২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে চীনের বেইজিং বা পেকিন জাতের হাঁস পালন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। জাগো নিউজের ২৭ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাংস উৎপাদনের পাশাপাশি এই হাঁস গ্রামের অনেক বেকার মানুষের আয়ের পথ খুলে দেয় এবং নারী-পুরুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ তখন জানায়, জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার হাঁসের খামার আছে, যার মধ্যে ৬ শতাধিক খামারি পেকিন জাতের হাঁস পালন করছেন।
রাজারহাটে উঁচু মাচায় হাঁসের খামার
রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট মাধাই গ্রামের খামারি মীর মোশারফ হোসেন আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে উঁচু মাচার ওপর পেকিন হাঁসের খামার গড়ে তোলেন। প্রতিবেদনের সময় তাঁর খামারে ছিল ১ হাজার পেকিন হাঁস। দেশজুড়ে চাহিদা থাকায় তিনি অনলাইনের মাধ্যমে ঢাকা, কুমিল্লা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় হাঁস বিক্রি করছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর খামারে এলাকার অর্ধশতাধিক বেকার নারী-পুরুষের কাজের সুযোগ হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সঠিক পরিচর্যা ও সুষম খাবারে ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিটি হাঁস গড়ে ৩ থেকে ৪ কেজি ওজনের হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ‘কৃষিকথা’য় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধের হিসাব কিছুটা ভিন্ন: সেখানে বলা হয়, আট সপ্তাহ বয়সে পুরুষ পেকিন হাঁসের ওজন সর্বোচ্চ ৪ কেজি এবং মাদি হাঁসের ৩ দশমিক ৭ কেজি হয়।
বার্ড ফ্লুর ক্ষতির পর হাঁসের খামার
মোশারফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাংক লোন নিয়ে ২০২২ সালে ১০ হাজার ব্রয়লার মুরগি পালন শুরু করি। এর মধ্যে বার্ড ফ্লু রোগে আক্রান্ত হয়ে সব মুরগি মারা যায়। খামারের ব্যবসায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খামারটি বন্ধ করে ফেলি। পরে একটি বেসরকারি সংস্থার পেকিন হাঁসের সাইনবোর্ড দেখে উদ্বুদ্ধ হই। ওই সংস্থার সহায়তায় ১০০ হাঁস দিয়ে শুরু করি খামার। এখন অনেক লাভ হয়।’
২০১০ সালে ‘প্রিভেন্টিভ ভেটেরিনারি মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, অত্যন্ত সংক্রামক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এইচ৫এন১, যা বার্ড ফ্লু নামে পরিচিত, বাংলাদেশের পোলট্রিতে প্রথম ধরা পড়ার খবর আসে ২০০৭ সালের মার্চে। খামারে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে বা টিকার সময়সূচি জানতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
খামারে গ্রামের নারীদের কাজ
খামারে কাজ করা রহিমা বেগম, মোসলেমা খাতুন ও খাদিজা বেগম বলেন, ‘সংসারের কাজের ফাঁকে ২৫-৩০ জন নারী খামারে কাজ করছি। প্রতি সপ্তাহে ২-৩ দিন করে কাজ করা যায়। দিনমজুরি হিসেবে ৩০০ টাকা এবং চুক্তিভিত্তিক জবাইকৃত হাঁস প্রসেসিং করলে প্রতি পিস হাঁস ২৫-২৭ টাকা পাওয়া যায়।’
রাজারহাট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রহমত আলী বলেন, ‘দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাও ভূমিকা রেখে চলেছে। খামারিদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।’

পেকিন হাঁস কেমন জাত
কৃষিকথার ওই নিবন্ধ অনুযায়ী, পেকিন জাতের উৎপত্তি চীনে। দেশি হাঁসের তুলনায় এটি আকারে প্রায় দ্বিগুণ, শরীর ধবধবে সাদা পালকে ঢাকা, ঠোঁট ও পায়ের পাতা কমলা রঙের। খাদ্যকে মাংসে রূপান্তরের দক্ষতা প্রায় ২ দশমিক ৭। এ হাঁস পালনে পুকুর লাগে না, মুরগির মতো মাচা পদ্ধতিতে পালন করা যায়। নিবন্ধে প্রতি ১০০টি হাঁসের জন্য ৩০ ফুট লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া ঘর এবং মাটি থেকে আড়াই ফুট উঁচু মাচার কথা বলা হয়েছে। প্রথম সপ্তাহে ক্রাম্বল ও দ্বিতীয় থেকে অষ্টম সপ্তাহ পর্যন্ত পিলেট খাবার এবং নিয়মিত টিকা দেওয়ার কথাও আছে। টিকা ও ওষুধের মাত্রা জানতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমেরিকান পেকিন’ নামে পরিচিত এই জাত প্রায় পুরোপুরি মাংসের জন্যই পালন করা হয়। একটি পেকিন হাঁসি বছরে ১৫০টির বেশি সাদা ডিম দিতে পারে, তবে তা দিতে ভালো নয় বলে ডিম ফোটাতে প্রায়ই কৃত্রিম উপায় লাগে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২২ সালের ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স’ অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে হাঁসের সংখ্যা ছিল ৬৩৮ দশমিক ৪৫ লাখ।

কুড়িগ্রাম জেলা
কুড়িগ্রাম রংপুর বিভাগের একটি সীমান্তবর্তী জেলা। এর আয়তন ২ হাজার ২৪৫ দশমিক ০৪ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ৯টি। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদী জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে, আছে দুধকুমার ও ফুলকুমারের মতো ছোট নদীও। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ২৩ লাখ ২৯ হাজার ১৬০।

ছবি: Katie Chodil / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, প্রিভেন্টিভ ভেটেরিনারি মেডিসিন, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)