলের রোগ, সার বা বীজ নিয়ে পরামর্শ চান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাংলাদেশ কৃষি-আবহাওয়া তথ্য ব্যবস্থা (বামিস) আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে কৃষকের জন্য পরামর্শ দেয়। এসব উৎস থেকে যে তথ্য তৈরি হয়, সেগুলোও কৃষির গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য মূল্যবান।
তবে সরকারি পরিসংখ্যান মূলত বড় পরিসরের হিসাব দেয়: জেলা বা দেশজুড়ে মোট উৎপাদন, মোট জমি। একজন কৃষকের খরচ, ঝুঁকি, সিদ্ধান্ত আর অভিজ্ঞতার খুঁটিনাটি, যা গবেষণার জন্য জরুরি, তা অনেক সময় এসব হিসাবে ধরা পড়ে না। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সংগৃহীত মাঠপর্যায়ের তথ্য এখানেই সরকারি পরিসংখ্যানের পরিপূরক হতে পারে।
কোন প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে
মাঠপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য হাতে থাকলে গবেষকেরা কোন ধরনের প্রশ্ন নিয়ে কাজ করতে পারেন, তার কয়েকটি উদাহরণ ভাবা যায়। এগুলো ঘোষণার অংশ নয়, বরং এ ধরনের তথ্যভান্ডারের সম্ভাব্য ব্যবহারের দৃষ্টান্ত:
- জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো: লবণাক্ততা, খরা বা আগাম বন্যার মুখে কৃষক কোন জাত ও কোন কৌশল বেছে নিচ্ছেন, আর তাতে ফলন কেমন হচ্ছে।
- উৎপাদন খরচ: সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক আর যন্ত্রের পেছনে কৃষকের খরচ কীভাবে বদলাচ্ছে, আর ফসলের দামের সঙ্গে তার তুলনা কী বলে।
- বাজার ও দাম: মাঠে কৃষক যে দাম পান আর শহরের বাজারে ভোক্তা যে দাম দেন, তার ব্যবধান কোথায় তৈরি হয়।
- নারী ও কৃষি: খেতে, উঠানে আর গবাদিপশু পালনে নারীর শ্রম কতটা, আর সেই শ্রমের স্বীকৃতি কোথায়।
- প্রযুক্তি গ্রহণ: নতুন জাত, যন্ত্র বা ডিজিটাল পরামর্শ সেবা কোন কৃষক নিচ্ছেন, কোন কৃষক পিছিয়ে থাকছেন এবং কেন।
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার প্রতিটির জন্যই দরকার এমন তথ্য, যা এক মৌসুমের ছোট জরিপে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় বছরের পর বছর ধরে সুশৃঙ্খলভাবে সংগৃহীত তথ্যে।
মাঠের তথ্য থেকে বাস্তব পরিবর্তন
উদ্যোগটির মূল দর্শন হলো: মাঠের তথ্য থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তব পরিবর্তন।
এই শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ আলাদা গুরুত্ব বহন করে। প্রথম ধাপে মাঠের তথ্য: কৃষক কী করছেন, কী পাচ্ছেন, কোথায় আটকে যাচ্ছেন। দ্বিতীয় ধাপে জ্ঞান: গবেষক সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে কারণ আর সম্পর্ক খুঁজে বের করেন। তৃতীয় ধাপে সিদ্ধান্ত: নীতিনির্ধারক, প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তা সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেন। আর শেষ ধাপে বাস্তব পরিবর্তন, যা আবার ফিরে যায় কৃষকের মাঠে। কোনো একটি ধাপ দুর্বল হলে পুরো শৃঙ্খলটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ কথাটার অর্থও এখানে পরিষ্কার হয়। অনুমান বা ধারণার ওপর নয়, মাঠের প্রকৃত তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে নীতি তৈরি করা। কোন অঞ্চলে কোন ধরনের সহায়তা দরকার, কোন ফসলে প্রণোদনা দিলে কৃষক বেশি উপকৃত হবেন, কোথায় সেচ বা সংরক্ষণাগার সবচেয়ে জরুরি, এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্য ছাড়া আন্দাজেই দিতে হয়।
সামনের প্রশ্নগুলো
ঘোষণায় ডেটাব্যাংকটি কীভাবে পরিচালিত হবে, কোন কোন এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু হবে কিংবা কোন নিয়মে গবেষকেরা তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন, সেসব বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে এ ধরনের যেকোনো তথ্যভান্ডারের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশ্বজুড়েই গুরুত্ব পায়: তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি কতটা মানসম্মত, নিয়মিত হালনাগাদ হচ্ছে কি না, আর যাঁদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে, সেই কৃষকদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে।
কৃষকের আস্থাও এখানে বড় বিষয়। একজন কৃষক তখনই নিজের জমি, ঋণ, আয় বা ক্ষতির সঠিক তথ্য দেবেন, যখন তিনি বিশ্বাস করবেন যে এই তথ্য তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না এবং তা কোনো কাজে লাগবে। শাইখ সিরাজের দীর্ঘদিনের মাঠের কাজের সুবাদে কৃষকের সঙ্গে যে পরিচিতি ও যোগাযোগ গড়ে উঠেছে, তা এই আস্থা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাঠামো তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণে পদ্ধতিগত শৃঙ্খলা আনতে পারে। দুই পক্ষের শক্তি মিলিয়ে কাজ করাই এই অংশীদারত্বের সম্ভাবনার জায়গা।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, তথ্য দিয়ে কৃষক নিজে কী পাবেন। তথ্যের উৎস যে কৃষক, গবেষণার ফল তাঁর কাছে ফিরে গেলে তবেই চক্রটি পূর্ণ হয়। উদ্যোগটির ঘোষিত লক্ষ্য, অর্থাৎ কৃষকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা, সেই দিকেই ইঙ্গিত দেয়।
কৃষি ও সামাজিক গবেষণার জন্য শক্ত ভিত্তি
এনএসইউ ও শাইখ সিরাজ ইনিশিয়েটিভের এই সহযোগিতা বাংলাদেশের কৃষি ও সামাজিক গবেষণা এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের জন্য একটি শক্তিশালী তথ্যভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মাঠপর্যায়ে সৃষ্ট তথ্যকে ভবিষ্যতের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ এবং দেশের কৃষি ও সামাজিক বাস্তবতা আরও গভীরভাবে বোঝার কাজে ব্যবহার করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কৃষি আর সমাজ এখানে আলাদা নয়। একজন কৃষকের ফলন শুধু মাটি, বীজ আর আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তাঁর ঋণ পাওয়ার সুযোগ, পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, বাজারে যাওয়ার রাস্তা, এমনকি পরিবারের নারী সদস্যদের শ্রমের ওপরও। তাই কৃষি তথ্যের সঙ্গে সামাজিক তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগ থাকলে গ্রামীণ জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। কৃষি ও সামাজিক গবেষণাকে একসঙ্গে রাখার পেছনে এটাই সম্ভবত যুক্তি।
কৃষকের খাতায় লেখা বা স্মৃতিতে থাকা যে তথ্য একসময় মৌসুম শেষে হারিয়ে যেত, তা যদি গুছিয়ে রাখা যায়, তবে আজকের একজন কৃষকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে আগামী দিনের কোনো গবেষকের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। দুই প্রতিষ্ঠানের এই যৌথ উদ্যোগ সেই পথেই একটি পদক্ষেপ।




মন্তব্য
(০)